মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর গড়ে ৪০,০০০ মানুষ বন্দুকবাজিতে নিহত হয়। ২০২৪ সালে এই ৪০,০০০ মৃত ব্যক্তির নামের মধ্যেই একটি নাম হতে পারত প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের। হয়নি, কিন্তু হবে না এমন কথাও হলফ করে বলতে পারছেন না মার্কিন গোয়েন্দারা।
মার্কিন দেশে যে কেউ দোকানে গিয়ে সেমি-অটোমেটিক রাইফেল কিনতে পারে। আমাদের দেশে মানুষের মন ভেঙে গেলে সে মাতলামি করতে পারে, নাওয়া খাওয়া ছেড়ে কৈকেইয়ের মত কোলবালিশে মাথা গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে পারে বা প্যানপেনে দুঃখের গানও ধরতে পারে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক নিয়ে গুলি ছুড়তে বেরিয়ে পড়তে পারে। বিচিত্র কারণে দুঃখে থাকা, ভগ্নহৃদয় মানুষের হাতে গর্জে ওঠা গান, লাশ ফেলে দেয় লাস ভেগাসে, কখনো বা কোনো স্কুলে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২০২১ সালে, অর্থাৎ করোনার বাজারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকবাজির আমোদে সবচেয়ে বেশি সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাটা ৪৮,৮৩০ জন, বলছে পিউ রিসার্চ। যে সময় তথাকথিত স্বৈরাচারী চীন, ভিয়েতনাম সরকারি চিকিৎসার বিস্তার ঘটিয়ে, রাস্তার মোড়ে মানুষ ধরে মুখে থার্মোমিটার গুঁজে দিয়ে, লকডাউনে বাড়িতে খাবার, ওষুধ পৌঁছে দিয়ে এবং বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত তার নাগরিকদের পুলিস দিয়ে পিটিয়ে, থালা বাজিয়ে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছিল, তখন মার্কিনিরা তৃতীয় পথ বেছে নেয়। বন্দুক বিক্রির বাজার তুঙ্গে ওঠে। তুঙ্গে ওঠে বন্দুকবাজিতে মৃতের সংখ্যাও।
মেলায় পাঁপড়, জিলিপি কেনার ব্যক্তিস্বাধীনতার মত বন্দুক কেনার স্বাধীনতা থাকা উচিত কিনা এই নিয়ে মার্কিন দেশে বিতর্ক আছে। এই বিতর্কে ট্রাম্পরা বন্দুক কেনার স্বাধীনতার পক্ষে। তাঁদের দাবি – মানুষ বন্দুক চালিয়ে মানুষ খুন করে, বন্দুক নিজে নিজে চলে না। তাই দোষটা বন্দুকের নয়, দোষটা মানুষের। দোষী মানুষকে আটকানো উচিত, বন্দুককে নয়। মার্কিন সরকার দেশের বাইরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অকারণ গোলমাল পাকিয়ে যেমন মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাজার তৈরি করে, তেমনি দেশের ভিতরের বাজারটিও তারা ছাড়তে নারাজ। তাই ট্রাম্পের উপর হামলার পরেও বন্দুকবিলাসের ব্যক্তিস্বাধীনতা রিপাবলিকানরা ছাড়তে নারাজ।
থমাস ম্যাথু ক্রুক নামে যে ছেলেটি ট্রাম্পের উপর গুলি চালায়, সে ঠিক কেন গুলি চালিয়েছিল তা দুনিয়ার সবচেয়ে ধুরন্ধর বলে চিত্রিত মার্কিন গোয়েন্দারা এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি। পাঁচটা গুলি চালিয়ে একজনকে হত্যা এবং ট্রাম্প সহ তিনজনকে আহত করার পরেই যেহেতু নিরাপত্তারক্ষীরা ক্রুককে হত্যা করে, ফলত ক্রুকের কোনো বক্তব্য জানা আর আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সে কোনো নকশাল মার্কা পোস্টার বা লিফলেটও ছড়িয়ে যায়নি। সুতরাং তার উদ্দেশ্য জানতে গেলে আমাদের মার্কিন গোয়েন্দাদের উপরেই নির্ভর করতে হবে। অবশ্য এও হামলার যদি সত্যিই কোনো উদ্দেশ্য থেকে থাকে, ‘জাস্ট ফর ফান’ না হয়ে থাকে। এটুকু কিন্তু জানা গেছে যে ক্রুক একজন নথিভুক্ত রিপাবলিকান ছিল। যদিও সে একবার এক ডেমোক্র্যাটপন্থী সংগঠনকে কিছু টাকা অনুদান দিয়েছিল।
ট্রাম্প সমর্থকরা যখন প্রশ্ন তুলছেন ট্রাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মহিলাদের খাটো উচ্চতা নিয়ে, বা woke মহিলাদের বাইডেন প্রশাসনের নিরাপত্তার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়োগ নিয়ে, বা কীভাবে নিরাপত্তাকর্মীদের নজর এড়িয়ে আততায়ী ট্রাম্পকে আক্রমণ করতে পারল তা নিয়ে, তখন মার্কিন গোয়েন্দারা নতুন তত্ত্ব সামনে এনেছেন। সেটা হল ইরান নাকি ট্রাম্পকে হত্যা করতে চায়। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে ট্রাম্পের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের মুখপাত্র এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও, ইরানের ট্রাম্পকে হত্যা করতে চাওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিকত্ব কিছু নেই। ২০২০ সালে রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় ট্রাম্প ইরানের সেনাপতি কাসেম সোলেমানিকে ড্রোনের মাধ্যমে ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরে হত্যা করেন বলে নিজেই দাবি করেছিলেন। ইরান থেকে বহুবার হুমকি এসেছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে, ২০২০ সাল থেকেই তা চলছে। তাছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন কোনো রাষ্ট্রপতি মার্কিন দেশে ক্ষমতায় আসেননি, যিনি অন্য দেশে গণহত্যা চালাননি। ফলত প্রত্যেকটি দেশের নাগরিক যদি সত্যি বদলা নিতে চাইতেন বা বদলা প্রচেষ্টার সামর্থ থাকত, তাহলে প্রত্যেক প্রাক্তন এবং ক্ষমতায় থাকা মার্কিনি রাষ্ট্রপতিকে প্রতিদিনই হয়ত প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়তে হত। এই কথা মার্কিন নিরাপত্তা আধিকারিকরা জানেন না তা তো নয়। ফলত নতুন করে ইরানের জুজু দেখিয়ে, নতুন করে ট্রাম্পের নিরাপত্তা জোরদার করার গন্ধটা খুব সন্দেহজনক।
আরো পড়ুন বারোটা বাজতে দেড় মিনিট: ২০২৪ সালে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে
প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে ট্রাম্প যেদিন জো বাইডেনকে নাস্তানাবুদ করলেন, সেদিনই বোঝা গিয়েছিল তিনি ফাঁপরে পড়েছেন। বাইডেন সেই পরাজয়ের ব্যাখ্যায় স্কুলের শিশুদের মত ঘুম না হওয়ার অজুহাত দিয়েছিলেন। সে বিড়ম্বনা কাটতে না কাটতেই ১১ জুলাই ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভোলোদিমির জেলেনস্কিকে ‘প্রেসিডেন্ট পুতিন’ বলে ডেকেছেন। তার দুই ঘন্টা পরে নিজের উপরাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিসকে ডেকেছেন ট্রাম্প বলে। এর আগে জি৭ বৈঠকে একসাথে ছবি তোলার সময়ে বাইডেনকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ধরে এনে ঠিক জায়গায় দাঁড় না করালে বাইডেন হেঁটে হেঁটে কোথায় যে চলে যাচ্ছিলেন কেউ জানে না।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তিধর দেশের সর্বোচ্চ কর্তার এই অবস্থা হলে ভারতের বা বাকি দুনিয়ার কিছু এসে যাওয়ার কথা ছিল না, যদি না মার্কিন রাষ্ট্রপতির নিজেকে পৃথিবীর রাষ্ট্রপতি ভাবার এষণা থাকত। উন্মাদকে এমনিতে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বন্দুকধারী উন্মাদ গুরুত্ব আদায় করে নেয়। মার্কিন দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি যেন বর্তমানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের করুন দশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। বর্ষীয়ান গণহত্যাকারী বাইডেনের এই শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সাম্প্রতিককালের ব্যাপার নয়। বছরখানেক ধরেই তিনি অহেতুক উলটে পড়ে যান, কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলেন তার ঠিক নেই। ফলত তাঁর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। তারপরেও কেন ৮১ বছরের বাইডেনকেই আসন্ন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী হতে হল? কেন ডেমোক্র্যাটরা অন্য কোনো মুখ খুঁজে পেল না, তাও কৌতূহলোদ্দীপক। এতদিনে প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে নাস্তানাবুদ হওয়ার পর ডেমোক্র্যাটদের ভিতর থেকেই সরে যাওয়ার চাপের মুখে বাইডেন ঘোষণা করেছেন তিনি আর নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন না। এমনটা না করে উপায়ও ছিল না, কারণ ডেমোক্র্যাটদের তহবিলে মোটা টাকা দেন যে অতিধনী ব্যবসায়ীরা, তাঁদের একাংশও ঘোষণা করেছিলেন যে বাইডেন না সরলে তাঁরা টাকা ঢালবেন না।

চীনা কমিউনিস্ট মাও সে তুং বলেছিলেন, ১০০% বিজয় অর্জনের গ্যারান্টি ছাড়া লড়তে যেতে নেই। কেউ অস্বীকার করবেন না, পুঁজিপতিরা কমিউনিস্টদের থেকে বেশি সেয়ানা। এ ক্ষেত্রে ১০০% হারের সম্ভাবনা অনুধাবন করলে বাবু কেন ঘোড়ার পেছনে পয়সা লাগাতে যাবেন?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







