বুদ্ধ উইপস ইন জাদুগোড়া তথ্যচিত্র খ্যাত শ্রী প্রকাশের জীবনের একটা ঘটনার কথা পড়েছিলাম।

শ্রী তখন দিল্লিতে থাকতেন, ভিসিআর সারানোর কাজ করছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের খুঁটিনাটি বুঝতে CENDIT (সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অফ ইনস্ট্রাকশনাল টেকনোলজি) -এ নিয়মিত যাতায়াত। তখন নয়ের দশক, বিহার ভেঙে ঝাড়খণ্ড হতে কিছু দেরি আছে। উক্ত সংস্থা আয়োজিত এক কর্মশালায় বাংলাদেশের কিছু নির্মাতাও উপস্থিত ছিলেন। শ্রী সেখানে মাঝেমধ্যে ক্যামেরার পিছনে দাঁড়ানোর দায়িত্ব পান। একদিন ভূমিহারা এক বৃদ্ধ কৃষক সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন ক্যামেরার সামনে। ঘর হারানোর কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিলেন, আর তা দেখে ‘পেশাদার’ পরিচালক সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে। নির্দেশ শুনে হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রী। মানুষের প্রতি এতটুকু সমবেদনা নেই, এরা আসে ছবি বানাতে? পত্রপাঠ নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে সেই কর্মশালা থেকে শ্রী বিদায় নেন। নিজেকে ‘অ্যাকসিডেন্টাল ফিল্মমেকার’ বলা শ্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ছবি বানালে তা বানাবেন মানুষের জন্য, এবং কোনো সহানুভূতি দেখানো মেকি পদ্ধতিতে নয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সেই শ্রী কয়েক বছর পরে বানালেন বুদ্ধ উইপস ইন জাদুগোড়া। ঝাড়খণ্ডের জাদুগোড়ায় ইউরেনিয়াম উত্তোলনের ফলে প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তার শিকার হওয়ার মানুষের গল্প বলল সেই ছবি। যে মানবিকতার অভাব নাড়িয়ে দিয়েছিল শ্রীকে, এই ছবি বানাতে তা যেন উজাড় করে দিতে চাইলেন। ছবি নির্মাতা হওয়ার আগে বন্ধু হলেন সকলের, চুপিসাড়ে চলেছিল ছবির নির্মাণ। গ্রেফতারিও টলাতে পারেনি।

শিল্পমাধ্যম হিসাবে চলচ্চিত্রের শক্তি অসীম। অন্তত বিশাল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে সে অনেকাংশেই এগিয়ে। কিন্তু ইতিহাস বিচার করলে দেখা যাবে, সে শক্তির অপব্যবহার হয়েছে আকছার। আফ্রিকায় গিয়ে প্রথম যিনি ভারতীয় ছবি বানিয়েছিলেন (আফ্রিকা মে হিন্দ, ১৯৩৯), সেই হীরেন্দ্রকুমার বসুর আফ্রিকা ভ্রমণের স্মৃতিকথা বনে জঙ্গলে পড়লেই জানা যায়, ছবি ব্যবসার স্বার্থে একসময় হলিউডি নির্মাতারা সে মহাদেশে গিয়ে যা যা করেছেন, তা কোনো অংশে ঔপনিবেশিক শোষণের চেয়ে কম ঘৃণ্য নয়। স্রেফ ছবির দর বাড়াতে কত যে সিংহ হত্যার ছবি তোলা হত ক্যামেরায়, তার লেখাজোখা নেই। আজকের ব্যবসাসর্বস্ব রাজনীতির যুগে মৃত্যুও মুনাফা উৎপাদক পণ্য, নিরীহ মানুষকে হেনস্থার ভিডিও রিল ভাইরাল হয়, সেখানে ছবি বানানোর নামে মানবিকতা বিসর্জন দেওয়াই যেন বাস্তব।

ঠিক এই অবক্ষয়ের শিকড়েই প্রথম আঘাতটা হানে কবিতা লঙ্কেশ নির্দেশিত তথ্যচিত্র গৌরী।

সম্প্রতি কলকাতায় পিপল’স ফিল্ম কালেক্টিভের উদ্যোগে দেখানো হল ছবিটা। ২০১৭ সালে হিন্দুত্ববাদী আততায়ীর গুলিতে শহিদ সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট গৌরী লঙ্কেশের জীবনালেখ্য। ঘটনা পারম্পর্য জুড়ে, নানা মুহূর্তের কোলাজে বানানো ছিমছাম ছবি। ২০২৩ সালে কানাডার মনট্রিয়লে সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘বেস্ট লং ডকুমেন্টারি’ পুরস্কার পেয়েছিল ছবিটি। গৌরীর লড়াই, গৌরীর হাসি, গৌরীকে নিয়ে নানাজনের স্মৃতিচারণার ফাঁকে ফাঁকে ছবি নির্মাতার নিজস্ব অনুভবের যে অন্তঃসলিলা প্রবাহ, তা যেন ঢেকে দিচ্ছিল ছবির শক্তি কিংবা দৌর্বল্যকে।

‘আপনি আমাদের রোজ ধন্যবাদ দেন কেন?’ গৌরীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রের এক সাংবাদিক। গৌরী তাঁর উত্তরে বলেছিলেন ‘আপনাদের সময়, কর্মদক্ষতা আমি টাকার বিনিময়ে কিনে নিচ্ছি, কিন্তু কাজের প্রতি আপনাদের যে দায়বদ্ধতা, সেটা কেনার ক্ষমতা তো আমার নেই। সেই দায়বদ্ধতা আপনারা রোজ দেখিয়ে চলেছেন, সেটা মনে রেখে রোজকার এই ধন্যবাদ দেওয়া, আপনাদের সম্মান জানানো।’

পরে একসময় সংবাদপত্র চালানো মুশকিল হয়ে পড়ল। কর্পোরেট বা সরকারি বিজ্ঞাপন নিতেন না গৌরী, সঙ্গে একের পর এক মামলা। গৌরীর সহকর্মী শরিফা স্মৃতিচারণা করছেন, গৌরী তাঁকে বলেছেন, কিছু বিমা পলিসি ম্যাচিওর করায় হাতে টাকা এসেছে, তা থেকেই কর্মীদের বেতন দিয়েছেন তিনি। শাহাদত বরণের দু সপ্তাহ আগে গৌরী ভাবছেন, কাগজটা এবার বন্ধ করে দেবেন।

এমন একজন ব্যক্তিত্বের জীবন নিয়ে কাজ। সেখানে ক্যামেরা অ্যাঙ্গল বা দৃশ্যসজ্জায় যে বড় রকমের পরীক্ষানিরীক্ষা কবিতা করেছেন তেমনটা নয়। বরং সাবেকি ধাঁচেই ভাষ্য নির্মাণে মন দিয়েছেন। সাংবাদিক গৌরী, আন্দোলনকারী গৌরী, পারিবারিক গৌরীর নানা মুহূর্ত ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, গৌরীর লেখা সম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। কথা বলেছেন কবিতার স্কুলপড়ুয়া মেয়ে এষা লঙ্কেশও। মাসির কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে এসেছে তাঁর। গৌরীর স্মরণসভায় কথা বলতে উঠেছেন তাঁদের মা, ইন্দিরা লঙ্কেশ। কিন্তু ব্যাকরণ কবিতা ভেঙেছেন অন্য এক জায়গায়। তিনি যে গৌরীর ছোট বোন, গৌরীর জীবনের সিংহভাগ জুড়ে তাঁর থাকা, পেশাদারিত্ব বজায় রেখেও সেই আত্মিক বন্ধনের সত্যকে সচেতনভাবেই অস্বীকার করতে চাননি কবিতা। বেশ করেছেন চাননি। মাঝেমধ্যেই তথ্যচিত্রের সাধারণভাবে অনুসৃত নিয়ম ভেঙে ফেলে নির্দেশক নিজেই বসে পড়েছেন ক্যামেরার মুখোমুখি। তখন তিনি আর গৌরীকে নিয়ে কথা বলছেন না, বলছেন তাঁর দিদিকে নিয়ে। গৌরীর অক্লান্ত কর্মজীবনকে ওভাবে ধরার পরও তাঁর মনে হয়েছে, এটুকু স্মৃতিচারণার প্রয়োজন আছে। এজন্য বোদ্ধাদের কাছে তিনি হয়ত সমালোচিত হবেন, কিন্তু এই সৎ সাহসের কাছে সেসব সমালোচনা ম্লান হয়ে যাবে।

ঠিক যেমন সমালোচনার জায়গা থাকবে খোদ গৌরীকে নিয়েও। বিশেষত, কুদরেমুখের জঙ্গল ঘেরা অঞ্চলে নকশালবাদী আন্দোলনকারীদের অস্ত্র বর্জনে রাজি করানোর প্রসঙ্গে। কিন্তু গৌরী সেসবকেও দিব্যি অতিক্রম করে যান সাকেত রাজনের রাষ্ট্রীয় হত্যার বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার লড়াই দিয়ে, উৎখাত হওয়া একগুচ্ছ জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে।

মুহূর্ত জুড়ে জুড়ে স্মৃতি তৈরি হয়, স্মৃতি জুড়ে জুড়ে মানুষ। কাজটা দেখতে বসে অমন নানা স্বাদের মুহূর্ত-স্মৃতির কোলাজ এত সাবলীলভাবে ফুটে উঠছিল, গৌরী লঙ্কেশ ক্রমশ আপনার হয়ে উঠছিলেন। আবার ঠিক পাশাপাশিই বুঝতে পারছি, গৌরীর সঙ্গে পা মেলানো নেহাত সহজ কাজ নয়, তিনি সরে যাচ্ছেন দূরে!

আরো পড়ুন সাহিত্য ও সাংবাদিকতা: এ বড় সুখের সময় নয়

শুরুর দিকে সংক্ষিপ্ত পরিচয়পর্ব শেষ হতে না হতে আমরা পৌঁছে যাচ্ছি কর্ণাটকের সবুজ শৈলাবাস চিকমাগালুরে। বাবরি ধ্বংসের পর প্রায় এক দশক অতিক্রান্ত। গুজরাট দাঙ্গার সমসাময়িক ঘটনা। বাবা বুদান গিরি, যেখানে সপ্তদশ শতকীয় সুফি সাধক বাবা বুদানের নামাঙ্কিত দরগা ও দত্তাপীঠের পাশাপাশি থাকা নিয়ে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি, একুশ শতকে এসে সেখানে ঠিক অযোধ্যার ঢঙে হট্টগোল শুরু করল হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। মুসলিমদের সমাধিক্ষেত্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হল। নাট্যব্যক্তিত্ব গিরিশ কারনাড, কে মারুলাসিদ্দাপ্পা, সাহিত্যিক জিকে গোবিন্দ রাও, শূদ্র শ্রীনিবাস, অধ্যাপক ভিএস শ্রীধরের সঙ্গে পথে নামলেন গৌরীও।

কবিতার ছবিতে উঠে আসছে, পুলিশ গ্রেফতার করছে গৌরীসহ বিরাট সংখ্যক আন্দোলনকারীকে। গারদে বসেই নিজের কাগজের জন্য সম্পাদকীয় লিখে পাঠাচ্ছেন গৌরী। তখন সোশাল মিডিয়ার সুবিধা নেই, ইন্টারনেট ব্যবস্থাও তত ভাল নয়। কোনোমতে একটা ল্যাপটপ জোগাড় করে চলছে কাজ, তার মাঝেই রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে চলছে তর্ক বিতর্ক। সেই মুহূর্তেও কথা বলতে বলতে হেসে ফেলছেন গৌরী, আমরা রোমাঞ্চিত হচ্ছি।

গৌরীরা হেরে যাচ্ছেন একসময়, আরও এক দশক পর খুন হচ্ছেন। তাতেও অতটা বিচলিত হচ্ছি না আমরা। কারণ ওদিকে জিগ্নেশ মেওয়ানি এসে পড়েছেন, উমর খালিদ এসে পড়েছেন। গৌরীর মৃত্যুবার্ষিকীর দিন উমর মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলে দিচ্ছেন খুব মৌলিক অথচ খানিক স্বল্পালোচিত এক বয়ান ‘গৌরী লঙ্কেশ মহিলা, নিজের কর্মদক্ষতার জোরে প্রতিষ্ঠিত মহিলা, এবং একার শর্তে বাঁচা মহিলা। তাই তিনি এমনিই বিজেপি-আরএসএসের শত্রু।’ কবিতা অশেষ কষ্ট চেপে এক পর্যায়ে ঘোষণা করছেন ‘গৌরী চিরকাল আশাবাদী ছিলেন। ওকে হত্যা করে ওরা হয়তো সেই আশাকেই গলা টিপে মারতে চাইল।’

এসব কথা শুনে আরও জোর পাই। অজান্তেই হাতের পাঁচ আঙুলের ওপর এসে বসে আরও পাঁচটা আঙুল, কাঁধের পাশে আরেকটা কাঁধ।

আবার ভয়ও পাই, যখন পরের ফ্রেমেই দেখতে পাই জনমঞ্চে দাঁড়িয়ে হিন্দুত্ববাদী নেতা সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন ‘এই গৌরী লঙ্কেশ গ্রেফতার হয়ে গিয়ে বেঁচে গেল, নয়তো ওই বাবা বুদান পাহাড়ের চূড়োয় ওকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিতাম আমরা (‘ধর্ষণ’-এর উল্লেখটা তখনও বুঝি ‘ট্রেন্ডি’ হয়নি)।’ যেমন তেমন ভয় নয়, যে বিপদ আছে জেনেও দূরে আছে ভেবে নিশ্চিন্ত থাকতে চেয়েছি এতদিন, অবশেষে হঠাৎ সে বিপদ নগ্ন, বীভৎস চেহারা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালে যে ভয় এসে ঝাপটা মারে, সেইরকম এক ভয়।

কিন্তু এমনই এক ব্যূহের মধ্যে ঢুকে পড়েছি তখন, বীভৎসতা দেখেও তাকে আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় থাকে না, বসে থেকে হজম করতে হয়, মেনে নিতে হয়। সোশাল মিডিয়ায় কয়েকখানা সরকারবিরোধী লেখা লিখেই আমরা যারা পরমুহূর্তে সচ্ছলতাটুকু খুঁজে নিয়ে বাঁচতে চাই (আসলে পালাতে চাই), তাদের সামনে আয়নার মত এসে দাঁড়ায় গৌরী ছবিটা।

তারপর, সেই ক-এর মেজোমামার মত সজোরে কানমলা দিয়ে বলবে ‘চেয়ে দেখ, এই মৃত্যু উপত্যকাই তোর দেশ।’

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.