‘আমাদের যারা আঘাত করবে, আমরাও তাদের আঘাত করব। ইরানের এমন কোনো কোণ নেই, ইজরায়েলের লম্বা হাত যেখানে পৌঁছতে পারে না। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই একথা প্রযোজ্য।’ সম্মিলিত রাষ্ট্রপুঞ্জের অধিবেশনে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই কথাগুলো বলার কয়েক ঘন্টা পরেই লেবাননের রাজধানী বেইরুটে ইজরায়েলের ভয়ানক আক্রমণে নিহত হন হিজবুল্লা প্রধান হাসান নাসারুল্লা।
গত দুসপ্তাহ ধরে লেবাননে হামলা চালাচ্ছিল ইজরায়েলের সেনাবাহিনী। শুক্রবারের আক্রমণে প্রায় ৮৫ টন বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে ইজরায়েল। তাদের নিক্ষিপ্ত প্রতিটি বোমার ওজন এক টন, অর্থাৎ ১,০০০ কিলোগ্রামেরও বেশি। বেইরুটের মত ঘন জনবসতিপূর্ণ একটি শহরে এই হামলার পরিণাম কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। বড় বড় গর্ত হয়ে তার মধ্যে ধসে পড়েছে বহুতল বাড়ি আর সেগুলির নিচ থেকে মৃতদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
গাজাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পিছনে ইজরায়েলের যে যুক্তি, নাসারুল্লা হত্যার পিছনেও যুক্তি সেই একই – আত্মরক্ষার অধিকার। নাগরিকদের সুরক্ষার অজুহাতে যে কোনো অপকর্ম করতে পারে ইজরায়েল। আর যথারীতি, ইজরায়েলের পরম সখা মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনও এই হামলাকে ‘ন্যায়বিচারমূলক পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছেন। গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লা, ইয়েমেনের হুতি, কিম্বা ইরানের হামলা অথবা সম্ভাব্য হামলা – এসবের থেকে আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে ইজরায়েলের এবং সেই অধিকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। তাতে ওই দেশগুলির অসংখ্য সাধারণ নাগরিক মারা যেতেই পারেন। সে দায় অবশ্যই ইজরায়েলের নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তো নয়ই। প্রসঙ্গত, ওই ১,০০০ কিলোর বোমাগুলির এক বড় অংশ ইজরায়েলকে সরবরাহ করে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই।
গত ৩০ বছর ধরে হিজবুল্লার নেতৃত্ব দিয়েছেন নাসারুল্লা। অসংখ্যবার প্রাণে বেঁচেছেন তিনি। ইউরোপ, আমেরিকাসহ পশ্চিমি প্রথম বিশ্ব তাঁকে একজন হত্যাকারী ও সন্ত্রাসবাদী শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করলেও, তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের অনন্য দিক নির্দেশক, আরবদের রক্ষাকর্তা।
১৯৮২ সালে লেবাননের মাটিতে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর দখলদারি ঠেকাতেই গড়ে উঠেছিল শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহ। তার ঠিক আগেই ঘটে গিয়েছে ইরানের ইসলামিক অভ্যুত্থান। আয়াতোল্লা খোমেইনির সাংগঠনিক কাঠামোর অনুসরণে লেবাননের বিভিন্ন শিয়া গোষ্ঠীগুলিকে একত্রিত করে গড়ে ওঠা হিজবুল্লা বরাবরই ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সম্পর্ক রেখেছে। ইজরায়েলকে নির্মূল করা ও ইরানের প্রতি আনুগত্যের পাশাপাশি লেবাননে পশ্চিমি প্রভাব প্রতিহত করাও ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। দ্বিমেরু বিশ্বের দুই শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন – উভয়কেই শত্রু মনে করত তারা। ১৯৯২ সালে এহেন হিজবুল্লার দায়িত্ব নেন হাসান নাসারুল্লা, ইজরায়েলকে দমন না করা পর্যন্ত অস্ত্রত্যাগ না করার অঙ্গীকারসহ।
আরো পড়ুন বন্দুকপন্থী ট্রাম্প আক্রান্ত হতেই ইরানের দোষ?
লেবানন ভূখণ্ড থেকে ইজরায়েলকে বিতাড়িত করার পরেও ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে হিজবুল্লা। তাছাড়াও বসনিয়ার যুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবক পাঠিয়ে সাহায্য করেছে বসনিয়ান সেনাবাহিনীকে। সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে স্থানীয় শক্তিগুলিকে প্রশিক্ষণ দিতে নিযুক্ত করেছে নিজেদের আধাসামরিক বাহিনীকে।
পরবর্তীকালে হিজবুল্লা মূল ধারার রাজনীতিতে মিশেছে, লেবাননের সংসদে তাদের প্রতিনিধি আছেন। নিজস্ব রেডিও, স্যাটেলাইট, সামরিক বাহিনী ছাড়াও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক কর্মকাণ্ডেও হিজবুল্লা যুক্ত। নাসারুল্লার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালে হিজবুল্লার সশস্ত্র যোদ্ধার সংখ্যা ছিল এক লক্ষ।
গতবছর অক্টোবরে ইজরায়েল বনাম হামাস যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই প্যালেস্তাইনের প্রতি সংহতি জানিয়ে এসেছে হিজবুল্লা। ইজরায়েলের দখল করা গোলান অঞ্চলে, এমনকি ইজরায়েলের অভ্যন্তরেও রকেট হামলা চালিয়েছে তারা। ইজরায়েলের ট্যাংক লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে, চালিয়েছে ড্রোন হামলাও। উত্তরে চুপ থাকেনি ইজরায়েলও। লেবাননে বিমান হামলার পাশাপাশি সাম্প্রতিককালের পেজার বিস্ফোরণের পিছনেও ইজরায়েলই রয়েছে বলে দাবি হিজবুল্লার। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, পেজার বিস্ফোরণে হিজবুল্লার ১,৫০০ যোদ্ধা আহত হয়েছে, অনেকেই স্থায়ীভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তারপরেও তেল আভিভের কাছে ইজরায়েলের ঘাঁটি লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে তারা।
নাসারুল্লার মৃত্যুতে আশঙ্কা ও শোক প্রকাশ করেছেন লেবাননের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী। ইরান, ইরাক ও ইয়েমেনের রাষ্ট্রপ্রধানরাও শোক প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে অনড় থাকার বার্তাও দিয়েছেন তাঁরা। নাসারুল্লার অভাব পূরণ করার মত নেতৃত্ব হিজবুল্লা হাজির করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে এখনো তাদের হাজার হাজার যোদ্ধা ছড়িয়ে রয়েছে লেবাননের ভিতরে ও বাইরে। তাদের সঞ্চিত অস্ত্রের পরিমাণও নেহাত কম নয় বলেই সকলের অনুমান।
তাই নাসারুল্লার মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির মোড় কোনদিকে ঘোরাবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে অনেকেরই বিশ্বাস, এই মৃত্যু হিজবুল্লাকে থামাতে পারবে না। বরং অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞর বক্তব্য, এটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও অবনতিরই ইঙ্গিত।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








