অগ্নিবেশ
কলকাতা হাইকোর্টের আলোকবৃত্তে থাকা বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলি পদত্যাগ করলেন এবং অব্যবহিত পরেই ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দিলেন। কর্মরত বিচারপতির এহেন পদত্যাগ এবং কালক্ষেপ না করেই রাজনৈতিক দলে যোগদানের নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেই। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এমন পদক্ষেপ রাজনৈতিক ও আইনি – উভয় মহলেই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
অভিজিৎ শুধুই কলকাতা হাইকোর্টের কর্মরত ৫১ জন বিচারপতির একজন ছিলেন না। তাঁকে বলা হচ্ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন যোদ্ধা, মসীহা, সাক্ষাৎ ভগবান। কারণ বিচার্য বিষয়ের তালিকায় (হাইকোর্টের পরিভাষায় ‘ডিটারমিনেশন’) শিক্ষা সংক্রান্ত মামলার বিচারের দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত থাকাকালীন তিনি এমন বেশকিছু নির্দেশ (প্রিয় পাঠক, ‘নির্দেশ’ শব্দটিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখবেন) দিয়েছেন, যার পরিণতিতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তভার পায়, এবং প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীসহ শিক্ষা দফতরের অনেক কর্তা গ্রেফতার হন, বিচারাধীন বন্দি হিসাবে তাঁদের কারাগারে ঠাঁই হয়। এক নির্দেশে সিবিআইয়ের বড়কর্তাকে আদালতে তলব করছেন, তো পরের নির্দেশেই মন্ত্রী সান্ত্রীদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার আদেশ জারি করছেন। আদালতের এমন ব্যতিক্রমী তৎপরতা স্বাভাবিকভাবেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকারের পরিকল্পিত শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির শিকার বঞ্চিত নিয়োগপ্রার্থীদের মধ্যে তো বটেই, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংবাদমাধ্যমের দৌলতে বিচারপতি গাঙ্গুলি হয়ে ওঠেন দুর্নীতিবিরোধী এক মহাযোদ্ধা (প্রিয় পাঠক, মনে করুন আজ থেকে এক দশক আগে দিল্লির যন্তর মন্তরে এমনই এক দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল আন্দোলনের নায়ক আন্না হাজারে আবির্ভূত হয়েছিলেন)। বিচারপতি গাঙ্গুলি যখন একের পর এহেন নির্দেশ জারি করছিলেন, তখনো কতিপয় নিন্দুকেরা বলার চেষ্টা করছিলেন, তাঁর নির্দেশ আপাতদৃষ্টিতে যতই দুর্নীতিরোধী যাদু ঔষধ মনে হোক, আদতে সেগুলি সাংবিধানিক আদালতের স্বীকৃত বিচার প্রক্রিয়ার শর্ত লঙ্ঘন করছে। অবশ্য অভিজিতের ভক্তরা তখন এগুলিকে লঘু বিষয় হিসাবে তাচ্ছিল্য করেছিলেন এবং বলে বেড়িয়েছিলেন যে তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য যে দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং তার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আরেক দল গুণগ্রাহী (দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তাঁদের অনেকেই সোশাল মিডিয়ায় নিজেদের বামপন্থী হিসাবে পরিচয় দিয়ে থাকেন) তো এমন নিন্দুকদের সরাসরি শাসক তৃণমূলের অনুগ্রহপ্রার্থী বলে দাগিয়ে দেন। মনে রাখা প্রয়োজন, বিচারপতি গাঙ্গুলি তাঁর এজলাসে একাধিকবার বিচার বহির্ভূত বিষয়ে মন্তব্য করেছেন এবং অবধারিতভাবে তা সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে। সাংবিধানিক আদালতের বিচারক হিসাবে যে সংযম, সহনশীলতা ও বুদ্ধিদীপ্ত নির্লিপ্তি প্রত্যাশিত – বিচারপতি গাঙ্গুলি বারংবার তা লঙ্ঘন করেছেন। তিনি কখনো বলেছেন, কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়ে তিনি কাশ্মীরের পুলিশকর্মীদের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব দেখেছেন (কারণ একজন হাইকোর্টের বিচারপতির যে খাতির প্রাপ্য তা নাকি তাঁরা দিতে পারেননি); আবার কখনো কলমের খোঁচায় তিনি মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনটাই (যা একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সুপ্রিম কোর্টেও সেটির সাংবিধানিক বৈধতা স্বীকৃত) তুলে দিতে চেয়েছেন। এর কোনোটাই অবশ্য অভিজিতের গুণগ্রাহী মহলকে বিচলিত করেনি। তাঁরা বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের মসীহা ভাবমূর্তিতে ক্রমাগত সার, জল দিয়ে গেছেন। সেই সুযোগে অভিজিৎ জনপ্রিয় সংবাদ চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, ব্যাঙ্গালোর প্রোটোকলের দোহাই (পড়ুন, অপব্যাখ্যা) দিয়ে সেই সাক্ষাৎকারে তাঁর এজলাসেই বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। তবুও মোহভঙ্গ হয়নি। তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। আমরা মনে রাখব, যা কিছু জনপ্রিয়, যা কিছু জনগণের বৃহদংশের পছন্দ, তার সবকিছুই মহৎ নয়। সচেতন পাঠককে উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
সংবাদমাধ্যমের দৌলতে, নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করা এক শ্রেণির আইনবেত্তার নিরন্তর সমর্থনে জনমানসে গড়ে তোলা দুর্নীতিবিরোধী মহাযোদ্ধা ভাবমূর্তিকে পুঁজি করেই অভিজিৎ পদত্যাগ করলেন এবং ‘রাজনীতির বৃহত্তর ক্ষেত্রে’ পদার্পণ করলেন। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, হাইকোর্টের বিচারপতি হিসাবে তিনি অত্যন্ত দক্ষ, তাই বিচারবিভাগের আঙিনা ছেড়ে ‘জুরিস্ট’ কোটায় রাজনীতির ময়দানে পা রাখলেন – তা কিন্তু নয়। তেমন দাবি অবশ্য তিনি নিজেও করেননি। তিনি যে তত দক্ষ বিচারকও নন, তা বোঝার জন্য হাইকোর্টের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত এই তথ্যটুকুই যথেষ্ট যে প্রায় সাড়ে চার বছরের দায়িত্বকালে তিনি মাত্র ৩৮টি রায় (জাজমেন্ট) দিয়েছেন। প্রিয় পাঠক, আদালতের পরিভাষায় রায় হল কোনো মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি-আদেশ, যাতে থাকবে যুক্তিবিন্যাস, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রাসঙ্গিক উল্লেখ এবং যুক্তিনির্মিত নৈর্ব্যক্তিক উপসংহার। আইনি মহলে রায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আইনের ব্যাখ্যার নতুন দিগন্তের হদিশ দেয় একেকটি রায়, চলমান বিধিদর্শনের (জুরিসপ্রুডেন্স) মুকুটে জুড়তে থাকে নতুন নতুন পালক। বিচারপতি গাঙ্গুলি বিধিদর্শনের ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছেন, তাঁর অতি বড় গুণগ্রাহীও এমন দাবি করবেন না। তিনি মূলত এমন অনেক নির্দেশ জারি করেছেন, যা ব্যতিক্রমী, তাৎক্ষণিক ও জনচিত্তমোহিনী। সেগুলি নিঃসন্দেহে বিধিব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতায় হতাশ জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার করেছে, দুষ্ট মন্ত্রী সান্ত্রীদের কারান্তরালে নিক্ষেপিত হতে দেখে মানুষ এক ধরনের তৃপ্তি পেয়েছেন। নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তের সাপেক্ষে বিচার যে আদতে হবে নিম্ন আদালতে, সাক্ষ্য-প্রমাণ-বয়ান-প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্নের কষ্টিপাথরে যাচাই হয়ে তবেই যে অভিযুক্ত মন্ত্রী সান্ত্রীরা দোষী সাব্যস্ত হবেন অথবা বেকসুর খালাস হবেন – একথা প্রায় ভুলিয়ে দিয়েই অভিজিতের দুর্নীতিবিরোধী যোদ্ধা ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়েছে।
আরো পড়ুন ‘বুলডোজার জাস্টিস’ ন্যায়বিচার নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা
হাইকোর্টের এজলাস ছেড়ে এবার মুরলীধর সেন লেনের ভারতীয় জনতা পার্টির কার্যালয় থেকে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করবেন অভিজিৎ। তাঁকে বারবার রাজ্যের শাসক দল রাজনীতির ময়দানে নামতে আহ্বান জানানোয় একরকম বাধ্য হয়েই নাকি তিনি রাজনীতিতে এলেন। এই যুক্তি হাস্যকর, কারণ একজন বিচারপতি যদি তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব, কর্তব্য সম্পর্কে নিঃসংশয় থাকেন, তাহলে রাজনৈতিক দলের কটু মন্তব্যে তাঁর কোনো হেলদোল হওয়ার কথা নয়। বিচারপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েই একটি রাজনৈতিক দলে যোগদান করলে বরং এই অভিযোগকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয় যে তিনি বিচারকের আসনে বসে একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রগতিশীল রাজনীতির অনুশীলন যাঁরা করেন, তাঁদের তরফে প্রায়শই একটি সঙ্গত দাবি তোলা হয় – সাংবিধানিক আদালতের বিচারকদের অবসরের অব্যবহিত পরেই কোনও সরকারি পদে নিয়োগে আইনি নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা করা উচিত। নিদেনপক্ষে তিন বছরের ‘কুলিং অফ পিরিয়ড’ বলবৎ হওয়া উচিত। অবসরের পর সরকারি পদ অলঙ্কৃত করার মোহে বিচারক থাকাকালীন নিরপেক্ষ বিচারের অন্তরায় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে – এমন আশঙ্কা থেকেই এই দাবি ওঠে। একই কথা রাজনৈতিক দলে যোগদানের ক্ষেত্রেই বা প্রযোজ্য হবে না কেন? বিশেষত সেই দল যখন দেশের শাসক দল, রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে যাদের বিপুল নিয়ন্ত্রণ? ভুললে চলবে না, দুর্নীতি নিবারণের মহৎ প্রেরণা থেকে অভিজিৎ এসইউসিআই বা মার্কসবাদী ফরওয়ার্ড ব্লকে যোগ দেননি, দিয়েছেন ভারতীয় জনতা পার্টিতে। রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্রে সেই দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগ আছে, নানা দলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা পিঠ বাঁচাতে ওই দলে ভিড়েছেন। সুতরাং অভিজিৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কিমাশ্চর্যম তৎপরম! বাম মহলের কেউ কেউও তাঁর বিজেপিতে যোগদানকে সরাসরি নিন্দনীয় না বলে মোলায়েম স্বরে ‘এটা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’, ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ইত্যাদি বলে পাশ কাটাচ্ছেন। যেন তিনি কোনো বাম দলে যোগ দিলেই এতে গর্হিত কিছু থাকত না। বাম দলে যে হঠাৎ করে মঞ্চে উঠে হাতে পতাকা নিয়ে যোগ দেওয়া যায় না, সংগঠনের নিয়মে কিছু পথ পাড়ি দিয়েই সে দলের সদস্য হতে হয়, তাও বুঝি অনেকেই বিস্মৃত। অভিজিৎ বিচারকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে কোনও বাম দলে যোগ দিলেও তা গর্বের ব্যাপার হত না।
২০১৮ সালের মে মাসে অভিজিৎ কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন। কলকাতা হাইকোর্টের সুপারিশ, সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়ামের সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রপতির বকলমে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতিতেই এই নিয়োগ হয়ে থাকে। বিচারকের আসনে বসে, সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে তিনি হয়ে উঠলেন দুর্নীতিবিরোধী মহাযোদ্ধা। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই, লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে পদত্যাগ করে তিনি যোগ দিলেন বিজেপিতে। শোনা যাচ্ছে, তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থীও হবেন। এই ঘটনাক্রম নেহাতই কাকতালীয়, নাকি কোনো অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা, তার উত্তর ইতিহাসের গর্ভে।
নিবন্ধকার পেশায় আইন আধিকারিক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








