২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন ঘিরে প্রতিবন্ধী আন্দোলনের প্রত্যাশা খুব বেশি না হলেও রাজনৈতিক দলগুলি এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে তাদের দাবি অনেক। নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণা হওয়ার বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই তারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে দেখা করে দলগুলোর ইশতেহারে নিজেদের কথা যাতে উল্লিখিত হয় তা নিয়ে তদ্বির করেছে। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে এমন কয়েকটা বড় এনজিও আলাদাভাবে ‘ডিসেবিলিটি ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করেছে।

২০০৭ সালে প্রখ্যাত প্রতিবন্ধী আন্দোলন কর্মী জাভেদ আবিদির করা মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে আদেশ দিয়েছিল – সব বুথ প্রতিবন্ধীবান্ধব করতে হবে। প্রয়োজনে কাঠের র‍্যাম্প লাগানো, ব্রেল চিহ্ন দেওয়া ইত্যাদি দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে। তারপর থেকে প্রতিবন্ধী আন্দোলনের কর্মীরা প্রত্যেক নির্বাচনের আগে আরও বেশি সোচ্চার হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের কাজের হিসাব করলে দেখা যাবে, ২০০৭ থেকে কিছুটা অগ্রগতি হলেও, এখনো এদেশে বয়স্ক অথবা চলাফেরায় অসুবিধা আছে এমন মানুষকে সিঁড়ি ভেঙে ভোট দিতে যেতে হচ্ছে এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কোলে করে বয়স্ক মানুষকে ভোট দিতে নিয়ে যাওয়াকে মহিমান্বিত করছে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে, সুপ্রিম কোর্টের প্রতিবন্ধীবান্ধব নির্বাচন সম্পর্কে রায় বেরোবার পরে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমকে এই বিষয়ে লেখালিখি করে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছিলাম আমরা। এর উত্তরে পশ্চিমবঙ্গের এক বিখ্যাত সাংবাদিক এই লেখককে খুব বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন ‘সুপ্রিম কোর্টের খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তারা এসব হাস্যকর রায় দেয় আর আপনারাও এমন পাগল, মনে করেন সত্যিই দেশের সব পাবলিক বিল্ডিংয়ে র‍্যাম্প তৈরি করা সম্ভব।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য এখন আরও অনেকগুলো নিয়ম যোগ করেছে, যাতে আরও বেশি সংখ্যক প্রতিবন্ধী ভোটার ভোট দিতে পারেন। তার মধ্যে আছে প্রয়োজনে ভোটারের বাড়িতে গিয়ে ভোটগ্রহণ, দরকার পড়লে ভোটারের বাড়িতে কমিশন থেকে গাড়ি পাঠানো ইত্যাদি নানারকম ব্যবস্থা। তবে প্রান্তিক মানুষদের জন্য তৈরি হওয়া আইনকানুন, নীতি কতটা রূপায়িত হল তা নিয়ে কেউই খুব চিন্তাভাবনা করে না। ২০২৪ সালেও দেখা যাচ্ছে, দেশের রাজধানীতেও নির্বাচন কমিশনের কাছে যদি কোনো হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ভোটারের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানায়, কমিশনের কাছে তার ব্যবস্থা নেই। দিল্লির বড় এনজিওগুলোকেই এগিয়ে আসতে হচ্ছে সেই ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্য তাদের ইশতেহারে প্রতিবন্ধী মানুষদের কিছুটা জায়গা দিচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য ওসবের মধ্যে যায়নি। ইশতেহারে প্রতিবন্ধীদের জন্য তারা কোনো প্রতিশ্রুতি রাখেনিবিজেপি প্রতিবন্ধীদের জন্য দেশেই নানা ‘এডস অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েন্সেস’ তৈরি করার দায়িত্ব নিতে চায় যাতে দেশ আত্মনির্ভর হয়। একথা ঠিক যে বিদেশ থেকে রফতানি করা যন্ত্র ব্যবহার করা এদেশের বেশিভাগ প্রতিবন্ধীর পক্ষে সম্ভব হয় না। কাজেই এদেশে সেসব যন্ত্র তৈরি করা গেলে খরচ কম পড়বে, প্রতিবন্ধী মানুষ নিজেও খানিকটা আত্মনির্ভর হতে পারবেন। তবে আলাদা করে প্রতিবন্ধীদের আত্মসম্মানের সঙ্গে বাঁচার জন্য কোনো পদক্ষেপ বিজেপি নেবে বলে দাবি করেনি। তাতে অল্পবিস্তর ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেলছে বড় বড় এনজিওগুলোও। কংগ্রেস আর সিপিএম এ ব্যাপারে যথেষ্ট ব্যতিক্রমী। ভারতীয় সংবিধানের ১৫ এবং ১৬ অনুচ্ছেদে যে যে কারণে বৈষম্য করা যাবে না বলে উল্লিখিত আছে তার মধ্যে ‘প্রতিবন্ধকতা’ নেই। ওই অনুচ্ছেদগুলোতে পরিবর্তন এনে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ পরিচয়ের সঙ্গে প্রতিবন্ধকতা নিয়েও বৈষম্য করা যাবে না – একথা যোগ করার কথা সিপিএম তাদের ইশতেহারে বলেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে আলাদা করে আলোচনা করছে সিপিএম। তাই তাদের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। শুধু ইশতেহারে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি নয়, সিপিএম এর আগে দৃষ্টিহীন মানুষদের জন্য তাদের ইশতেহার অডিও বুক হিসাবেও প্রকাশ করেছে। এবছরের ইশতেহার পুরোটাই সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে প্রকাশ করে তারা অন্য দলগুলোর থেকে খানিকটা এগিয়ে গেছে। সংবিধানের ১৫ ও ১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে প্রতিবন্ধকতাকে বৈষম্যের কারণ হিসাবে যোগ করার জন্য রাজ্যসভায় প্রাইভেট মেম্বার্স বিল এনেছিলেন বৃন্দা কারাত। কাজেই এই দলের কাজকর্মের সঙ্গে ইশতেহারের কিছুটা সাদৃশ্য আছে বলা যেতে পারে।

আরো পড়ুন সিপিএম পার্টি কংগ্রেস ও প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন

তবে এবছরের সাধারণ নির্বাচন থেকে প্রতিবন্ধী আন্দোলনের সবথেকে বড় পাওনা হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে পাঠানো নির্বাচন কমিশনের নির্দেশাবলীকে। সেখানে লেখা আছে, নির্বাচনী প্রচারে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে অপমানজনক শব্দ, প্রতিবন্ধী মানুষকে নিচু চোখে দেখা ইত্যাদি কমিশন মেনে নেবে না। প্রতিবন্ধী আন্দোলন কর্মীদের হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত কমিশনের কাছে তিনটে অভিযোগ জমা পড়েছে। প্রথমটা রাজস্থানের বিজেপি সভাপতির বিরুদ্ধে এবং তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যায়নি। পরের দুটো ক্ষেত্রে কমিশনের প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চন্দ্রবাবু নাইডুর মতন প্রবীণ নেতাকে যখন প্রতিপক্ষকে ‘সাইকো’ বলার জন্য নির্বাচন কমিশন নোটিস পাঠায়, তখন বলতেই হয় যে প্রতিবন্ধীদের মনে একটু হলেও আশা জাগে, সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করার অধিকার হয়ত এই ভারতবর্ষেও পাওয়া যেতে পারে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.