শিবপ্রসাদ মিত্র

মঙ্গলবার (১৪ মে) কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ১৪ জন পাকিস্তানি নাগরিককে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) অনুযায়ী নাগরিকত্ব দিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব অজয় কুমার ভাল্লা দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ওঁদের হাতে নাগরিকত্বের শংসাপত্র তুলে দিয়েছেন। বিষয়টি কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। আবার বিজেপিও বড় বড় বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জয়ঢাক পেটাচ্ছে। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় বিশাল বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হয়েছে

ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী,
ধন্যবাদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শুরু হল CAA-র শংসাপত্র দেওয়া,
এবার সবাই বাঁচবে সসম্মানে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তারপর পদ্মফুল চিহ্নে ভোট দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

দিল্লিতে কাদের সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁদের বৈশিষ্ট্য কী? একটু দেখা যাক।

যাঁরা সেখানে নাগরিকত্ব পেয়েছেন তাঁদের কয়েকজন হলেন ভরত কুমার ও তাঁর পরিবার, শীতল দাস, দয়াল দাস ও যশোদা। এঁরা সবাই থাকেন দিল্লির মঞ্জু কা টিলা উদ্বাস্তু শিবিরে। এঁদের ভোটার তালিকায় নাম নেই। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ভরত কুমার বলেছেন, তিনি এবারে আর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। কারণ ভোটার তালিকায় নাম ঢোকানোর শেষ তারিখ ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গেছে। আরেকজন প্রাপক দয়াল দাস বলেছেন, তিনি এবার ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য আবেদন করবেন। অর্থাৎ এঁদের কারোর ভোটার তালিকায় নাম নেই, আধার কার্ডও নেই।

আরও একটা কথা। মোটামুটি এঁরা সকলেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসেছেন ২০১৩ সালে। রীতিমত পাসপোর্ট ভিসা করে। এসে আর ফিরে যাননি, থেকে গিয়েছেন উদ্বাস্তু হিসাবে। ফলে তাঁরা যে পাকিস্তান থেকে এসেছেন তা প্রমাণ করার সব মালমশলা এঁদের হাতে মজুত। তাই সহজেই সিএএ নিয়মাবলী মেনে দরখাস্ত জমা দিতে পেরেছেন এবং কেন্দ্রীয় সরকার দেশের লোককে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রমাণ দেখাতে এঁদের সাত তাড়াতাড়ি নাগরিকত্ব দিয়ে দিয়েছে

এখন প্রশ্ন হল, এঁদের অবস্থা আর পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায়ের অবস্থা কি এক? উভয়কে কি একই দাঁড়িপাল্লায় মাপা যায়, না মাপা উচিত? উত্তর, না। কারণ এই দুই দলের মধ্যে পার্থক্য ব্যাপক ও দুস্তর। কী সেই পার্থক্য? দেখা যাক।

প্রথমত, এই বাংলার মতুয়ারা কি দিল্লির পাকিস্তানিদের মত উদ্বাস্তু? কোনো মতেই নয়। মতুয়াদের হাতে ভোটার কার্ড আছে,আধার কার্ড আছে। তাঁরা ভোট দেন, ভোটে দাঁড়ান, বিধায়ক, সাংসদ, মন্ত্রীও হয়ে থাকেন। অর্থাৎ তাঁরা ইতিমধ্যেই এদেশের নাগরিক। তা না হলে এইসব অধিকার তাঁরা পেলেন কীভাবে? তাঁরা যদি নাগরিক না হন, তাহলে তাঁদের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীও তো নিজ নিজ পদে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলবেন। ফলে দিল্লির যে মানুষগুলি নাগরিকত্ব পেয়েছেন তাঁদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়াদের কোনো তুলনাই চলে না। এঁদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তাই দিল্লির পাকিস্তানিদের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হয়েছে, কিন্তু বাংলার মতুয়াদের আবেদন করার কোনো প্রয়োজনই নেই। নাগরিকদের আবার নতুন করে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হবে কেন? বিজেপি সরকার যে কাজটা সফলভাবে করেছে, তা হল মতুয়াদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করা। বলেছে তোমরা নাগরিক নও। তারপর বলেছে, ভয় কী? বিজেপি তো আছে। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তোমরা নাগরিকত্ব পাবে। এ এক মারাত্মক প্রতারণা। নাগরিককে অনাগরিক বানানোর চক্রান্ত।

দ্বিতীয়ত, দিল্লির ওই উদ্বাস্তুরা ভারতে এসেছেন ১০-১২ বছর আগে। তাঁদের কাছে পাসপোর্ট, ভিসা সহ পাকিস্তান থেকে আসার সমস্ত প্রমাণপত্র আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের যেসব মানুষ বাংলাদেশ থেকে এসেছেন (মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়াও) তাঁরা এসেছেন বহুদিন আগে। হয়ত ৩০, ৪০, ৫০ বছর আগে। যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন। এখন আছেন তাঁদের সন্তানসন্ততি নাতিপুতিরা। তাঁদের কাছে বাংলাদেশ থেকে আসার কোনো প্রমাণপত্র নেই, থাকা সম্ভবও নয়। ফলে তাঁরা চাইলেও আবেদন করতে পারবেন না। এজন্য বিজেপির নানা স্তরের নেতাদের (মায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কাতর আবেদন সত্ত্বেও বাংলার একজনও এখন পর্যন্ত নাগরিকত্বের আবেদন করেননি বা করতে পারেননি। এমনকি মতুয়া সম্প্রদায় বা বাংলাদেশ থেকে আসা অন্যান্যদের মধ্যে যে বিজেপি নেতারা আছেন তাঁরাও কিন্তু আবেদন করেননি।

আরো পড়ুন যে জন থাকে মাঝখানে: মেয়েদের নাগরিকতার অভিজ্ঞতা

ওইসব বিজেপি নেতাদের মধ্যে আসলে একটা ভয় কাজ করছে। সিএএ নিয়মাবলী অনুযায়ী আবেদনের সময়ে আদালতের সামনে হলফনামা দিয়ে বলতে হবে, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক, এদেশের নাগরিকত্ব চান। তারপর যদি নাগরিকত্ব না পাওয়া যায়, তখন কী হবে? একুল যাবে, ওকুলও যাবে। ফলে নরেন্দ্র মোদীর আশ্বাসবাণীও তাঁদের আশ্বস্ত করতে পারছে না। তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতায় টান পড়েছে। ফলে বাংলায় বিজেপির ভোটে ব্যাপক ভাঙন ধরার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই ভাঙন রুখতে তড়িঘড়ি দিল্লির অনুষ্ঠান করা হয়েছে। ওই অনুষ্ঠান দেখিয়েই মোদীরা পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে এবারও ভোটের ঝুলি ভর্তি করতে চাইছেন। কিন্তু এই প্রতারণায় রাজ্যের মানুষ কী আবারও ভুলবেন? মনে হয় না।

নিবন্ধকার সমাজকর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.