উত্তর কলকাতার মোহনবাগান লেনে জমাটি চায়ের আড্ডা। বুধবারের সকাল। এক প্রৌঢ় বলে বসলেন, ‘অতীনের তো কিছু কৃতজ্ঞতাবোধ আছে, নাকি? এককালে যাকে গুরু মানত, তাকে হারিয়ে দেবে?’

শুধু কি অতীন? গোটা উত্তর কলকাতার অধিকাংশ তৃণমূল নেতারই রাজনীতিতে হাতেখড়ি তাপস রায়ের হাত ধরে। ঘোর বাম আমলে তাপস ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ ছাত্র পরিষদের সভাপতি। তাঁর বিরোধী লবিতে ছিলেন অশোক দেব। সারাজীবন উত্তর কলকাতায় রাজনীতি করেছেন তাপস। বিধায়কও হয়েছেন এখান থেকে। রাজ্যে পালাবদলের সময়ে একদা সোমেন মিত্রের ঘনিষ্ঠ তাপসকে মমতা পাঠিয়ে দেন বরানগরে। কিন্তু উত্তর কলকাতার সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান। মোহনবাগান, দুর্গাপুজো, রকের আড্ডা, খেলাধুলো – সবকিছুতেই তাপস। নির্বাচনের আগে তিনি হঠাৎ দলবদল করে বিজেপিতে। উত্তর কলকাতায় গুঞ্জন, একদা যাঁকে রাজনৈতিক গুরু মানতেন, সেই তাপসের হয়ে নাকি জান লড়িয়ে দিচ্ছেন তৃণমূলের এক ঝাঁক কাউন্সিলর।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আসলে উত্তর কলকাতার তৃণমূল নেতাদের অনেকের সঙ্গেই তাপসের সম্পর্কটা ঠিক রাজনৈতিক নয়, বরং পারিবারিক। অতীনের কথাই ধরা যাক। শোনা যায়, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে অতীনের প্রেমপর্ব শুরুই হয়েছিল তাপসের বাড়িতে। এন্টালির স্বর্ণকমল সাহা, বেলেঘাটার পরেশ পালের সঙ্গেও তাপসের বহু দশকের সুসম্পর্ক। শশী পাঁজার সঙ্গেও সম্পর্ক মন্দ নয়। উত্তর কলকাতার এক তৃণমূল নেতার কথায়, ‘মাত্র দুজন বিধায়ক সুদীপ ব্যানার্জির সঙ্গে আছেন। একজন ওঁর স্ত্রী নয়নাদি, অন্যজন বিবেক গুপ্তা। বাকি অধিকাংশ বিধায়ক, এক ঝাঁক কাউন্সিলর সুদীপবাবুর বিরোধী।’

কথাটা যে মিথ্যে নয়, তা তো উত্তর কলকাতার অলিগলিতে হাঁটলেই মালুম হচ্ছে। তৃণমূলের অর্ন্তবিরোধ রাজপথেও নেমে আসছে। এই তো কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। একজন তৃণমূল কাউন্সিলর সুদীপের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে ধর্নায় বসলেন। অভিযোগ, সাংসদকে নাকি দরকারে পাওয়াই যায় না। তৃণমূলের মুখপাত্র এবং উত্তর কলকাতার ভূমিপুত্র কুণাল ঘোষ প্রার্থী ঘোষণার আগে থেকেই সুদীপের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এমনকি তাঁকে চিটফান্ডের লোক, বিজেপির লোক বলতেও ছাড়েননি। প্রার্থী ঘোষণার পরেও এক সামাজিক অনুষ্ঠানের মঞ্চে তাপসের উপস্থিতিতে তাঁর প্রশংসা করেছেন কুণাল। দল প্রথমে ব্যবস্থা নিলেও পরে ঢোঁক গিলেছে। অবস্থা সামাল দিতে প্রচারের শেষ দিনে সুদীপ এবং কুণালকে একসঙ্গে বসিয়ে নিজে কথা বলেছেন স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি।

উত্তর কলকাতার লড়াইটা ঠিক তৃণমূল বনাম বিজেপির যুদ্ধ নয়। অনেকটাই সুদীপ বনাম সুদীপবিরোধী জোটের লড়াই। নিন্দুকরা বলছেন, তাপসের মাথায় আর্শীবাদের হাত আছে স্বয়ং অভিষেক ব্যানার্জির। যে কাউন্সিলর ধর্নায় বসেছিলেন, তিনি অভিষেকের ঘনিষ্ঠ। কুণাল যে অভিষেকেরই লোক, তা তো সবাই জানে। শান্তনু ঘোষের বিরুদ্ধেও ‘বিজেপির হয়ে দালালি’ করার অভিযোগ তুলে পোস্টার পড়েছে উত্তর কলকাতায়। তিনিও অভিষেক ঘনিষ্ঠ। সবচেয়ে বড় কথা, উত্তর কলকাতায় একবারও প্রচার করেননি অভিষেক। বরং সুদীপের প্রচারে কেন অভিষেকের ছবি নেই – সেই প্রশ্ন তুলে সোশাল মিডিয়ায় হইচই বাধিয়েছেন তৃণমূলের নবীন প্রজন্মের কাউন্সিলর।

আরো পড়ুন তৃণমূল না বিজেপি? একই অঙ্গে এত রূপ!

কলকাতা উত্তরের বড়বাজার এলাকার তিনটি ওয়ার্ড ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির ঘাঁটি। ঘোর বাম আমলে যখন বিজেপির চিহ্ন ছিল না বাংলায়, তখনো পুরভোটে হইহই করে জিততেন মীনাদেবী পুরোহিতরা। সম্প্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সজল ঘোষের প্রভাব। প্রথমে শোনা গিয়েছিল সজলই লড়বেন বিজেপির টিকিটে। পরে তাপস যোগ দেওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যায়। লোকসভার টিকিট না পেয়ে সজল ক্ষুব্ধ – এমনটা কিন্তু শোনা যায়নি। তিনি তাপসের ছেড়ে আসা বরানগর বিধানসভায় লড়ছেন। মধ্য কলকাতায় তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করছেন সুদীপকে হারাতে।

তাপসের মূল ভরসা তিনটি বিধানসভা – জোড়াসাঁকো, শ্যামপুকুর এবং মানিকতলা। এর মধ্যে জোড়াসাঁকোয় ২৩.৬% মুসলিম ভোট থাকলেও এর মধ্যেই রয়েছে বড়বাজার এলাকা। ২০১৯ সালে এই বিধানসভায় এগিয়েছিল বিজেপি। এবার অবশ্য গত লোকসভার মত মোদী হাওয়া নেই। তাই টক্কর দেবে তৃণমূলও। শ্যামপুকুরে মুসলমান ভোট ১.৭%। এখানেও গত লোকসভায় এগিয়ে ছিল বিজেপি। মানিকতলায় ২০১৯ সালে তৃণমূল এগিয়েছিল বটে, তবে এক শতাংশেরও কম ভোটে। এই বিধানসভায় মুসলমান ভোটার ২.৩%। কাশীপুর বেলগাছিয়ার বিধায়ক অতীন। এখানে ১৭.৩% মুসলমান ভোট। ২০১৯ এবং ২০২১ – দুই নির্বাচনেই ভাল ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। তবে এই এলাকায় তৃণমূল কি এবার আগের মত গা ঘামাচ্ছে? সন্দেহ আছে অনেকের।

সুদীপের প্রধান ভরসা দুটি বিধানসভা – চৌরঙ্গী এবং এন্টালি। প্রথমটির বিধায়ক তাঁর স্ত্রী নয়না, ৩৮% মুসলিম ভোট। তার জোরেই বিরাট ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। এন্টালির বিধায়ক স্বর্ণকমল। শোনা যায়, তাঁর সঙ্গে সুদীপের সম্পর্ক শীতল। তবে এই বিধানসভাতেও প্রায় ৩৭% মুসলমান ভোট। সুদীপ শিবিরের আশা, বিজেপিকে হারাতে সংখ্যালঘুদের ভোট একজোট হয়ে জোড়া ফুলেই পড়বে। বেলেঘাটা বিধানসভায় পরেশ পালের দুর্দান্ত সংগঠন, সেখানেও মুসলমান ভোট ২৫ শতাংশের বেশি। খালি চোখে দেখলে সুদীপের চিন্তার কোনো কারণ নেই৷ কিন্তু আদৌ তৃণমূলের সব ভোট সুদীপের পক্ষে যাবে তো?

কলকাতা উত্তর কেন্দ্রে কংগ্রেসের সংগঠন প্রায় অস্তিত্বহীন, সিপিএমও দুর্বল। জোটের প্রার্থী প্রদীপ ভট্টাচার্য কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা। কাউন্সিলর সন্তোষ পাঠকের এলাকায় কংগ্রেসের কিছু সংগঠন আছে, প্রয়াত সোমেন মিত্রেরও কিছু প্রভাব শেষ হতে হতেও হয়নি। তবে দুই প্রধান প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রদীপ লড়াইতেই নেই। তবে যেহেতু হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসন, তাই ‘কিং’ না হতে পারলেও কিংমেকার হতে পারেন প্রদীপ। কুণাল ঘোষ সহ তৃণমূলের সুদীপবিরোধী নেতারা বারবার তারস্বরে প্রচার করেছেন – সুদীপ বিজেপির লোক, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য। তৃণমূলের একাংশের আশঙ্কা, এই প্রচারের প্রভাবে মুসলমান ভোটের কিছুটা কেটে নিতে পারেন প্রদীপ। তাতে বিপদ বাড়বে সুদীপের।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.