এক্সিট পোল বা বুথফেরত সমীক্ষা সবসময় যে একশো শতাংশ মিলে যায় তা নয়। ২০০৪ সালের বুথফেরত সমীক্ষা বিজেপিকে ২৪০-২৭৫ আসনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু অটলবিহারী বাজপেয়ীর বিজেপি ১৩৮ আসন পেয়েছিল। তারা ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ স্বপ্ন বেচেও সরকারে ফিরতে পারেনি। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার গড়েছিল। ২০১৪ সালেও এনডিএকে ২৬১-২৮৯ আসন দিয়েছিল বুথফেরত সমীক্ষা। বিজেপির নেতৃত্বেই এনডিএ সরকার গড়েছিল বটে, কিন্তু তাদের আসন সংখ্যা ৩৩৬ আসনে পৌঁছে গিয়েছিল।

২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হবে বলে জানিয়েছিল বুথফেরত সমীক্ষা। কিন্তু বিজেপি ৩২৫ আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে সরকার গড়েছিল। আর ২০১৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে বুথফেরত সমীক্ষা আর আসল ফলাফলের কথা সবার মনে থাকার কথা। সেখানেও ত্রিশঙ্কু বিধানসভার সম্ভাবনার কথা বলেছিল ভোট শেষের পর করা সমীক্ষা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় জনতা দল-জনতা দল (ইউনাইটেড) ও কংগ্রেসের সরকার হয় সেখানে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল সবচেয়ে বেশি আসনে জেতে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এরকম অনেক উদাহরণ হাতের সামনে আছে যেখানে বুথফেরত সমীক্ষার উল্টো ফল হয়েছে ভোটগণনার পর।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন শেষ হতেই যে বুথফেরত সমীক্ষার ফল দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে সব সমীক্ষাই বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে এগিয়ে রাখছে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের থেকে। গড়পড়তা দেখলে ৩৫৫ থেকে শুরু করে ৪১৫ পর্যন্ত আসন এনডিএ জোটকে দিয়ে রাখছে বুথফেরত সমীক্ষাগুলো। টুডে’জ চানক্য, যারা গত দুটো লোকসভা নির্বাচনে মোটামুটি ঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তারাও এনডিএ জোটের ৩৮৫-৪১৫ আসন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছে। শুধুমাত্র দৈনিক ভাস্কর এনডিএকে ২৮১ থেকে ৩৫০ আসন দিয়েছে তাদের বুথফেরত সমীক্ষায়। ইন্ডিয়া জোটকে দিয়েছে ১৪৫-২০১ আসন।

যদিও কোনো কোনো সমীক্ষায় নানারকমের গরমিলও উঠে আসছে। যেমন একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আসনের সংখ্যার থেকে জয়ী হওয়া আসন সংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে কেউ কেউ।

সমীক্ষায় নমুনার সংখ্যায় হেরফের হলেও ফলাফল ভুল আসতে পারে। কাজেই এইসব গরমিল এবং এর আগে বুথফেরত সমীক্ষার ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হওয়ার নজির থাকলেও, এবারের বুথফেরত সমীক্ষা ঠিক হবে না ভুল হবে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর আগে কয়েকটা বিষয় একটু দেখে নেওয়া দরকার।

একদিকে নরেন্দ্র মোদীরা এবার ৪০০ বেশি আসন পাওয়ার কথা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন ভোটপর্ব শুরু হওয়ার সময় থেকেই। অন্যদিকে ভোটপর্ব মিটতে না মিটতেই ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক সেরে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে দাবি করেছেন যে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলো ২৯৫ আসনে জয়লাভ করবে।

তাহলে কে ঠিক? উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে বিজেপি রাজস্থান, গুজরাত, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, বিহারে প্রায় সব আসন জিতে নিয়েছিল গত নির্বাচনে।  ২০২৪ সালে বিজেপি তাদের আধিপত্য বজায় রাখলেও আসন সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং দিল্লি, পঞ্জাব, হিমাচল, হরিয়ানা, রাজস্থান, গুজরাট, বিহারের মত রাজ্যে ২-৪ টি করে আসন কমে যাওয়ার কথা বুথ ফেরত সমীক্ষাই বলছে। এমন কী মহারাষ্ট্রে তো গতবারের থেকে এনডিএ ১০-২০টি আসন কম পেতে পারে বলেও দাবী করা হচ্ছে। কর্ণাটকে বিজেপি বিধানসভার ভরাডুবির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারলেও সেখানেও গতবারের জেতা ২৬টি আসনের থেকে খান তিনেক আসন কমতে পারে বলেও দাবী করছে বুথ ফেরত সমীক্ষাই।

একটা কথা স্বীকার করে নেওয়া ভাল যে গত দুটো নির্বাচনের মত ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর ম্যাজিক অদৃশ্যই থেকে গিয়েছে গোটা নির্বাচন পর্ব জুড়ে। তিনি মোদী-ঝড় তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। ‘মোদী বনাম কে’ — এই আলেখ্যও তৈরি করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী। জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে কোনো পুলওয়ামা-বালাকোটও তাঁর হাতে কাছে ছিল না এবার। তাই বারবার ইস্যু বদলাতে হয়েছে তাঁকে। বিরোধীদের বিভ্রান্ত করতে গিয়ে ভোটারদেরও বিভ্রান্ত করেছেন তিনি। কংগ্রেসের ইশতেহার নিয়ে, মুসলমানদের হাতে দেশের সব সম্পত্তি তুলে দেওয়ার কংগ্রেসি চক্রান্তের মত অভিযোগ এনে তিনি আসলে মিথ্যা ভাষণই করেছেন। হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর উত্তর ভারতের মূল হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককেই পোক্ত করার চেষ্টা করেছেন। চাকরির দাবি করা, দলিত হিসাবে শোষিত হওয়া যুবক-যুবতীদের কাছে টানতে ব্যর্থ হওয়ারই কথা মোদীর। তাঁর মনের মত করে নির্বাচন করানোর চেষ্টা করেও তিনি ‘হেরে’ গেছেন।

তাহলে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে দু-চারটে করে আসন কমে গেলেও বিজেপি ও তার সহযোগী দলগুলো আসন সংখ্যা বাড়াবে কোথা থেকে? বুথফেরত সমীক্ষাগুলো ভোট-পণ্ডিত প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে গলা মিলিয়েই দাবি করেছে যে বিজেপির আসন সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা থেকে বাড়বে। তামিলনাড়ু ও কেরালায় আসন সংখ্যার নিরিখে দু-তিনটে আসন পেলেও ভোট শতাংশ বাড়াবে বিজেপি। সেক্ষেত্রেও দাক্ষিণাত্য জয়ের দিকে এক পা বাড়াবেন মোদী।

ওড়িশাতে অসুস্থ নবীন পট্টনায়কের দল বিজেডিকে ছাপিয়ে আট থেকে আসন সংখ্যা ১২-১৪ পর্যন্ত বাড়াতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে বুথফেরত সমীক্ষায়। বিজেডির যোগ্য উত্তরসূরী বিজেপিকেই লোকসভা নির্বাচনে ওড়িশাবাসী বেছে নিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বোধহয় অন্ধ্রপ্রদেশ নিয়ে বুথফেরত সমীক্ষাগুলোর ভবিষ্যদ্বাণী। তেলুগু দেশম পার্টি ও জনসেনার সঙ্গে জোট করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ অন্ধ্রপ্রদেশে খান ১৫ আসন পেতে পারে। সেখানে বর্তমান রাজ্য সরকারে আসীন ওয়াইএসআরসিপির জগন্মোহন রেড্ডির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার প্রবল হাওয়া রয়েছে। ফলে বুথফেরত সমীক্ষার ফল সেখানে মিলে গেলেও যেতে পারে।

পড়শি রাজ্য তেলেঙ্গানাতেও ভারত রাষ্ট্র সমিতির ভোট নিজের ঝুলিতে টেনে নিয়ে বিজেপি বাজিমাত করলেও করতে পারে। গতবার চারটে আসন পেয়েছিল বিজেপি। এবার বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের মানুষ কংগ্রেসের উপর আস্থা রাখলেও, বিজেপির পক্ষে লোকসভা নির্বাচনে খান চারেক আসন বাড়িয়ে নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আরো পড়ুন ওপিনিয়ন, এক্সিট পোলের জন্য উর্বর নয় এ দেশের জটিল সমাজ ও পরিবর্তনশীল রাজনীতির মাটি

উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে ভবিষ্যদ্বাণী, বিজেপির আসন সংখ্যা ৬২ থেকে বেড়ে ৭২ হতে পারে। কিন্তু সেখানকার দলিত ভোটাররাও কি বহুজন সমাজ পার্টিকে ছেড়ে বিজেপিকে ভোট দিলেন? কংগ্রেস-সমাজবাদী পার্টির জোট কোনো ফ্যাক্টরই হবে না সেখানে? প্রশ্ন থাকবেই। তবে কোনো সমীক্ষাই উত্তরপ্রদেশে বিজেপির আসন সংখ্যা আশির কাছাকাছি চলে যাবে এমন দাবি করছে না।

আর পশ্চিমবঙ্গের জন্য বুথফেরত সমীক্ষাগুলির বড় দাবি যে বিজেপি ২৬-২৭ খানা আসন জিতে নেবে এই রাজ্য থেকে! বাংলাতে যদি বিজেপিকে ২৬-২৭ আসন জিততে হয়, তাহলে গতবারের জেতা ১৮ আসন ছাড়াও আরও ৮-৯ খানা আসন তৃণমূলের থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে। এমনিতেই জেতা আসনগুলোর মধ্যে রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, মালদা (উত্তর), ব্যারাকপুর, হুগলী, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, আসানসোলে বিজেপির লড়াই কঠিন হওয়ার কথা। এর মধ্যে বাবুল সুপ্রিয় বিজেপি ছাড়ার পর উপনির্বাচনে এমনিতেই আসানসোল তৃণমূলের কাছে খুইয়েছিল বিজেপি।

বুথফেরত সমীক্ষা সত্যি মেনে নিলে বলতে হবে গতবারের জেতা সব আসন বিজেপি এবারও জিতে যাবে। হিসাব বলছে, ২০১৯ সালে বিজেপির ঝুলিতে যাওয়া বামেদের ভোট বামেদের কাছে ফিরে এলে বিজেপির ক্ষতি হওয়া উচিত এবং তৃণমূলের লাভ। কিন্তু বামেরা ভোট কেটে বিজেপির সুবিধা করে দিলে বিস্ময়কর ফলাফল হতেও পারে। যেমন কৃষ্ণনগর আসন। আরামবাগ, তমলুক, কাঁথি, কলকাতা উত্তরকে টার্গেট করেছে বিজেপি। এছাড়াও ধর্মীয় মেরুকরণে এবং তৃণমূলের ভোট কাটায় যদি মালদা দক্ষিণের মত আসনেও বিজেপি জিতে যায়, তাহলে বুথফেরত সমীক্ষার ফল মেলা সম্ভব।

অন্ধ্র, তামিলনাড়ু ও কেরালায় ভাল ফল করলে বলতে হবে বিজেপির কাছে দক্ষিণ ভারত আর ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়। ওড়িশাতে বিজেডির যোগ্য উত্তরসূরী বিজেপি হলেও, পশ্চিমবঙ্গে এত গুছিয়ে খেলতে নেমেও যদি তৃণমূল ২২ থেকে আরও কম আসনে জয় পায়, তাহলে বুঝতে হবে মমতা ব্যানার্জির শিরে সংক্রান্তি। এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় ইস্যুতে ভোট হয়েছে। ধরে নিতে হবে পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি কোনো একটা বিশেষ ইস্যু নিয়ে প্রচারের আলেখ্য তৈরি করতে না পারলেও শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি ও সন্দেশখালির ঘটনা ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে।

অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডেও যদি বুথফেরত সমীক্ষার ফল মেনে নিতে হয়, তাহলে বিজেপির গতবারের জেতা ১১ আসনের খুব হেরফের হবে না। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার করার ঘটনায় ঝাড়খণ্ডের ভোটাররা ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার দিকে সমবেদনার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। বরং বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের উপরেই তাঁরা বেশি ভরসা রাখছেন।

তবে যা-ই হোক না কেন, বুথফেরত সমীক্ষা ভারতের বিরোধী দলের কর্মীদের হতাশ করবে। সেই হতাশা থেকে প্রার্থীদের গণনা এজেন্টরা যদি গণনাকেন্দ্র ঠিকমত রক্ষা না করেন, তাহলে গণনায় কারচুপির ঘটনা আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে। ভোটগণনা হয়ে গেলে সেই অভিযোগের বিশেষ সারবত্তা থাকবে না। মোদী আগের দুটো নির্বাচনের মত ঝড় তুলতে ব্যর্থ হয়েও হ্যাটট্রিকের মুকুট মাথায় নিয়ে ৪ জুনের পরে সরকার গড়তে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাবেন। তা ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে কতটা ভাল হবে তা অন্য আলোচনার বিষয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.