পশ্চিমবঙ্গে ষষ্ঠ দফার লোকসভা নির্বাচনে লড়াইটা সরাসরি দুজন রাজনৈতিক নেতার – মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বনাম বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এই দফায় অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, দেবাংশু ভট্টাচার্য, জুন মালিয়া বা অগ্নিমিত্রা পালের মত ওজনদার প্রার্থী আছেন বটে, কিন্তু তাঁরা নেহাতই পার্শ্বচরিত্র। বাঁকুড়া এবং বিষ্ণুপুর বাদে বাকি সবকটি আসনে বিজেপির প্রার্থী যিনিই হোন, আসলে লড়ছেন শুভেন্দু। এই আটটি লোকসভা কেন্দ্রের নির্বাচন তাঁর গড় বাঁচানোর লড়াই৷ যদি সফল হন, রাজ্য বিজেপির অন্দরে ক্ষমতার লড়াইয়ে অনেকটা এগিয়ে যাবেন। যদি ব্যর্থ হন, তাহলে প্রশ্নের মুখে পড়বে তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব।

দুর্গরক্ষার যুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন শুভেন্দু। ভোটের আগে উত্তপ্ত নন্দীগ্রামে খুন হয়েছেন এক বিজেপি কর্মী৷ তারপর থানায় ঢুকে পুলিসকে ধমক দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা। সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকছে এই দফায় – ৯১৯ কোম্পানি বা ৭৫,০০০ আধাসামরিক বাহিনী। রাজ্য পুলিস মাত্র ২৯,৫০০। তার মধ্যে অধিকারী পরিবারের গড় হিসাবে পরিচিত কাঁথি এবং তমলুকেই থাকছে ২৩৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। এই দুই কেন্দ্রে রাজ্য পুলিস চোখে পড়ার মত কম – মাত্র ৭১৪ জন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তমলুক

তমলুকে বিজেপি প্রার্থী করেছে প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে। সাদা চোখে দেখলে বিজেপির নিরাপদ আসন, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, চোরা স্রোত রুখতে হবে শুভেন্দুকে। তমলুক ঐতিহাসিকভাবে বামবিরোধী আসন। ১৯৫২ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত আড়াই দশক এখান থেকে জিতে সাংসদ হয়েছেন বিয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের নায়ক সতীশচন্দ্র সামন্ত। প্রথমে কংগ্রেস, পরে বাংলা কংগ্রেসের টিকিটে। ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টির হয়ে জয়ী হন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আর এক নায়ক সুশীল ধাড়া। এরপর ১২ বছর (১৯৮৪-৯৬) এই আসনে জেতেন সিপিআই প্রার্থী। ১৯৯৬ সালে জেতে কংগ্রেস। ১৯৯৮ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তমলুকের সাংসদ ছিলেন সিপিএমের বিতর্কিত নেতা লক্ষ্মণ শেঠ। ২০০৯ সালে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তাঁকে হারিয়ে দেন তৃণমূল প্রার্থী শুভেন্দু। তারপর সাংসদ হন শুভেন্দুর ভাই দিব্যেন্দু। গত লোকসভা নির্বাচনেও সহজ জয় পান তিনি।

তমলুক লোকসভার সাতটি বিধানসভার মধ্যে তৃণমূলের বিধায়ক চারজন, বিজেপির তিনজন। তমলুকের তৃণমূল বিধায়ক ওজনদার নেতা সৌমেন মহাপাত্র। এছাড়া পাঁশকুড়া পূর্ব, নন্দকুমার, মহিষাদলও তৃণমূলের দখলে। বিজেপির তিন বিধায়কের একজন শুভেন্দু নিজে। নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ময়না এবং হলদিয়াও বিজেপির দখলে।

অধিকারী পরিবারের গড় হিসাবে পরিচিত এই লোকসভায় শুভেন্দুর বিক্রম নিয়ে যত আলোচনা হয়, বাস্তবতা কি তার চেয়ে কিঞ্চিৎ আলাদা? পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, শুভেন্দু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে আসার পর গেরুয়া শিবিরের ভোট যে বিপুল বেড়েছে তা কিন্তু নয়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে, অর্থাৎ শুভেন্দু যখন তৃণমূলে ছিলেন, তখন এই কেন্দ্রে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ৩৭.২%। ২০২১ সালের বিধানসভায়, অর্থাৎ শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর, তা বেড়ে হয় ৪৫.৯%। অর্থাৎ শুভেন্দু বিজেপির ভোট বাড়ান নয় শতাংশের কাছাকাছি৷ এই বর্ধিত ভোট কি পুরোটাই তৃণমূল থেকে যাওয়া? তাও তো বলার উপায় নেই। পরিসংখ্যান বলছে, তৃণমূল ২০১৯ সালে ভোট পেয়েছিল ৫০.৫%। ২০২১ সালে তা ৪.৫% কমে হয় ৪৬%। বাম-কংগ্রেসের ভোট ২০১৯ সালে ৯.৫% ছিল, যা ২০২১ সালে কমে হয় ৫%।

এই আসনে জোরকদমে প্রচার করছেন সিপিএমের সায়ন ব্যানার্জি। নিঃসন্দেহে বলা যায় সিপিএমের ভোট বাড়বে, তাতে ক্ষতি হবে বিজেপির। তৃণমূলের দেবাংশু ভট্টাচার্য দৌড়চ্ছেন। কিন্তু লড়াই থাকলেও নিঃসন্দেহে তমলুকে অ্যাডভান্টেজ বিজেপি।

কাঁথি

কাঁথি লোকসভার ছবিটাও প্রায় একইরকম। এটিও ঐতিহাসিকভাবে বামবিরোধী আসন। ১৯৫২ সালে কংগ্রেস, ১৯৫৭ সালে প্রজা সোশালিস্ট পার্টি, ১৯৬২ সালে কংগ্রেস জেতে। ১৯৬৭ সালে প্রজা সোশালিস্ট পার্টির হয়ে জেতেন সমর গুহ। ১৯৭১-৭৭ তিনিই সাংসদ থাকেন জনতা পার্টির হয়ে। ১৯৮০ সালে সিপিএম কাঁথি লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়। ১৯৮৪ সালে জেতেন কংগ্রেসের ফুলরেণু গুহ। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত সিপিএমের সাংসদ ছিলেন কাঁথিতে। ১৯৯৯ সালে জয়ী হয় তৃণমূল, ২০০৪ সালে আবার সিপিএম। তারপর ২০০৯ থেকে টানা জিতেছেন তৃণমূলের শিশির অধিকারী।

আক্ষরিক অর্থেই কাঁথি অধিকারী পরিবারের দুর্গ। কাঁথি উত্তর, কাঁথি দক্ষিণ, ভগবানপুর এবং খেজুরিতে বিজেপির বিধায়ক। তবে তৃণমূলের তিনজন বিধায়ক এবং তিনজনই ওজনদার। রামনগরের বিধায়ক অখিল গিরি, যিনি দশকের পর দশক জেলার রাজনীতিতে অধিকারীদের বিরোধী বলে পরিচিত। চণ্ডীপুরের বিধায়ক অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী। পটাশপুরের বিধায়ক উত্তম বারিককে এবার প্রার্থী করেছে তৃণমূল। বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দুর ভাই সৌম্যেন্দু অধিকারী।

আপাতদৃষ্টিতে এই আসনটিও বিজেপির পক্ষে সহজ। কিন্তু সত্যিই কি খুব সহজ? পরিসংখ্যান কিন্তু এই আসনেও শুভেন্দুর পরাক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রাখে। ২০১৯ সালে শুভেন্দুহীন বিজেপি এখানে পেয়েছিল ৪২.৪% ভোট। শুভেন্দুর যোগদানের পর ২০২১ সালের নির্বাচনে তা ৬% বেড়ে হয় ৪৮.৭%। একে কি বিপুল বৃদ্ধি বলা যায়? অন্যদিকে শুভেন্দু চলে যাওয়ায় তৃণমূলের ২০১৯ সালের ৫০.৩% ভোট ২০২১ সালের বিধানসভায় মাত্র ৩% কমে হয় ৪৬.৮%।

উত্তম হাতের তালুর মত এলাকা চেনেন, শুভেন্দু আর সৌম্যেন্দুও তাই। এখানে ১৪.৫৯% সংখ্যালঘু ভোট যেমন আছে, তফসিলি জাতির ভোটও আছে ১৪.৬%। কাজেই এই আসনে লড়াই সমানে সমানে। তবে শুভেন্দুর জন্যই বিজেপি এগিয়ে।

ঘাটাল

ঘাটাল লোকসভায় এবার দুই নায়কের লড়াই। তৃণমূলের দীপক অধিকারী (দেব) বনাম বিজেপির হিরণ চট্টোপাধ্যায়। আপাতদৃষ্টিতে ঘাটাল তৃণমূলের পক্ষে সহজ আসন। যদিও ভোটের আগে শুভেন্দু দেবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে হাওয়া গরম করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সাংগঠনিক ক্ষমতায় বিজেপি এখানে পিছিয়ে। ঘাটাল লোকসভার সাতটি বিধানসভার মাত্র একটিতে বিজেপির বিধায়ক, বাকি সবকটিতে তৃণমূলের বিধায়ক। বোঝাই যাচ্ছে শুভেন্দুর দলত্যাগ এই লোকসভায় তৃণমূলকে খুব বেশি ধাক্কা দিতে পারেনি।

২০১৯ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ঘাটালে নিজের ভোট ধরে রেখেছে। গত লোকসভা নির্বাচনে দেব পেয়েছিলেন ৪৮.৭% ভোট। ২০২১ সালে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৭.৬% ভোট। বিজেপি অবশ্য কিছুটা ভোট বাড়িয়েছিল। ২০১৯ সালের ৪১.৩% থেকে বেড়ে গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট হয় ৪৩.৩%, অর্থাৎ ভোট বাড়ে দুই শতাংশের মত। জেলার এক শীর্ষস্তরের তৃণমূল নেতা নাগরিককে বললেন, ‘হিরণের বদলে এবারও ভারতী ঘোষ প্রার্থী হলে চাপ ছিল’। কিন্তু তেমন কিছু যখন হয়নি, তখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত দেব।

মেদিনীপুর

মেদিনীপুর আসনে এবার ঠিক যেন কাটাকুটি খেলা। হরেকরকম সমীকরণ, নানারকম অন্তর্দ্বন্দ্ব। ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে এই লোকসভার অর্ন্তগত খড়্গপুর সদর থেকে জিতেছিলেন দিলীপ ঘোষ। শোনা যায়, ২০১৯ সালে তৎকালীন তৃণমূল নেতা শুভেন্দুর দায়িত্ব ছিল লোকসভায় প্রার্থী হওয়া দিলীপকে হারানো। কিন্তু সেবারও বিপুল ভোটে জেতেন দিলীপ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই এলাকায় ফিরে আসে তৃণমূল। সাতটি বিধানসভার মধ্যে ছটিতে জেতে তৃণমূল, কেবল খড়্গপুর সদরে বিধায়ক হন বিজেপির হিরণ। এবার দিলীপকে এই আসনে টিকিট দেয়নি বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের অন্দরের খবর, আসন বদলে একদম রাজি ছিলেন না দিলীপ৷ নিতান্ত বাধ্য হয়ে তিনি বর্ধমান থেকে লড়েছেন। আবার আসানসোলের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালকে নিয়ে আসা হয়েছে এখানকার প্রার্থী করে। শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ অগ্নিমিত্রার হয়ে কি আদৌ পরিশ্রম করেছেন দিলীপের অনুগামীরা? প্রশ্ন আছে বিজেপির অন্দরেই। আবার জুন মালিয়াকেও প্রার্থী হিসাবে মানতে নারাজ তৃণমূলের অনেকেই। ফলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কাঁটা যে ফুল ভালভাবে সামলাতে পারবে, সে ফুলই ফুটবে এখানে।

২০১৯ সালের আগে এরাজ্যে জনসংঘ/বিজেপি বড় শক্তি ছিল না। কিন্তু মেদিনীপুর আসন থেকে সেই ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচনেই সংসদে গিয়েছিলেন জনসংঘের দুর্গাচরণ ব্যানার্জি। তখন আসনের নাম ছিল মিদনাপুর-ঝাড়গ্রাম। তারপর কখনো কংগ্রেস, কখনো বাংলা কংগ্রেস, কখনো জনতা পার্টি জিতেছে এই আসন। ১৯৮০ থেকে টানা জিতেছেন সিপিআই প্রার্থী। কখনো নারায়ণ চৌবে, কখনো ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, কখনও প্রবোধ পাণ্ডা।

২০১৯ সালে এই কেন্দ্রে গেরুয়া পতাকা ওড়ান দিলীপ। সেবারের ৪৯.১% ভোট দুবছর পরে একুশের বিধানসভা নির্বাচনে কমে হয় ৪৩.৩%। তৃণমূল ২০১৯ সালে পেয়েছিল ৪২.৮% ভোট। ২০২১ সালে তা বেড়ে হয় ৪৯.৭%। তবে এবারের লড়াই একদম হাড্ডাহাড্ডি। দলের অভ্যন্তরের সমীকরণ যে যত ভাল সামলাবেন, তাঁর জয়ের সম্ভাবনা তত বেশি।

ঝাড়গ্রাম

২০১৯ সালের সাফল্যের পর থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এবং তারপরে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে যেসব এলাকায় বিজেপির সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক ক্ষয় হয়েছে, তার অন্যতম ঝাড়গ্রাম। ২০১৯ সালে এই কেন্দ্রে জিতেছিল বিজেপি, আদিবাসী ভোটাররা বিপুল সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঝাড়গ্রাম লোকসভার অর্ন্তগত সাতটি বিধানসভা আসনেই তারা হেরে যায়। গতবারের সাংসদ কুনার হেমব্রমকে এবার টিকিট দেয়নি বিজেপি। ভোটের ঠিক আগে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন কুনার।

ঝাড়গ্রামে বিজেপির অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে এই লোকসভায় সিপিএমের তরতাজা তরুণ প্রার্থী সোনামণি মুর্মুর জোরদার প্রচার। ২০১৯ সালে ৫.৪% ভোট ছিল সিপিএমের, ২০২১ সালে ছিল ৬.৫%। এবার নিঃসন্দেহে ভোট বাড়াবেন ‘প্যাড উওম্যান’ সোনামণি। সেই ভোট যে তৃণমূলবিরোধী ভোট, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আরো পড়ুন কেবল ঘৃণা, বিদ্বেষের পাঁকেই বিজেপির পদ্ম ফুটতে পারে

দীর্ঘ কয়েক দশক বামপন্থীদের দুর্গ বলে পরিচিত ছিল ঝাড়গ্রাম। ১৯৭৭ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত একটানা এখানে জিতেছে সিপিএম। তার আগে দুবার কংগ্রেস এবং একবার বাংলা কংগ্রেসের প্রার্থী জিতেছেন এখানে। ২০০৯ পর্যন্ত বেশ ভাল ভোট পেতেন ঝাড়খণ্ড পার্টির প্রার্থীও। এখন অবশ্য তাঁরা দুর্বল। ২০১৯ সালে ঝাড়গ্রামে ৪৫.১% ভোট পেয়েছিল বিজেপি। ২০২১ সালে তা কমে হয় ৩৮%। তৃণমূলের লোকসভার ৪৪.৩% ভোট বেড়ে হয় ৫০.৬%। জঙ্গলমহলে আরএসএস রীতিমত সক্রিয়, তবু এই আসনে বিজেপির লড়াই কঠিন।

পুরুলিয়া

ষষ্ঠ দফার নির্বাচনে যে একটিমাত্র কেন্দ্রে কংগ্রেস-বাম জোটের নজরকাড়া ফলাফল করার সম্ভাবনা রয়েছে, সেটি পুরুলিয়া। এই আসনে কংগ্রেসের প্রার্থী প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতা নেপাল মাহাতো। একাধিক বিধানসভা এলাকায় তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব প্রবল। তাছাড়া এবছর পুরুলিয়া লোকসভায় লড়াই ত্রিমুখী। বিজেপির জ্যোর্তিময় সিং মাহাতো, তৃণমূলের শান্তিরাম মাহাতো মত নেপালবাবুও লড়াইয়ে আছেন। আর আছেন অজিত মাহাতো – কুড়মি সমাজের প্রার্থী। তিনি নিজে হয়ত জিতবেন না, কিন্তু জয় পরাজয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারেন।

পুরুলিয়া আসনে কিন্তু জোট হয়নি। সিপিএম সমর্থন করছে কংগ্রেসের নেপালবাবুকে, কিন্তু ফরোয়ার্ড ব্লক আলাদা লড়ছে। এই আসনে তারা কিন্তু হেলাফেলা করার মত শক্তি নয়। গত লোকসভা নির্বাচনেও এখানে জোট হয়নি। সিপিএমের সমর্থন নিয়ে লড়ে নেপালবাবু ৮৪,০০০ ভোট পেয়েছিলেন। ফরোয়ার্ড ব্লক একা লড়ে পেয়েছিল ৬৮,০০০ ভোট। এবারও গোটা লোকসভার সর্বত্র দুই ফুল এবং হাত চিহ্নের পাশাপাশি নজর কাড়ছে সিংহ। যেহেতু অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন, তাই এসইউসি প্রার্থী সুস্মিতা মাহাতোর প্রাপ্ত ভোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পুরুলিয়া লোকসভার সাতটি বিধানসভার মধ্যে পাঁচটি বিজেপির। বলরামপুর, জয়পুর, পুরুলিয়া, কাশীপুর এবং পারায় বিজেপির বিধায়ক। বাগমুন্ডি এবং মানবাজার তৃণমূলের দখলে। ২০১৯ সালে প্রায় ৫০% ভোট পেয়েছিল বিজেপি, তৃণমূল অনেক পিছনে ছিল ৩৪.৫% ভোট পেয়ে। ২০২১ সালের বিধানসভায় কিন্তু বিজেপির প্রায় ১৩% ভোট কমে যায়। তৃণমূলের ভোট বাড়ে ২%। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে দুই দল প্রায় সমান – বিজেপি ৩৬.৮%, তৃণমূল ৩৬.৭%। ২০১৯ লোকসভায় কংগ্রেসের ভোট ছিল ৬.৩% আর ২০২১ সালে কংগ্রেস ও সিপিএমের মিলিত ভোট ছিল প্রায় ১৩%।

কিন্তু এসব হিসাব দিয়ে পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্রকে বোঝা মুশকিল। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় কুড়মিদের হলুদ পতাকার জয়জয়কার হয়েছে। দেওয়াল জুড়ে লেখা হয়েছে ‘জয় গরাম’। স্লোগান উঠেছে ‘দলের আগে জাতি’। এবারও প্রচারে রীতিমত ঝড় তুলছেন অজিত মাহাতো। পুরুলিয়া শহর থেকে বলরামপুরের দিকে একটু এগোতেই একের পর এক দেওয়ালে ‘কালো পাহাড়ের কালো নেতা’ অজিতকে ভোট দেওয়ার ডাক। অজিত কি জিতবেন? সেই সম্ভাবনা কম। কিন্তু তিনি কুড়মি সমাজের ভোটের সিংহভাগ পেলে কপালে ভাঁজ পড়বে বিজেপির। কারণ বিগত নির্বাচনে কুড়মিদের সমর্থন পেয়েছিল গেরুয়া শিবিরই। এই ভোট কাটাকুটির অঙ্কেই আশার আলো দেখছে জোটও। নেপালবাবুর জেতার সম্ভাবনা কম ঠিকই, কিন্তু একদম উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। আবার এই এলাকায় আরএসএস কাজ বহু দশক ধরে কাজ করছে। সবমিলিয়ে অঙ্কটা বেশ জটিল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.