ভবানীপুরের বলরাম বোস ঘাট থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাড়ির দূরত্বকে ঠিক ঢিল ছোড়া বলা যাবে না। কারণ ঘাটের সামনে থেকে গলির মধ্যে অন্তত মিনিটখানেক হাঁটলে পলশন বেকারি। তার উল্টোদিকে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি। সেখান থেকে আরও এক মিনিট হাঁটলে কালীঘাট মন্দিরের প্রধান ফটক। রবিবাসরীয় সকাল। ভবানীপুর সবে আড়মোড়া ভাঙছে। বলরাম বোস ঘাটের সামনে পৌঁছে দেখা গেল, একদল পুলিসকর্মী রীতিমতো শশব্যস্ত হয়ে আছেন। বেশকিছু নির্বাচন কমিশনের কর্মী গলায় কার্ড ঝুলিয়ে প্রস্তুত। আদিগঙ্গার সামনে চায়ের ভাঁড় হাতে স্থানীয় লোকজন বেশ উপভোগ করছেন গোটা বিষয়টা। একজন তো বেশ গলা চড়িয়েই বললেন, ‘কমরেডরা আসবে, মীনাক্ষী আসবে, তাই কড়া ডিউটি পড়েছে বাবুদের।’

হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে সেদিন প্রচার কর্মসূচি ছিল দক্ষিণ কলকাতার সিপিএম প্রার্থী সায়রা শাহ হালিমের। সিপিএম দাবি করেছিল, ১৪৪ ধারা না ভেঙে, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় সহ জনাকয়েক পার্টিকর্মী প্রার্থীকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির গলিতে প্রচার করবেন। স্বাভাবিক কারণেই পুলিস অনুমতি দিতে নারাজ। গলির দুই মাথায় কড়া পাহারা। সাড়ে আটটা নাগাদ কালীঘাট মন্দিরের দিক থেকে মীনাক্ষীরা গলিতে ঢোকার চেষ্টা করতেই শুরু ধস্তাধস্তি। পুলিস কিছুতেই ঢুকতে দেবে না, মীনাক্ষীও নাছোড়। প্রায় ঘন্টাখানেকের লড়ালড়ি স্থানীয় মানুষ ভালই উপভোগ করলেন। গলিতে প্রচার হল না বটে, তবে মিডিয়ার কল্যাণে ভালই ‘হিট’ হল সিপিএমের কর্মসূচি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে খোদ মমতার ওয়ার্ডে বিজেপির কাছে পিছিয়ে পড়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী। কিন্তু বলরাম ঘোষ ঘাট থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি ছুঁয়ে কালীঘাট মন্দির পর্যন্ত গোটা হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে আক্ষরিক অর্থেই একটিও বিজেপির পতাকা, পোস্টার, দেওয়াল লিখন চোখে পড়ল না। নিদেনপক্ষে কোনো দরজায় লাগানো স্টিকারও নয়। কলকাতার এই অংশটুকু যেন সত্যিই বিজেপিমুক্ত। কিন্তু তা বলে মোটেই বিরোধীশূন্য নয়। মুখ্যমন্ত্রীর গলিতে তৃণমূল প্রার্থী মালা রায়ের সঙ্গে রীতিমত পাল্লা দিয়ে রয়েছে সিপিএমের সায়রার প্রচার। গোটা গলি ছয়লাপ কাস্তে হাতুড়ি তারা আঁকা দেওয়ালে। এমনকি এসইউসি প্রার্থী জুবেইর রব্বানির পোস্টারও যথেষ্ট। কিন্তু পদ্মফুল? নাঃ! অনেক খুঁজেও চোখে পড়ল না।

কেবল মমতার গলি বলে নয়। গোটা দক্ষিণ কলকাতাতেই এবার বিজেপির প্রচার যেন অপেক্ষাকৃত স্তিমিত। বিজেপি এই আসনে এবার প্রার্থী করেছে দেবশ্রী চৌধুরীকে। কলকাতার মানুষ, দীর্ঘদিন ধরে আরএসএস করছেন। গত লোকসভা নির্বাচনে তিনি রায়গঞ্জ থেকে জিতেছিলেন। জায়গা পেয়েছিলেন মোদীর মন্ত্রিসভায়। তাঁকে দক্ষিণ কলকাতার ভীষণ কঠিন আসনে দাঁড় করানোয় অবাক হয়েছিলেন অনেকেই। দলের অন্দরে লড়াকু নেত্রী হিসাবে পরিচিত দেবশ্রী কি খুব গা লাগিয়ে লড়ছেন না? পোস্টার, দেওয়াল লিখন, পতাকার সংখ্যা যদি বিবেচ্য হয়, তাহলে অবশ্যই তাঁকে টেক্কা দিচ্ছে সিপিএম। ভবানীপুর, লেক গার্ডেন্স, সার্দান অ্যাভিনিউ, বালিগঞ্জের মতো সাবেকি বামবিরোধী এলাকাও লাল পতাকায় ছয়লাপ। সায়রার বাংলা উচ্চারণে জড়তা রয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার সিপিএম সংগঠনকেও জড়তামুক্ত বলা মুশকিল। কিন্তু প্রচারে সর্বশক্তি নিয়োগ করে জড়তামুক্তির চেষ্টা রয়েছে। সংখ্যালঘু এলাকায় তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও জোর প্রচার করছে সিপিএম। বেহালা পূর্ব এবং পশ্চিম বিধানসভায় সিপিএমের সংগঠন অপেক্ষাকৃত ভাল। বিশেষ করে বেহালা পশ্চিম তাদের নিবিড় কাজের জায়গা। সেখানে সায়রার প্রচার নিঃসন্দেহে নজরকাড়া।

পোস্টার বা পতাকা মানেই কি ভোট? একেবারেই নয়। সিপিএম বা তৃণমূলের কাছে চিরন্তন প্রহেলিকা দক্ষিণ কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়ির ভোট। অভিজাত আবাসনগুলোর বাসিন্দাদের বিরাট অংশ গত লোকসভায় ঢেলে ভোট দিয়েছিলেন বিজেপিকে। জোড়াফুল শিবিরের হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির কাছে পিছিয়ে পড়েছিল তৃণমূল। যদিও একুশের বিধানসভা নির্বাচনে সেই ক্ষত অনেকটাই মেরামত করতে পেরেছিল রাজ্যের শাসক দল। কিন্তু লোকসভা নির্বাচন তো আবারও মোদীকে প্রধানমন্ত্রী করার ভোট। তাই তৃণমূলের কাউন্সিলরদের ভাবটা অনেকটা ‘নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না’ গোত্রের। জনক রোডের রাধুবাবুর দোকানে চা খাওয়ার ফাঁকে একজন দাপুটে কাউন্সিলর বলেই ফেললেন, ‘ফ্ল্যাটের ভোট কিন্তু অদ্ভুত, মশাই। পুরসভায় লিড, বিধানসভায় লিড, কিন্তু লোকসভা এলেই অন্যরকম।’ তিনি যা বললেন না, তা হল দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফ্ল্যাটগুলো অবাঙালি ভোটারে ভরপুর। তাঁদের বড় অংশই বিজেপি সমর্থক। যদিও পুরসভা বা বিধানসভায় তাঁরা পরিষেবা ইত্যাদি প্রশ্নে তৃণমূলের চেনা মুখদের ভোট দেন। মালা রায় যেমন দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় কাউন্সিলর। তবে তাঁর নিজের ওয়ার্ডেই কানাঘুষো রয়েছে, ‘মালাদি কাউন্সিলর হিসাবে ভাল। কিন্তু লোকসভায় তো কথাই বলেন না।’ প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর বাড়ির সামনের আড্ডায় এক তৃণমূল নেতা অবশ্য আত্মবিশ্বাসী, ‘দেখুন, মালা রায় কোনো ফ্যাক্টর নন। কলকাতা দক্ষিণ দিদির আসন। এখানে দিদি যাঁকে দাঁড় করাবেন, তিনিই জিতবেন। একটা কলাগাছ দাঁড় করান না। সেও জিতবে।’

মমতার আসন তো বটেই। ১৯৯১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত এই আসনের সাংসদ ছিলেন বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। তার আগে কিন্তু কলকাতা দক্ষিণকে প্রথাগত বামবিরোধী আসন বলা যেত না। ১৯৫২ সালে এই আসনেরই নাম ছিল কলকাতা দক্ষিণ-পূর্ব। জিতেছিলেন ভারতীয় জনসংঘের শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তারপর আসনের নাম হয় কলকাতা পূর্ব। ১৯৫৭ এবং ১৯৬২ সালে সিপিআইয়ের সাধন গুপ্ত এবং রণেন সেন জেতেন। এরপর আবার নাম বদলে হয় কলকাতা দক্ষিণ। ১৯৬৭ সালে কমিউনিস্ট প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন চট্টগ্রামের বিপ্লবী নায়ক, মাস্টারদা সূর্য সেনের সহযোদ্ধা গণেশ ঘোষ। ১৯৭১ সালে এই আসনে জয়ী হন কংগ্রেসের তৎকালীন তরুণ তুর্কী প্রিয়রঞ্জন। ১৯৭৭ সালে দক্ষিণ কলকাতায় জয়ী হন জনতা পার্টির প্রার্থী দিলীপ চক্রবর্তী। ১৯৮০ সালে জেতেন সিপিএমের সত্যসাধন চক্রবর্তী। ইন্দিরা গান্ধী খুন হওয়ার পরে, ১৯৮৪ সালের সহানুভূতির ভোটে জয়ী হন কংগ্রেসের ভোলানাথ সেন। ১৯৮৯ সালে সিপিএমের বিপ্লব দাশগুপ্ত জেতেন। তারপর ১৯৯১ থেকে টানা জিতেছেন মমতা। ২০০৪ সালে রাজ্যে আর একটিও আসন জেতেনি তৃণমূল। কিন্তু মমতা জেতেন দক্ষিণ কলকাতায়। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমে সুব্রত বক্সী এবং পরে মালা রায়কে জিতিয়েছে তৃণমূল।

আরো পড়ুন একদা বামেদের শক্ত ঘাঁটি বাঁকুড়া কেন্দ্রে এখন লড়াই দুই ফুলের

প্রার্থী নিয়ে কি তৃণমূলে ক্ষোভ নেই? আছে। কিন্তু আসনটার নাম যেহেতু দক্ষিণ কলকাতা, তাই পাশের কেন্দ্র উত্তর কলকাতার মত এখানে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ তেমন নেই। সাতাশ শতাংশ মুসলমান ভোটও তৃণমূলের বড় ভরসা। ২০১৯ সালে বিজেপি পেয়েছিল ৩৫% ভোট, সিপিএম ও কংগ্রেস মিলিয়ে ১৫.৫ শতাংশের কাছাকাছি। রাসবিহারী বিধানসভায় পিছিয়ে পড়েছিল তৃণমূল, ভবানীপুরে কান ঘেঁষে লিড ছিল। কিন্তু কলকাতা বন্দর, কসবা, দুই বেহালা, বালিগঞ্জের লিড মালা রায়কে অস্বস্তিতে ফেলেনি। এর মধ্যে বালিগঞ্জে ২০২১ সালে ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে জিতেছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়, ২০% ভোট পাওয়া বিজেপির বহু পিছনে ছিল সিপিএম – মাত্র ৫.৬১% ভোট পেয়েছিলেন ফুয়াদ হালিম। কিন্তু সুব্রতর মৃত্যুর পর হওয়া উপনির্বাচনে সিপিএম দারুণভাবে ফিরে আসে। সাড়ে পাঁচ শতাংশ ভোটকে ৩০ শতাংশে নিয়ে যান সায়রা। বিজেপি থেকে তৃণমূলে যাওয়া বাবুল সুপ্রিয় রীতিমত চাপে পড়ে যান। এক বছর আগে সরকারে আসা তৃণমূলের ভোট কমে ২০ শতাংশেরও বেশি।

এবারে কী হবে? খালি চোখে দেখে মনে হচ্ছে, সিপিএমের ভোট বাড়বে। প্রচারে পিছিয়ে থাকলেও বিজেপিকে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই ফ্ল্যাটবাড়ির ভোটের জন্য। তৃণমূলের কপালেও ভাঁজ একই কারণে। কিন্তু সেই ভোট কি অঘটন ঘটাতে পারে? সম্ভাবনা বেশ কম।

অভিষেক ব্যানার্জি সম্প্রতি দাবি করেছেন, দক্ষিণ কলকাতা নয়, তৃণমূলের নতুন গড় ডায়মন্ড হারবার। কিন্তু পুরনো চাল এখনো ভাতে বাড়ে। দক্ষিণ কলকাতায় এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল। সৌজন্যে হরিশ চ্যাটার্জি লেনের বিখ্যাততম বাসিন্দা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.