ইমতিয়াজ আলির সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি অমর সিং চমকিলা। পাঞ্জাবি গায়কের ধনি রাম থেকে সানডিলা হয়ে চমকিলা হয়ে ওঠার গল্প ইমতিয়াজের ছবি। পাঞ্জাবের ডুগরীতে জন্ম ধনি রাম ওরফে চমকিলার। সেখান থেকে লুধিয়ানার মোজা তৈরির কারখানা হয়ে গানের জগতে। ধূমকেতুর মত উত্থান চমকিলার। নেটফ্লিক্সের জন্য তৈরি এই বায়োপিক নজর কেড়েছে সিনেমাপ্রেমীদের।
২১ জুলাই, ১৯৬০ সালে এক রামদাস পরিবারে জন্ম চমকিলার। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতে আগ্রহী চমকিলা লুধিয়ানায় হারমোনিয়াম ও টুম্বি বাজানো শিখে নেন। সুর আর সুরের তালে বেঁধে ফেলেন নিজের লেখা শব্দ। সেই শব্দগুচ্ছ যা শিখতে স্কুলের পাঠ নিতে হয় না, একজন হতদরিদ্র দলিত তার নিজের যাপনের মধ্যে দিয়েই রপ্ত করে তার মনে ও মননে। তার উত্থানের প্রতিটি বাঁকে যে বাধা এবং সেই বাধা অতিক্রম করে উত্তরণের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, তা দিয়েই গান বাঁধেন চমকিলা। আর ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তাল পাঞ্জাবের আমজনতা পায় এমন এক গায়ককে, যে আমজনতার রোজকার যাপনের কথা বলছে, বলছে তাদের মনের কোণে লুকিয়ে থাকা নিষিদ্ধ ইচ্ছেগুলোর কথা। ফলে জনতা আপন করে নেয় চমকিলাকে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত কী বলবে ভেবে পরিশীলিত রুচির দেখনদারির বিরুদ্ধে চমকিলার অবস্থান।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তবে চমকিলা একা নন, সেইসময় পাঞ্জাবের সঙ্গীত জগতের অনেক শিল্পীই ছিলেন দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত। যেমন মোহাম্মদ সাদিক, মানক ছিলেন মিরাসি সম্প্রদায়ের। সেইসময় গানবাজনা করা নিচু জাতের কাজ বলে মনে করা হত। তাই ইমতিয়াজের মুখ্য চরিত্র চমকিলার উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে ধরলে ভুল হবে। আখড়া সংস্কৃতির একজন গায়ক হিসাবে চমকিলার বায়োপিক আসলে সেই সময়কার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বোধকে আরও একবার দর্শকদের সামনে তুলে ধরে।
সিনেমার শুরুতেই দর্শককে ছবির মুখ্য চরিত্র এবং তার বেড়ে ওঠার উত্তাল সময় সম্পর্কে অবগত করেন নির্দেশক ইমতিয়াজ ‘বাজা’ গানটির কথার মধ্যে দিয়ে:
সখত ওয়ক্ত থা
উয়ো ভয় ভয়ানক থা
দহশতোঁ কা দওর চলি
ঠা ঠু, ঠা ঠু
নিত গোলি, নিত রক্ত কি হোলি
আতঙ্ক মে বোলি,
চমকিলা চমকা অ্যায়সে মেঁ
চম চম চমকিলা চমকিলা।
যৌন, অশ্লীল, নিষিদ্ধ শব্দ ব্যবহার করে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন চমকিলা। চার্লস ডিকেন্সের মত নয়, তাঁর উত্থান নিষিদ্ধ গন্ধমাখা সুলভ চটুল গানের মাধ্যমে। জনপ্রিয়তা সফল শিল্পের মাপকাঠি হতে পারে কি? সাবল্টার্ন স্বর হিসাবে চমকিলার উত্থানকে আমরা উচ্চশ্রেণি বা তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে এক প্রান্তিক ব্যক্তির উত্থান হিসাবে চিহ্নিত করতে পারি কি? ইমতিয়াজ দর্শকদের এত জটিল তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে নিয়ে যান না। নির্দেশক চটুল গানের মাধ্যমে চমকিলার সাফল্যকে কোথাও না কোথাও নিজের সাফল্যের মাধ্যম হিসাবেও ব্যবহার করেছেন। তাই ছবির শুরুটা আশা জাগিয়ে হলেও মাঝে ইমতিয়াজের আগের ছবিগুলোর মতই চমকিলা ও অমরজ্যোতের পারস্পরিক রসায়ন অনেকখানি পরিসর দখল করে নেয়।
বাস্তবের চমকিলা কি ততখানি পিতৃতান্ত্রিক ছিলেন যে প্রথম স্ত্রী ও সন্তানকে নিজের ঘাড় থেকে নামাতে একটুও দ্বিধা বোধ করেননি? ছবির দর্শক কিন্তু দেখে উচ্চশ্রেণিতে আরোহণের সূত্র মেনে চমকিলা সত্যিকারের ‘বাগী’ হয়ে ওঠেন না। বরং তিনি হয়ে ওঠেন বা উঠতে চান উচ্চশ্রেণির এক অংশ, শুধু পিতৃতন্ত্ৰ এবং মদের নেশায় বুঁদ এক সমাজ যা শুনতে চায় তা শুনিয়েই। চমকিলার গানে মহিলাদের পণ্য হিসাবে গণ্য করা হয়েছে বারবার:
জিহ্নে লাল পরী না পিটি, রান কুট কে সিধি না কিতি
নালে নশা পানী না পীনা, উস ভড়ওয়ে দা দিস কী জীনা
ওহো ভেলি কহদা, কোহদি হ্যায় জাহান দা।
(যে মদ খায় না আর বউকে সিধা করার জন্য মারে না
যে কোনো নেশা করে না, সেই বোকাচোদার জীবন বিফল
সে মরদ নয়, সে একজন কুষ্ঠরোগীর মত)
তাই চমকিলাকে একজন বিদ্রোহী হিসাবে দেখিয়ে কিছু সংবাদমাধ্যম ও আলোচক যে আলেখ্য তৈরি করছেন তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।
তবে খালিস্তানি আন্দোলন, অপারেশন ব্লু স্টার এবং ইন্দিরা গান্ধী হত্যা – এই উথাল পাথাল সময়ে একজন দলিত গায়কের উত্থান এবং সামাজিক প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। যদি অশ্লীলতা ও চটুলতার দোষে চমকিলাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে দীর্ঘকাল ধরে মেয়েদের বিয়ের যেসব গান চালু আছে সেগুলোকেও একই দোষে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়। চমকিলা তাঁর গানের মাধ্যমে যেমন মহিলাদের উপর পুরুষদের নিপীড়নকে গৌরবান্বিত করেছেন, তেমন মহিলাদের চাপা পড়া যৌন ইচ্ছাকেও তুলে ধরেছেন। চমকিলার উত্থান নিয়ে অনেক আলোচনা, সমালোচনা হতেই পারে কিন্তু চমকিলাকে বাতিল করার ক্ষমতা ইতিহাস কাউকে দেয়নি।
আরো পড়ুন মগজের কারফিউ ভেঙে ঢিল ছুড়ল জুইগাটো
যেমন আশা ভোঁসলের গাওয়া জনপ্রিয় বাংলা ছবির গান ‘আর কত রাত একা থাকব’ এখনো গ্রামে গ্রামে বেজে চলে আইসক্রিম বিক্রেতা বা লোহা, ভাঙা টিন, ইত্যাদি নিয়ে যারা ময়লা কাগজে চানাচুর বা আচার দেয় তাদের মাইকে। তেমন চমকিলার গানও শুনতে থাকবে মোজার কারখানায় কাজ করা, সর্ষে খেতে কাজ করা শ্রমিক কিংবা দিনমজুররা। দেওরকে আকাঙ্ক্ষা করা কোনো বউদি বাসন মাজতে মাজতে দু-চার কলি আউড়ে নেবে একাকী। যে সামাজিক কাঠামোয় শিল্পচর্চা এমন এক শ্রেণির বিলাস যাদের অঢেল সময়, যারা ঠান্ডা ঘরে বসে দারিদ্র্যকে পর্ন হিসাবে বিক্রি করে বিদেশি ফিল্মোৎসবের মঞ্চে পুরস্কার ও হাততালি কুড়োয়, তাদের চেয়ে চমকিলার মত শিল্পীরা সাধারণ মানুষের অনেক বেশি কাছের।
তাই ১৯৮৮ সালে যেদিন চমকিলা ও অমরজ্যোৎকে হত্যা করা হয়, সেদিন তাদের মৃত্যু হয়নি। তারা বেঁচে ছিল দিনমজুর, শ্রমিক, গ্রামের বিয়ের আসরে। ইমতিয়াজ তাঁর ছবির মাধ্যমে ভারতের সব শ্রেণির দর্শকের কাছে তাঁকে আরেকবার ফিরিয়ে এনেছেন মাত্র। এই স্মৃতি ফিরিয়ে আনা আরও সূক্ষ্ম হতে পারত। কিন্তু মূলধারার ছবি বানানো ইমতিয়াজ চেনা পথেই হেঁটেছেন। দলজিৎ দোসাঞ্জ ও পরিণীতি চোপড়ার অভিনয়ে ভর করে ইমতিয়াজ তাঁর ট্রেডমার্ক ছবি উপহার দিয়েছেন সিনেমাপ্রেমীদের।
কে জানে, ১৯৮৮ সালের সেই অভিশপ্ত দিনে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ না গেলে হয়ত সত্যিই বিদ্রোহী হয়ে উঠতেন চমকিলা। অনেক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলেও ইমতিয়াজকে ধন্যবাদ দিতেই হয় চমকিলাকে সবার কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য। চমকিলার মত তাঁকেও তো দিনের শেষে নিজের লাভের কথা ভাবতেই হয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







