সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে যৌথভাবে চিঠি পাঠালেন অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন আমলা। মসজিদ, দরগা ঘিরে বিতর্ক নতুন মাত্রা পাওয়ার প্রেক্ষিতেই এই চিঠি। উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে শাহী জামা মসজিদ এবং রাজস্থানের আজমেরে সুফি খাজা মইনুদ্দিন চিস্তির দরগার সমীক্ষাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গত দশ বছরে সংখ্যালঘুদের উপর একের পর এক আক্রমণ নেমে এসেছে। লক্ষাধিক মানুষ গৃহহারা হয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশ মুসলমান। মসজিদ, দরগা বিতর্ক উস্কে দিচ্ছে আজ থেকে ৩২ বছর আগের সেই দিনের কথা – আজকের ভারতে যাকে কালো দিন বললে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ভারতে অনেক রাজনৈতিক উত্থান-পতন ঘটেছে। বলা যেতে পারে, আজ বিজেপির দেশজোড়া আধিপত্যের ভিত প্রস্তুত করতে সেই ঘটনার অবদান কম নয়। শীর্ষ আদালতের রায়ের পর এবছর ঘটা করে প্রধানমন্ত্রী বাবরির জায়গায় গড়ে তোলা রামমন্দির উদ্বোধনও করেছেন। কিন্তু উত্তেজনা থামেনি। একের পর এক মসজিদ, দরগাকে ঘিরে তৈরি করা হচ্ছে বিতর্ক। অদূর ভবিষ্যতে মন্দির-মসজিদ ঘিরে রাজনৈতিক তরজা থামা তো দূরের কথা, কমার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

বিগত শতকের নয়ের দশকে দেশ দেখেছিল নানা পরিবর্তন। নয়া উদারনীতির হাত ধরে দেশের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার স্বপ্ন ফেরি করা হয়েছিল। উদারীকরণ-বেসরকারিকরণ-বিশ্বায়নের (এলপিজি) পথে উন্নয়নের প্রচারে মাতোয়ারা হয়েছিল গোটা দেশ। আর তারই সঙ্গে মন্দির-মসজিদ বিতর্ককে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িকতার দ্রুত উত্থান। বিশ্বায়ন আর সাম্প্রদায়িকতা, নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি আর উদার রাজনীতির বদলে বিদ্বেষের রাজনীতি, পথ চলা শুরু করেছিল হাত ধরাধরি করে। ১৯৮৪ সালে যে বিজেপি লোকসভায় মাত্র দুটি আসন জিতেছিল, তারাই ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১২০টি আসন জিতে (তার আগে ১৯৮৯ সালে জেতে ৮৫টি আসন) হয়ে যায় প্রধান বিরোধী দল। ১৯৯০ সালে অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য রথযাত্রায় সওয়ার হয়ে বিজেপি আসন সংখ্যা অনেক বাড়িয়েছিল। সেই রথযাত্রার নায়ক লালকৃষ্ণ আদবানি হয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা। কংগ্রেসের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর সেই শুরু, আজও সেই ধারার পরিবর্তন ঘটেনি। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার হয়েছিল বটে, কিন্তু তাদের নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা ছিল না। কংগ্রেসের নরসিমা রাও সরকারের আমলেই বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়েছিল, আর নয়ের দশকে শেষভাগে দেশ দেখেছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের সরকার। আদবানি তখন কট্টরপন্থী বলে পরিচিত।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যার পর প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে রাজধর্মের কথা স্মরণ করালেও (অবশ্য বাজপেয়ীর ‘মন কি বাত’ সেটাই ছিল কিনা জানা নেই), আদবানির স্নেহ থেকে মোদী বঞ্চিত হননি। আর আজ মোদীর আধিপত্যে আদবানি বিস্মৃতির অন্তরালে। কিন্তু রথযাত্রা, বাবরি মসজিদ ধ্বংসে আদবানির ভূমিকার কথা তাঁর সমর্থক বা সমালোচক – কেউই অস্বীকার করতে পারেন না। যেমন পারা যায় না বিজেপির আজকের দেশজোড়া আধিপত্যে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর দিনটির ভূমিকার কথা। তাই দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে পাত্তা না দিয়ে ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি রামমন্দিরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মোদীও আদবানির রথযাত্রাকে স্মরণ করেছিলেন।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি – এই সময়কালে হিন্দুত্ববাদের দাপট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপন্ন হয়েছে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা, আমাদের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য। সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির আগ্রাসন। হিন্দুত্ববাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও কর্পোরেটতন্ত্র আজ গণতান্ত্রিক পরিসরকে ধ্বংস করে দিতে চাইছে। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত স্থানে রামমন্দির নির্মাণের আদেশ দেয়। যদিও বিতর্কিত স্থানই যে রাম জন্মভূমি তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওই রায়ে কেবল বহু মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস আইনের চোখে কতখানি যুক্তিগ্রাহ্য সে প্রশ্ন রয়েই গেছে। বিশেষত ভারত যেখানে ধর্মীয় নয়, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গোগোইয়ের নেতৃত্বাধীন সাংবিধানিক বেঞ্চ ওই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল। রায়দানের কিছুদিন পর ১৭ নভেম্বর প্রধান বিচারপতির পদ থেকে তিনি অবসর নেন আর কয়েক মাসের মধ্যেই ২০২০ সালের মার্চ মাসে রাজ্যসভার সাংসদ হয়ে যান। মনে রাখা ভাল, তিনি এবং বিচারপতি রোহিনটন নরিম্যান ২০১৪ সালে আসামে ১৯৫১ সালের পর আবার এনআরসি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলার বিচারে গঠিত সাংবিধানিক বেঞ্চের অন্যতম সদস্য ছিলেন বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়। তিনি পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হন। গত ১০ নভেম্বর তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর নিলেন। তার কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলায় সমাধান সূত্রের জন্য তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। শুনলে মনে হবে, ঈশ্বরই যেন রামমন্দির নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রতি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ভুলে তাঁর এই মন্তব্য প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।

ঐতিহাসিক সেই রায়দানের পর মন্দির-মসজিদ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিতর্ক ক্রমশ বেড়ে চলেছে। হচ্ছে একের পর এক মামলা। প্রশ্ন উঠেছে, এইসব মামলা ১৯৯১ সালের প্লেসেজ অফ ওয়রশিপ আইনের পরিপন্থী কিনা। সেই আইন অনুসারে মন্দির, মসজিদ, গির্জা সমেত যে কোনো ধর্মীয় উপাসনা স্থলের চরিত্র বদলানো যাবে না। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার দিনে যা ছিল, তেমনই থাকবে। কেবল বাবরি মসজিদকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল, কারণ তা তখনই বিচারাধীন।

আজ মন্দির-মসজিদ বিতর্ককে উস্কে দিয়ে একের পর এক মামলায় মসজিদের নিচে মন্দির ছিল কিনা তা নিয়ে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াকে (এএসআই) সমীক্ষার আদেশ দেওয়া হচ্ছে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর স্লোগান উঠেছিল ‘অযোধ্যা তো ঝাঁকি হ্যায়, কাশী মথুরা বাকি হ্যায়।’ সেই স্লোগান বাস্তবায়নে নতুন উদ্যমে নেমে পড়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে প্রথম মামলা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ২০২১ সালে আরেকটি মামলা হয়। আবেদনকারীদের দাবি, ঔরঙ্গজেব মন্দির ধ্বংস করে এই মসজিদ বানিয়েছিলেন। বারাণসী জেলা আদালত এই মামলায় মসজিদে ‘নন-ইনভেসিভ’ সমীক্ষার নির্দেশ দেয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টও ২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে তাতে স্থগিতাদেশ না দিয়ে সমীক্ষা চালানোর ছাড়পত্র দেয়। সুপ্রিম কোর্টও হস্তক্ষেপ করেনি। বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের সেই রায় নিয়েও আজ প্রশ্ন উঠছে।

মথুরার শাহী ঈদগাহ মসজিদ শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমির জমিতে নির্মিত – এই অভিযোগ নিয়েও মামলা হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ওই মসজিদে সমীক্ষার নির্দেশ দেয়। যদিও ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্ট সেই রায়ে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। মসজিদ তো বটেই, সুফি সাধকদের দরগা নিয়েও বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের ফতেপুর সিক্রির জামা মসজিদ এবং সুফি সাধক সেলিম চিস্তির দরগা সহ আরও তিনটি মসজিদ নিয়ে মামলা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের কামাল মওলা মসজিদ ভোজশালা মন্দির ধ্বংস করে নির্মিত হয়েছে বলে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে মামলা করা হয়। ২০২৪ সালে হাইকোর্ট সেই মসজিদেও সমীক্ষার অনুমতি দেয়। তাজমহল ও কুতুব মিনারও মন্দির ধ্বংস করে তৈরি বলে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। ভারতীয় স্থাপত্যের এই গর্বগুলিকেও কালিমালিপ্ত করতে হিন্দু মৌলবাদীরা পিছপা নয়। এসবই নাকি দেশপ্রেমের নমুনা।

বিদ্বেষের এই রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সংযোজন উত্তরপ্রদেশের সম্ভলের শাহী জামা মসজিদ ও রাজস্থানের আজমেরের সুফি খাজা মইনুদ্দিন চিস্তির দরগা। ১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহী জামা মসজিদ মন্দির ধ্বংস করে তৈরি হয়েছে – এই অভিযোগ করে গত ১৯ নভেম্বর জেলা আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। সেদিনই আদালত মসজিদ সমীক্ষার নির্দেশ দেয়। রায়দানের দু ঘন্টার মধ্যেই শুরু হয় সমীক্ষার কাজ। ২৪ নভেম্বর ভোরে দ্বিতীয়বার সমীক্ষক দল গেলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, পাঁচজনের প্রাণ যায়। অভিযোগ – এর মধ্যে চারজন পুলিসের বুলেটে মারা গেছেন। পুলিসের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার বদলে হামলার অভিযোগে অনেককে গ্রেফতার করা হয়। উত্তরপ্রদেশ সরকার সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির স্থানীয় সাংসদ জিয়াউর রহমান বার্কের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। ওই শহরের ৭৫% বাসিন্দা মুসলমান। সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে তাঁদের ভোট দিতে না দেওয়ার অভিযোগ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই এসব করা হয়েছে বলে বিরোধীদের বক্তব্য। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেও সম্ভলের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ, উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এই ঘটনার জন্য সরাসরি বিজেপি ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে দায়ী করেছেন। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, বিভিন্ন বামপন্থী দলও সোচ্চার হয়েছে। অখিলেশ, রাহুল সহ বিরোধী কোনো নেতাকেই সম্ভলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ২৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের অনুমতি ছাড়া সমীক্ষা নিয়ে কোনো নির্দেশ দিতে নিম্ন আদালতকে নিষেধ করেছে। নিম্ন আদালতকে সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করতে বারণ করার পাশাপাশি মসজিদ কমিটিকে এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। শাহী জামা মসজিদ বিতর্ক নিয়ে বিজেপি যে অনেকদূর এগোতে চায়, তা তাদের আচরণে স্পষ্ট।

আরো পড়ুন বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিন বুঝেছিলাম, আমি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক

রাজস্থানের খাজা মইনুদ্দিন চিস্তির দরগাও মন্দির ধ্বংস করে তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। সম্প্রতি আদালত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলকে এই নিয়ে নোটিস জারি করেছে। আজমেরের এই ঐতিহ্যশালী দরগায় বহু হিন্দুও শ্রদ্ধা জানাতে যান। এমনকী স্বয়ং মোদীও ওই দরগায় চাদর চড়িয়েছেন অতীতে। সুফিবাদ আসলে ভক্তিবাদের মতই ধর্মীয়, জাতপাতের বিভাজনের ঊর্ধ্বে সম্প্রীতি ও উদারতার কথা বলে। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান মৌলবাদীরাও সুফি মতাবলম্বী ব্যক্তি এবং দরগাগুলির উপর আক্রমণ বাড়িয়েছে সাম্প্রতিককালে। যেমন ২০১৬ সালে করাচিতে বিখ্যাত সুফি কাওয়ালি গায়ক আমজাদ সবরীকে খুন করা হয়। অভিযোগ উঠেছিল যে এ কাজ তালিবানদের। এ ব্যাপারে হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদীদের মিল চোখে পড়ার মত। দুই পক্ষই আসলে উদারতা, পরধর্মসহিষ্ণুতার শত্রু।

অযোধ্যা মামলার রায়কে বড় জয় মনে করে হিন্দুত্ববাদীরা নতুন উদ্যমে নেমে পড়েছে। রামমন্দির নির্মাণের পর তা থেকে নতুন করে আর রাজনৈতিক ফায়দা তোলার সম্ভাবনা নেই। এখন চাই অন্যান্য মসজিদ, দরগা নিয়ে বিতর্ক। অযোধ্যা যে লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, সেই ফৈজাবাদে বিজেপিকে হারিয়ে সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী অবধেশ প্রসাদের জয়ে প্রমাণিত হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দারা রামমন্দিরের আবেগে রুটিরুজির সমস্যা ভোলেননি। লোকসভা ভোটে বিরোধী পক্ষের শক্তি বাড়লেও – উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা সহ বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি ধাক্কা খেলেও – সাম্প্রদায়িক, ঘৃণার রাজনীতি থেকে তারা সরতে রাজি নয়। লোকসভা ভোট পরবর্তী হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্য বিজেপির উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হরিয়ানায় বিধানসভা নির্বাচনের আগে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বাড়াতে গোরক্ষক বাহিনীর তাণ্ডব বেড়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ থেকে শ্রমিক হিসাবে যাওয়া যুবক সাবির মল্লিকও তাদের হাত থেকে বাঁচেননি। গরুর মাংস আছে গুজব রটিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে যে তাঁর কাছে গরুর মাংস ছিল না। মহারাষ্ট্রেও আরএসএস বিধানসভা নির্বাচনের আগে সক্রিয় ছিল। উত্তরপ্রদেশের উপনির্বাচনেও বিজেপি সাফল্য পেয়েছে। যদিও সেই উপনির্বাচনগুলিতে ব্যাপক কারচুপি, সংখ্যালঘুদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা ভোটেও বিজেপি তীব্র বিদ্বেষমূলক এবং উস্কানিপূর্ণ প্রচার চালিয়েছিল। বাঙালি মুসলমান মাত্রই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী – এই প্রচার করে ঘৃণার পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। অথচ সেখানে বাঙালি মুসলমানরা বহু প্রজন্ম ধরে রয়েছেন, বহু স্থানে তাঁরা মূলবাসী। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে যেন ঝাড়খণ্ডে বিদ্বেষমূলক প্রচার করার বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। চরম সাম্প্রদায়িক এই নেতা ভোটকুশলী হিসাবেও পরিচিত। ঝাড়খণ্ডে বিজেপি সাফল্য না পেলেও বিদ্বেষের যে বাতাবরণ তৈরি করল তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

গোরক্ষা, মন্দির-মসজিদ বিতর্ক ছাড়া বিজেপির কোনো উপায়ও নেই। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তাই নিজের রাজ্যে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খাওয়া, রেস্তোরাঁ, হোটেলে গরুর মাংস বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। বিগত দশ বছরের দেশজোড়া ঘৃণা, বিদ্বেষের রাজনীতিকে সম্বল করেই তারা এগোতে চায়। তৃতীয় মোদী সরকার এমনিতেই শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের সম্মুখীন। বেহাল অর্থনীতি, ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম ক্রমশ কমে যাওয়া, নিট পরীক্ষা নিয়ে কেলেঙ্কারি, একের পর এক রেল দুর্ঘটনায় শাসনের হাল বেহাল হয়েছে। আদানি কাণ্ডেও তারা অস্বস্তিতে রয়েছে।

লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির শক্তি কমিয়ে বিরোধীদের হাতে বড় দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন দেশের মানুষ। নির্বাচনের কয়েক মাস পরেই বিধানসভা নির্বাচনে ফল উল্টো হচ্ছে কেন, সে বিষয়ে বিরোধীদের আত্মবিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। লোকসভা ভোটে বিরোধীদের মধ্যে যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল, তা অটুট নেই। বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে সার্বিক ঐক্য হয়নি। ঝাড়খণ্ডে কিন্তু ঐক্যের ফল পাওয়া গেছে। বিহার, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন বিরোধীদের কাছে অগ্নিপরীক্ষা। লোকসভা ভোটের আগে ভারত জোড়ো যাত্রা সমেত একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করে কংগ্রেস অবস্থা অনেকখানি পাল্টাতে পেরেছিল। কিন্তু ভোটের পর থেকে কোনো ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ করেনি। বিজেপির চরম দক্ষিণপন্থার মোকাবিলায় ভোটের আগে কিছু কর্মসূচি নিলেই চলে না, চাই ধারাবাহিক কর্মসূচি। বিজেপির সাম্প্রদায়িক, বিদ্বেষের রাজনীতির মোকাবিলায় তারা কতখানি সক্ষম সেই পরীক্ষাও তাদের দিতে হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.