অর্ক মুখার্জি
বাংলায় ১৩ নভেম্বর যে ছটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, ২৩ নভেম্বর ফল ঘোষণার পর দেখা গিয়েছে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধীদের পর্যুদস্ত করে সবকটি আসনেই জিতেছে। এমন নয় যে পশ্চিমবঙ্গে উপনির্বাচনের ফলাফল সর্বদা শাসকের পক্ষেই যায়। ২০১৩ সালে নলহাটি, সাম্প্রতিককালে সাগরদীঘি বা বাম জমানার শেষদিকের সেই উত্তাল সময়ে জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জে খগেশ্বর রায় জিতেছিলেন। তিনিই উত্তরবঙ্গ থেকে নির্বাচিত প্রথম তৃণমূল বিধায়ক। সেবছরেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর পশ্চিম (আসনটির এখন আর অস্তিত্ব নেই) কেন্দ্রের উপনির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন তৃণমূলের মদন মিত্র। সুভাষ চক্রবর্তীর প্রয়াণের পর তাঁর পূর্ব বেলগাছিয়া (এই আসনটিরও এখন আর অস্তিত্ব নেই) কেন্দ্রে হেরে গিয়েছিলেন সিপিএম প্রার্থী সুভাষের স্ত্রী রমলা। তাঁকে হার মানতে হয়েছিল একদা সুভাষের ‘শিষ্য’ সুজিত বসুর কাছে।
এছাড়া উল্লেখযোগ্য উপনির্বাচনের কথা বলতে গেলে বলতে হবে ২০০০ সালের হয়েছিল পাঁশকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের কথা। এলাকা দখলের রাজনৈতিক লড়াইয়ে উত্তপ্ত সেই নির্বাচনে সদ্য মুখোমুখি হয়েছিল সদ্যোজাত তৃণমূল কংগ্রেস এবং বাংলার মাটিকে শক্ত ঘাঁটি বলে দাবি করে আসা বামফ্রন্টের শরিক সিপিআই। সেই ভোটে প্রাক্তন আমলা তৃণমূল প্রার্থী বিক্রম সরকারের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন গুরুদাস দাশগুপ্ত। সেইসময় তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি একে ‘পাশকুঁড়া লাইন’ নামে অভিহিত করেন। ওই বছরই আর এক বিধানসভা উপনির্বাচনে জঙ্গলমহলের বিনপুরে সিপিএম প্রার্থীকে হারিয়ে বিধায়ক হয়েছিলেন ঝাড়খণ্ড পার্টির নরেন গোষ্ঠীর প্রার্থী চুনিবালা হাঁসদা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আরেকটু পিছিয়ে গেলে আরও এক আশ্চর্য উপনির্বাচন আমরা দেখতে পাব। ১৯৯৫ সালে অশোকনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে সিপিএম প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী বাদল ভট্টাচার্য। তখন বাংলায় বিজেপি রাজনৈতিকভাবে প্রায় অবয়বহীন। এখন প্রায়ই গরম গরম মন্তব্য করে খবরের শিরোনামে থাকা ভরতপুরের তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরও মন্ত্রী থাকাকালীন উপনির্বাচন লড়তে গিয়ে হেরে গিয়েছিলেন। রেজিনগরের সেই উপনির্বাচন ছিল অধীর চৌধুরীর সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াই। ২০২৪ সালে অধীর দুর্গের পতন হলেও সেবার কংগ্রেস প্রার্থীর চেয়ে বেশি লম্বা ছিল অধীরের ছায়া। হুমায়ুন হারেন এবং তাঁকে মন্ত্রিসভা ছাড়তে হয়।
আরও পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে, ১৯৮৪ সালে এক উপনির্বাচনে কলকাতার বেলগাছিয়া কেন্দ্রে কংগ্রেসের অমর ভট্টাচার্য হারিয়েছিলেন শাসক দল সিপিএমের লক্ষ্মী সেনকে। সেবছরই বামফ্রন্টের আরেক শরিক আরএসপির কাছ থেকে বোলপুর বিধানসভা ছিনিয়ে নেয় কংগ্রেস।
অর্থাৎ উপনির্বাচন হলেই কেবল শাসক দল বা জোট জিতবে – বাম আমলে বা তৃণমূলের আমলেও তার কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা দেখা যায়নি। অথচ এবারের উপনির্বাচনে ৬-০ হেরে বিরোধীরা এই কথাই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেছেন ‘বাই-ইলেকশন বলে এরকম হয়েছে। ২৬-এ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গড়বে।’
বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মন্তব্য করেছেন ‘বাংলাতে উপনির্বাচন হয় না।’ অন্যদিকে প্রবীণ বাম নেতা রবীন দেব বলেছেন ‘আমাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। সব জায়গায় লড়াই করতে পারিনি। আমরা সকলকে নিয়ে লড়াই করছি। কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া না হওয়ায় ভোট বিভাজন হয়েছে। যদিও তার খুব একটা প্রতিফলন ভোটবাক্সে পড়েনি, কারণ একচেটিয়া ভোট পেয়েছে তৃণমূল। তবে এত দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও কীভাবে এত ভোট? তা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলবে।’ ডিওয়াইএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেছেন ‘আজ হয়নি বলে কাল হবে না তা নয়। আর জি করে রাজ্যের সরকার, পুলিস, স্বাস্থ্য দপ্তর যা ঘটিয়েছে ছটা বিধানসভা কেন্দ্রে জিতে গেল বলে তাদের সমস্ত দোষ ধুয়ে গেল এমনটাও নয়।’
সাম্প্রতিক সময়ের আর জি কর নিয়ে যেভাবে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়েছিল, সরকারি ব্যর্থতা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে যেভাবে তৃণমূলের সংযোগ প্রকট হয়েছিল, তাতে বিরোধীরা আশা করেছিল তারা খানিকটা লড়াই দিতে পারবে। কিন্তু ক্ষোভ, বিক্ষোভ, আন্দোলনকে রাজনৈতিক অভিমুখ দিয়ে জনসমর্থন আদায় করতে গেলে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা দরকার হয়। তার জন্যে লাগে সংগঠন এবং ক্রমাগত লড়ে যাওয়ার জন্য ক্যাডার বাহিনী। বঙ্গে বাম রাজনীতির উত্থান হয়েছিল এর উপর ভিত্তি করেই। কিন্তু ক্ষমতা হারাবার পর থেকে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলে তাকে ভোটের ইস্যুতে পরিণত করতে লড়াইয়ের যে তীব্রতা দরকার, তা বাম দলগুলোর মধ্যে দেখা যায়নি। তাছাড়া আর জি করের ঘটনা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলেও যে বিধানসভা কেন্দ্রগুলোতে উপনির্বাচন হয়েছে সেখানে আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য বুথ স্তরে সংগঠন দরকার। তা এখন সিপিএম সহ প্রায় কোনো বাম দলেরই নেই।
বিধানসভাভিত্তিক বুথ সংগঠন ভোটে রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত জনসংযোগ ছাড়া উপনির্বাচনে শাসক দলকে কুপোকাত করা সম্ভব নয়। ২০০৬ সালে সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার যখন তৈরি হয়েছিল, বামফ্রন্ট ২৩৫টি আসন জিতেছিল। তার দুবছরের মধ্যে শাসকবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়েছিল সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে । ২০০৬ সালের ভোটে সিঙ্গুরে কিন্তু বিরোধীরা জিতেছিল। সিঙ্গুর থেকে বিধায়ক হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। নন্দীগ্রামে বামফ্রন্ট প্রার্থী সিপিআইয়ের ইলিয়াস মোহাম্মদ পান ৬৯,৩৭৬ ভোট, তৃণমূল প্রার্থী শেখ সুফিয়ান পান ৬৪,৫৫৩ ভোট। সুফিয়ান হারলেও ব্যবধান ছিল অল্প। বিরোধীদের মজবুত সংগঠন থাকার কারণে নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে নিজেদের কব্জায় আনতে পেরেছিল তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। অর্থাৎ ইস্যু আছে, ক্ষোভ আছে, বিক্ষোভ আছে, বিক্ষুব্ধও আছে – কিন্তু এগুলিকে এক সুতোয় বেঁধে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিমুখ স্থির করে ভোটবাক্সে প্রতিফলিত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অভাব দেখা যাচ্ছে আজকের বিরোধীদের মধ্যে।
সাম্প্রতিক উপনির্বাচনের ফলে স্পষ্ট যে বিজেপি বাংলার রাজনীতিতে বিরোধীদের পরিসর দখলে রাখতে সফল হয়েছে। কিন্তু তাদের সমস্যা হল, বঙ্গ বিজেপি নেতারা কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলির উপর নির্ভর হয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছেন। অনেকসময় দেখা যাচ্ছে, কেবলমাত্র মুসলিম আগ্রাসনের মিথ্যা ভাষ্য তৈরি করে হিন্দুদের জুজু দেখিয়ে রাজনৈতিক পরিসর দখল করার চেষ্টা করছেন। সন্দেশখালির ঘটনায় বিজেপি শেষপর্যন্ত সে কাজে ব্যর্থ হয়ে জমি হারিয়েছিল। এখনো ওই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। তার উপর আছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। বঙ্গ বিজেপির উপর এখন কেন্দ্রীয় বিজেপির নেতারাও তেমন ভরসা রাখছেন বলে মনে হচ্ছে না। সুকান্ত, শুভেন্দুরা যতই বলার চেষ্টা করুন যে উপনির্বাচনে এরকম ফল প্রত্যাশিত, আসলে তাঁদের খাপছাড়া রাজনৈতিক কৌশলই এর জন্য দায়ী। শুভেন্দু ছাড়া রাজ্য বিজেপির কোনো নেতার সাধারণ মানুষকে নিয়ে আন্দোলন করে দাবি আদায় করার অভিজ্ঞতা নেই। স্বাভাবিকভাবেই তারা আন্দোলন করতে গেলে তার কৃত্রিমতা সাধারণ মানুষের কাছে ধরা পড়ে যায়। ছাত্র সমাজ নাম দিয়ে নবান্ন অভিযানের মত আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন তদন্তে সিবিআই, ইডির স্লথ গতির কারণে বিজেপির তৃণমূলবিরোধিতা নিয়েও মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করেছে।
আরো পড়ুন বাঙালি মধ্যবিত্তের আন্দোলন দেখে ট্যাবলো মনে হয়
কংগ্রেস অধীর বলয় থেকে বেরিয়ে এই মুহূর্তে বাংলায় তৃণমূলবিরোধিতা কতটা তীব্রভাবে করতে পারবে তা নিয়ে কংগ্রেস নেতাদের মনেই বোধহয় সন্দেহ আছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আসলে পরবর্তীকালে পরিস্থিতি অনুযায়ী তৃণমূলের সঙ্গে জোট বাঁধার পথ খোলা রাখার জন্যই অধীরকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। আর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট এখনো কিছু সংখ্যালঘু এলাকাতেই সীমাবদ্ধ। তবে সেইসব জায়গায় তারা কিন্তু সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও বেশ ভাল লড়াই দিচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলা জুড়ে তৃণমূলের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার জায়গায় তারা নেই।
সুতরাং বিরোধীদের আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। উপনির্বাচন গুরুত্বহীন বা ওতে শাসক সবসময় জেতে – এই জাতীয় কথা বলে নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ২০২৬ সালে লড়াইয়ে থাকতে গেলে এখন থেকে ভাবতে হবে, সংগঠন বাড়াতে হবে এবং নিয়মিত ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি পালনের উপর জোর দিতে হবে। নইলে উপনির্বাচনের মত ফলই দেখা যাবে বিধানসভা নির্বাচনেও।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







