উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে দুজন বিচারাধীন বন্দি খুন হয়েছেন। দুজনেরই হাতে ছিল হাতকড়া। পুলিস ও স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের ঘেরাটোপে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আচমকা মাথায় গুলি খেয়ে একজন পড়ে যান। পাশের জন বুকে গুলি খেয়ে পড়ে যান। তারপর তাঁদের ঘিরে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে থাকে আততায়ীরা। আশ্চর্যের এই, যে পুলিস ও এসটিএফের দুঁদে অফিসাররা নীরব দর্শক। ঠুঁটো সেজে দাঁড়িয়ে ছিলেন, নয়ত এদিক-ওদিক কেটে পড়েছিলেন। আততায়ীরা অবাধে পুলিসি কর্ডন পার করল, নিখুঁত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করল এবং সহজ ভঙ্গিতে ধরা পড়ে পুলিসের সঙ্গে চলে গেল।

ভারতীয় গণতন্ত্রে প্রতিদিন এমন সব ঘটনা ঘটছে, যাতে হতবাক হয়ে যেতে হয়। এই ঘটনা তাতে নবতম সংযোজন। পুলিস ও সাংবাদিকদের সামনে নির্ভয়ে বন্দুক বের করে আততায়ীরা হত্যা করছে – এই বিরলতম ঘটনার ভিডিও দেখে ফেলেছেন দেশ বিদেশের অসংখ্য মানুষ। দুটি লজ্জাজনক তদুপরি আতঙ্কের বিষয় প্রতীয়মান হয়। (১) প্রাক্তন সাংসদ তথা পুলিশ হেফাজতে থাকা অপরাধীকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ উত্তরপ্রদেশ পুলিস। (২) নিহতেরা মুসলমান এবং আততায়ীরা গর্বিত হিন্দুত্ববাদী। নিহতেরা মুসলমান! হ্যাঁ, মৃতের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে টানাটানি করতে আমাদের অনেকেরই রুচিতে বাধে, অনৈতিক মনে হয়। কিন্তু, নীতিহীনতা আর দুঃশাসন যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন নিহতের ধর্মীয় পরিচয় তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক ও সামাজিক – দুদিক থেকেই। বিশেষত উত্তরপ্রদেশের মত রাজ্যে, যেখানে প্রতিদিন ঘটা অসংখ্য ঘটনায় হিন্দুত্ববাদী শাসনে সরকারি সিলমোহর লাগছে। উপর্যুক্ত ঘটনায় নিহতেরা মুসলমান এ কথাকে গুরুত্ব দিতেই হবে, কারণ আততায়ীরা খুনের পরে প্রকাশ্যে ‘জয় শ্রীরাম’ চিৎকার করেছে। খুনের ‘লাইভ’ ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই জাতীয়তাবাদী উল্লাসে হত্যাকে ন্যায্যতা দেওয়া চলছে। আততায়ীর ধর্মীয় পরিচয় এবং খুনের উদ্দেশ্যে ধর্ম, রাজনীতি ও সামাজিক সংস্কৃতি ওতঃপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। দুজন প্রভাবশালী মাফিয়াকে নিকেশ করতে এসে তিনজন হবু মাফিয়া আইন-পুলিসকে কাঁচকলা দেখানোর পাশাপাশি সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে – ভারতের যে কোনো গণতন্ত্রপ্রেমী নাগরিকের কাছে এটি আতঙ্কময় বাস্তবতা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আরো পড়ুন আনিস খান হত্যা: যেটুকু জানি

পুলিস হেফাজতে মৃত্যু ভারতে রোজকার ঘটনা। এপ্রিল ২০২০ থেকে মার্চ ২০২২ অবধি সারা দেশে পুলিস ও জেল হেফাজতে মৃত্যুর মোট ৪৪৮২টি কেস নথিভুক্ত হয়েছে। শীর্ষে উত্তরপ্রদেশ – ৯৫২। তারপরেই যথাক্রমে পশ্চিমবঙ্গ (৪৪২), বিহার (৩৯৬) এবং মধ্যপ্রদেশ (৩৬৪)। ২০২০-২২ সালে সারা দেশে মোট ২৩৩টি পুলিশি এনকাউন্টারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে শীর্ষে জম্মু-কাশ্মীর এবং ছত্তিশগড়। তারপরেই উত্তরপ্রদেশ। জাতীয় নির্যাতন বিরোধী প্রচার দপ্তর ২০১৯ সালের রিপোর্টে প্রকাশ করে, পুলিস হেফাজতে মৃত ১২৫ জনের মধ্যে অধিকাংশ আদিবাসী, দলিত ও মুসলমান। এই তালিকাতেও শীর্ষস্থানে উত্তরপ্রদেশ। জাতীয় মানবাধিকার রক্ষা কমিশনের প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিগত ছ বছরে ৮১৩টি পুলিসি এনকাউন্টার এবং পুলিসের গুলিচালনায় মৃত্যুর ১৪৩টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে এখন অবধি উত্তরপ্রদেশ পুলিস ১৮৩টি এনকাউন্টার করেছে। এই পরিসংখ্যানগুলি লজ্জার। গণতন্ত্রের পক্ষে এবং মানবাধিকারের পক্ষে লজ্জার। ২০১৯ সালে জাতিপুঞ্জ দ্বারা প্রকাশিত একটি রিপোর্টে উত্তরপ্রদেশে ঘটে চলা এনকাউন্টার, পুলিসি অত্যাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আর ভয়ের বিষয়, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই তথ্য, নমুনাগুলি সামাজিক পরিসরে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। আতঙ্কের বিষয় – গণচাহিদা মেটাতে শাসক সাংবিধানিক পরিসর যথেচ্ছ লঙ্ঘন করছে এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক মতাদর্শের সাহায্যে তাকে ন্যায্যতা দিচ্ছে। এনকাউন্টারের মত মানবতাবিরোধী বিষয়কে ন্যায্যতা দিতে ব্রাহ্মণ্যবাদী মতাদর্শ চাপিয়ে শাসিতের সম্মতি আদায় করছে। কখনো ভুয়ো প্রচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রবাদী যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছে। রাষ্ট্রানুসারী মিডিয়া, চলচ্চিত্র, সাহিত্য এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এই পদ্ধতিকে জনমানসে চারিয়ে দিচ্ছে। এ এক সন্ত্রাস, যা সরাসরি শাসিতের চেতনাকে গ্রাস করে রাষ্ট্রের শোষণের ভিত মজবুত করে। অতি সম্প্রতি আতিক আহমেদ ও আশরফের হত্যা সেই সন্ত্রাসকে আরও নগ্ন করে দিয়েছে।

 

 

আতিক আহমদ কে? সজ্জন, নীতিবান, ভদ্রলোক? না। ১৯৭৯ সালে প্রথমবার খুনের দায়ে অভিযুক্ত। তারপর পশ্চিম এলাহাবাদে দাপিয়ে বেড়ানো। ১৯৮৯ সালে নির্দল প্রার্থী হিসেবে ভোটে জেতা, তারপর সমাজবাদী পার্টিতে যোগদান। সমাজবাদী পার্টির টিকিটে রাজ্যসভার সাংসদ হয়ে মাফিয়াগিরির বিস্তার ঘটিয়েছেন। এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন, যে আদালতের নির্দেশে ২০১৯ সালে তাঁকে গুজরাটের জেলে স্থানান্তরিত করা হয়, যাতে উত্তরপ্রদেশের জেলে বসে খুন, অপহরণ, তোলাবাজি না করতে পারেন। গত মাসে ফের প্রয়াগরাজে নিয়ে আসা হয় তাঁকে। উদ্দেশ্য উমেশ পালের খুনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ। উমেশ পাল খুন হন ফেব্রুয়ারি মাসে। তিনি ছিলেন ২০০৫ সালে রাজু পাল খুন হওয়ার প্রধান সাক্ষী। সেই রাজু পাল, যিনি আশরফ আহমদকে ২০০৪ সালে নির্বাচনে হারিয়েছিলেন। উমেশ পালের খুনে প্রধান আসামী আতিকের ছেলে আসাদ আহমেদ, গুলাম প্রমুখ। কয়েকদিন আগেই উত্তর প্রদেশ স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের ‘এনকাউন্টার’-এ খুন হয়েছে আসাদ আহমেদ। গত ১৩ এপ্রিল ঝাঁসিতে ‘ফেরার’ আসাদ ও গুলামকে খুন করেছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের তিন ‘বীর’ এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞ। বাস্তবের এই জটিল এবং আন্তঃসম্পর্কিত জাল হুবহু বুনে ফেলে ক্রাইম থ্রিলার লিখে বা বানিয়ে ফেলা যায়। তবে এহেন রোমহর্ষক অন্তহীন অপরাধসুতোর বিস্তারে প্রমাণিত হয় উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বেহাল। তাতে আর যাই থাকুক স্থিতি নেই, গণতন্ত্র নেই এবং নিরাপত্তা নেই। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো সরকারি এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞরা রয়েছে।

বিকাশ দুবের এনকাউন্টার নিশ্চয়ই মনে আছে? সেও গ্যাংস্টার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছিল। ২০২০ সালে ধরা পড়ার একদিনের মধ্যে প্রকাশ্যে পুলিসের গুলিতে নিহত হয়। পুলিস হেফাজতেই। এই এনকাউন্টার ‘ভুয়ো’ তথা ‘সাজানো’ কিনা তা নিয়ে সঙ্গত প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু শাসকপন্থী মিডিয়ার প্রচারে এবং সোশাল মিডিয়ায় নির্মিত জনতোষী বয়ানে বিকাশের খুন বৈধতা পেয়ে যায়। চাপা পড়ে যায় সাংবিধানিক অধিকারের যুক্তি ও আইন লঙ্ঘনের তর্ক। গ্যাংস্টার টিঙ্কু কাপালা ২০২০ সালের জুলাইয়ে একইরকম এনকাউন্টারে নিহত হয় বরাবাঁকিতে। ২০২১ সালের অক্টোবরে গোমতী নগরে গ্যাংস্টার হামজাকে খতম করে উত্তরপ্রদেশ পুলিস। এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে ‘চটজলদি ন্যায়বিচার’ নাম দিয়ে যাবতীয় দায় ঝেড়ে ফেলে রাষ্ট্র। আইনের বাণী যতই নিভৃতে কাঁদুক, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিহত অভিযুক্তদের সঙ্গে জড়িয়ে না যাওয়া সমাজের মাথারা। অনেক বেখাপ্পা প্রশ্নের সম্ভাবনা ধামাচাপা দেওয়া যায়, জনতার মগজে দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের বীরত্বের ‘নীল ডিম বুনন’ করা যায় এভাবে। মাফিয়ারাজ, বন্দুকবাজি, এনকাউন্টার, বাহুবলী, অনৈতিক কাজকর্ম – উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক জলবায়ুর প্রধান উপাদান। আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত একটা ব্যবস্থা বছরের পর বছর শুধু অপরাধী ও অপরাধপ্রবণতা বিইয়ে চলেছে। এর সঙ্গে জুড়েছে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার রাজনীতি। তাই খুনের পরে নির্ভয়ে পুলিস ও সাংবাদিকদের সামনেই ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া চলছে।

চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য এমন হয়। পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিঁড়ে নায়ক বা খলনায়ক বা তাদের পক্ষাবলম্বী কেউ ঢুকে পড়ে, গুলি চালায়। হইহই রবে জয়োল্লাস করে। অগ্নিপথ (১৯৯০) ছবিতে আদালত চত্বরে নায়কের প্রিয়জনদের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট করেছিল খলনায়কের লোকেরা। ধ্রুব (২০১৬) ছবির শেষ দৃশ্যে খলনায়ককে পুলিসি বেষ্টনীর মধ্যেই গুলি করে খুন করে প্রতারিত প্রেমিকা। আরও ছবিতেই এমনটা দেখানো হয়েছে। ১৫ এপ্রিল ২০২৩, তিন আততায়ী অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে খুন করল আতিক ও আশরফকে। আততায়ীদের নাম লাভলেশ তিওয়ারি, সানি সিং এবং অরুণ মৌর্য। বাইকে করে এসেছে, সাংবাদিক পরিচয়ে লক্ষ্যের নাগালে পেয়েছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের সঙ্গে মস্ত তফাত এই যে, বাস্তবে অতি-জাতীয়তাবাদী চর্চা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। খুনের পরে আততায়ীদের দেওয়া ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের উল্লাস নিয়ে কিছু জলঘোলা হয়েছে। বিজেপি ও আরএসএসের কিছু গণসংগঠন দাবি করে যে, ‘জয় শ্রীরাম’ বলা হয়নি, সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটি নাকি ‘ডক্টরড’। হিন্দুত্ববাদীদের বদনাম করতেই এমনটা করা হয়েছে। কিন্তু অল্টনিউজ একাধিক সংবাদমাধ্যমের ভিডিও, প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছে, আততায়ীরা সত্যিই হিন্দুত্ববাদী স্লোগান দিয়েছে। গুলি চালানোর সময় এবং গুলি চালানোর পরে। যেহেতু নিহত অভিযুক্তরা ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান, তাই তাদের সঙ্গে পাকিস্তানযোগ আবিষ্কৃত হয়েছে। টুইটার থেকে ফেসবুক, হত্যার লাইভ ভিডিওর নিচে মন্তব্যে উপচে পড়ছে জাতীয়তাবাদী অভিনন্দন। শম্ভুলাল রেগারের মত, দারা সিংয়ের মত, বাবু বজরঙ্গির মত হিন্দুধর্ম রক্ষাকারী জাতীয়তাবাদী নায়ক হয়ে উঠেছে এই তিনজন আততায়ী। এই নির্মাণ একদিনে হয়নি। বহু বছর ধরে জনচেতনায় ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি এবং ভুয়ো তথ্য পরিমাণ মত মিশিয়ে এমন নির্মাণ হয়েছে। বহু সঙ্গত প্রশ্ন চাপা পড়ে যাচ্ছে শাসকের এমন সচেতন উদ্যোগে।

প্রশ্নগুলি

অতিসাধারণ নিম্নবিত্ত তিন তরুণ ৫-৬ লাখ টাকা দামের তিনটে পিস্তল জোগাড় করে ফেলল কীভাবে? মোটরবাইক এবং সাংবাদিকের পরিচয়পত্র জোগাড় করে খুনের এমন নিখুঁত পরিকল্পনা অনভিজ্ঞদের পক্ষে সম্ভব? কিছু সাংবাদিক প্রশ্ন তুলেছেন, আতিক ও আশরফের শারীরিক অবস্থা কতটা উদ্বেগজনক ছিল, যে তাদের হাসপাতালে আনতে হয়েছিল? দৃশ্যত তাঁদের মধ্যে অসুস্থতার কোনো লক্ষণ ছিল না। আতিকদের হাসপাতালে আনা হবে – এ কথা রাষ্ট্র হল কীভাবে? আতিক ও আশরফকে নিয়ে আসা পুলিসের গাড়ি হাসপাতালের গেটের বাইরে থেমে গেল কেন? বাকি পথ হাঁটিয়ে নিয়ে আসতে হল কেন? আততায়ীদের কাজ সহজ করে দিতেই কি? অভিযুক্তদের জীবনের সুরক্ষা নিয়ে সরকার সচেতন ছিল বলে দাবি করেছেন প্রশাসনিক কর্তারা। তাঁদের নিরাপত্তার বন্দোবস্ত নাকি সাধারণ অভিযুক্তদের থেকে কয়েক গুণ বেশি ছিল। আতিক গতমাসে আদালতে জানিয়েছিল, সে খুন হওয়ার আশঙ্কা করছে। তারপরেও আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন করে মিডিয়া এমন দুজন বন্দির এত কাছাকাছি এসে প্রশ্ন করার অনুমতি পেল কী করে? অমর উজালা-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আতিক ও আশরফ জিজ্ঞাসাবাদ পর্বে যা যা বলেছেন, তাতে অনেক রাজনৈতিক ও সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির নাম জড়িয়ে ছিল। মন্ত্রী থেকে বড় ব্যবসায়ী, আমলা, পুলিস – অনেকেই তাতে সমস্যায় পড়ত।

বিকাশ দুবের সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছিল এমন অনেকের নাম। সংসদীয় রাজনীতির ছত্রছায়া ছাড়া মাফিয়া-গুণ্ডা-আততায়ী তৈরি হয় না। ভারতীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এই প্রকাশ্য-গোপন সত্য সকলেই জানেন, যে কালো টাকার প্রবাহ ছাড়া কোনো সংসদীয় দলের একটি পাতাও নড়ে না। যে দল যত বাহুবলী আর মাফিয়া পোষে, সে দলের ভোট বৈতরণী পার করা তত সোজা হয়। স্থানীয় স্তরে অনৈতিক কাজে প্রশ্রয় না দিলে সংসদীয় দলের ভোটজমি শক্ত হয় না। আর প্রশাসনিক মাথারা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে না থাকলে এই ব্যবস্থা চলতে পারে না। এই ব্যবস্থার কাছে আতিক ও আশরফের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছিল। রবীশ কুমারের মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক প্রশ্ন তুলেছেন, সিস্টেম চালানোর মালিকরা আতিক ও আশরফের খুনের পরিকল্পনার অংশ বলেই কি এত নিখুঁত বাস্তবায়ন সম্ভবপর হল?

আদিত্যনাথ ২০১৭ সালে ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা করেছিলেন, “অগর আপ অপরাধ করেঙ্গে, তো ঠোক দিয়ে যায়েঙ্গে”। শুধুমাত্র হত্যা করে সমাজশোধনের ব্যবস্থা নয়, আদিত্যনাথের পুলিসি নীতি এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল পঙ্গু করে দেওয়া। ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে উত্তরপ্রদেশে ৩৪ জন এনকাউন্টারে খতম হয়েছিলেন এবং ২৬৫ জন আহত/পঙ্গু হয়ে গেছিলেন। দমননীতির ছক পুরো সাজানো। ভয়ে হোক বা স্বাভাবিকীকরণের জবরদস্তিতে, দিনের পর দিন তা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন মানুষ। রাজনীতি থেকে সামাজিক পরিসরের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে এই হত্যাকাণ্ডগুলি। কারণ বিগত কয়েক বছরে ভারতে মুসলমান হত্যার প্রাবল্য। প্রকাশ্যে হননোল্লাসে মত্ত হন্তারকরা ধর্মীয় চিহ্নায়ক তুলে ধরে হত্যাকে ন্যায্যতা দিচ্ছে। বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এবং ব্যক্তিবর্গ তাতে অনুমোদন দিচ্ছে। আদিত্যনাথ অপরাধীদেরই শুধু বার্তা দেননি, বিরোধীদেরও বার্তা দিয়েছেন। মুসলমানদের নিরন্তর বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের বিরোধিতা করে আন্দোলন করলে বুলডোজার দিয়ে ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বললে অপরাধী প্রমাণ করে এনকাউন্টার করে দেওয়া হবে। হিন্দুত্বের চিহ্নায়কগুলি নতমস্তকে মেনে না নিলে রাষ্ট্রদ্রোহী তকমা দিয়ে জনমত তৈরি করে পিষে ফেলা হবে। “দেশ কে গদ্দারোঁ কো / গোলি মারোঁ শালো কো” স্লোগানের ভয়াবহ বাস্তবতা নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। ভুয়ো তথ্য-নথি আর ভুয়ো প্রচারের মাধ্যমে নিহতকে অপরাধী, দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রবিরোধী, হিন্দুবিরোধী ইত্যাদি তকমা দিয়ে ফেলতে কতক্ষণ আর লাগে? সাম্প্রতিক এনকাউন্টারে পুলিসকে হাত গন্ধ করতে হল না, শ্রীরামভক্তরাই কাজটা করে দিল।

প্রকাশ্যে খুনের ভিডিও সংবাদমাধ্যমে এবং সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া খুনীদের পরিকল্পনার অংশ ছিল। খেয়াল করলে দেখা যাবে, আতিক-আশরফদের হত্যা করার ভিডিওতে হিন্দুত্ববাদী খুনীদের সোল্লাস উদযাপন আদতে অনেকগুলি বার্তা দেওয়া – ১) পুলিস প্রশাসন কিচ্ছু করতে পারবে না হিন্দুত্ববাদী ‘ডেয়ারিং’ যুবকদের, অথবা তাদের মদত দেবে। ২) মুসলমান বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের বীজ বপন করা, যে তাদের সঙ্গেও যে কোনো সময় এরকম করা হতে পারে। যেমনটা এই ভিডিওতে একজন বলছেন।

এরকম ঘটনার সামাজিক প্রতিক্রিয়া হবেই। মুসলমান সম্প্রদায়ের তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া এলে তাকে বাড়িয়ে-চড়িয়ে পুরো সম্প্রদায়কেই অপরাধী/সন্ত্রাসবাদী প্রমাণ করা হবে। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিতে ব্যবহার করা হবে। যেমন এই টুইটে দেখা যাচ্ছে।

৩) মন্ত্রী, প্রশাসনিক কর্তা এবং উঁচুতলার লোকেদের বিপদ হলে সরকার তাদের রক্ষা করবে। ৪) মাফিয়ারাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রের থেকে বড় ‘মাফিয়া’ কেউ নেই, তা বিচারবহির্ভূত পথে হলেও। ৫) এই ধরণের ভিডিও, ছবির সামাজিক প্রভাব মারাত্মক। এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত হিন্দুত্ববাদীদের উল্লাস ও মুসলমানদের আতঙ্ক পরবর্তী ভোটে ব্যবহার করা যাবে। ৬) ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে খুন করা হলেই তা ন্যায্য। তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন চলতে পারে না। উপর্যুক্ত বার্তাগুলি চিহ্নিত করে ন্যায্য প্রশ্নগুলি তুলে ধরা প্রয়োজন। সাংবিধানিক পরিসর যথাযথ রাখতে প্রতিরোধ প্রয়োজন। ভারতীয় বিচারব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রকামী নাগরিক – কেউই এই প্রতিরোধের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.