ত্রিপুরার পুরসভা এবং নগর পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। সবকটি পুরসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিজেপি। নগর পঞ্চায়েতেও দাঁড়াতে পারেননি বিরোধীরা। এমন ফলাফল যে হবে, তা অবশ্য প্রত্যাশিতই ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচন দেখেছেন। বামফ্রন্ট আমলেও বহুবার বিরোধীদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৩ এবং ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূলের একচেটিয়া দাদাগিরি, ভোট লুঠের স্মৃতি এখনও টাটকা। কিন্তু ত্রিপুরায় পুরভোট জেতার জন্য বিজেপি যা করল, তা বোধহয় এই সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল। গোটা রাজ্যে মাত্র তিনটি ওয়ার্ডে জিতেছে প্রধান বিরোধী সিপিএম, তৃণমূল একটিতে। অন্য বিরোধী এবং বিক্ষুব্ধ বিজেপি, নির্দল মিলিয়েও সংখ্যা ৩-৪।

এই নির্বাচনকে প্রহসন বললে কম বলা হয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা বিপ্লব দেবের সরকার দেখাতে পারলেন না। এটা নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু তার চেয়েও বেশি অবাক করা। কারণ, ত্রিপুরার গেরুয়া সরকারের বয়স বেশি নয়। বলা যায়, এখনো যৌবন পেরোয়নি। দীর্ঘদিনের বামপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে নিঃসন্দেহে মানুষের বিরক্তি, ক্ষোভ জমা হয়েছিল। মানিক সরকারদের সরানোর মত ক্ষমতা কংগ্রেসের যে ছিল না, তা-ও বারবার স্পষ্ট হচ্ছিল। এই রকম অবস্থায় কার্যত ধূমকেতুর মতো ত্রিপুরার রাজনৈতিক পরিসরে ভারতীয় জনতা পার্টির আবির্ভাব। শেষ বিধানসভা নির্বাচনে বামপন্থী ফ্রন্ট বা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে রিগিংয়ের অভিযোগ ওঠেনি। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিলেন, সেই কারণেই সরতে হয়েছিল মানিক সরকারদের। বিজেপি ৪৩% ভোট পেয়েছিল, সিপিএম পেয়েছিল ৪২%। যদিও আসনের বিচারে অনেক এগিয়ে থেকে সরকার গড়েছিল বিজেপি। এসব ২০১৮ সালের কথা। মাত্র তিন বছরের মধ্যে কী এমন ঘটিয়ে ফেললেন বিপ্লব দেব, যার ফলে পুরসভা নির্বাচন জিততেও এই রকম হিংসা, রিগিং, সার্বিক জালিয়াতির আশ্রয় নিতে হচ্ছে? ত্রিপুরায় এখন সাংগঠনিকভাবে বিরোধীরা প্রায় অস্তিত্বহীন। প্রধান বিরোধী সিপিএমের সর্বত্রই সংগঠন আছে বটে, কিন্তু কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তোলার ধারে কাছে তারা নেই। তৃণমূল কয়েকটি পকেট বাদে অস্তিত্বহীন। কংগ্রেস বিলুপ্তপ্রায়। আইপিএফটি এবং আইএনটিপি-ও হীনবল। তা সত্ত্বেও কেন আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন বিপ্লব দেব? মাত্র তিন বছরে একটি সরকার রাজ্যের মানুষের কতখানি বিরক্তি উৎপাদন করতে পারেন যে, পুরভোটে জেতার জন্যও বেলাগাম সন্ত্রাস প্রয়োজন হয়?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ত্রিপুরার মানুষ বাম সরকারকে সরিয়েছিলেন মূলত দুটি কারণে। উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান। ২০১৮ সালের নির্বাচন কভার করতে গিয়ে দেখেছি, সার্বিকভাবে মানিক সরকারের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ চোখে পড়ার মত। তিনি সৎ, পরিশ্রমী মানুষ, দুর্নীতিগ্রস্ত নন — এ কথা শহরাঞ্চল তো বটেই, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও বিশ্বাস করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা কমিউনিস্টদের প্রতি মানুষের বিরক্তি তৈরি হচ্ছিল। দাবি উঠছিল, উন্নয়ন চাই। বেশ পিছিয়ে পড়া রাজ্য ত্রিপুরা। প্রতিকূল ভূ-প্রকৃতি। যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যা আছে। তার উপর নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়েও ক্ষোভ ছিল। কংগ্রেস দল সরকারবিরোধী ক্ষোভকে ব্যালটবন্দি করতে পারছিল না। রাজ্যের নামজাদা কংগ্রেস নেতাদের ভাবমূর্তি সুবিধাজনক ছিল না। তাঁদের একজন কংগ্রেস থেকে তৃণমূল হয়ে এখন বিজেপিতে বিপ্লব দেব-বিরোধী শিবিরের নেতা। রাজনৈতিক মহলের জল্পনা, তিনি ফের তৃণমূলে ফিরবেন। এই অবস্থায় আরএসএসের পুরনো বেস এবং কংগ্রেসছুট নেতাদের জুটিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মার কুশলী শরচালনায় সিপিএমকে বিদ্ধ করে বিজেপির উল্কাসদৃশ উত্থান ও ক্ষমতা দখল। কিন্তু সমস্যা হল, ত্রিপুরা বিজেপির হাতে এমন কেউ ছিলেন না (এখনও নেই), যিনি নানা জাতি-উপজাতির এই রাজ্যটিকে সামলাতে পারবেন। ডবল ইঞ্জিন সরকারের কথা বলে আগরতলা দখল তো হল, কিন্তু সেখানকার ইঞ্জিনটি চালানোর দায়িত্ব পড়ল এমন একজনের হাতে, যাঁর না আছে প্রশাসনিক দক্ষতা, না আছে বড় কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা। গত তিন বছরে উন্নয়ন বা কর্মসংস্থান যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। উপরন্তু ত্রিপুরা জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিজেপির ঝটিকাবাহিনী। একদল লুম্পেন হিন্দুত্ববাদী যারা মসজিদে আগুন দেয়, মসজিদ ভাঙে, বামপন্থীদের দফতর জ্বালায়, সব রকম বিরোধী কণ্ঠকে টুঁটি টিপে মারে।

এই লুম্পেন বাহিনীকে অবলম্বন করে কোনোরকমে ক্ষমতা দখলে রাখা ছাড়া বিপ্লব দেবের সম্ভবত কোনো উপায় নেই। ত্রিপুরার অভিজ্ঞতা নিশ্চিতভাবেই পশ্চিমবঙ্গের থেকে আলাদা। ভাতা দেওয়া, সরকারকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, বাহ্যিক উন্নয়নের মতো জনমোহিনী কাজকর্ম করে গণতন্ত্রের উপর হামলাকে ঢাকার চেষ্টা বিপ্লব দেব করেন না।

ত্রিপুরার সিপিএমের সঙ্গে বঙ্গ বামের তুলনা করে অনেকে বলেন, ছোট রাজ্যটিতে বাম শিবিরের মেদ কম, গতি বেশি। না মেনে উপায় নেই। মানিক সরকাররা পেরে উঠছেন না ঠিকই, তবে তাঁরা লড়াই করছেন। কয়েক মাস আগে বিজেপির ঝঞ্ঝাবাহিনী এবং পুলিশের সম্মিলিত আক্রমণের সামনে তাঁরাও বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তবুও কয়েকটি কথা বলতে হয়। অতি সম্প্রতি ত্রিপুরায় সংখ্যালঘুদের উপর খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে। বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর হামলার পাল্টা হিসাবে ত্রিপুরার হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিমদের ধর্মস্থান ভাঙচুর করেছেন, মুসলিম নাগরিকরা আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু এই প্রশ্নে সিপিএমের বিবৃতিটি ছিল রক্ষণাত্মক। এই হামলাটি যে কেবল মামুলি এলাকাভিত্তিক অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা নয়, বরং মুসলিমদের দাবিয়ে রাখার সচেতন সংগঠিত প্রয়াস, বিবৃতি পড়ে তা মনে হয়নি। পুরভোটের প্রাক্কালে নির্বাচকমণ্ডলীর একটি বড় অংশকে কি বিরক্ত করতে চাননি বাম নেতৃত্ব? আশা করি, বিষয়টি তেমন নয়। কিন্তু যদি হয়ে থাকে, তাহলে তা দুর্ভাগ্যজনক। ত্রিপুরা ছোট রাজ্য। মাত্র দুটি লোকসভার আসন। কিন্তু কেরল বাদে একমাত্র এই রাজ্যেই সরাসরি লড়াই চলছে হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে হিন্দুত্ব বিরোধীদের। হিংস্র, রক্তাক্ত সেই যুদ্ধে কমিউনিস্টদের রাজ্যের সদর দফতর পুড়ছে। ভোটে হারজিত আছেই, কিন্তু মূলগত প্রশ্নে পিছু হটলে কি সাফল্য সম্ভব?

দ্বিতীয়ত, বিজেপির বিপুল অর্থ এবং পেশিশক্তির সামনে কেবলমাত্র নিজেদের ক্ষয়িষ্ণু গণভিত্তিকে ভরসা করে লড়তে হচ্ছে বামেদের। পরাজয়ের তো কোনো সাফাই হয় না, কাঁদুনি গেয়েও কোনও লাভ নেই। কীভাবে বিজেপির এই বিপুল পেশিশক্তি, অপর্যাপ্ত অর্থের মোকাবিলা করা যাবে, তা বামপন্থীদের খুঁজে বের করতে হবে। গত তিন বছরে এই বিষয়ে কোনো দিশা বাম নেতৃত্ব দিতে পারেননি। জেলায় জেলায় আক্রান্ত কর্মীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাও যায়নি। তবে আশার কথা, আক্রান্তদের পাশে ছুটে গিয়েছেন মানিক সরকার সহ শীর্ষ নেতারা। এবং দেরি না করে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। তাঁরাও আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা, পশ্চিমবঙ্গের মানুষরা, এমন ছবি দেখে খানিক অবাক হতে পারি, অথবা হয়ত রেগে ওঠাও সম্ভব।

শেষ পাতে তৃণমূল কংগ্রেস নিয়ে দু চারটে কথা বলার। বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের পর তৃণমূলের সর্বভারতীয় হওয়ার ইচ্ছে ফের জেগে উঠেছে। তাতে কোনো দোষ নেই। একথা সত্য, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা যে সব রাজ্যে সংগঠন বাড়াতে চাইছেন, তার মধ্যে ত্রিপুরাই তাঁদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। এর আগেও ওই রাজ্যে তাঁরা বিধায়ক পেয়েছেন। সেই বিধায়করা যদিও বিজেপিতে চলে গিয়েছিলেন দলের প্রায় গোটা রাজ্য ইউনিট নিয়ে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামটির যে প্রভাব আছে, তা অনস্বীকার্য। কিন্তু বাস্তব হল, ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেস এখনো অবধি ভোট কাটা ছাড়া আর কিছু করার জায়গায় নেই। বিপুল ঢাকঢোল পিটিয়ে তারা পুরভোটে নামল। মাত্র তিনটি পুরসভায় তারা সিপিএমকে টেক্কা দিতে পেরেছে — আমবাসা, তেলিয়ামুড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ আগরতলা। বাকি পুরসভাগুলির মধ্যে সোনামুড়ায় তারা সাড়ে ১৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যগুলিতে তাদের ভোট শতাংশ সর্বোচ্চ ৫.৩৩, সর্বনিম্ন ০.৭২। চারটিতে তারা কোনো ভোটই পায়নি, একটিতে ১.১৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে সিপিএম সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে কুমারঘাটে, ৩৩.৩৬ শতাংশ। সর্বনিম্ন মেলাগড়ে ১৪.৫৫ শতাংশ। এটা ভালো ফল নয়, প্রহসনের নির্বাচনে ভালো ফল হওয়া সম্ভবও ছিল না, কিন্তু একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ত্রিপুরায় প্রধান বিরোধী দল সিপিএমই। তৃণমূল ধারে কাছে নেই।

বঙ্গ মিডিয়ার একাংশ যেভাবে তৃণমূলকে প্রধান বিরোধী হিসাবে প্রচার করছে, তা পৃথক আলোচনার দাবি রাখে। ১৬টি পুরসভায় ভোট হল, অথচ সামনে আনা হচ্ছে কেবল আগরতলার ফল। সেখানে তৃণমূল বামেদের চেয়ে প্রায় আড়াই শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে। যে দল তিনটি পুরসভায় ভোটপ্রাপ্তিতে খাতাই খুলতে পারেনি, একটি পুরসভার ফলকে কেন্দ্র করে তাদের দ্বিতীয় প্রমাণের এই চেষ্টায় আর যাই থাক, সত্য নেই।

Leave a Reply