রাম পুনিয়ানি

যাঁরা চান সমাজ সাম্য ও ন্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুক, তাঁদের জন্যে ভারতের সংখ্যালঘুদের, বিশেষত মুসলমানদের, অর্থনৈতিক অবস্থা বিশেষ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আছে অনেকদিন ধরেই। মালাবার উপকূল দিয়ে সপ্তম শতকে ভারতে যে আরব ব্যবসায়ীরা এসেছিল, তাদের বাদ দিলে বাকি ভারতে মুসলমান সমাজের প্রসারের ইতিহাস যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখব যে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন মূলত বর্ণবাদী হিন্দু সমাজের অত্যাচারিত মানুষ। তাঁরাই তখনকার সমাজের অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত অংশ। মোগল আমলে মুসলমান নৃপতিরা দিল্লি-আগ্রা থেকে শাসনকার্য চালাতেন। সেইসময় জমিদারদের অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু এবং মুসলমানদের বড় অংশের অর্থনৈতিক অবস্থা গরিব হিন্দুদের মতই ছিল।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশদের প্রতিশোধস্পৃহা মুসলমানদের দিকেই বেশি করে ধাবিত হয়, কারণ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন ওই বিদ্রোহের ঘোষিত নেতা। ফলে মুসলমান সম্প্রদায় ইংরেজদের তোপের মুখে পড়ে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া নেতিবাচক প্রচার এবং কিংবদন্তিগুলোকে বড় করে তুলে ধরা হয় এবং মুসলমানরা সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর চাঁদমারি হয়ে ওঠেন। যখন অন্যান্য সম্প্রদায় শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের উন্নতি ঘটিয়ে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিল, মুসলমানরা একাধিক কারণে পিছিয়ে পড়েন। সেই কারণের মধ্যে দুটো হল তাঁদের বিরুদ্ধে চালু প্রোপাগান্ডা আর অর্থনৈতিক পশ্চাদপরতার উত্তরাধিকার।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের সংবিধান দলিত আর আদিবাসীদের অর্থনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পশ্চাদপরতাকে স্বীকৃতি দিয়ে ওই সম্প্রদায়গুলোর মানুষের জন্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। ফলে তাঁরা খানিকটা শ্বাস ফেলার জায়গা পান। ১৯৯০ সালে জাতীয় স্তরে অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণি (ওবিসি) ২৭% সংরক্ষণের সুবিধা পায়, কোনো কোনো রাজ্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার আগেই ওবিসি সংরক্ষণ করেছিল। মোটের উপর ওবিসি সংরক্ষণের বিরোধিতা করেছিল ইউথ ফর ইকুয়্যালিটির মত সংগঠন।

এমনকি দলিতদের মধ্যে কিছু অংশের সংরক্ষণেরও বিরাট বিরোধিতা শুরু হয়। ১৯৮০-র দশকে দলিতবিরোধী বর্ণবাদী হিংসা শুরু হয়, ১৯৮৫ সালে তা ঘটতে শুরু করে গুজরাটেও। অন্যদিকে যেহেতু সংবিধান ধর্মভিত্তিক সংরক্ষণ অনুমোদন করেনি, সেহেতু ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপরই থেকে যান। কোনো কোনো রাজ্য ওবিসি কোটার মধ্যে মুসলমানদের নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এই ধরনের প্রয়াসের জোরালো বিরোধী ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো। সাম্প্রদায়িক হিংসা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং কিছু অঞ্চলে ঘেটোর মত আবদ্ধ হয়ে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হওয়ার ফলে মুসলমানদের মধ্যে প্রবল নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। যখনই মুসলমানদের জন্য কোনোরকম সংরক্ষণের কথা উঠেছে, তখনই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তার বিরোধিতা করেছে এবং উচ্চস্বরে ‘মুসলমান তোষণ’ কথাটা আউড়েছে। এর ফলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কমিটি মুসলমানদের অর্থনৈতিক উন্নতিসাধনে যা যা করার সুপারিশ করেছিল, রাষ্ট্রের সেগুলোকে বাস্তবায়িত করার প্রয়াসও থমকে যায়।

এমন নয় যে ভারত রাষ্ট্র মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করেনি। সেই চেষ্টার প্রমাণ হল গোপাল সিং কমিটি, রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশন এবং সর্বশেষ প্রয়াস সাচার কমিটি। এই রিপোর্টগুলোর অধিকাংশই দেখিয়ে দিয়েছিল যে মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ এবং গত কয়েক দশকে ক্রমশ আরও খারাপ হয়েছে।

হয়ত অনেকের মনে আছে যে ২০০৬ সালে রাজিন্দর সাচারের নেতৃত্বাধীন কমিটি যখন তার রিপোর্ট প্রকাশ করল, তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পিছিয়ে পড়া মুসলমান সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য সংস্কারসাধনের ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ভাষায় ‘তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য যেসব পরিকল্পনা রয়েছে সেগুলোর পুনরুজ্জীবন দরকার। আমাদের এমন উদ্ভাবনীমূলক পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে যাতে সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে মুসলমানরা, উন্নয়নের ফল সমানভাবে পাওয়ার ক্ষমতা তাঁদেরও আছে বলে অনুভব করতে পারেন। দেশের সংস্থানে তাঁদের ভাগ প্রথমে স্বীকার করতেই হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের উপর আরও বহু মানুষের দায়িত্ব আছে। তাঁদেরও দেশের সামগ্রিক সংস্থানের মধ্যে থেকেই ভাগ দিতে হবে।’ তাঁর এই উক্তিকে বিকৃত করে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে নরেন্দ্র মোদী মুসলমানবিদ্বেষী প্রচার চালানোর চেষ্টাও করেছিলেন।

আরো পড়ুন তথ্য ওবিসি মুসলমান সংরক্ষণ বিলোপকে সমর্থন করে না

মোদী বলেছিলেন ‘এই কথাই তো কংগ্রেসের ইশতেহার বলছে। ওরা আমাদের মা, বোনেদের কাছে যে সোনা আছে তার হিসাব করবে। তারপর সেইসব লোকেদের দিয়ে দেবে যাদের কথা ডঃ মনমোহন সিংয়ের সরকার বলেছিল। ওই সরকার বলেছিল যে দেশের সম্পদে অধিকার প্রথমে মুসলমানদেরই।’

এই আলোকে ইউএস-ইন্ডিয়া পলিসি ইনস্টিটিউট অ্যান্ড সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিসের রিথিংকিং অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশন ফর মুসলিমস ইন কনটেম্পোরারি ইন্ডিয়া শীর্ষক যে নতুন রিপোর্ট এসেছে তাকে স্বাগত জানানো দরকার। এই রিপোর্ট তৈরি করেছেন হিলাল আহমেদ, মহম্মদ সঞ্জীর আলম ও নাজীমা পরভীন। এই রিপোর্ট মুসলমানদের জন্য কোটার চিন্তা থেকে সরে গিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছে। মুসলমানদের মধ্যেও যে বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্তর রয়েছে তা এই রিপোর্ট স্বীকার করেছে। মুসলমানদের সম্প্রদায়ের কেউ কেউ বেশ বিত্তশালী। তাঁদের জন্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজন নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের জন্য এই রিপোর্ট ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে মূলত বর্ণভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করার কথা বলে।

ইতিমধ্যেই সংবিধানে সংরক্ষণের যে ঊর্ধ্বসীমা নির্দিষ্ট করা আছে অনেকে তা বাড়ানোর পক্ষে প্রচার করছেন। আর সব বাদ দিলেও সেইভাবে মুসলমান সম্প্রদায়ের আরও অনেক বিভাগকে ওবিসি আর দলিত কোটায় যুক্ত করা সম্ভব। এই রিপোর্ট সিএসডিএস-লোকনীতির তথ্য ব্যবহার করেছে। রিপোর্ট প্রস্তুতকারকরা মুসলমান সম্প্রদায়কে যেভাবে দেখা হয় তাও হিসাবের মধ্যে রেখেছেন। মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ নিয়ে কথা বলা বিজেপি এবং তার মত সংগঠনগুলোর পক্ষে ষাঁড়কে লাল কাপড় দেখানোর মত ব্যাপার। তাই এই রিপোর্ট মুসলমানদের মধ্যে পিছিয়ে পড়া অংশকে পেশাভিত্তিক পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মধ্যে যুক্ত করার কথা বলে।

মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বঞ্চিত অংশ হলেন পসমন্দা মুসলমানরা (নিম্নবর্ণের মুসলমান)। তাঁরা দলিতদের মধ্যেই পড়েন। অনেক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও এই বিভাগের মধ্যে পড়ে। এঁদেরও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা দরকার।

এই রিপোর্ট রাষ্ট্রের বদলাতে থাকা চরিত্র নিয়েও আলোচনা করেছে এবং ভারত রাষ্ট্রকে বলেছে ‘চ্যারিটেবল স্টেট’ (দানশীল রাষ্ট্র)। এমন এক রাষ্ট্র যে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পগুলোর সুবিধাভোগীদের জন্যে ‘লাভার্থী’ শব্দটা ব্যবহার করে। রিপোর্টের অন্যতম লেখক হিলালের মতে ভারত রাষ্ট্র নাগরিক কল্যাণের ক্ষেত্রে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এলাকাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সরে গেছে।

এই রিপোর্টের লেখকরা ওবিসিদের যুক্তিসঙ্গত, ধর্মনিরপেক্ষ উপবিভাগ তৈরি করার সুপারিশ করেছেন। ইতিমধ্যেই চালু প্রকল্পগুলোতেও এই ব্যবস্থা করা দরকার বলে তাঁদের মত। এই মুহূর্তে ‘অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশন’ (ইতিবাচক পদক্ষেপ) প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে চাকরিতে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রান্তিক (বর্ণের ভিত্তিতে বা লিঙ্গের ভিত্তিতে) মানুষকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। এইসব সম্প্রদায়ে অনেক কারিগর আছেন। প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ করে দিলে তাঁরা উপকৃত হবেন।

রিপোর্টটা সার্বিক এবং দেশে বর্তমানে আধিপত্যকারী যে রাজনীতি সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে মনে করে, তাকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। এখন লাখ টাকার প্রশ্ন হল, সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী বর্তমান সরকার কি এমন একটা রিপোর্টের সুপারিশ আন্তরিকভাবে, রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবায়িত করতে পারবে?

ইনিউজরুম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে ভাষান্তরিত। লেখক মুম্বাই আইআইটির প্রাক্তন অধ্যাপক, সমাজকর্মী ও বিশ্লেষক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.