ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসাবে জম্মু ও কাশ্মীরের শেষ রাজ্যপাল ছিলেন সত্যপাল মালিক। তিনি সম্প্রতি সাংবাদিক করণ থাপারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন পুলওয়ামাতে সন্ত্রাসবাদীদের হামলা এবং ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন “এই ঘটনা আমাদেরই ভুলে ঘটেছে।” কারণ সত্যপালের বক্তব্য, যে কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর কনভয়ের যাতায়াতের নিজস্ব প্রোটোকল আছে, সেগুলোর সুরক্ষার বিষয়ে নিজস্ব পদ্ধতিও আছে। সেই অনুযায়ী সিআরপিএফ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে পাঁচটি বিমানের দাবি জানিয়েছিল, সে আবেদন খারিজ করা হয়। তখন রাজনাথ সিং ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাধ্য হয়েই জওয়ানদের গাড়ি করে যেতে হয়। যে পথ দিয়ে সেই কনভয় গিয়েছিল তা সঠিকভাবে ‘স্যানিটাইজ’ করা হয়নি, যে ৮-১০ টা রাস্তা সেই পথে এসে মিশেছে তার কোনোটায় পাহারাও ছিল না। সত্যপাল নাকি এইসমস্ত তথ্য মোদীকে জানিয়েছিলেন। মোদীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল, “এসব নিয়ে কথা বলবেন না, চুপ থাকুন”। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও নাকি একই কথা বলেন।
আসলে পুলওয়ামার ঘটনা এমন একটা সময়ে ঘটে যখন দেশজুড়ে বিজেপিবিরোধী মনোভাব তৈরি হচ্ছিল, সামনেই ছিল সাধারণ নির্বাচন। সিআরপিএফ জওয়ানদের মৃত্যুকে ব্যবহার করে সারা দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচার চালানো হয়, যার ফায়দা তোলে বিজেপি। মোদী দ্বিতীয়বার দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। সত্যপাল যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তা এই সত্যই তুলে ধরেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সিআরপিএফের উপর হামলা গোটা দেশের লজ্জার বিষয় সন্দেহ নেই। এমন ঘটনায় দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ভিত্তি দুর্বল হয় – একথাও সঠিক। প্রশ্ন হল, যে রাজনৈতিক দল উঠতে বসতে দেশের জনগণকে সশস্ত্র বাহিনীর কঠিন জীবন সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হতে বলে, যে দল নিজেদের সেনাবাহিনীর স্বার্থরক্ষাকারী বলে সবচেয়ে জোরে ঢাক পেটায়, তারা আজ পর্যন্ত পুলওয়ামার ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করেনি কেন? পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইকে যারা দেশের ভিতরে বা বাইরে রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বলে মনে করে, তারা কেন দেশের জনগণকে জানাতে চায় না আসলে ঠিক কী ঘটেছিল?
কেন এমন নৈঃশব্দ্য, তার ব্যাখ্যা শক্ত নয়। ইতিহাস বড় রসিক – কারোর পছন্দ হোক বা না-ই হোক। যে কোনো দেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর শিকড় লুকিয়ে থাকে ইতিহাসবোধে। মোদী যতই ভারতকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাচীনতম আধার (কার্ড না, ধারণার আধার) বলুন, আসল সত্য তো এই, যে মোদীর আধার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ নিজে যেমন ইতিহাস বিকৃত করে, তেমনই তারা যাদের দ্বারা অনুপ্রেরিত, তারাও এভাবেই সত্য গোপন করত। মানবেতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক শাসন তারাই চালিয়েছিল। আজও দুনিয়ার সমস্ত স্কুলে পাঠ্যবইতে শিশুরা সেকথা পড়ে। হ্যাঁ, ফ্যাসিবাদীদের কথাই বলছি।
দক্ষিণপন্থারও কিছু অতীত গৌরব ছিল। মার্কেন্টাইল পুঁজির হাত ধরে তখন লুটেরা পুঁজি সবে বিনিয়োগের পথ ধরেছে। শরীরে লেগে থাকা রক্ত (দুনিয়া জুড়ে দাস ব্যবসা, লুঠ ও শোষণের দ্বারাই পুঁজির পথ চলা শুরু) ধুয়ে ফেলতে তারা শুরু করেছে বিরাট আকারের নির্মাণ – কলকারখানায় ব্যাপক উৎপাদন, রেল-জাহাজপথ ব্যবহার করে পণ্য ব্যবসায় বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। দুনিয়া জুড়ে মানুষের তাক লেগে গিয়েছিল এমন সমারোহে। ইতিহাসের বিচারে সেটাই ছিল পুঁজিবাদের স্বর্ণযুগ। প্রথমে ইতালি ও পরে গোটা ইউরোপে নবজাগরণের প্রসার, ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহ্য – সবটা মিলে পুঁজি নিজেকে এক বিরাট শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন চিন্তা-চেতনার জগতেও বিরাট পরিবর্তন এনে দেয়। নির্মিত হয় নতুন নতুন মূল্যবোধ, যা আগের জমানার চাইতে নিঃসন্দেহে প্রগতিশীল, কিন্তু মুনাফার লোভ নামক ভূতটি তখন বোতলবন্দি ছিল। সেই লোভেই মুনাফার হার যত বাড়ে, লুটে নেওয়ার স্বার্থপর মনোভাব আরও বেশি কদর্য হয়ে ওঠে। এসব পড়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, অর্থশাস্ত্রের ইতিহাসের চর্বিতচর্বণ করছি কেন? আসলে পুঁজিবাদ শুধুই অর্থব্যবস্থা নয়, একটা সমাজব্যবস্থাও। পুঁজি শুধু পণ্যের উৎপাদন আর বিনিময় করে না। লুঠ করার সপক্ষে মতামত নির্মাণও করে। লু সুন বলেছিলেন, মশাই সবচাইতে ঘৃণ্য, কেননা মশা শুধু রক্তপান করে না, তার পক্ষে যুক্তিও হাজির করে। পুঁজিবাদের ব্যাপারটাও সেরকম। কিন্তু উৎপাদন, নির্মাণের বিপুল সমারোহেও শেষরক্ষা হয়নি। বোতলের ভূত বেরিয়েই এল।
মুনাফা যে মালিকের বিশেষ দক্ষতা নয়, ওটা স্রেফ চুরি – সেকথা জানাজানি হয়ে যায় (কার্ল মার্কসের আবিষ্কার)। একের পর এক দেশে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই গতি পায়। পুঁজি উপলব্ধি করে, লুঠ করতে সোজা পথে এগোনো যাবে না। আসরে নামে মানবেতিহাসের কুৎসিততম মতবাদ – ফ্যাসিবাদ, নাজিবাদ। জার্মানিতে ক্ষমতায় আসেন হিটলার, ইতালিতে মুসোলিনি।
১৯১৬ সালের ৪-৮ জুন ভারতে শিবাজী উৎসব হয়। সেই উৎসবে উপস্থিত ছিলেন বালগঙ্গাধর তিলক, গণেশ কৃষ্ণ খাপার্দে এবং আরএসএসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ বি এস মুঞ্জে। পরবর্তীতে এই মুঞ্জেই মুসোলিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদী দলের সশস্ত্র সংগঠন বালিল্লার আদলেই আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন, বারবার সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শিবিরের ব্যবস্থাও করেন। সেই আরএসএস মোদী সরকারের নিয়ন্ত্রক।
একটা দেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ কখন বিপদ হয়ে ওঠে? যখন জাতীয়তাবাদের জিগির তোলা হয় মানুষের প্রকৃত সমস্যাগুলো চাপা দিতে। কর্তব্যের অজুহাতে নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, গরিব মানুষের সমস্যাগুলোর প্রসঙ্গ ধামাচাপা দিতে নিপীড়িত মানুষেরই একটা অংশকে চাঁদমারি করে জনমানসে ঘৃণার প্রচার চলে। ইতিহাসের নামে সাজানো ঘটনাকে মর্যাদা দিতে অতীতচর্চার সবকিছু জলাঞ্জলি দেওয়া হয়। রাতারাতি একদল নতুন বুদ্ধিজীবী পরিচিতি লাভ করে, যারা বইতে লেখা তথ্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং নিজেদের কথাকে চেপে রাখা ইতিহাস বলে চালিয়ে দেয়। হিটলারি জমানার জার্মানি কিংবা মুসোলিনির ইতালিতে এমনটাই হত। ভারতীয়রা এখন এমন এক যুগে বাঁচছেন, যখন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তাই পুলওয়ামার ঘটনায় তথ্য সামনে আসে না, প্রচার চলে দেশ আক্রান্ত। এমন পরিস্থিতিতে জাতির প্রয়োজন এমন একজন নেতা, যার আর কিছু না থাক, পড়শী দেশের প্রতি সীমাহীন ঘৃণা প্রচারের দক্ষতা আছে।
আরো পড়ুন গণতান্ত্রিক থেকে সামরিক রাষ্ট্রের পথে এক বছর
একথা দুঃখের হলেও সত্যি, যে আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষেরই ইতিহাস সম্পর্কে, বিজ্ঞান সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। ২০০৮ পরবর্তী সময়ে গোটা দুনিয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশেও অর্থনৈতিক সংকট বেড়েছে। সেই সংকটে গরিব মানুষের জীবনরক্ষার সংগ্রাম ক্রমশ তীব্র হয়েছে, হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে এক বিরাট অংশের জনতার জীবনযন্ত্রণাজনিত ক্ষোভকে বিপথে চালিত করা হচ্ছে। সেই বিপথে চালিত ভিড়ই রামনবমীর মিছিল থেকে মসজিদের উপর হামলা চালায়, গোরক্ষার নামে খুন করে। ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে উন্মত্ত রাজনীতির ফল কী হয়। আমরা সেই শিক্ষা মনে রাখিনি অথবা বিপদের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখেছি।
সত্যপাল যা বলেছেন তাতে অনেকে আশ্চর্য হয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্য হওয়ার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সত্যপাল যা বলেছেন তা শুনে প্রহসনের মত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতন হওয়া। ক্ষমতায় থাকুক আর না-ই থাকুক, উগ্র দক্ষিণপন্থা সচেতন থাকে, সতর্কও থাকে। এর প্রতিরোধে যেটুকু ঢিলেঢালা সুবিধাবাদ, তার দায় আমাদের সবার। এটুকু দায় স্বীকার করে নিলেও অনেকটা এগিয়ে যাওয়া যায়। এগোব কিনা তা অবশ্য আমাদেরই ঠিক করতে হবে।
আর সব যদি ভুলেও যাই, একটা চিরায়ত সাবধানবাণী কিন্তু জানাই ছিল। দার্শনিক সক্রেটিস বহুকাল আগেই লিখে গেছেন “Where there is reverence there is fear, but there is not reverence everywhere that there is fear, because fear presumably has a wider extension than reverence”
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








