Shillong
চেরিষ্টারফিল্ড থাংখিউর অন্ত্যেষ্টি যাত্রা

১৩ই আগস্ট ভোররাত্রে পুলিশ হানা দেয় প্রাক্তন জঙ্গি চেরিষ্টারফিল্ড থাংখিউর বাড়িতে, শিলঙের মাওলাই এলাকায়। কারণ? মেঘালয় পুলিশের কাছে প্রমাণ আছে যে থাংখিউ ১৪ই জুলাই পূর্ব জয়ন্তিয়া হিলস জেলার খ্লেরিয়াতে বোমা বিস্ফোরণের সাথে জড়িত। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করা থাংখিউ নাকি ছুরি নিয়ে হামলা করেন পুলিশের উপর, পুলিশ গুলি চালায় আত্মরক্ষার জন্যে। সাতান্ন বছর বয়সী কিডনির অসুখে ভোগা থাংখিউ আহত হন এবং হাসপাতালে যাওয়ার পথে মারা যান।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিলংয়ের শান্তিভঙ্গ হয়। কয়েক মাস ধরে যে আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল, তা দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। ১৫ই আগস্ট থাংখিউয়ের অন্ত্যেষ্টির দিন শহরের নানা এলাকায় হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে। পুলিশের গাড়ি ছিনতাই এবং পোড়ানো থেকে শুরু করে কালো ঝান্ডা নিয়ে স্লোগান দেওয়া — কিছুই বাকি ছিল না। মাওলাই ঢেকে যায় কালো পতাকায়। কোভিড-১৯ অতিমারীর মধ্যে স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অমান্য করে শত শত মানুষ জড়ো হন প্রয়াতের বাড়িতে, এবং কফিনের সঙ্গে সাত কিলোমিটার হেঁটে, কবরস্থান অব্দি যান।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ইতিমধ্যে মেঘালয় সরকার বেগতিক বুঝে কারফিউ জারি করে আর বন্ধ করে দেয় মোবাইল ইন্টারনেট। ফিরে আসে ২০১৮ সালের বিভীষিকার স্মৃতি। সেবার পাঞ্জাবি আর খাসিয়াদের কেন্দ্র করে শহর হয়ে উঠেছিল রণক্ষেত্র। যা-ই হোক, বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সমালোচনা অগ্রাহ্য করে রাজ্য সরকার ৪৮ ঘন্টা শিলংকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পর ইন্টারনেট আবার চালু করে।

কিন্তু যে জালে রাজ্য সরকার বাঁধা পড়েছে তা থেকে বার হওয়ার পথ খুঁজতে মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা হিমসিম খাচ্ছেন। তাঁর জোট সরকার গত তিন বছরে তিনটে সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। প্রথম, ২০১৮ সালের পাঞ্জাবি ও খাসিয়াদের সাম্প্রদায়িক সংঘাত। দ্বিতীয়, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তৃতীয় —- এবং আশা করব আগামী দু বছরে এই শেষ —– থাংখিউয়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘাত। যদিও প্রথম দুটোর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, এবারের ঘটনা নানা দিক থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

থাংখিউ ছিলেন Hynniewtrep National Liberation Council (HNLC), যা আগে Hynniewtrep A’chik Liberation Council বলে পরিচিত ছিল, তার অন্যতম সদস্য। ৯০-এর দশকে এবং এই সহস্রাব্দের একেবারে গোড়ার দিকে HNLC-র রীতিমত দাপট ছিল মেঘালয়ে। তারপর উপরের দিকের বহু জঙ্গি নেতা আত্মসমর্পণ করেন। HNLC-র বহু সদস্য বাংলাদেশে গা ঢাকা দেয়, যদিও সে তথ্য রাজ্যের নেতারা বহু বছর স্বীকার করেননি। একের পর এক আত্মসমর্পণের ফলে এই জঙ্গি বাহিনী একেবারে মিলিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের শিলং আবার হয়ে ওঠে শান্তিপূর্ণ, বাঙালি পর্যটকদের ভালবাসার জায়গা। কিন্তু গত কয়েক মাসে HNLC আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ঘন ঘন মিডিয়া বিবৃতির মাধ্যমে নিজেদের দাবি প্রকাশ করা এবং সেগুলো না মানলে কী হতে পারে, তা জানিয়ে সরকারকে হুমকি দিয়েছে। তারপর ১৪ই জুলাইয়ের বিস্ফোরণ। সেখানেই শেষ নয়, ১০ই আগস্ট আরেকটা বিস্ফোরণ হয় শহরের লাইতুমখ্রাহ এলাকায়। গত এক বছরে এটা ষষ্ঠ বিস্ফোরণ। গত বছর কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল, যা অতিমারির জন্য স্থগিত আছে।

বিস্ফোরণের পরেও রাজ্য সরকার নিজের অবস্থানে অটল ছিল। বলেছিল “আগে অস্ত্র সমর্পণ, তারপর শান্তি আলোচনা।” HNLC-র মধ্যস্থতাকারী নির্বাচন করে আলোচনার দাবি মানা হয়নি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশের মতে, রাজ্য পুলিশ বোমা বিস্ফোরণ হবে তা আগে থেকেই জানত, কিন্তু প্রতিরোধ করার কোনো চেষ্টা করেনি। এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার কিছুদিন পরেই স্বাধীনতা দিবসের দুদিন আগে থাংখিউয়ের মৃত্যু। এই প্রাক্তন জঙ্গি নাকি ‘অ্যাকটিভ’ হয়ে উঠেছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনার কিছুই জানতেন না বলে পদত্যাগ করেছেন, তাঁর পদত্যাগপত্র এখনো গৃহীত হয়নি।

তাহলে কি বর্তমান জোট সরকার HNLC-র পুনর্গঠনের কথা কিছুই টের পায়নি? নাকি HNLC-র শক্তি অনুমান করতে পারেনি? মেঘালয় সরকার এখন কাঠগড়ায়। মুখ্যমন্ত্রী স্বাভাবিকভাবেই সব অভিযোগ নাকচ করেছেন। কনরাড গত তিন বছরে বহুবার দিল্লি গেছেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি।

বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী তা নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলবে। কিন্তু যদি সত্যি সন্ত্রাসবাদ রাজ্যে ফিরে আসে, তাহলে তার একাধিক পরিণাম হতে পারে। তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে শিলঙের গত দুই দশকে বহু কষ্টে অর্জন করা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর, উপজাতির নন এমন অধিবাসীদের উপর। HNLC-র অত্যাচার তারা ভোলেনি। তাদের একাংশ মনে করছে HNLC যদি আবার নব্বইয়ের দশকের মত শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে তাদের উপর অত্যাচার আরও বাড়বে। হয়তো অনেককে শিলং ছাড়তে হবে।

একের পর এক হিংসাত্মক ঘটনা যদি চলতে থাকে, তাহলে তার গভীরভাবে প্রভাব পড়বে রাজ্যের পর্যটনশিল্পের উপরেও। মেঘালয়ের সিংহভাগ আয়ের উৎস পর্যটকরা। সন্ত্রাসের ভয়ে পর্যটন বন্ধ হলে বহু খাসিয়া, গারো এবং জয়ন্তিয়া উপজাতির মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম, অনির্দিষ্টকালের জন্য জীবিকাহীন হয়ে পড়বেন। রাজ্যের দুর্বল অর্থনীতি আরও ক্ষীণ হয়ে পড়বে। এমতাবস্থায় আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে পর্যটনের পরিকাঠামো উন্নয়ন নেহাতই নির্বুদ্ধিতা।

কিছুকাল আগে অব্দি রাজ্যের গারো হিলস অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি ছিল। ২০১৮ বিধানসভা নির্বাচনের আগে তা অবশেষে দমন করা সম্ভব হয়। এখন এই অঞ্চল স্বাগত জানাছে পর্যটকদের। নিজেদের উপজাতির প্রথা ও ইতিহাসকে প্রচার করছে দেশে বিদেশে। কিন্তু খাসি-জয়ন্তিয়া হিলস এ নতুন করে জঙ্গিদের উত্থান হলে এই নতুন শান্তির সুর কেটে যাবে।

খাসি-জয়ন্তিয়া সন্ত্রাসবাদ ভাঙন ধরাতে পারে আসাম আর মেঘালয়ের সম্পর্কেও। দুই রাজ্য এখন সীমান্ত আলোচনা নতুন করে শুরু করেছে বহু দশকে্র বিতর্ক মেটানোর আশায়, এবং সে আশা অমূলক নয়। কিন্তু হিংসা ও ভীতির পরিবেশে সে আলোচনা বেশি দূর গড়ানো মুশকিল। কারণ HNLC-র অন্যতম দাবি হল সার্বভৌম হ্যিন্যুত্রেপ (Hynniewtrep, মানে সাতটি কুটির) রাজ্য।

এসবের মধ্যে স্বপ্নভঙ্গ হবে কনরাডেরও। প্রয়াত নেতা পূর্ণ সাংমার কনিষ্ঠ পুত্রের জাতীয় রাজনৈতিক দল গড়ার উদ্যোগে বাধা পড়বে। ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), যা বিজেপি ও অন্যান্য স্থানীয় দলের সাথে জোট করে সরকার গড়েছিল ২০১৮ সালে, হালে দিল্লিতে পার্টির দপ্তর খুলেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব রাজ্যেই সংখ্যার দিক এনপিপির ভাল উপস্থিতি আছে। কিন্তু কনরাডের নিজের রাজ্যে যখন টালমাটাল অবস্থা, তখন ভিনরাজ্যের মানুষকে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিরই কোনো মূল্য থাকে না। অতএব যদি সন্ত্রাসবাদ দমন করতে হয়, তাহলে মুখ্যমন্ত্রীকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মধ্যস্থতাকারী নির্বাচন করে পুনরায় HNLC-কে শান্তির বার্তা দিতে হবে।

তবে এসবের শিলংয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কিন্তু সরাসরি যোগ নেই। এক প্রাক্তন জঙ্গির জন্য এত সহানুভুতি কেন? কেন মানুষ পাড়ায় পাড়ায় কালো পতাকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়বে আর সরকার স্থাপিত তদন্ত কমিটিকে নাকচ করবে? শিলংবাসীর, বিশেষ করে মাওলাইয়ের মানুষের, রাগের দুটো কারণ। প্রথমত, আত্মসমর্পণের পর থাংখিউয়ের সাধারণ নাগরিকের মতই সমস্ত অধিকার ছিল। কিন্তু মানুষের অভিযোগ, রাজ্য পুলিশ তাঁর মৌলিক অধিকার মানেনি। নির্দ্বিধায় তাঁর বাড়িতে হামলা করেছে, তাঁর পরিবারকে হুমকি দিয়ে চুপ করিয়েছে, তারপর গুলি চালিয়েছে। জনসাধারণের কাছে অজুহাত দিয়েছে, তাদের উপর ছুরি হাতে হামলা করা হয়েছিল। এর ফলে জনগণের আইনের রক্ষকদের উপর বিশ্বাস ভেঙে গেছে। এই বিশ্বাসভঙ্গের জন্য তাঁরা দায়ী করছেন মেঘালয় সরকারকে।

শিলংয়ের বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটা কারণ হল নিরাপত্তাহীনতা। শহরবাসী এতদিন যেসব ভুয়ো এনকাউন্টারের কথা পড়তেন খবরের কাগজে, সেগুলো ঘটত তাঁদের শিলং থেকে বহু দূরে। কিন্তু থাংখিউয়ের মৃত্যুতে বিভীষিকা হানা দিয়েছে দরজায় দরজায়। শান্ত শহরতলির চার দেওয়ালের মধ্যেও তাঁরা এখন নিরাপদ বোধ করছেন না। জনপ্রতিনিধিদের উপর ভরসা হারিয়েছেন, পুলিশি ব্যবস্থা উপর তো বটেই। সরকারের নিজেদের অবস্থানের পুনর্মূল্যায়ণের পক্ষে এটাই আদর্শ সময়। সাংমা সরকার ইতিমধ্যে বহু কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে কয়লাখনি কেলেঙ্কারি অন্যতম। অপরাধীকে শাস্তি না দেওয়ার উদাহরণও যে নেই তেমন নয়। এই সন্ধিক্ষণে যদি এনপিপির জোট সরকার সবদিক বিবেচনা করে না এগোয়, তাহলে ২০২৩ সালের নির্বাচনে ভুগতে হবে।

Leave a Reply