সদ্য ১৬ই আগস্ট গিয়েছে। বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের শোকের দিন। নাগরিকের পক্ষ থেকে আমরা ১৯৮০ সালের সেই অভিশপ্ত দিন সম্বন্ধে প্রবীণ সাংবাদিক জয়দীপ বসুকে লিখতে অনুরোধ করেছিলাম। জবাবে কিঞ্চিৎ বিলম্বে তিনি আমাদের যা জানিয়েছেন তা তাঁর অনুমতিক্রমে প্রকাশ করা হল। বিলম্বের কারণও এখানে পরিষ্কার।

প্রিয় নাগরিক সম্পাদকমণ্ডলী,

তোমরা আমাকে ১৬ই আগস্ট, ১৯৮০ সালের মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গলের কলকাতা লিগের ম্যাচ ঘিরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে দু কলম লিখতে বলেছিলে। তোমরাই প্রথম নও, এর আগেও এই একই বিষয়ে লেখবার অনুরোধ এসেছে বেশ কয়েকবার; হয়তো গত বছর, কিংবা তারও আগে কখনও — প্রতিবারই তুচ্ছ কোনো অজুহাতে এড়িয়ে গেছি সেই দায়, সচেতনভাবে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছি, এবার না হলেও, পরেরবার নিশ্চয়ই। আসলে গত ৪১ বছর ধরে সংগোপনে হৃদয় রক্তাক্ত করেছে যে ব্যর্থতার যন্ত্রণা, তাকে সর্বসমক্ষে অনাবৃত করে দেখাবার মত যথেষ্ট সাহস সম্ভবত সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি কোনোদিন। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কিন্তু তবু লিখতেই হল। কারণ না লিখলে নিস্তার নেই, এই সামগ্রিক ব্যর্থতার দায় যে আমাদের সেই প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীদের নিতেই হবে। লিখতেই হল, কারণ এই রক্তক্ষরণ অবিরত, এর উৎসমুখ কোনোদিন শুকিয়ে যাবে না, বরং তীব্রতর ব্যথায় বারবার বিবশ করে দেবে যাবতীয় অঙ্গ।

লিখতে আমার কলম সরছে না, কারণ হৃদয়ের কথা বলিতে এই মুহূর্তে বিন্দুমাত্র ব্যাকুল নই আমি। আর বলবার মত আছেই বা কী? ১৬ই আগস্ট ইডেনের বুকে দৃশ্যমান ছিল ১৬টি প্রাণহীন দেহ — আসলে সেদিন অদৃশ্য মৃতের সংখ্যা ছিল অগণিত, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ। সেদিন আদতে নির্মমভাবে হত্যা করা হল ভারত তথা কলকাতা ফুটবল ও তার যাবতীয় সত্তাকে, সবাই জানল এর পিছনে দায়ী থাকলেন মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল নামে দুটি ক্লাবের কয়েকজন ফুটবলার ও তাদের বিরাট সমর্থককুল। কেউ একবার বিচার করে দেখল না এই চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পিছনে আসলে কলকাঠি নেড়েছিলেন কারা এবং ঠিক কবে। সবচেয়ে লজ্জার কথা, আমরা যারা নিজেদের বাল্যকাল পেরিয়ে এসে সদ্য কৈশোরের মুগ্ধতাকে সঙ্গী করে যৌবনে পা রাখবার আনন্দে বুঁদ হয়েছিলাম সমগ্র সত্তর দশক জুড়ে, যারা মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলকে করেছিলাম জীবনের ধ্রুবতারা, তারাও বুঝিনি কীভাবে আমরা নিষিদ্ধ মাদক সেবনের মত ক্রমশ নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি, এই দুটি দল নিয়ে আমাদের অতি সক্রিয়তা আদতে আমাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখবার কল মাত্র।

সত্তর দশক হবে মুক্তির দশক — এমনই কথা দিয়েছিলেন একদল বাঙালি যুবক। না, সে কথা তাঁরা রাখতে পারেননি। কিন্তু ফুটবল মাঠে এক ঝাঁক বাঙালি ফুটবলার সেই সময় ময়দান কাঁপিয়েছেন, শাসন করেছেন ভারতীয় ফুটবল। তাই আজও কলকাতার ফুটবলের কথা উঠলেই বারংবার আলোচনায় এসে যায় সত্তর দশকের কথা।

কেন যেন মনে হয়, কলকাতার ফুটবলের সত্তর দশকের জন্ম ও মৃত্যু, দুটিই ঘটেছিল ময়দানের অন্য কোথাও নয়, ক্রিকেটের নন্দনকানন নামে খ্যাত ইডেন গার্ডেনে। শুরু সেই ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যেদিন পরিমল দে-র শেষ মুহূর্তের গোলে ইরানের পাজ ক্লাবকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জিতে নিল ইস্টবেঙ্গল। ইডেনের বুকে পড়ন্ত আলোয় মশাল জ্বালিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত উৎসবে মাতলেন সমর্থকরা, কার্যত শুরু হল কলকাতার ফুটবলে সত্তর দশকের জয়যাত্রা। সেই জয়যাত্রা শোকযাত্রায় পরিণত হল সেই ইডেনেই, ঠিক দশ বছর বাদে, যেদিন ১৬ জন ফুটবলপ্রেমীর নিথর দেহ মর্গে চালান দিল পুলিশ। চিরদিনের জন্য নিম্নগামী হল কলকাতার ফুটবল।

তোমরা যারা পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ, তারা ইতিহাস খুলে দেখে নিও, কলকাতার ফুটবলের ক্ষয় কিন্তু শুরু হয়েছিল এই ঘটনার সাত বছর আগে, ১৯৭৩ সালে, যেদিন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করবার জন্য হাতিয়ার করা হয়েছিল দুই বড়ো ক্লাবকে, জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছিল জাতীয় স্বার্থ, ইন্ধন জোগানো হয়েছিল যাবতীয় উচ্ছৃঙ্খল আচরণের, তৈরি করা হয়েছিল এক ফ্র্যাঙ্কেনস্টিন, যার অবধারিত প্রকাশ ১৯৮০-র ১৬ই আগস্ট।

দুঃখটা কোথায় জানো? ১৯৭৩ সালের মে-জুন মাসে যেদিন আওয়াজ উঠল মারদেকার জন্য ডাকা জাতীয় শিবিরে পাঠানো হবে না বাংলা থেকে ডাক পাওয়া ১৯ জন ফুটবলারকে, কারণ কলকাতা লিগ নাকি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সারা বছর মানুষজন তাকিয়ে থাকেন এই লিগের দিকে, এবং সেই দাবিকে সমর্থন করলেন স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তখন আমরা আনন্দিত হলাম এই ভেবে যে যাক, কলকাতা লিগটা তাহলে মার খাবে না।

আমাদের না হয় বয়স ছিল না ব্যাপারটা নিয়ে গভীরে যাবার। কিন্তু যাঁরা যেতে পারতেন, তাঁরা কায়েমী স্বার্থের কল্যাণে মুখে কুলুপ এঁটে রইলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর তখন দুই বড় ক্লাব ঘিরে উন্মাদনাটা ব্যবহার করা প্রয়োজন সম্পূর্ণ অন্য কারণে। দলে দলে নকশালপন্থী যুবক নিধনের তাজা রক্ত হাতে মেখে সবে তখন পশ্চিমবঙ্গের গদি দখল করেছেন এই বিলাত ফেরৎ নেতা। তাঁর প্রতি কেন্দ্রের কড়া নির্দেশ, রাজ্যের যুব সম্প্রদায়কে যতটা সম্ভব সরিয়ে আনতে হবে উগ্র রাজনীতির মঞ্চ থেকে; প্রয়োজনে ঠেলে দাও এদের ক্রিকেট কিংবা ফুটবলের দিকে, খেলার মাঠই হয়ে উঠুক এদের একমাত্র বিচরণক্ষেত্র।

তৈরি ছিল নিটোল পরিকল্পনা; মুখ্যমন্ত্রী উড়ে গেলেন দিল্লি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে স্পষ্ট জানিয়ে এলেন রাজ্য ফুটবলের স্বার্থে বিসর্জন দিতে হবে জাতীয় স্বার্থ।

এত বড় অন্যায়টা হয়ে গেল, সেদিন একটা প্রতিবাদ করল না কেউ। উত্তর ও মধ্য কলকাতা থেকে প্রকাশিত দুই মেছুয়াবাজার সংবাদপত্র নেমে পড়ল মুখ্যমন্ত্রীর সমর্থনে, আমরা জানতে পারলাম মারদেকা নাকি তেমন কোনো প্রতিযোগিতা নয়, সেখানে জাতীয় দল খেলবে বলে কলকাতা লিগ ব্যাহত হতে দেওয়া যায় না কোনোমতেই। কেউ একবারও প্রশ্ন করল না, সেই ১৯৫৯ থেকে প্রতিবছর আগস্ট/সেপ্টেম্বর মাসে মারদেকা খেলতে গেছে ভারত, প্রতিবার দলে একগাদা কলকাতার ফুটবলার, তাতে কি রসাতলে গেছে কলকাতা লিগ? হাসি পায়, যখন দেখি এই সাংবাদিককুলই ১৯৮১ সালে জাতীয় দলের “অপমানে” কেঁদে ভাসিয়ে দিলেন, যখন কলকাতার ফুটবলাররা এশিয়ান গেমসের শিবির ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ক্লাবের হয়ে খেলবেন বলে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এই সাংবাদিকরাই কিন্তু মাত্র আট বছর আগে একটা কথাও বলেননি। বলবার আছেটাই বা কী? হিটলার অথবা মুসোলিনি খেলাধুলা নিয়ে যে রাজনীতি করেছিলেন, সেটাই তো অনুসরণ করেছেন দিল্লির ধামাধরা আইনজীবী মুখ্যমন্ত্রী! মহাজ্ঞানী, মহাজন….

বর্তমান প্রজন্ম জানে না, সেদিন কী অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল কলকাতার এবং ভারতীয় ফুটবলের। রাজনীতির স্বার্থে দুটি ক্লাবকে প্রয়োজনের তুলনায় বহুগুণ উচ্চে নিয়ে যাওয়া হল; ব্যবস্থা হল তাদের যাবতীয় আবদার রাখবার, এক অতিমানবিক ভাবমূর্তিতে প্রতিষ্ঠা করা হল তারকা ফুটবলারদের, তারা কার্যত যা ইচ্ছা করে পার পেয়ে যেতে শুরু করল।

ফুটবল মাঠে গন্ডগোল কলকাতার বহুদিনের “ঐতিহ্য”, কিন্তু এরপর যা শুরু হল তা ছিল লাগামহীন অসভ্যতা। রেফারির সঙ্গে নিয়মিত বিশ্রী ঝামেলা পাকিয়ে অনায়াসে পার পেয়ে যেতে লাগলেন বড় দলের নামী ফুটবলাররা, একজন তো রেফারিকে মেরে রক্তাক্ত করে হাসপাতালে অবধি পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু তাতে কী-ই বা এসে যায়? যেদিন কয়েকজন নিরন্ন চাল পাচারকারীর প্রতি সহানুভূতি দেখাবার অপরাধে হিন্দমোটরে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে প্রাণ দিলেন তিনজন শ্রমিক, সেদিনই কয়েক ঘন্টা বাদে দর্শকে ঠাসা ইডেনে মুখোমুখি হলো দুই প্রধান। সেদিন আমাদের সবার চোখ ইডেনে, অন্য কোথায় কী হচ্ছে তা নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না। সার্থক হল মুখ্যমন্ত্রীর নীতি। সবার উপরে কলকাতার ফুটবল সত্য, তাহার উপরে নাই।

আজ ৪১ বছর বাদে পিছন ফিরে দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করি ১৬ই আগস্ট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সাক্ষী নয়। কলকাতার ফুটবল নামক এক বিশেষ গোষ্ঠীর মদতপ্রাপ্ত কড়া আফিমে দিনের পর দিন আচ্ছন্ন ছিলাম আমরা, তারই প্রতিফলন ঘটল সেদিনের ইডেনে। কয়েক বছর আগে বার্মার কাছে নয় গোল হজম করেছি, চিন দিয়েছে গুনে গুনে সাত গোল। কুছ পরোয়া নেই — নেশায় বুঁদ হয়ে আমরা একে অপরকে আক্রমণ করলাম — বহুকাল ঝাপসা চোখে থাকবার ফলে আসল প্রতিপক্ষ কে তা জানলামই না। এই অশান্তির মূল খলনায়ক হিসাবে খবরের কাগজের সবজান্তা সাংবাদিকরা দুষলেন দুই বিশেষ ফুটবলারকে, প্রশাসনকে কষাঘাত করা হল, কেন দুই দলের সমর্থকদের একই জায়গায় আসন দেওয়া হয়েছিল, এই দোষারোপ করে। কিন্তু আমি তো জানি, ওগুলি স্রেফ অজুহাত মাত্র; বছরের পর বছর ধরে যারা নিষিদ্ধ এক ফেনিল নেশার শিকার, তারা কি জানতে পারে কোন অতলে তারা পাড়ি দিচ্ছে? আমরাও জানতাম না।

তাই, আজ যদি তোমরা সেই ইডেনের দিনটির কথা আমাকে লিখতে বলো, তাহলে প্রবল রক্তক্ষরণ ছাড়া আমার আর বেশি কিছু বলবার থাকবে না। তাই এর বেশি কিছু জানতে চেয়ে আজ আর বিব্রত করে কী লাভ তোমাদের? বরং সম্পাদকত্রয়, এবারের মত না হয় ক্ষমা ঘেন্না করে দাও কলকাতার ফুটবলের এক একনিষ্ঠ বিষণ্ণ অনুগামীকে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.