ক্ষণস্থায়ী শান্তির পর মণিপুর আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল এ মাসের প্রথম সপ্তাহে। এবার সংঘাত উপজাতি বনাম অনুপজাতি – কুকি বনাম মেইতেই। মে মাসের ৩ তারিখে রাজ্যের দশটি জেলায় তীব্র উত্তেজনা ছড়ায় সমস্ত উপজাতির এক মিলিত পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে। এই পদযাত্রা সংগঠিত হয়েছিল মণিপুর হাইকোর্টের মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতি বলে ঘোষণা করা যায় কিনা, তা রাজ্য সরকারকে চার সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশের প্রতিক্রিয়ায়।

তেসরা মে-র সংঘাত শুরু হয় পদযাত্রা দিয়ে। বোঝাই যায় মেইতেইদের পাল্লা ভারি। তাদের দাবি এক দশক প্রাচীন। কিন্তু মণিপুরে নাগা, কুকি এবং মেইতেইদের সংঘাতের ইতিহাস আরও পুরনো। যদিও কুকি ও নাগারা মেইতেইদের বিরুদ্ধে একজোট, তাদের নিজেদের মধ্যেও রক্তাক্ত সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মণিপুরের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ মেইতেই সম্প্রদায়ের, যাঁরা প্রধানত ইম্ফল উপত্যকায় বাস করেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংও এই সম্প্রদায়ের মানুষ। বাকি উপজাতিগুলো ছড়িয়ে আছে পাহাড়ি বনাঞ্চলে। সাধারণভাবে নাগা ও কুকি বলা হলেও এই দুই উপজাতির মধ্যে আছে প্রায় ২৯টি গৌণ উপজাতি যাদের শ্রেণিবদ্ধ করা হয় ব্রিটিশ আমলে। ব্রিটিশ শাসকদের বিভাজনমূলক নীতি চিরকালীন নাগা-কুকি সংঘর্ষের পথ প্রস্তুত করে। ইতিমধ্যে অনুপজাতি মেইতেইদের সঙ্গে অন্যান্য উপজাতিদের ভেদাভেদও ক্রমশ বাড়তে থাকে।

মণিপুরে আলাদা রাজ্য হয় ১৯৭২ সালে। তার আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় জঙ্গি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। স্বাধীন নাগা ভূমির দাবিতে নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল তৈরি হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। সাতের দশকে সার্বভৌম নাগা ভূমির জন্য লড়াই করতে স্থাপিত হয় ন্যাশনাল সোশালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড (এনএসসিএন)।

অন্যদিকে কুকিরা একজোট হয় চারের দশকে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনী রাজনীতির উপর ভিত্তি করে সমগ্র উপজাতির অগ্রগতি। কুকিদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কয়েক দশক চলেছিল। কিন্তু আটের দশকে তাদের একটা অংশ সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। শুরু হয় নাগা-কুকি সংঘর্ষ এবং মণিপুরের দীর্ঘ হিংসাত্মক ইতিহাসের পর্ব।

উপজাতিদের মধ্যে মেইতেইদের প্রতি বিদ্বেষ ক্রমশ বাড়ছে। তার মূল কারণ মেইতেইদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। বিধানসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব যেমন বেশি, তেমনি আমলাদের মধ্যেও মেইতেইদের প্রাধান্য। অতএব রাজ্য সরকারের সব সিদ্ধান্তকেই সন্দেহের চোখে দেখেন উপজাতিভুক্ত মানুষ। ঠিক সেটাই হয়েছে জঙ্গল সংরক্ষণের ব্যাপারে। গত কয়েক বছরে মণিপুর সরকার বহু মানুষকে উচ্ছেদ করেছে পাহাড়ি অঞ্চলের জঙ্গল থেকে। তা নিয়ে ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল এবং মাঝে মাঝে তার বহিঃপ্রকাশও হয়েছে। মণিপুর হাইকোর্টের উপর্যুক্ত আদেশ এই আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে ফেলে।

মণিপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে দুটো বিষয় আলোচ্য। এক, মেইতেইদের দাবি ন্যায্য কিনা এবং দুই, সরকার যেভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে তা সঠিক ছিল কিনা।

আরো পড়ুন মিঞা মিউজিয়াম বন্ধ: কোথায় শুরু, কোথায় শেষ?

মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি বলে ঘোষণা করার দাবি উঠেছে কেন? এই সম্প্রদায় শুধু যে মণিপুরে সংখ্যাগরিষ্ঠ তা নয়, এদের মধ্যে শিক্ষার হারও বেশি। অতীতে মেইতেইরা উপজাতি তকমা নিতে অস্বীকারও করেছে। গত শতকের মাঝামাঝি যখন নাগা উপজাতির নেতা সুইসা রুংসুং মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির মর্যাদা দিতে চেয়েছিলেন, তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। তাহলে আজ এই দাবি উঠছে কেন? এখানে মনে রাখতে হবে, মেইতেইরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মণিপুরের মাত্র ১০% জমির উপর তাদের দাবি। বাদবাকি পাহাড়ি অঞ্চল এবং জঙ্গলে উপজাতিভুক্ত মানুষের বাস। তাহলে কি এই দাবি শুধু জমির উপর ভাগ বসানোর জন্য? যে সম্প্রদায় ইতিমধ্যেই আর্থসামাজিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তাদের তফসিলি উপজাতির সুবিধা নেওয়া বা দেওয়া কি ন্যায়সঙ্গত? এই দাবিকে ইন্ধন জোগানো কি ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি নয়? এর চেয়ে তো বেশি জরুরি ছিল মণিপুরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত মেটানোর দিকে নজর দেওয়া। এখন পর্যন্ত নাগাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের শান্তিচুক্তির কোনো সাফল্য টের পাওয়া যায়নি। সেই গিঁট না ছাড়িয়ে আরেকটা গিঁট পাকানো কি উচিত কাজ? হিন্দু মেইতেই এবং মুসলিম মেইতেই বা মেইতেই পাঙ্গালদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বও এখনো অমীমাংসিত। ইতিমধ্যে নতুন করে আরেকটা দাবি উঠে এলে অশান্তি বাড়ারই কথা। তাতে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়েন। এখানেই প্রশ্ন ওঠে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে। মণিপুরে সন্ত্রাসবাদ সামলাতে আর্মড ফোর্সের স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট (আফস্পা) লাগু ছিল বহু দশক ধরে। এবারের অশান্তি সামলাতেও সরকার দেখামাত্র গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এ বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখাই শ্রেয় মনে করেছেন। তাঁর সমস্ত মনোযোগ কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে নিয়োজিত ছিল। নাকি তিনি সচেতনভাবেই নীরব, কারণ এটাও হিন্দুত্ব বিস্তারের আরেক ফিকির? কারণ নাগা আর কুকিদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই তো খ্রিস্টান। দুপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় না বসে শুধু বলপ্রয়োগ করে কিন্তু এই সংঘাতের সমাধান হবে না। এমতাবস্থায় রাজ্য সরকারকেই সদর্থক পদক্ষেপ নিতে হবে।

মণিপুরে এখন অবধি প্রায় ৬০ জন মারা গেছেন এবং বহু মানুষ বাসস্থান থেকে উৎখাত হয়েছেন। বলা বাহুল্য, এই পরিস্থিতির সমাধানে কেন্দ্রীয় সরকারের অংশগ্রহণও প্রয়োজন। মণিপুরের রক্তাক্ত ইতিহাসের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় এবং ফের সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দিয়ে না ওঠে সেদিকে নজর দিতে হবে। যে কুকি নেতারা বিজেপির দিকে, তাঁদের তৎপর হতে হবে। এটা শুধু একটা রাজ্যের ভালমন্দের প্রশ্ন নয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যের বহু ছাত্রছাত্রী মণিপুরে পড়াশোনা করে। তাদের ভবিষ্যৎও এখানে জড়িত। এই সংঘাত যাতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্য রাজ্যগুলোতে ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার। তেমন ঘটনা কিন্তু ইতিমধ্যেই অল্পবিস্তর ঘটেছে। যদি রাজ্যগুলোর ভিতরকার দ্বন্দ্বই সামলানো না যায়, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’-র ভবিষ্যৎ কী?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

2 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.