দেবজিৎ ভট্টাচার্য
গত কয়েক বছর নানা শিল্পের শ্রমিক, কর্মচারীরা ধর্মঘট বা কর্মবিরতির ডাক দিচ্ছেন। শুধু তাঁদের মধ্যেই ধর্মঘট সীমাবদ্ধ রয়েছে তা নয়, ছোট পুঁজির মালিকরাও এতে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের আওয়াজ ছড়িয়ে দিতে এবং বড় পুঁজির মালিকদের বিরুদ্ধের আন্দোলন প্রসারিত করতে এত মানুষ ধর্মঘটের রাস্তা নিচ্ছেন। ভারতের বামপন্থী রাজনীতির বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বহু তাত্ত্বিক বিতর্ক, অনুশীলনের তফাত ইত্যাদি থাকলেও সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, বর্তমান বিশ্বে শ্রম বনাম পুঁজির দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্র বনাম জনগণের দ্বন্দ্ব ক্রমশ বাড়ছে। এর পরিণামে রাষ্ট্র শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার অধিকার, সামাজিক সুরক্ষার অধিকার, ইউনিয়ন করার অধিকার, আন্দোলন করার অধিকার কেড়ে নিয়ে নতুন আইনের সাহায্যে শ্রমিকের কাজের সময় ১২ ঘন্টা করে দেওয়ার চক্রান্ত করেছে। নয়া উদারবাদ হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়ে উঠছে। দেশের শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের অধিকার গিলে খেতে নতুন আইন এবং চারখানা শ্রম কোড এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানত এরই বিরুদ্ধে ছিল গত ৯ জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘট। অর্থাৎ এই ধর্মঘট শ্রমিকদের ডাকে নয়া উদারবাদবিরোধী সাধারণ ধর্মঘটে পরিণত হয়েছিল।
এই সাধারণ ধর্মঘট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, ধর্মঘট সফল হল না বিফল হল, তা গভীরে গিয়ে বুঝতে গেলে প্রথমেই এদেশের শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা এবং সাধারণ ধর্মঘট ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃতি
ঐতিহাসিকভাবেই এদেশে শ্রমের বর্ণভিত্তিক বিভাজন চলে এসেছে, যা জমি সমস্যার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইউরোপ বা আমেরিকার মত এখানে জমি সমস্যার নিষ্পত্তি ঘটিয়ে দেশি বুর্জোয়ারা সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্কগুলোকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে পারেনি, যেমনটা মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের লেখাপত্রে বলেছেন। বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সেই ভারতকে উপনিবেশে পরিণত করে জমিদারদেরই এক অংশের হাতে পুঁজি, উৎপাদনের উপকরণ ইত্যাদি সঁপে দিয়ে তাদের নিজেদের প্রয়োজনভিত্তিক শিল্পের মালিকে পরিণত করেছে। উদাহরণ হিসাবে টাটা, বিড়লাদের কথা ভাবা যেতে পারে। ফলে ভারতীয় সমাজে কৃষি সংক্রান্ত সমস্যা আর বর্ণবাদ যেমন টিকে যায়, তেমন ব্রিটিশ শাসনের চাহিদা অনুযায়ী বড় শিল্পও গজিয়ে ওঠে। প্রথমে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে চাষবাসে – ছোট কৃষক, ভূমিহীন কৃষক ও খেতমজুরদের উপরে। তারপর কৃষিতে আয় কমে যাওয়ায় সেখান থেকে শহরে এসে শ্রমিক হয়ে যাওয়ার মানুষের উপরে। এঁরা শহরের বড় কারখানায় ইউরোপ বা আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণির মত সর্বহারা হয়ে কাজ করতে আসেননি। এঁদের অধিকাংশের জমির উপর নির্ভরশীলতা রয়ে গেছে, গ্রামে ফিরে জমি কেনার খিদে থেকে গেছে। রজনী পাম দত্ত লিখেছেন, ১৯১১ সালে ভারতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির লগ্নির পরিমাণ ছিল ৬৫০ লক্ষ পাউন্ড। সেই সময়ের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতে ২১ লক্ষ বৃহৎ সংগঠিত শিল্পের শ্রমিক ছিলেন, যাঁদের সিংহভাগই গ্রাম থেকে আসা হিন্দু নিম্নবর্ণ এবং মুসলমান। এঁরা আদতে ছোট বা ভূমিহীন কৃষক এবং খেতমজুর। এই সময় থেকেই ভারতীয় শ্রমিকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রবেশ করার মধ্যে দিয়ে আলাদা শ্রেণি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে ভারতের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার গোড়ার দিকে (১৯৫০-৫১), জাতীয় আয়ে (জিডিপি) প্রাইমারি সেক্টরের (কৃষি) অবদান ছিল ৫৬%, সেকেন্ডারি সেক্টরের (শিল্প) ১৫%, টার্শিয়ারি সেক্টরের (পরিষেবা) ২৯%। ১৯৮০-৮১ সালে কৃষি ৩৮%, শিল্প ২৪%, পরিষেবা ৩৮%। ২০১৩-১৪ সালে অবস্থা বদলে দাঁড়ায় কৃষি ১৪%, শিল্প ২৬%, পরিষেবা ৬০%। ২০১৪-১৫ সালে আবার কৃষিতে জাতীয় আয়ের পরিমাণ বেড়ে হয় ১৬.১%, পরিষেবা কমে দাঁড়ায় ৫২.৫ শতাংশে। পাশাপাশি জাতীয় আয়ের পরিমাণ শিল্পে বেড়ে হয় ৩১.৪%। এখন তা কৃষিতে ১৯%, শিল্পে ২৬%, পরিষেবায় ৫৫%। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের প্রায় ৯৫%, বা ৫০ কোটি মানুষ, অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিযুক্ত। এই ক্ষেত্র জাতীয় আয়ে শিল্পের যে অবদান, তার মাত্র ৫০% জোগায়। বাকি ৫০% অবদান শ্রমশক্তির বাকি পাঁচ শতাংশের, যাঁরা সংগঠিত (ছোট, মাঝারি, বড় কারখানা) ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করেন। সরকারি তথ্য মতে, সংগঠিত ও অসংগঠিত মিলিয়ে ৬০%-৬৫% শ্রমিকের আবার জমির সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে। তাঁরা ছমাস চাষ করেন আর ছমাস ছোট, মাঝারি বা বড় কারখানায় কাজ করেন। অথবা অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলোতে শ্রম দেন খানিক বেশি পয়সা রোজগারের আশায়, কেউ প্রবাসী শ্রমিক হিসাবে ভিনরাজ্যে কাজে যেতে বাধ্য হন।
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ শ্রমিক অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে জড়িত। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক কোটির বেশি অভিবাসী শ্রমিক আছেন। রাজ্যের বড় চটকলগুলোতে মালিকপক্ষের জোরজুলুম বাড়লে অনেক শ্রমিক প্রায়ই বলেন, ‘গ্রামে জমি আছে, গিয়ে চাষ করব, অযথা ঝামেলায় জড়াব না।’ আবার অনেকে বলেন ‘এখানকার রোজগার যদি কিছু জমে, তাহলে গ্রামে গিয়ে জমি কিনব।’ তবে এখন চাষবাসে আয় ভীষণ কমে যাওয়ায় তাঁরা ফসল বাজারে বেচার সুযোগ পান না, বরং তা দিয়ে নিজেদের পেট চালান। একথাও সংগঠিত শিল্পের শ্রমিকরাই বলে থাকেন। অসংগঠিত শিল্পের বেশিরভাগ শ্রমিক জমির খিদে মিটিয়ে বা চাষের মরসুমে জমিতে ফসল ফলিয়ে, চাষবাস শেষ করেই প্রবাসী শ্রমিক হিসাবে অন্য রাজ্যে চলে যান। এঁদের অধিকাংশই নির্মাণ শিল্পে শ্রম দেন। এই সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে গড়ে ১০ জন শ্রমিকের মধ্যে ৮-৯ জন নিম্নবর্ণ ও মুসলমান সম্প্রদায়ের এবং গ্রামে চাষের জমি রয়েছে। এমন তথ্য নানা বেসরকারি সমীক্ষায় ধরা পড়েছে।
অর্থাৎ ভারসাম্যহীন বিকৃত উন্নয়ন কৃষির সমস্যা মিটিয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটানোর বদলে অর্থনীতিকে বাড়াবাড়ি রকমের পরিষেবাভিত্তিক করে তুলেছে। এই অসম বিকাশ ভারতের কৃষিজমি ও শ্রমের বর্ণভিত্তিক বিভাজনের সমস্যাকে জিইয়ে রেখেছে। ফলে প্রকৃত সমাধানও কৃষি সমস্যার সমাধানের মধ্যেই রয়েছে। প্রধানত এদিকে লক্ষ রেখেই ভারতের শ্রমিকশ্রেণির প্রকৃতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারা শ্রমিকশ্রেণির অংশ, ভারতের সর্বহারা শ্রেণির চরিত্র কেমন, এই শ্রেণির বন্ধু কোন কোন শ্রেণি আর প্রধান শত্রু কে বা কারা – তা নির্ধারণ করা দরকার। সেই অনুযায়ী শ্রমিকশ্রেণির সংগঠন বিস্তারে জোর দেওয়া দরকার। একথা নিশ্চিন্তে বলা যায়, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের শ্রমিকশ্রেণির প্রকৃতির মৌলিক অমিল আছে। এদেশের শ্রমিকশ্রেণিকে আগে চাষবাস সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান ঘটাতে হবে।
ধর্মঘটের চরিত্র
সারা বিশ্বেই গ্রাম ভেঙে শহরাঞ্চলে যত কারখানা হয়েছে, ততই শ্রমিকশ্রেণির হাত ধরে ধর্মঘট বা কর্মবিরতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৮৯৯ সালে লেনিন লিখেছিলেন, প্রুশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভন পুটকেমার একবার বলেছিলেন ‘প্রত্যেক ধর্মঘটের পিছনে বিপ্লবের হাইড্রা লুকিয়ে থাকে।’ আসলে প্রত্যেকটা ধর্মঘট শ্রমিকশ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার রসদ জোগায়, শ্রেণিসচেতন করে তোলে, শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার আন্দোলনকে সমাজে ছড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি সমাজ বদলানোর লড়াইকে রাজনৈতিকভাবে আরও সচেতন করে তোলে। ধর্মঘটের দিন স্পষ্ট বোঝা যায়, রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল শ্রমিকশ্রেণির উপরে। সেদিন রাষ্ট্র ও মালিকের আসল চরিত্র বেরিয়ে আসে। সামাজিক হিংসার পরিচালক ও নায়ক আসলে কারা, তা প্রকাশ্যে আসে। একজন শ্রমিক সবথেকে বেশি ভালবাসেন নিজের কারখানা বা কাজের জায়গাকে। তাঁরা তখনই ধর্মঘট বা কর্মবিরতির ডাক দেন যখন তাঁদের দেওয়ালে পিঠ থেকে যায়। তখন তাঁরা ধর্মঘটের ধাক্কা দিয়ে শক্তি সঞ্চয় করেন। ১৯০৫ সালে ধর্মঘট সম্পর্কিত এক প্রবন্ধে লেনিন লিখেছেন, ‘প্রতিটি ধর্মঘট পুঁজিপতিদের মনে করিয়ে দেয় যে শ্রমিকরাই আসল মালিক, তারা নয়। বরং শ্রমিকরাই ক্রমশ জোরের সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণির ন্যায়সঙ্গত অধিকারগুলো ঘোষণা করছে। প্রতিটি ধর্মঘট শ্রমিকদের মনে করিয়ে দেয় যে তাদের অবস্থান হতাশাজনক নয়, শ্রমিকরা একা নয়।’ অর্থাৎ, শ্রমিক ধর্মঘট রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষকে সন্ত্রস্ত করে এবং শ্রমিকশ্রেণির অধিকার আদায়ের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক লড়াইকে জোরদার করে।
ভারতে প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট সংগঠিত হয় অসংগঠিত শ্রমিক, পালকি বেহারাদের হাত ধরে, ১৮২৭ সালে মে মাসে। এক মাস চলা সেই ধর্মঘটের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ ফরমান এবং উচ্চবর্ণের লোকেদের নিপীড়ন থেকে মুক্তি।
১৮৬৪ সালে রেলে প্রথম শ্রমিক, কর্মচারীদের ধর্মঘট হয় দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে। পরবর্তীকালে বড় শিল্পে একের পর এক শ্রমিক ধর্মঘট বা কর্মবিরতি হয়েছে কখনো ব্রিটিশ সরকারের সামনে কোনো অর্থনৈতিক দাবি তুলে ধরে, কখনো উচ্চবর্ণের অত্যাচারের বিরুদ্ধে, কখনো বা এই দুয়ের বিরুদ্ধেই। গত শতকের নয়ের দশক থেকে এখন পর্যন্ত হল ৯ জুলাইয়ের ধর্মঘটকে ধরে মোট ২২টি বড় ধর্মঘট সংগঠিত হল। ওই দিন সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ এই ধর্মঘট কেবল শ্রমিকরা পালন করবেন না, জনসাধারণও পালন করবেন। সকলেই উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ থেকে বিরত থাকবেন, যাতে বড় পুঁজির মালিকদের অফুরন্ত মুনাফায় ঘাটতি হয়।
সাধারণ ধর্মঘটে শ্রমিক, কর্মচারীদের অংশগ্রহণ
৯ জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘট যেমন স্বাধীন দেশে এতদিন ধরে চলে আসা শ্রমিক অধিকারের সুরক্ষার দাবিতে ছিল, তেমন যাঁরা সেই আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত, তাঁদের জন্যেও ছিল। নরেন্দ্র মোদী সরকারের আনা নতুন শ্রম কোডের আগে থেকে ভারতে যে শ্রম আইন চালু আছে, তাতে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, ইউনিয়ন করার অধিকারের আইন ইত্যাদি সুরক্ষিত। তবে বাস্তবে সেই আইন কোথায় কতটা প্রযুক্ত হয় তা অন্য প্রশ্ন। আগেই বলেছি, ভারতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকই বেশি। সেখানে কাজের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর, সামাজিক সুরক্ষা নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, শ্রমিকের অধিকার, শ্রমের সময়ের হিসাবে – কিছুই ঠিক নেই।
ভারত সরকারের শ্রমমন্ত্রক অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের নাম নথিভুক্ত করতে ই-শ্রম পোর্টাল চালু করেছে। মার্চ মাস পর্যন্ত নথিভুক্ত ৩০ কোটি শ্রমিকের মধ্যে ১৬ কোটির বেশি যুক্ত আছেন কৃষিকাজে। দু কোটি ৮৯ লক্ষের বেশি শ্রমিক কাজ করেন গৃহকর্মী হিসাবে, ২ কোটি ৭৮ লক্ষ নির্মাণ শিল্পে, দু কোটি শ্রমিক বস্ত্রশিল্পে, গাড়ি শিল্পে ৮২ লাখ, চর্মশিল্পে ৬০ লাখ, পর্যটন শিল্পে ৪১ লাখ। এঁদের বড় অংশ প্রবাসী শ্রমিক, চাষের মরসুমে কৃষিকাজে যোগ দেন। এঁরা অন্তত ৯-১২ ঘন্টা কাজ করেন। দেশের মূল্যবৃদ্ধি মারাত্মক আর ন্যূনতম মজুরি কমছে, তাই অনেকেই দিনে ১৬-১৮ ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য হন।
পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বহু জায়গায় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বালাই নেই, সবটাই মালিকের হাতে। সামাজিক সুরক্ষার তো প্রশ্নই নেই। ইটভাটার শ্রমিকরা ১২ ঘন্টা কাজ করেন, ইট পিছু ৫০-৬০ পয়সা করে পান। বিড়ি শ্রমিকরা ১৪-১৬ ঘন্টা সময় দিয়ে মজুরি পান ১৬০-১৭০ টাকা। এই দুই শিল্পে মহিলা ও শিশু শ্রমিক প্রচুর। তাঁদের উপর অত্যাচারের মাত্রাও অনেক বেশি। বাড়ির কাজের লোকেরা সরকারের থেকে শ্রমিক হওয়ার স্বীকৃতি পাননি। সাফাইকর্মী, রিকশা, ভ্যানচালক ইত্যাদি অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের অবস্থা ভয়াবহ। সিংহভাগ ১২-১৪ ঘন্টার বেশি কাজ করতে বাধ্য হন। তাঁদের কাছে আট ঘন্টার শ্রম স্বপ্নের মত, আর মোদী সরকারের শ্রম কোডে যে ১২ ঘন্টা কাজের সময় বলা হয়েছে, তা রসিকতা। এই নতুন কোড বাতিলের লড়াইয়ে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ৯ জুলাই বেশিরভাগ অসংগঠিত শ্রমিক কাজ করেছেন। নির্মাণ শ্রমিকরা অনেকেই কাজে গেছেন, অনেকে যাননি বৃষ্টির কারণে। অনেকে জানতেনই না সেদিন ধর্মঘট। আবার অনেকে জানতেন, এই ধর্মঘট ডেকেছে সিপিএম এবং এই ধর্মঘট তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে।
আরো পড়ুন মোদী রাজত্বে শ্রমিক অধিকার স্রেফ জুমলা
সেই তুলনায় রাজ্যের মাঝারি ও বড় সংগঠিত শিল্পের শ্রমিকরা অনেকটা সচেতন। তাঁরা সেদিনের ধর্মঘট সম্পর্কে জেনেছেন, আপত্তিকর শ্রম কোডগুলো কী কী তা সঠিকভাবে না জানলেও ১২ ঘন্টা কাজ করবেন না বলে নিজে থেকেই কাজে যাননি। অথবা কাজে গিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর পিকেটিং দেখে স্বেচ্ছায় বাড়ি ফিরে গেছেন। এই কারণে হুগলির ১১ খানা চটকল সকালের শিফট থেকে বন্ধ ছিল। সুতো কল, কাপড় কলগুলোকে খোলা রাখতে পারেনি রাজ্য সরকার ও মালিকপক্ষ। কিন্তু দিল্লি রোড সংলগ্ন যেসব ছোট কারখানায় শ্রমিকের ইউনিয়ন করার অধিকার নেই, ২০০০ সালের মাঝামাঝি থেকেই স্পেশাল ইকোনমিক জোন ঘোষণার ফলে কাজের সময় ১২ ঘন্টা, সেগুলো খোলা ছিল।
ভাগীরথীর ওপারে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অবস্থা এর তুলনায় খারাপ। কিছু চটকল অর্ধেক শ্রমিক নিয়ে খোলা ছিল, আবার কিছু বন্ধ। হাওড়ার অবস্থাও একইরকম। অর্থাৎ সংগঠিত শিল্পে ধর্মঘটের প্রভাব অনেকটাই লক্ষ করা গেলেও অসংগঠিত শিল্পে তেমন প্রভাব পড়েনি সাংগঠনিক বিস্তার, প্রচার ও জোরের অভাবে। যাঁরা পাড়ার ইউনিয়ন বা বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত, কেবল তাঁরাই যুক্ত হয়েছিলেন। তবে এই সাধারণ ধর্মঘটে ব্যাংক ও বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, কর্মচারী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করায় সরকারের কাজকর্মে অনেকখানি প্রভাব পড়েছে। ফলে ধর্মঘট ভাঙতে, ধর্মঘটীদের সরাতে পুলিশ প্রশাসন যথেষ্ট হিংস্র হয়ে উঠেছিল। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছিল, অনেককে সকালে আটক করে রাতে ছেড়ে দিয়েছে।
সঠিক রণনীতি ও রণকৌশলের অভাব
ধর্মঘট একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি, শ্রমিকশ্রেণির রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যকে প্রসারিত করতেই ধর্মঘট সংগঠিত হয়। ফলে তা সফল করতে সঠিক রণনীতি ও রণকৌশলের প্রয়োজন। এই রণনীতি ঠিক করতে হয় ধর্মঘটের ডাক দেওয়া শ্রমিকশ্রেণির সংগঠন বা পার্টিকে।
ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে এখনো প্রধান সমস্যা কৃষিজমির অসম বন্টন, ফসলের অধিকার না পাওয়া, বাজার বহির্ভূত শোষণ। তাই শ্রমিকশ্রেণির সংগঠন বা পার্টিগুলোর গ্রামেই বেশি সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। চাষবাসের সমস্যার সমাধান না হলে শ্রমিকশ্রেণির সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে না। ওই সমস্যা দূরে সরিয়ে রেখে সংগঠনের বিস্তারে মনোযোগ দিলে শহরের শ্রমিকের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দাবি আদায়ের আন্দোলন তেমন জোরালো হবে না। এমনকি অসংগঠিত ক্ষেত্র এবং প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে সংগঠনের বিস্তার ঘটাতেও গ্রামীণ সংগঠনের উপর জোর দেওয়া দরকার। এই কাজে এ রাজ্যে খামতি থাকায় ধর্মঘটের প্রভাব শহর ও শহরতলি ছাড়িয়ে বেরোতে পারেনি। শ্রমিকশ্রেণির যে কোন রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রয়োজন ব্যাপক পরিমাণ কৃষকের অংশগ্রহণ। তবেই কোনো আন্দোলন বা সাধারণ ধর্মঘট সফল হতে পারে।
৯ তারিখের ধর্মঘটের রণকৌশলও বেঠিক ছিল। ধর্মঘট ছিল ২৪ ঘন্টার। অর্থাৎ ৮ তারিখ রাত বারোটা থেকে ৯ তারিখ রাত বারোটা পর্যন্ত। অথচ ৮ তারিখ রাত বারোটার পরে গ্রাম থেকে শহরে আসা মাছ, শাকসবজি, মাংস ইত্যাদি বোঝাই পণ্য সরবরাহের যানবাহন যাঁরা চালান তাঁদের ধর্মঘটে যোগ দেওয়ানো যায়নি। আবার ৯ তারিখ রাত নটার পর থেকে শহরের কারখানাগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্য বড় বড় ট্রাকে করে গ্রামের দিকে রওনা হওয়াও বন্ধ হয়নি। ধর্মঘটের দিনক্ষণ নিয়েও অনেক শ্রমিকের অভিযোগ ছিল। তাঁদের মতে, সপ্তাহে তিন ভাগে উৎপাদনের পরিমাণের গুণগত পরির্বতন হয়। উৎপাদনের হার ও মালিকপক্ষের মুনাফা সবথেকে ঊর্ধ্বমুখী হয় সোমবার ও মঙ্গলবার। পরের দিনগুলোতে এমনিতেই উৎপাদনের পরিমাণ কমতে থাকে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার খানিকটা কমে, শুক্রবার ও শনিবার এমনিতেই নেমে আসে। তাই বড় পুঁজির মালিকের মুনাফার ঘাটতি বাড়াতে সপ্তাহের প্রথম দুদিনের মধ্যেই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া উচিত। অথচ এবারের ধর্মঘট হল বুধবারে।
শ্রমিক সংগঠন বা পার্টির রণনীতির সমাজ সম্পর্কিত ধারণাই লড়াইয়ে বন্ধু কারা তা নির্ধারণ করতে শেখায়। সেই ধারণার খামতিও ভয়াবহভাবে ধরা পড়েছে। তাই খুচরো ব্যবসাদার ও ছোট পুঁজির মালিক, যেমন ছোট দোকান, ডিস্ট্রিবিউটর হাউজ ও বাস, গাড়ি, ট্রাক মালিকদের এই ধর্মঘটে সেইভাবে যুক্ত করা যায়নি। এঁরা প্রত্যেকেই বিদেশি পুঁজি এবং বড় পুঁজির মালিকদের দ্বারা রোজ ক্ষতিগ্রস্ত এবং বর্তমানে সরকারবিরোধী সংগ্রামে লিপ্ত। অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামে কৃষক, পরিবহন ব্যবস্থা এবং ছোট ব্যবসাদারদের যুক্ত করতে না পারার ফলে এই ধর্মঘট ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারেনি। ফলে দেশজুড়ে গ্রামে গ্রামে এই ধর্মঘট ছড়িয়ে দেওয়া যায়নি।
নিবন্ধকার গবেষণামূলক শ্রমিক পত্রিকা ‘বিবাদী’-র সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







