দেবজিৎ ভট্টাচার্য

চারশো আশি টাকা রোজে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ গতমাসে অর্ধেক দিন পাওয়া গেছে। এই নিয়ে চিন্তায় রজত (নাম পরিবর্তিত)। আগামী দিনগুলোয় কাজ থাকবে কিনা, সংসার চলবে কীভাবে, তা জানা নেই। অন্যত্র ‘ভাল’ কাজের খোঁজও করছেন। তবে রজত ২১ বছর বয়স থেকে কাজ শিখেছেন চটকলের ‘তাঁত’ বিভাগে। পরবর্তীকালে ২০১২ সালে নাম-নম্বর (অস্থায়ী ‘নিউ এন্ট্রান্স’ শ্রমিক) পেয়েছেন। এখন তাঁর বয়স ৪০। গতবছরের এপ্রিল মাসে বিভাগ বদলি তাঁর জীবনকে চটকলের অন্ধকারের চার দেওয়ালের বাইরে এনে দাঁড় করিয়েছে। তবুও আলো ফেরেনি জীবনে। এখন তিনি ঠিকাদারের কথায় দিনরাত এদিক-ওদিক ছুটছেন, আলোর সন্ধানে সামান্য মজুরিতেই ৯-১২ ঘন্টার কাজ করছেন। রজতের চটকলিয়া বন্ধু মাহফুজ (নাম পরিবর্তিত) একই কারণে একইসঙ্গে অলিখিতভাবে ছাঁটাই হয়েছিলেন। তারপর থেকে তিনিও ঠিকাদারের হাত ধরে চটকলেই রাতের শিফটে ‘ভাউচার শ্রমিক’ হয়ে যান। যেদিন রাতে কাজ পান, পরেরদিন ভোর ছটায় শিফট শেষে ৫১০ টাকা পকেটে পুরে ফের সেদিন রাতে কাজ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

চটকলের এমনই আরেক শ্রমিক, ঠিকাদারের হাত ধরে কয়েক মাসের চুক্তিতে অন্য রাজ্যে গিয়েছিলেন। আশা দেওয়া হয়েছিল মাসিক ২০,০০০ টাকা রোজগার করতে পারবেন। কিছুদিন পরেই ফিরে এসেছেন খরচের চাপ সামলাতে না পেরে। তাঁর স্ত্রী বলেন, ঋণ নিয়ে হাট থেকে কাপড় কিনে এনে বেচবেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের চটকল শ্রমিকদের সিংহভাগেরই এখন এই অবস্থা। এখন আর চটকলগুলোতে সরাসরি ছাঁটাই হয় না। অনেক শ্রমিক নিজেই কাজের চাপে সহ্য করতে না পেরে স্বেচ্ছায় বসে যান। আবার ২০-২৫ বছর কাজ করে ফেলা দক্ষ শ্রমিকের কপালে নতুন ফাঁড়া ঝুলছে – বিভাগ বদলি, নতুন মেশিনে (চিনা তাঁত) কাজ শেখা এবং সামান্য মজুরিতে উৎপাদনের বাড়তি লক্ষ্য মাত্রাপূরণ করার চাপ। পূরণ না হলেই শোকজ নোটিস দেওয়া হয়, বসিয়ে দেওয়া হয় কাজ থেকে। স্বভাবতই শ্রমিকরা এই অলিখিত ছাঁটাইয়ের খপ্পরে পড়ছেন। তারপর পেটের টানে ঠিকা শ্রমিকে পরিণত হচ্ছেন, ঠিকাদারের হাত ধরে নানা জায়গায় কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এঁদের বেশিরভাগই চটকলে রাতের শিফটে ভাউচার শ্রমিক হয়ে সামান্য মজুরির বিনিময়ে খাটতে যাচ্ছেন। আজ কাজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে – একথা সরাসরি জানিয়ে দেন অনেক ঠিকাদার।

আরো পড়ুন বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই

কাজের পরিবেশের উন্নতি, আধুনিকীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা বিধি, ঠিকাদারি আইন – ওসব চটকল চত্বরে স্রেফ কাগুজে ব্যাপার। ২০২২ সালে দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে ঠিকা আইনে (১৯৭০) শ্রমিক নিয়োগের সুষ্ঠু নীতি নির্ধারণ করতে হবে। তা হল কই? বরং ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে হনুমান চটকলে রাতের শিফটে দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন ভাউচার শ্রমিক নিহত হলেন। ২০২৪ সালে অলিখিত ছাঁটাই হয়ে জীবন থেকেই ছুটি নিলেন ওয়েভারলি চটকলের শ্রমিক। সেই বছর একই কারণে অম্বিকা চটকলের আরও দুজন শ্রমিক মারা যান।

চুক্তি শ্রমিক আইন (১৯৭০) অনুসারে, যে ঠিকাদারি সংস্থা ২০ জনের বেশি শ্রমিক নিয়োগ করবে তাদের সব ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা বিধি, কাজের অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আনা নতুন শ্রম কোড কিন্তু এই নিয়ম বদলে ‘৩০০ শ্রমিক-কর্মী’ করে দিয়েছে। মানে আইনও এখন শ্রমিকদের প্রায় বিপক্ষে চলে গেছে। নয়ের দশক থেকে চটকলে প্রথমে ভাগা-শ্রমিকের (যাঁরা অর্ধেক মজুরিতে অন্যের নম্বরে কাজ করতেন) আবির্ভাব, পরবর্তীকালে ২০০২ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি, দক্ষ শ্রমিকদের ঠিকা প্রথার ভাউচার শ্রমিক হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। সময় যত গড়ায়, চটকলে ভাউচার শ্রমিকের সংখ্যা ততই বাড়তে থাকে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ – এখন অধিকাংশই চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী (নিউ এন্ট্রান্স) ও ভাউচার শ্রমিক।

তবে সংগঠনগুলো শ্রম কোডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আশ্বাসটুকু দিলেও, চটকলের অসুখ নিয়ে নিঃশব্দে রাজনৈতিক অঙ্ক কষছে। অনেকেই নীরবতা পালন করছে। সিংহভাগ চটকলের বহু বিভাগ ঠিকাদারি সংস্থাগুলো চালায়। নিয়ম অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ছমাস কাজ শেখার পরে কোনো শ্রমিককে নাম-নম্বর দেওয়ার কথা। কিন্তু সে মেয়াদ ফুরোবার পরে আরও দেড় বছর ভাউচারে কাজ করে শ্রমিকরা যখন হাজিরার (মাস্টার রোল) কথা বলছেন, তখন পরদিন কাজ চলে যাওয়ার হুমকি পাচ্ছেন। তা নিয়ে ন্যূনতম প্রতিবাদ করলে শ্রমিকের বাড়িতে মধ্যরাতে পুলিস পৌঁছে যায় বলেও অনেকের অভিযোগ।

আসলে চটকল এখন শ্রমিকদের জীবনে ক্রমশ মরণফাঁদ হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই বিভাগ বদলি, কাজের চাপ এবং অলিখিত ছাঁটাইয়ের জাঁতাকলে তাঁরা মরণাপন্ন। শ্রমের বাজারেও মজুরি তলানিতে ঠেকেছে, কম মজুরির শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। শ্রমিক আর ক্রীতদাসের জীবনের তফাত রাষ্ট্রীয় মদতেই ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। আজ কাজ আছে, কাল নেই – এই ধারা অন্য সব শিল্পের মত চটকলেও ক্রমশ নিয়মে পরিণত হচ্ছে। ২০২৪ সালে কিন্তু রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক জানিয়েছিলেন – ৯০% শ্রমিককে স্থায়ী করা হবে। একথা বলা হয়েছিল চটকল নিয়ে ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে ২০ বছর কাজ করার পরে একজন শ্রমিকের স্থায়ীকরণ প্রসঙ্গে। বছরখানেক হয়ে গেল। কতদূর কী হয়েছে তা নিয়ে কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা তদন্ত করলে ঠিক উলটো চিত্র পাওয়া যাবে। শ্রমিকের জীবনসংগ্রাম যে আরও কঠিন হয়ে গেছে এবং তা নিয়ে প্রত্যেক মহলে নানা ধরনের উদাসীনতা রয়েছে, তা টের পাওয়া যাবে।

নিবন্ধকার গবেষণামূলক শ্রমিক পত্রিকা ‘বিবাদী’-র সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.