কংগ্রেসি সন্ত্রাস আমাদের দলের অনেককে পোড়খাওয়া কমিউনিস্টে পরিণত করেছিল, নাগরিককে বললেন বিমান বসু

শেষ বিকেলের আলিমুদ্দিন স্ট্রিট শুনশান। আগে এই সময়টায় সিপিএমের রাজ্য দফতরে সাংবাদিকদের ভিড় লেগেই থাকত। সাংবাদিক বৈঠক থাক বা না থাক, বিকেলে অফিসে ফোন করে কপি পাঠানোর আগে ঢুঁ মেরে যেতেন অনেকেই। একের পর এক নির্বাচনে বিপর্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলিমুদ্দিনে সাংবাদিকদের আনাগোনাও কমেছে। দোতলার অফিস ঘরে জনা তিনেক বৃদ্ধ বা প্রায়-বৃদ্ধ পার্টিকর্মী দফতর সামলাচ্ছেন। ব্যস্ততাহীন বিকেল, মুড়ির ঠোঙা, টিফিনবক্স ভর্তি কাঁঠাল আর গণশক্তির পাতায় চোখ বোলানোর ফাঁকে জানালেন, বিমান বসু ব্যস্ত আছেন, বসতে হবে।

বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান সময় দিয়েছিলেন সাড়ে তিনটেয়। একটু আগেভাগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম। মিনিট পনেরো অপেক্ষা করার পর ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবির বৃদ্ধ নিজেই এসে খোঁজ নিলেন। লক্ষ করলাম, পরিপাটি পাটভাঙা পাঞ্জাবির হাতাটা একটু ছেঁড়া। বিমান বসুর হাতে চায়ের গ্লাস। লাল চা। এর আগে দেখা হয়েছে, টুকটাক কথাও৷ কিন্তু সাক্ষাৎকার নিয়ে ওঠা হয়নি। প্রাথমিক কথাবার্তার পর বললেন, “চা দিয়েছে? চা খাও। আমিও চা শেষ করে আসছি।” একটু পজ দিয়ে হেসে, “শরীরটা ভাল নেই। চা না খেয়ে কথা বলতে পারব না।”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অফিস ঘরের উল্টোদিকের সরু প্যাসেজ পেরিয়ে ডান হাতে ঘুরে একটা ছোট ঘর। দশ ফুট বাই দশ ফুট মতো হবে। একটা টেবিল। খান দুয়েক চেয়ার। পিছনে একটা গদিওয়ালা বেঞ্চ। তাতে জনা তিনেক বসতে পারে। টেবিলের উপরে মাও সে তুঙের একটা মূর্তি। তার পিছনে কাস্তে হাতুড়ি আঁকা লাল পতাকা। একটা পেপার ওয়েটের নিচে কাগজপত্র, কয়েকটা বই। নজর করে দেখলাম একটা মুজফফর আহমেদের সমকালের কথা, আরেকটা বার্টান্ড রাসেলের আনআর্মড ভিক্ট্রি। বিমান বসু বিড়ি ধরিয়ে বললেন, “তাহলে, শুরু করা যাক…”।

কথা ছিল জরুরি অবস্থা নিয়ে কথা বলব। ১৯৭৫ সালের ২৫-২৬ জুনের পর ভারতবর্ষ সাড়ে চার দশক এগিয়ে এসেছে। এই বদলে যাওয়া সময়ে ভারত রাষ্ট্রের বদলে যাওয়া শাসনকে অনেকে বলছেন ‘সুপার এমার্জেন্সি’। তাই ফিরে দেখতে চাওয়া। রাজ্যের অন্যতম প্রবীণ বামপন্থী নেতার চোখ দিয়ে সেই সময়টার আঁচ নেওয়া। সেই জন্যই আসা।

বিমানদা, এত বছর পরে জরুরি অবস্থাকে কীভাবে দেখেন?

আগে যেভাবে দেখতাম, এখনও সেভাবেই দেখি। অবস্থান বদলের তো কোনও কারণ নেই। একটা জঘন্য, কুৎসিত স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করা হয়েছিল। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং তাঁর দল কংগ্রেস (ই) ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোটার উপর দিয়ে স্টিমরোলার চালিয়ে দিয়েছিলেন। গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্তের মতো ডাকসাইটে সাংবাদিকদের জেলে পোরা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গান ছাপতে দেওয়া হয়নি। গোটা দেশে লক্ষাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অসংখ্য সাংসদ ও বিধায়ককে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এর চেয়ে অন্ধকার সময় ভারতের ইতিহাসে আর আসেনি। তবে আমাদের রাজ্যে পরিস্থিতিটা একটু আলাদা ছিল।

একটু বুঝিয়ে বলবেন?

দেখো, পশ্চিমবঙ্গে তো জরুরি অবস্থা নতুন করে কিছু আঘাত নামিয়ে আনতে পারেনি। ১৯৭১ সাল থেকেই এখানে বীভৎস স্বৈরাচার চলছিল। ’৭২ সালে তা চরমে ওঠে৷ বস্তুত, টানা ৩-৪ বছর বাংলায় যা চলছিল, জরুরি অবস্থা তাকেই আরও ব্যাপকভাবে গোটা দেশে ছড়িয়ে দেয়। জরুরি অবস্থা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে,কিন্তু আমাদের রাজ্যে তার আগের কয়েকটা বছর যা চলেছে, তা আমরা ভুলে যেতে পারি না।

 সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় তো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এলেন বাহাত্তরে..

আরে ওটা নির্বাচন হয়েছিল নাকি! জাল ভোট, বুথ দখল, ছাপ্পা — যা খুশি তাই করেছিল। জ্যোতিবাবুকে হারিয়ে দিল। পুকুরের ধারে, ঝোপে, রাস্তার পাশে ব্যালট উদ্ধার হয়েছিল। এমন প্রকাশ্য জালিয়াতি, খোলাখুলি জুয়াচুরির নজির মেলা ভার। তবে শুরুটা তো বাহাত্তরে নয়, তার আগে থেকেই বাংলার রাজনীতিতে বামপন্থীদের সংসদীয় উত্থান প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মেনে নিতে পারেনি। পর পর দুবার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ফেলে দেওয়া হল। মানুষের রায়কে মর্যাদা দেওয়া হল না। বামপন্থীদের উপরে, বিশেষ করে আমাদের দল মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির উপরে নৃশংস আক্রমণ চলল। আমরাও সাধ্যমত প্রতিরোধ করেছি, কিন্তু ’৭১ থেকে আমরা ক্রমশ পিছু হটতে শুরু করলাম। তারপর ’৭২ সালের কলঙ্কিত নির্বাচনের পর আমরা, বামপন্থী কমিউনিস্টরা কোণঠাসা হয়ে গেলাম৷ পাড়ায় পাড়ায় অবর্ণনীয় সন্ত্রাস চলল। অসংখ্য কমরেড বাড়িছাড়া হল। অনেকে শহীদ হলেন। এই সবের ধারাবাহিকতাতেই এল জরুরি অবস্থা। তবে এর দুটো ভাল দিকও ছিল।

কী রকম?

প্রথমত, ’৭২ সালের নির্বাচনের পর আমরা সংসদীয় রাজনীতিতে একটা উদাহরণ তৈরি করতে পারলাম। ওই রকম জাল, জোচ্চুরি সত্ত্বেও সিপিআইএমের ১৪ জন বিধায়ক জয়ী হলেন। অন্য বামপন্থীরাও দু-একটা করে সিট পেলেন। মানে আমি যে বামপন্থীরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, তাঁদের কথা বলছি। স্বৈরাচারের পক্ষে থাকা বামপন্থীদের কথা বলছি না। সে যাই হোক, আমাদের ১৪ জন এম এল এ জাল নির্বাচনের প্রতিবাদে বিধানসভায় অংশ নেননি। তাঁরা কেউ শপথ নেননি। বেতন, ভাতা কিচ্ছু নেননি। টানা পাঁচ বছর এমন চলেছিল। এটা একটা অনন্য নজির। আমি জানি না এদেশে এরকম নজির আর আছে কিনা।

দ্বিতীয়টা?

এটা সাংগঠনিক ক্ষেত্রের বিষয়। দেখো, কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু শেষ বিচারে গরীব মানুষের পার্টি, মজুর-কৃষকের পার্টি। শহুরে ছাত্র-যুব কমরেডরা বিপুল আবেগ ও উদ্দীপনা নিয়ে পার্টিতে আসেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের এই দেশটাকে চিনতে হবে। গ্রাম, কারখানাকে বুঝতে হবে। ’৭২ এবং জরুরি অবস্থা সেই সুযোগটা করে দিয়েছিল। এটা ইতিবাচক বলে আমার মনে হয়েছে। আসলে সব অন্ধকার সময়েই তো একটা আলোকরেখা থাকে। তেমনই এই সন্ত্রাস আমাদের দলের অনেককে গড়ে পিটে নিয়েছে, পোড়খাওয়া কমিউনিস্টে পরিণত করেছে।

 আরেকটু যদি বিশদে বলেন..

সিদ্ধার্থ রায়ের আমলের শুরুর দিক থেকেই সন্ত্রাসের কারণে শহরে মধ্যবিত্ত এলাকায় কাজকর্ম করা মুশকিল হচ্ছিল। ছাত্র-যুবরা খুবই সমস্যায় পড়ল। যারা শ্রমিক আন্দোলন করত, তারা বাদে অনেকেই আত্মগোপন করতে বাধ্য হল। অন্য জেলায় চলে গেল কেউ, অনেকেই একদম প্রত্যন্ত গ্রামে গেল। গ্রামের গরীব মানুষের মধ্যে আন্দোলন সংগঠিত করতে লাগল। দেশ চিনল, মানুষকে চিনল, অনেক বেশি অভিজ্ঞ হয়ে উঠল। এটা পরে আমাদের খুবই কাজে দিয়েছে। আমরা এক ঝাঁক পোড়খাওয়া কমিউনিস্টকে পেয়েছি।

 আপনি তো আগে থেকেই গ্রামে যেতেন, তাই না?

হ্যাঁ, আমি যেতাম। আমায় জেলায় কাজ করতে পাঠানো হত। কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত আমায় বলেছিলেন জেলাগুলোকে চিনতে হবে, জেলার মানুষকে, গ্রামের মানুষকে জানতে হবে। আমি সেই চেষ্টা করতাম। মূলত সেই কারণেই ’৭৫ সালে আমাকে এস এফ আই থেকে রিলিজ করা হল। যদিও অফিশিয়ালি আমি সম্পাদক রইলাম, আমাদের কমরেড প্রকাশ কারাট প্রেসিডেন্ট হল। যাবতীয় বিবৃতি আমাদের দুজনের নামেই বেরত। তবে ছাত্র সংগঠনের কাজকর্ম ও দেখত মূলত। আমি জেলায় পার্টির কাজ করতাম।

আমার কথা বাদ দাও। আমি একা নই, আরও অনেকেই গ্রামে যেত। তবে এই সময় থেকে অনেক বেশি সংখ্যক কর্মী গ্রামে যেতে লাগল। কারণ প্রকাশ্যে কাজ করা যাচ্ছিল না। আরও একটা কথা বলব, এই জরুরি অবস্থা বা তার আগে-পরের সময়টায় আমরা শত আঘাতের মধ্যেও আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো কিন্তু অটুট রাখতে পেরেছিলাম। এর ফল বোঝা গিয়েছিল সাতাত্তরের বিধানসভায়। স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন মজবুত থাকায় আমরাই হয়ে উঠলাম বিকল্প। লোকসভায় সাফল্য সত্ত্বেও জনতা দল কিছুই করতে পারল না।

বিমানদা, আবার একটু জরুরি অবস্থায় ফিরি। সবচেয়ে স্মরণীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি কোনটা?

কলকাতার সেই ঐতিহাসিক মিছিল। তবে তার আগে পরিস্থিতিটা একটু বোঝা দরকার। দেখো, একথা ঠিক যে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন আমরা, বামপন্থীরা শুরু করিনি। বা বলা ভাল আমাদের নেতৃত্বে শুরু হয়নি। জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং তাঁর অনুগামী ছাত্র-যুব সংঘর্ষ সমিতির উদ্যোগেই ইন্দিরা বিরোধী আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি হয়। তার ধারাবাহিকতাতেই এমার্জেন্সি বিরোধী আন্দোলন। এটা মানতে কোনও দ্বিধা নেই। বিহারে যে বিপুল গণআন্দোলন, যুব আন্দোলন শুরু হয়েছিল, লালুপ্রসাদ যাদব, নীতিশ কুমারের মতো নেতারা যার ফসল, সেই লড়াই আমাদের প্রাণিত করেছিল। তবে কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু কংগ্রেস বিরোধী শক্তি বলতে আমরাই ছিলাম। সংগঠন কংগ্রেস ছিল বটে, কিন্তু তাদের ক্যাডার বেস তেমন ছিল না। আর জনসংঘের মতো রাইটিস্টরা ছিল খুবই নগণ্য শক্তি। এরপর তো লাগাতার ধরপাকড় শুরু হল। কমরেড জ্যোর্তিময় বসু, এ কে গোপালন গ্রেফতার হলেন। আমরাও ’৭২ সালের ধাক্কা সামলে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলাম। ছোট ছোট স্কোয়াড মিছিল, মহল্লা সভা, গ্রাম বৈঠক শুরু হল। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে, এমার্জেন্সির বিরুদ্ধে গণ ঘৃণা এই রাজ্যে লাল পতাকার নিচেই সংগঠিত হল। যদিও প্রফুল্লবাবুরাও তাঁদের মতো করে রাস্তায় ছিলেন। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছি, ক্যাডার বেস, সংগঠিত পার্টিশক্তি, সেটা আমাদের ছিল।

আপনি মিছিলের কথা বলছিলেন..

হ্যাঁ, সেই ঐতিহাসিক মিছিল। পতাকাহীন মিছিল। জনপ্লাবন। বন্যার মতো বাঁধভাঙা মিছিল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মিছিল। জয়প্রকাশ নারায়ণ এসেছিলেন, জ্যোতিবাবু ছিলেন। খুব বেশি বক্তৃতা হয়নি। দু-একজন বলার পরই মিছিল শুরু হল। কাতারে কাতারে মানুষ। গোটা চৌরঙ্গি জনস্রোতে ভেসে গেল। কংগ্রেসিরা কিছু অসভ্যতা করেছিল, কিন্তু গুরুত্ব পায়নি। এত লোক হয়েছিল যে ফুটপাথ উপচে পড়েছিল। আমি অনেক মিছিল দেখেছি, কিন্তু ওই দিনের মতো স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত দেখিনি। আমার একটা অভ্যাস আছে, কত লোক হল সেটা হিসাব করা। আমি একটা পদ্ধতি মেনে এটা করি। কিন্তু সেদিন মাপতে পারিনি। ওই মিছিল নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি পার্টির নির্দেশে ওই দিন মিছিলে ছিলাম বলে।

 বিমানদা, যদি পতাকা নিয়ে আপনারা মিছিলে যোগ দিতেন, সেটা কি আরও ভাল হত বলে মনে হয়?

এটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। পার্টি নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে মনে হয় পতাকা ছাড়া মিছিল বলেই অমন স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত হয়েছিল।

জরুরি অবস্থার শেষ থেকে বামফ্রন্ট সরকার গঠনের মাঝে দুটো নির্বাচন। একটা লোকসভা, আর একটা বিধানসভা। লোকসভায় কিন্তু বাংলায় আপনারা তেমন সফল নন, অথচ বিধানসভায় ঐতিহাসিক ফল। কী করে হল?

সাতাত্তরে বামফ্রন্ট সরকার তৈরির আসল রহস্য হল মানুষের সঙ্গে আমাদের নিবিড়তম যোগাযোগ। এটা অনেকেই বোঝেননি। কংগ্রেস যেমন বোঝেনি, তেমন জনতা দলও বোঝেনি। আমরাও ধরতে পারিনি। প্রথমে লোকসভার কথাটাই বলি। জনতা পার্টির সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া হল। কংগ্রেস তিনটে পেল, জগজীবন রাম, বিজয় সিং নাহাররাও ওই রকমই পেলেন। বাকি আসনগুলো আমরা আর জনতা পার্টি পেলাম। কিন্তু ওঁদের আসন সংখ্যা আমাদের চেয়ে বেশি হল। তার উপর কেন্দ্রেও ওঁদের সরকার হল। ওঁরা ভাবতে লাগলেন এই রাজ্যে ওঁরাই প্রধান বিরোধী শক্তি। কমিউনিস্টদের সঙ্গে মানুষের কয়েক দশকের নিবিড় সম্পর্কটা ওঁরা ধরতে পারলেন না।

সে যাই হোক, প্রথমে কথা হল, মানে ওরা বলল, জনতা ৫৮% আসনে লড়বে, আমরা লড়ব ৪২% আসনে। পরে অনেক আলোচনার পর ব্যাপারটা ওদের দিক থেকে ৫৬% আর ৪৪% হল। এরপর আমরা ৫২% শতাংশ আসনে লড়তে চাই। ওরা বলে ৫৬ শতাংশের চেয়ে এক চুলও নামবে না। ওদের যুক্তি, কেন্দ্রে ওদের সরকার আছে, রাজ্যেও তাই হবে। এভাবে তো মুশকিল। নির্বাচনে কী হবে তা তো পরের ব্যাপার, আগে তো আমাদের বোঝাপড়াটা ঠিক করতে হবে। তখন জোটের আলোচনা ভেস্তে গেল।

 এরপরই তো বামফ্রন্ট তৈরি হল..

হ্যাঁ, বামফ্রন্ট। তখন বামপন্থী ফ্রন্টও বলা হত। সিপিআই ছিল না। আমাদের পাঁচ দলের ফ্রন্ট। জনতা যখন মানতে রাজি হলই না, তখন বামফ্রন্ট নিজেরা বসল। একদিনেই চটপট সব ঠিক হয়ে গেল। প্রমোদ দাশগুপ্ত বার্তা দিলেন, রাজ্যে স্বৈরাচারী শক্তিকে যেমন পরাস্ত করতে হবে, তেমনই ঐক্যবিরোধী শক্তিকেও পরাস্ত করতে হবে। এসইউসি ফ্রন্টে এল না। একা লড়ে চারটে আসন জিতেছিল। সিপিআই দুটো পেয়েছিল। নকশালরা গোপীবল্লভপুরে জিতেছিল। জনতা ২৯টা জিতেছিল। তার মধ্যে জনসংঘের কয়েকজন ছিলেন। হরিপদ ভারতী, বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রীরা জিতে গিয়েছিলেন। কংগ্রেস শোচনীয় ফল করল, ২০টা পেল মাত্র। বাকি সবই প্রায় আমরা।

এই বিপুল জয় থেকে প্রমাণ হল, আমরা বামপন্থীরা, বিশেষত মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি একদম মাটির কাছাকাছি থাকা শক্তি। আমাদের পক্ষে যে খুব হাওয়া ছিল তা নয়। কিন্তু ছিল শক্ত সংগঠন আর নিবিড় জনসংযোগ। আমরা বাহাত্তর থেকে মার খেয়েছি, কাজ করতে পারিনি, পার্টি অফিস খুলতে পারিনি। তারপর এমার্জেন্সি। জনতা দলের উত্থান। কিন্তু কোনকিছুই আমাদের মানুষের মন থেকে মুছতে পারেনি।

কথাবার্তা প্রায় শেষের পথে। এই সময়টুকুর মধ্যে বিমানবাবু খান আষ্টেক বিড়ি খেয়েছেন। টানা তিরিশ বছর দুপুরে এবং প্রায় কুড়ি বছর রাতে ভাত না খেয়ে সুস্থ থাকার রহস্য বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার শহীদ, শহীদ পরিবারের গল্প করেছেন। পার্টির একদম নিচুতলার কর্মীদের হুবহু বর্ণনা দিয়েছেন। তাই একটু সাহস করে জিজ্ঞেস করা গেল:

বিমানদা, এই যে চরম স্বৈরাচারী কংগ্রেস, জরুরি অবস্থা জারি করা একটা দল, আপনাদের এত কমরেডকে যাঁরা মেরেছে বলছেন, আজ তাদের সঙ্গেই আপনাদের জোট! অস্বস্তি হয় না?

বিমান বসু হাসলেন। আবার একটা বিড়ি ধরালেন। নেহাতই ঘটনাচক্রে ফ্যানের হাওয়ায় পরপর দুবার দেশলাই নিভে গেল। তৃতীয় বার হাত দিয়ে আড়াল করে দেশলাই জ্বালিয়ে বললেন, “নাহ্, হয় না। আসলে স্বস্তি-অস্বস্তির কিছু নেই। আমরা কমিউনিস্ট। আমরা ডিমিট্রভের তত্ত্ব জানি। আমরা জানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা চিনের ইতিহাস। মাও নিজে কুয়োমিনটাঙের সঙ্গে জোট করেছিলেন। আমরা জানি এক সময়ের প্রধান শত্রু অন্য সময়ে অপ্রধান শত্রু হয়ে যায়। প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে নানা রকমের শক্তির সঙ্গে ঐক্য গড়তে হয়। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অস্বস্তির কিছু নেই।”

আপনারা শূন্য হয়ে গিয়েছেন। বাহাত্তরের শেষ নির্বাচনেও এমন হয়নি। আর কি আদৌ পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজনীতির ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব?

বিমান বসু উঠে দাঁড়ালেন। টেবিলের কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, “যতদিন বৈষম্য থাকবে, ততদিন লাল পতাকার রাজনীতি থাকবে। আমাদের মুছে ফেলা যাবে না। এত নতুন নতুন ছেলেমেয়েরা আসছে। নতুন রক্ত, নতুন ভাবনাচিন্তা আসছে। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই। প্রয়োজন কেবল নিবিড় জনসংযোগ আর অদম্য সাহস।”

আলিমুদ্দিনের শুনশান গাড়িবারান্দায় বিকেল শেষ হয়ে এল। আর একটু পরেই সন্ধে নামবে।

অকপট বিমান বসু – ছবি উইকিপেডিয়া ও দ্য স্টেটসম্যান থেকে।

3 মন্তব্য

    • কেন এরকম মনে হচ্ছে? একটু বিশদে বুঝিয়ে বললে ভবিষ্যতে আমরা সঠিক হোমওয়ার্ক সহকারে প্রস্তুত থাকতে পারব।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.