সৃজন ভট্টাচার্য

সিঙ্গুর নিয়ে কথা বলার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত এক বিরাট হতাশার সামনে আমাদের দাঁড় করায়। একটা গোটা প্রজন্মের হতাশা। আমাদের রাজ্যের যুবক যুবতীদের তো বটেই, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও হতাশা। যে জমিতে কারখানা হওয়ার কথা ছিল, যে কারখানা গোটা রাজ্যের কর্মসংস্থানের চেহারাকে বদলে দিতে পারত, সেখানে কেবল শ্মশানের শূন্যতা। তার সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো রাজ্যের শাসক দলের মাঝেমধ্যেই নানা রকম ঘোষণা, যেগুলো আসলে নির্মম রসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। সম্প্রতি সিঙ্গুরে মাছের ভেড়ি করা নিয়ে রাজ্য সরকার যে কথা বলেছে, সেটি ওইরকমই একটি রসিকতা। এক বীভৎস মজা। অমিত সম্ভাবনাময় একটি প্রকল্পকে খুন করার পর, একটি রাজ্যের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে সক্ষম একটি কারখানা হতে না দেওয়ার পর যাঁরা সিঙ্গুরে মাছের ভেড়ি করার কথা ভাবেন, তাঁদের একদিন ইতিহাসের কাছে জবাবদিহি করতেই হবে।

মাছের চাষকে ইংরেজিতে পিসিকালচার বলে। আমাদের রাজ্যে পিসি শব্দটির অভিঘাত ব্যাপক। সর্বত্রই পিসির কালচার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই সংস্কৃতিই ন্যানো কারখানাকে নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য গুজরাটে পাঠায়, কারখানার জমিতে সর্ষে ছড়ায়। আবার এখন মাছের ভেড়ি তৈরির কথা বলে। মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ কৃষক, জমির মালিক কারখানার জন্য জমি দিয়েছিলেন। তাঁদের সম্মতির বুকে পা দিয়েই চলছে গত দেড় দশকের বীভৎস মজার লজ্জাহীন অভিনয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কারখানা হতে না দেওয়াটা ছিল প্রথম অঙ্ক। কিন্তু নাটক সেখানেই শেষ হয়নি। আমরা বামপন্থীরা বারবার বলেছিলাম, ওই জমিতে আর চাষ হওয়া সম্ভব নয়৷ ওখানে শিল্পই করতে হবে। জমির চরিত্র বদলে গিয়েছে। কিন্তু তিনি তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! বিরোধীদের সদর্থক পরামর্শ শোনা তাঁর স্বভাব নয়। তাই জমি অধিগ্রহণ নিয়ে আদালতের রায়ের পর তিনি ওই জমিতে সর্ষে ছড়িয়ে আসেন। বলেন, চাষ হবে। আগের মতই ফসল ফলবে। আমরা সেই সময়েই বলেছিলাম, মুখ্যমন্ত্রী ঠিক কথা বলছেন না। ওখানে চাষ হবে না। হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের কথাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। সিঙ্গুরের জমিতে চাষ হয়নি।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআইএম আমাকে সিঙ্গুরে বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার নির্দেশ দিল। আগে থেকেই জানতাম, প্রচার শুরু করার পর দেখলাম সাধারণ মানুষের মধ্যে কারখানা না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ তীব্র। এক দশকের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁদের সমৃদ্ধ করেছে। তাঁরা বুঝেছেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা ঠিক কথাই বলেছিলেন। হাওয়া বুঝে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সিঙ্গুরে প্রচারে এলেন। বিজেপি নেতারা জানালেন ভোটে জিতলেই কারখানা করে দেবেন। মুখ্যমন্ত্রীই বা পিছিয়ে থাকেন কেন? তিনিও বললেন, সিঙ্গুরে অ্যাগ্রো হাব গড়বে তৃণমূল সরকার। নির্বাচনে তৃণমূল জিতল, বিজেপি প্রধান বিরোধী দল হল। আজ আমরা দেখছি, সমস্তটাই শেষ অবধি মাছের ভেড়িতে পরিণত হল।

দেড় দশক আগে সিঙ্গুরে শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। সিঙ্গুরের মানুষ বামেদের কথার সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখছেন। ওই জমিতে চাষ আর হবে না। হতে পারে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প, তার সঙ্গে সহযোগী শিল্প। কারখানা হতে পারে এখনো। হতে পারে স্থায়ী কর্মসংস্থান। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের মডেলকে গায়ের জোরে খারিজ তো করলেন, কিন্তু স্বায়ী কর্মসংস্থান গড়ার প্রশ্নে বিকল্প কী হল? দেড় দশকের হতাশার সমুদ্রের সামনে পেশ করা হচ্ছে মাছের ভেড়ির পরিকল্পনা! আমি মনে করি, এটাই মুখ্যমন্ত্রীর নৈতিক পরাজয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করলেন, তাঁর মডেল পরাজিত। প্রমাণ হল, সিঙ্গুরে কারখানাই করতে হবে। অন্য কিছু করা সম্ভব নয়।

সিঙ্গুর জুড়ে হতাশা ছাড়া আর কিছুই নেই এখন। বাম বিরোধীদের মধ্যেও তীব্র হতাশা। ভোটপ্রচারে গিয়ে শুনেছি, “সৃজন, ভোট হয়তো দেব না, তবে আখেরে ক্ষতি হল আমাদের। কারখানাটা দরকার ছিল…”

আসলে ক্ষতিটা কেবল সিপিআইএমের হয়নি। হয়েছে গোটা সিঙ্গুরের, গোটা রাজ্যের। সিঙ্গুর সুজলা সুফলা জায়গা। কিন্তু সেখানেও কৃষিজীবী মানুষ বাড়তি ভাল নেই। গোটা দেশে কৃষকের যা সমস্যা, সিঙ্গুরেও তাই। কৃষকের ফসলের দাম না পাওয়া, ফড়ের বাড়াবাড়ি — সব আছে। নতুন কোনো মডেল তৈরি হয়নি। শিল্পের গলা টিপে কৃষির কোনো উন্নয়ন হয়নি।

আমরা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছি। ভোটের তো হাজার রকমের অঙ্ক থাকে। সামাজিক প্রকল্পগুলি দেখে মানুষ ভোট দিয়েছেন, অনেকে বিজেপিকে হারাতে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তাতে জ্বলন্ত সত্যটা মিথ্যে হয়ে যায় না। এই সমৃদ্ধ জনপদে হতাশা তীব্র। শূন্যতা বড় স্পষ্ট। তাকে ঢাকতেই মাছের ভেড়ির কুৎসিত রসিকতা।

কেবল সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের শিল্পনীতির জন্য বামফ্রন্ট হেরেছে, এটা অতিসরলীকৃত একটা তত্ত্ব। বাংলায় সাড়ে তিন দশকের বাম সরকারের পতনের অনেক সামাজিক, রাজনৈতিক কারণ ছিল। কৃষিতে গোটা দেশের মধ্যে শীর্ষে ছিল বাংলা। ভূমি সংস্কার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এরপর প্রশ্ন এল, আগামী প্রজন্ম কি চাষই করবে, নাকি আরেকটু বেশি কিছু করবে? প্রশ্ন এল, আরেকটু আধুনিক কি হব না আমরা? কৃষির ভিতের উপর দাঁড়িয়ে শিল্পায়নের উড়াল দেবে না এই রাজ্য?

সিপিএমের স্লোগান ছিল, কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ। সেই স্লোগান প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। মেনে নিচ্ছি। কিন্তু গত এক দশকের বাংলায় বিকল্পটা ঠিক কী হল? রাজ্যের ঘাড়ে বিপুল ধারের বোঝা। কুটির শিল্পের হাল ভাল নয়, কোথাও কোনো চাকরি নেই। চপ ভাজো, পকোড়া ভাজো, কাশের বালিশ তৈরি করো বলে যুবসমাজের সঙ্গে রসিকতা করা হচ্ছে। আমি যদি জানতে চাই রাজ্যের সরকারের অর্থনীতির মডেল কী? কোনো উত্তর পাব না।

পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যাটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ১৯৪৭-২০১১ — এই কালপর্বে বাংলার মোট পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল পাঁচ লক্ষ, এক দশকে সেটা বেড়ে দশ লক্ষ হয়েছে। কেন? কারণ রাজ্যে চাকরির সুযোগ নেই। লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা আইটি বা অন্য সেক্টরে কাজ নিয়ে ভিনরাজ্যে চলে যাচ্ছে৷ আর গরীব মানুষ পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন বেছে নিচ্ছে। এই বাংলার কত বেকার যুবককে পেটের দায়ে বাইরে গিয়ে আফরাজুলের মত মরতে হচ্ছে, তার খবর কে রাখে?

এই যন্ত্রণার দায় আপনাকে নিতে হবে, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী। মাছের ভেড়ি তৈরির কথা বলে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প সম্ভাবনাকে হত্যার দায় এড়াতে পারবেন না আপনি।

লেখক ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে সিঙ্গুরে সিপিআইএম দলের প্রার্থী ছিলেন। মতামত ব্যক্তিগত।