অবশেষে এল স্কুল কলেজ খোলার খবর। ২০২০ সালের মার্চ মাসের শেষ থেকে যে শিক্ষাব্যবস্থা হঠাৎই শুধুমাত্র অনলাইন হয়ে গিয়েছিল, তার অফলাইনে প্রত্যাবর্তনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অপেক্ষা করেছে অনেক দিন। ছাত্র সংগঠনগুলো এই দাবিতে নিয়ে আন্দোলন করছে বেশ কিছুদিন হল। কাজেই জানুয়ারির ৩০ তারিখ স্কুল কলেজ আংশিক খুলে দেওয়ার ঘোষণা হতেই কলেজ স্ট্রিটে লাল আবীর খেলার ছবি আমরা দেখতে পেয়েছি। মুশকিল হল, পাড়ায় পাড়ায় স্কুল খোলার কথা ভাবা হচ্ছে, অথচ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা সে স্কুলে কী করে অংশগ্রহণ করবে কেউ জানেন না।

আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়ানোর ব্যবস্থা বেশ প্রাচীন। আমরা পড়েছি, পঞ্চতন্ত্র রচিত হয়েছিল রাজা অমরশক্তির তিন “মন্দবুদ্ধি” পুত্রকে শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যে। প্রজাদের প্রতিবন্ধী সন্তানের শিক্ষাব্যবস্থা কী ছিল জানা না গেলেও বোঝা যায়, ‘স্পেশাল’ এডুকেশনের ধারণা আমাদের দেশে অনেক আগেই চালু হয়েছিল। আধুনিক ইতিহাস দেখলে অবশ্য আমরা জানতে পারি ভারতবর্ষের স্পেশাল স্কুলগুলো চালু করেন ইংরেজ মিশনারিরা। সারা দেশের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের স্পেশাল স্কুলগুলো খোলার পিছনে প্রতিবন্ধী শিশুদের অভিভাবকদের ভূমিকা স্পষ্ট। এই বিষয়ে সরকারের উদাসীন মনোভাব নতুন নয়। প্রতিবন্ধী আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে স্পেশাল এডুকেশনকে শিক্ষা দপ্তরের অধীন করা হোক। কিন্তু প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা সমাজকল্যাণ দপ্তরের অধীনেই রয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার অবশ্য এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁরা জনশিক্ষা নামে এক নতুন দপ্তর তৈরি করে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষাকে সেই দপ্তরের অধীন করেছিলেন। ফলত আজও শিক্ষা দপ্তর যা সিদ্ধান্ত নেয়, তা স্পেশাল স্কুলগুলোর জন্য প্রযোজ্য নয়। তাই ৩১ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে স্পেশাল স্কুল সম্পর্কে কিছু শুনতে না পেয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের অভিভাবকরা হতাশ হয়েছেন। বলা বাহুল্য, অনলাইন শিক্ষা প্রতিবন্ধীদের জন্য মরীচিকার সমান। মনে হয় সামনে বাগান, আসলে সব ফাঁকা।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নিজের সন্তান প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মানোর পর হুগলী জেলায় স্পেশাল স্কুল চালাচ্ছেন এমন এক অভিভাবক জানালেন, তিনি ঠিক করেছেন ফেব্রুয়ারি মাসে সব অভিভাবকদের ডেকে ‘কন্সেন্ট লেটার’ নিয়ে স্কুল খুলে দেবেন। কবে জনশিক্ষা দপ্তর কী জানাবে তার জন্য অপেক্ষা করবেন না। তাঁর পরিচালিত স্কুলে অনেক মানসিক প্রতিবন্ধী ট্রেনি আছে, যাদের বয়স আঠারো বছর পেরিয়ে গেছে। স্কুলের ব্যবস্থাপনায় এদের ভ্যাক্সিনও দেওয়া হয়েছে। দুটো ভ্যাক্সিন পাওয়ার পরও এই ট্রেনিরা কেন ভোকেশনাল ক্লাসে আসতে পারবে না, তার কোনো উপযুক্ত কারণ জনশিক্ষা দপ্তর দেখাতে পারেনি।

হাওড়ার এক স্পেশাল স্কুলের অধ্যক্ষ জানালেন, যদি সরস্বতীপুজোর আগে এই দপ্তর কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে, তাহলে উনি দৃষ্টিহীন ছাত্রদের নিয়ে ব্রেইল বই এবং ব্রেইল স্লেট সহ পথ অবরোধ করবেন। দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা পঠনপাঠন চলে স্পর্শের মাধ্যমে। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রীদের অনলাইনে পড়াশোনার করতে বলার মত মস্করা সত্যিই আর বেশিদিন মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

এখানে বলে রাখা ভাল, সব প্রতিবন্ধী শিশুই স্পেশাল স্কুলে পড়ে না। শিক্ষার অধিকার আইন অনুসারে এদের পড়াশোনার দায়িত্ব সাধারণ স্কুলগুলোর উপরেও বর্তায়। পাড়ায় শিক্ষালয় নামে যে নতুন ধরণের শিক্ষাব্যবস্থা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার চালু করতে চাইছেন, সেখানে এই শিশুদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে তা নিয়ে শুধুই ধোঁয়াশা। মাঠঘাটের পাঠশালায় কি সর্বশিক্ষা মিশনের স্পেশাল টিচাররা যাবেন? সেখানে টিচিং, লার্নিং মেটিরিয়াল কী থাকবে? কিছুই জানা নেই। অতিমারীর কারণে এমনিতেই প্রান্তিক মানুষ অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। স্কুল না খোলার ব্যবস্থা তাদের আরও পিছনে ঠেলে দেওয়ার উদ্যোগ নয় তো?

মতামত ব্যক্তিগত