কলকাতা এখন উত্তাল। শুধু তো কলকাতা নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গেই লেখা হচ্ছে প্রতিরোধের ইশতেহার। ধর্মতলায় আমরণ অনশন করছেন জুনিয়র ডাক্তাররা, রাত দখল করছেন মেয়েরা। রাজ্য সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে আন্দোলন দমন করার। কলকাতার বাইরেও বাংলার শহর, মফস্বল, গ্রাম দুলে উঠছে আর জি করে মৃতার ন্যায়বিচারের দাবিতে। প্রকৃত প্রস্তাবেই যেন শুরু হয়ে গিয়েছে রাজ্যব্যাপী প্রতিরোধের কার্নিভাল। কিন্তু এই অসাধারণ গণআন্দোলনের সমান্তরালে চলছে এক অন্য লড়াই। আমাদের রাজ্যের উত্তরাংশের চা-শ্রমিকরা রচনা করছেন প্রতিরোধ আন্দোলনের নতুন ইতিহাস। কিন্তু কলকাতাকেন্দ্রিক নাগরিক সমাজের নজর হয়ত অত দূরে পৌঁছতে পারছে না।

পেয়ালা উপচে চা তো নয়, বলা যায় চা-শ্রমিকের রক্ত, ঘাম সাজানো থাকে আমাদের শৌখিন ট্রেতে। বছরভর নিদারুণ শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হন চা-শ্রমিকরা। হকের টাকা মেরে দেওয়া, বোনাসের কথা বললেই বাগানের ঝাঁপ ফেলে দেওয়া – এসব তো রোজকার সমস্যা। সেই ধারাবাহিকতাতেই দার্জিলিংয়ের সিংতাম চা বাগান গতমাসে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার কদিন আগে বন্ধ হয় পেশকও। ফি বছর উৎসবের বোনাসের দাবি মাথাচাড়া দিতেই বেপাত্তা হয়ে যান কিছু বাগানের ম্যানেজার। এবারও তাই। বোনাস ঘোষণার পর কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয় সোম, লিঙ্গিয়া, বার্নসবেগ বা কুমাই চা বাগানেরও। ডুয়ার্সের নানা জায়গা থেকেও ভেসে আসছে একইরকম খবর। বছরের পর বছর চলছে একই চিত্রনাট্য।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বোনাসের এই মরশুম থেকে শীত পেরিয়ে ফার্স্ট ফ্লাশের কচি পাতা বেরনো পর্যন্ত শ্রমিকদের সঙ্গে বাগান মালিকদের এই চিরকালীন লুকোচুরি খেলা চা বাগানগুলোকে ধূসর করে ফেলেছে। তবে এবছর কিছুটা অন্য ছবি দেখা যাচ্ছে। চা-শ্রমিকদের মরিয়া সংগ্রাম দেখছে উত্তরবঙ্গ। চা বাগানের মালিকদের বার্ষিক পলায়ন আর বঞ্চনার বিপরীতে নবজীবনের গান রচিত হয়েছে এবার। মাসখানেকের অদম্য লড়াই পাহাড়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ‘জয় শ্রমিক’ গর্জনে পিছু হটেছে সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৬% বোনাস ঘোষণা করে দিয়ে ল্যাঠা চুকিয়ে ফেলতে চাইলেও, নাছোড়বান্দা শ্রমিকদের চাপে ফের সভা হবে বলে ঘোষণা করতে হয়েছে। সেই বৈঠক হবে ৬ নভেম্বর। চা-শ্রমিকদের হালফিলের লড়াই নিয়ে এ রাজ্যের নাগরিক সমাজ তেমন ওয়াকিবহাল নয়। কিন্তু শ্রমিকরা সংগঠিত হচ্ছেন, লড়ছেন, জয় ছিনিয়ে আনছেন।

#

১৯৫৫ সালের ২৫ জুন মার্গারেটস হোপ বাগানে পুলিশের গুলিতে ছজন শ্রমিক শহিদ হয়েছিলেন। সেই মর্মান্তিক দিনটার স্মৃতিতে লোকসভা ভোট মিটতেই ন্যূনতম মজুরি, পাট্টা, অবসরকালীন সুবিধাসহ নানা দাবিতে দুমাসব্যাপী প্রচারাভিযান শুরু করেন চা-শ্রমিকরা। তার মধ্যেই বিভিন্ন বাগানে বকেয়া পাওনার আন্দোলন চলতে চলতে সমস্ত চা-শ্রমিকের বোনাসের দাবি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শ্রমিকদের দাবি খুব স্পষ্ট – ২০% বোনাস একবারে দিতে হবে। কেন ২০%, কেন এক কিস্তি? তা বুঝতে গেলে শারদোৎসবের চাকচিক্য ভুলে বাগানিয়া শ্রমিকদের জীবনকে জানতে হবে।

বিশাল আয় তথা বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হল দার্জিলিং টি, চা মহলে যার নাম ‘শ্যাম্পেন অফ টিজ’। জিআই ট্যাগ তার ভূষণ। শুধু রফতানি নয়, দেশের অভ্যন্তরেও এই চায়ের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম বলে অর্থনীতির মৌলিক নিয়মে দার্জিলিং টি উৎপাদন লাভজনক। হ্যাঁ, নেপাল টি-র অনধিকার প্রবেশ বা উৎপাদনের তুলনায় ট্রেডিংয়ের বাড়তি মুনাফার কথা মাথায় রেখেও একথা সত্য।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে দার্জিলিং পাহাড়-তরাই-ডুয়ার্সের চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ২৫০ টাকা। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। এই ২০২৪ সালেও, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অগ্নিমূল্যের বাজারেও দৈনিক ২৫০ টাকা। মনে রাখা জরুরি, আসামের মতই পশ্চিমবঙ্গের চা শিল্পও ন্যূনতম মজুরি আইনের আওতায় এখনো আসেনি। ২০১৪ সালে চা শিল্পে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জেরে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরির কথা লেখা হলেও এক দশক পেরোতে চলল, কোনো ফল হল না। পরামর্শদাতা কমিটি পাল্টে পাল্টে গেছে, হাইকোর্টের নির্দেশ এসেছে বারবার, তবু লাগু হয়নি ন্যূনতম মজুরি। মজুরির বাইরের প্রাপ্য অন্যান্য সুযোগসুবিধা – ছাতা, জুতো, ত্রিপল, জ্বালানি কাঠ, চিকিৎসা, ক্রেশ, ঘর মেরামতি – বহু বাগানে সেসবও গায়েব। জমি, বাড়ির পাট্টাও নেই শ্রমিকদের। প্রভিডেন্ট ফান্ড জমা হয় না, গ্র্যাচুইটি মেলে না, শ্রমিকদের অবসর নেওয়ার বয়স পেরিয়ে গেলেও কাজ করিয়ে যাওয়া হয়। সব মিলিয়ে চা-শ্রমিকের জীবন মানে এক ভয়াবহ অসুরক্ষিত জীবন। বহু যুগ ধরে এর কোনো বদল হয়নি।

চা-শ্রমিকদের ২০% বোনাসের দাবি কেন উঠল, তা বুঝতে একটা সরল হিসাব দেখতে হবে। দৈনিক ২৫০ টাকা মজুরির শ্রমিক যদি মাসে চারটে সাপ্তাহিক ছুটি বাদে বাকি ২৬ দিনও কাজ করেন, তাহলে মাসের শেষে তাঁর মজুরি হবে ২৬x২৫০ = ৬,৫০০ টাকা। পিএফের টাকা কাটার পর আরও কম হাতে আসবে। কোনোদিন কাজে না গেলে বা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম পাতা তুললে ‘পরোটা’ (প্রো-রাটা) হিসাবে মজুরি কাটা যাবে। বেশি মজুরির উপায় রয়েছে ভরা মরশুমে ওভারটাইম বা অতিরিক্ত পাতা তোলার মাধ্যমে। যদিও এক্সট্রা লিফ প্রাইস (ইএলপি) বাবদ প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে মেলে মাত্র ৪-৫ টাকা।

তাহলে মাস গেলে কমবেশি ৬,৫০০ টাকা মজুরি পান যে শ্রমিক, বছরভর বোনাসের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তাঁর আর উপায় কী? পাহাড়ের বাগানগুলোতে অধিকাংশ শ্রমিক নেপালি, কিছু আদিবাসী, সামান্য রাজবংশী আর অত্যন্ত অল্পসংখ্যক বাঙালি। উৎসবের এই সময়টার খানিক আগে-পরে আদিবাসীদের করম পুজো, নেপালিদের দসৈঁ-তিহার আসে – আনন্দ-বিনোদন-সামাজিকতা, ঘর সাজানো, জামাকাপড় বা আসবাবপত্র কেনা, বাচ্চাদের আর বড়দের উপহার দেওয়ার সময় এটা। এইসময় ২৫০ টাকার রোজের দৈন্য পেরিয়ে আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাবিকাঠি এই বোনাসই। এক কিস্তিতে পুরোটা পেলে তবেই কল্পিত আনন্দের অন্তত বারো আনা উশুল করা যায়, না হলে আনন্দও কিনতে হয় কিস্তিতে।

গত ২ সেপ্টেম্বর দার্জিলিং টি অ্যাসোসিয়েশনের (ডিটিএ) অফিসে চা বাগানের মালিকরা পাহাড়ের ৮৭টা বাগানের ৫৫,০০০ স্থায়ী শ্রমিকের বোনাস সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ডাকে। মালিকদের সবকটা সংস্থা অবশ্য ছিল না সেই বৈঠকে। চা-শ্রমিক আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠন হিল প্ল্যান্টেশন্স এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (এইচপিইইউ) সমেত পাহাড়ে সক্রিয় নটা ইউনিয়নের প্রতিনিধি বৈঠকে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন। মালিকরা বলেন, উৎপাদন ঘাটতি, লোকসান, শ্রমিকদের কাজে কামাই ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। তাই ৮.৩৩ শতাংশের বেশি বোনাস দিতে তাঁরা দিতে পারবেন না।

উল্লেখ্য, ১৯৬৫ সালের বোনাস আইন অনুযায়ী সারা বছরের রোজগারের ৮.৩৩% (১/১২ ভাগ = এক মাসের আয়) হল সর্বনিম্ন বোনাস দর আর ২০%, অর্থাৎ আড়াই মাসের আয় হল সর্বোচ্চ। এর বেশি কোনো মালিক দিলে সেই বোনাসকে এক্স-গ্রাশিয়া বলা হয়। ভারতে সংগঠিত শিল্পগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন মজুরি প্রাপক চা-শ্রমিকদের বচ্ছরকার দিনে সর্বোচ্চ বোনাস চাওয়ার দাবিকে ন্যায্যই বলতে হবে, ন্যূনতম মজুরি চালু থাকলে অন্য কথা ছিল।

উৎপাদন ঘাটতি, লোকসান, শ্রমিকদের কাজে কামাইয়ের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা পরে করা যাবে। কিন্তু এটুকু বলে নিতেই হবে, যে কম মজুরির কারণে বাগানের কাজ ছেড়ে দেওয়া স্থায়ী শ্রমিকের বদলে ‘শুখা-হাজিরা’-য় অন্যান্য সুযোগসুবিধাহীন ‘বিঘা’ বা অস্থায়ী শ্রমিক লাগিয়ে মালিকদের লাভই হচ্ছে। আর ‘অ্যাবসেন্ট’ শ্রমিকদের উৎপাদনের ঘাটতি যখন উপস্থিত শ্রমিকরা পুষিয়ে দিচ্ছেন, তখন তাঁদের কাজের বোঝা কত মারাত্মক, তাও সহজেই অনুমেয়। কম শ্রমিকে সমান উৎপাদন হলে কার সুবিধা? কার মুনাফা? কার উপর কাজের বোঝা? প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।

মার্গারেটস হোপের মত তথাকথিত প্রথম সারির বাগানে শ্রমিককণ্ঠ কিংবা বন্ধ ধোত্রে-তুংসুংয়ের শ্রমিক কমিটি মারফত বাগান বাঁচানোর বিকল্প প্রচেষ্টার পাশে দাঁড়ানো আগে থেকেই চলছিল। ২৫ জুন থেকে শুরু হওয়া দুমাসের প্রচারাভিযানে সোনাদার কাছে রিংটং বাগানে হিল এইচপিইইউয়ের নেতৃত্বে জোরদার আন্দোলন শুরু হয়। তুমুল বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় চা বাগিচার মধ্যে শয়ে শয়ে চা-শ্রমিকের জমায়েতের সেই ছবি বাগানে বাগানে আলোড়ন তোলে। শিলিগুড়ির মাটিগাড়ায় মালিকদের সংগঠন টিপা-র অফিসে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মধ্যে দিয়ে সেই আন্দোলন খানিক শান্ত হতে না হতেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে পাংখাবাড়ির কাছে লং ভিউ চা বাগানের আন্দোলন। বকেয়া ১৬.৯ কোটি টাকা মেটানোর দাবিতে নানা পর্যায়ে ডেপুটেশন, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর ১৭ আগস্ট থেকে যে ধরনা-বিক্ষোভ শুরু হয়, পাতা তোলার কাজ বন্ধ করা হয়, তার জেরে ২৮ অগাস্ট প্রথম ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ৬ সেপ্টেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বকেয়া মেটানোর সময়সূচি তৈরি হয় এবং প্রাথমিক জিত হয় শ্রমিকদের।

এইচপিইইউয়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন গোটা পাহাড় এবং চা-বলয় জুড়ে ছড়িয়ে দেয় শ্রমিক সংগ্রামের এবং স্বতন্ত্র ইউনিয়নের অনন্য বার্তা। লড়াইয়ে, স্লোগানে, দৃঢ়তায়, সাহসিকতায় শ্রমিক সক্রিয়তার নতুন নজির সৃষ্টি করে এই আন্দোলনগুলো। ৮ সেপ্টেম্বর কার্শিয়াংয়ে অনুষ্ঠিত এইচপিইইউয়ের জেলা স্তরের সাধারণ সভায় বিভিন্ন বাগানের শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে ৫২ জনের জেলা কমিটি গঠিত হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর গরুবাথানে গঠিত হয় কালিম্পংয়ের জেলা কমিটি। শ্রমিক সক্রিয়তা, ব্যতিক্রমী অংশগ্রহণ, তারুণ্যের জোয়ার আর প্রবীণদের বিচক্ষণতা সহযোগে এগোতে থাকে শ্রমিকদের নিজস্ব ইউনিয়ন।

এই সময়েই পাহাড়ের অন্য আট ইউনিয়নের সম্মিলিত বৈঠক থেকে গঠিত হয় পার্বতীয় শ্রমিক সংগঠন সমন্বয় মঞ্চ। গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (জিটিএ) ক্ষমতায় থাকা অনিত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার ইউনিয়ন এইচটিডিপিএলইউ, তৃণমূল কংগ্রেসের ইউনিয়ন টিএমসিবিএসইউ, সিপিএমের ডিডিসিকেএমইউ, সিপিআরএমের ডিটিডিসিকেএমইউ, বিমল গুরুং গোষ্ঠীর ডিটিডিপিএলইউ, জিএনএলএফের এইচপিডব্লিউইউ, আরএসএস-বিজেপির বিসিএমএস, অজয় এডওয়ার্ডের হামরো পার্টির এইচএইচটিডিসিএসএস – এই আট ইউনিয়ন মিলে গড়ে তোলে এই মঞ্চ।

সরকারের পক্ষে থাকা, বিরোধী পক্ষে থাকা এবং মাঝামাঝি নানা অবস্থানে থাকা পাহাড়ের রাজনৈতিক দলের ইউনিয়নগুলো, যাদের বেশিরভাগ পার্টির পরিচয়েই নিজ ইউনিয়নকে চেনায় – তারা এক মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে, মালিকদের ৮.৩৩% বোনাস প্রস্তাবের বিপরীতে সরকারি হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়েছে। প্রসঙ্গত জেনে রাখা ভাল, এই পার্বতীয় মঞ্চ গঠনের সভায় পাহাড়ের ইউনিয়ন হওয়া সত্ত্বেও এইচপিইইউকে ডাকা হয়নি। কারণ অজানা।

ইতিমধ্যে ৫ সেপ্টেম্বরের অনলাইন মিটিং থেকে তরাই-ডুয়ার্স বোনাস বৈঠকের ক্রম শুরু হয় এবং পরে আরও দুই দফায় চারদিন কলকাতায় মালিকদের অফিসে বৈঠক হওয়ার পর ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয় – ১৬% বোনাস পাবেন তরাই-ডুয়ার্সের চা-শ্রমিকরা। পরদিন, ২০ সেপ্টেম্বর, ডাকা হয়েছিল পাহাড়ের বোনাস নিয়ে বৈঠক। কিন্তু সেই মিটিং ডেকেছিল সরকার, শ্রম দফতরের অফিসে। ২ সেপ্টেম্বর মালিকদের ডাকা প্রথম বোনাস বৈঠকের পর দ্বিতীয় বৈঠক মালিকরা না ডেকে কেন সরকারই আগ বাড়িয়ে ডাকছে – তা পরিষ্কার নয়। তরাই-ডুয়ার্সের ক্ষেত্রে তো এমনটা হয়নি!

সংঘবদ্ধ আট ইউনিয়ন এবং মালিকদের সংগঠন সরকারি বোনাস-বৈঠকে ডাক পায়। এইচপিইইউয়ের কাছে এই বৈঠকের চিঠিই আসেনি, নথিভুক্ত ইউনিয়ন হওয়া সত্ত্বেও। যে শ্রম দফতরে লং ভিউ বাগানের নির্ণায়ক ইউনিয়ন হিসেবে এইচপিইইউকে বৈঠকে ডেকে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি করে, তারা বোনাস মিটিংয়ের সময়ে এইচপিইইউয়ের নাম লেখেনি কেন? এই প্রশ্নেরও উত্তর সহজ। চা-শ্রমিক আন্দোলনের নতুন সংগ্রামী ধারার শ্রমিক সংগঠনকে কোণঠাসা করার প্রচেষ্টা ছিল দিনের আলোর মত স্পষ্ট।

আরো পড়ুন বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই

বেশ অস্বস্তিকর হলেও একটা তথ্য এ প্রসঙ্গে না দিলেই নয়। এবছর মে দিবসে এইচপিইইউ যখন শ্রমিকদের নিয়ে মিটিং মিছিল করছিল, সেদিনই দার্জিলিংয়ে সরকারি শ্রম দফতর অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনকে সংবর্ধনা দেয়। শ্রমিক ইউনিয়নকে সংবর্ধনা দিয়ে সরকারি শ্রম দফতর মে দিবস পালন করছে – এও এক আশ্চর্য ঐতিহাসিক ঘটনা।

বোনাস বৈঠকে না ডাকায় এইচপিইইউয়ের সদস্য শ্রমিকরা প্রথমে ভাবেন – গতবছর সদ্য নতুন ইউনিয়ন গঠিত হয়েছে, তাই হয়ত তাঁদের নাম ছিল না। কিন্তু এবারও তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ওই বৈঠকের চিঠি অন্য সূত্র থেকে দেখার পরই উত্তরবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাডিশনাল লেবার কমিশনার (শিলিগুড়ি) শ্যামল দত্তর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘মিটিংয়ে ব্যস্ত, পরে ব্যাপারটা দেখছি’ বলেন। কার্শিয়াংয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট লেবার কমিশনারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন ‘কোনোভাবে ভুল হয়েছে হয়ত, আপনারা মিটিংয়ে আসুন’। পরে অবশ্য একথা অস্বীকার করেন তিনি।

২০ তারিখ বিশালসংখ্যক শ্রমিক এই ভুল শুধরে নেওয়ার আর্জি জানিয়ে, ২ তারিখ মালিকদের ডাকা সভায় এইচপিইইউ ছিল জানিয়ে, এএলসির সাথে ফোনে কথার ভিত্তিতেই আসা হয়েছে বলে চিঠি লিখে বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য শিলিগুড়ির শ্রমিক ভবনে উপস্থিত হলে এএলসি এই সংগঠনকে বৈঠকে থাকতে দেবেন না বলে জানান। শ্রমিকরা যারপরনাই আশ্চর্য হন যুক্তিহীনতায়, রূঢ় আচরণে এবং কথার খেলাপে। এখানেও কি কোনো সিন্ডিকেট রাজ কাজ করছে? সন্দেহ জাগে।

বোনাস বৈঠকের দিন শ্রমিকদের জমায়েত, এমনকি সভায় ঢোকাও দস্তুর। তাই এইচপিইইউয়ের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য শ্রমিক দুপুরের অসহ্য গরমেও সেখানে হাজির ছিলেন। তাঁরা গেটের বাইরে বসে পড়েন। ভিতরে বৈঠক শুরু হয়, বাইরে বিক্ষোভ। মালিকরা ৮.৩৩% বোনাসের দরেই আটকে থাকে। দীর্ঘক্ষণ বৈঠক চলার পরেও কিছু এগোয়নি। বাইরের অস্থির শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এইচপিইইউ লং ভিউ শাখার সেক্রেটারি লড়াকু শ্রমিক সঙ্গীতা ছেত্রী জোর করে মেন গেটের বাধা পেরিয়ে ‘শ্রমিক হিসাবে’ বৈঠকে ঢুকে পড়েন। শ্রমিক বিষয়ক বৈঠকে শ্রমিকরা কেন থাকতে পারবেন না – এই প্রশ্ন তোলেন তিনি। কথার মারপ্যাঁচে ৩-৪ ঘন্টা কেটে যাওয়ার পর অধৈর্য হয়ে ২০% বোনাস দেওয়ার সোচ্চার দাবি ও যুক্তি হাজির করতে থাকেন সঙ্গীতা। মালিকরা এবার সামান্য দর বাড়িয়ে ৯.৫% বোনাসের প্রস্তাব দেয়।

সঙ্গীতার শ্রমিকসুলভ অনন্য তর্কের সামনে দাঁড়াতে না পেরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং বেমানান ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তাঁকে মৌখিকভাবে অপমান করতে থাকেন পুরুষ-অধ্যুষিত ওই সভার অনেকে। ফলে সঙ্গীতা বৈঠক থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। বাইরে শ্রমিকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ততক্ষণে এইচপিইইউয়ের শতাধিক শ্রমিক ছাড়াও অন্যান্য শ্রমিক সংগঠন এবং হামরো পার্টির অজয় এডওয়ার্ড সহ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সংবাদমাধ্যমে সেখানে জড়ো হয়ে গেছে। তাঁরা দেখেন শ্রমিকদের রুদ্র রূপ। সভায় এইচপিইইউয়ের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আটকানোর পরে একজন শ্রমিক সদস্য গিয়ে তাঁর বক্তব্য রাখলেও এই ব্যবস্থা তথা প্রশাসন কী চোখে শ্রমিকদের দেখে – তা স্পষ্ট হয়ে যায়। বৈঠকের ভিতরে তখন অচলাবস্থা। সাড়ে নয় শতাংশ বোনাসের প্রস্তাবে মালিকরা অনড় থাকায় অন্য শ্রমিক ইউনিয়নগুলোও বুঝে যায় যে এই বৈঠক থেকে কিছু হওয়ার নয়। ফলে তারা বাইরে বেরিয়ে আসে, সভা ভেস্তে যায়। কিছু ইউনিয়নের নেতা পরিস্থিতি দেখে চটজলদি সরে পড়লেও কোনো কোনো নেতা বেরিয়ে এসে শ্রমিকের জীবনযন্ত্রণা উপস্থাপিত করার প্রশ্নে সঙ্গীতার ভূমিকা এবং জেদকে সেলাম জানান। তাঁরা বলেন, পরবর্তী সভায় এইচপিইইউকে না ডাকা হলে তাঁরাও উপস্থিত থাকবেন না। বোনাস নিয়ে এবার তীব্র আন্দোলন শুরু করার কথাও বলেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, ওই মঞ্চেরই কেউ কেউ অন্য কথা বলছেন। ইতিমধ্যে রাজ্যের লেবার কমিশনারের কাছে এই ঘটনা জানিয়ে ইমেল করা হয়, এইচপিইইউকে পরবর্তী বৈঠকে ডাকার আর্জি জানানো হয়। যদিও তার কোনো উত্তর আসেনি। এইচপিইইউ এবং অন্যান্য ইউনিয়নের উদ্যোগে বাগানে বাগানে চলতে থাকে গেট মিটিং। পরের বৈঠক ডাকা হয় চারদিন পরে, ২৪ তারিখ। এবারেও ডাক পায়নি এইচপিইইউ। চারদিন আগে যেসব ইউনিয়ন এইচপিইইউকে না ডাকলে ঢুকবে না বলেছিল, তারা প্রশ্ন তোলার আশ্বাস দিয়ে বৈঠকে যোগ দেয়। জানা গেছে, আগের দিনের গোলমালের দায় ভিত্তিহীনভাবে এইচপিইইউয়ের উপর চাপানোর চেষ্টা চলেছে। যাঁরা সত্যিই প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের সরকারি অফিসাররা বলেন, বিষয়টা আর তাঁদের হাতে নেই, উপরমহলে যোগাযোগ করতে হবে। কোন উপর? তার জবাব নেই।

শেষাংশ আগামীকাল

~ তথ্য লেখকের, মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.