অর্ক মুখার্জি
দুর্গাপুজোকে কেবলমাত্র ধর্মীয় উৎসব পালনের বাধ্যবাধকতায় মাপতে গেলে ভুল হবে। দুর্গাপুজো বর্তমান সময়ে এমন এক আর্থ- সামাজিক ‘ইভেন্ট’ হিসাবে উদযাপিত হয়, যেখানে কেবল ভক্তি, নিষ্ঠা, আচার পালন, বিনোদন, মজা, দেদার আনন্দই নেই, আছে নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মানুষের কাছে অর্থ উপার্জনের উন্মুক্ত সুযোগ। আমরা যদি দুর্গাপুজোর ইতিহাস ঘাঁটি, তাহলে দেখব এই উৎসব কিন্তু প্রথম থেকেই এমন সার্বজনীন সামজিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বরং রাজা-মহারাজদের এবং পরবর্তী সময়ে জমিদারের পারিবারিক উৎসব হিসাবেই পরিচিত ছিল। এমন এক মহোৎসব, যেখানে বৈভব, বংশগরিমা এবং রাজকীয় ভোগবিলাসের ছাপ পরিলক্ষিত হত। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী রাজা সুরথ প্রথম বাংলাদেশে দুর্গাপুজো করেছিলেন। বাংলায় দুর্গাপুজো প্রচলনের কৃতিত্ব দাবি করার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন সম্রাট আকবরের আমলে তৎকালীন বাংলার বারো ভুঁইয়ার অন্যতম রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। কথিত আছে, ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে এই দুর্গাপুজোকে মহাসমারোহে পালনের জন্য তিনি সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। এই অর্থ ও বৈভবের প্রদর্শনীকে টেক্কা দিতে ভাদুড়িয়ার জমিদার জগৎনারায়ণ ওই বছরই বসন্তকালে বাসন্তী দুর্গোৎসব করতে ৯ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। আবার কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখেছিলেন, ‘বোধহয় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমল হতেই বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রাদুর্ভাব বাড়ে।’ ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদৌল্লার পরাজয় নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং কলকাতার রাজা নবকৃষ্ণ দেবকে উচ্ছ্বসিত করেছিল। বলা হয়, ক্লাইভ তাঁদের পরামর্শ দিয়েছিলেন পলাশীর যুদ্ধের বিজয় উৎসব দুর্গোৎসবের মধ্য দিয়ে পালন করতে এবং তাঁরা সেই পরামর্শ অনুযায়ী প্রচুর টাকা খরচ করেছিলেন। হান্টারের অ্যানালস অফ রুরাল বেঙ্গল বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, জন চিপস সাহেব বা বীরভূমের জনপ্রিয় ‘শ্রীযুক্ত চিক বাহাদুর’ সুড়ুলে কোম্পানির দেওয়া সাহেবের কুঠিতে মহা ধূমধামে পূজা শুরু করেন। চিপসের এই পূজা থেকে প্রথম অনুদান সংস্কৃতির আমদানি হয়। পুজো বাবদ গ্রামের লোককে বছরে ৫০ টাকা খরচ হিসাবে আর ১৭ টাকায় নতুন কাপড় দেওয়া ও খাওয়ানো হত। এই সময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ধনীদের গৃহে বাঈজি, নর্তকী এবং গায়িকাদের দিয়ে অনুষ্ঠান করানো হত। আবার অনেক জায়গায় যাত্রাগান,পাঁচালি ও কবিগানের আসর বসত। যদিও আমজনতার সঙ্গে এইসব পূজার সরাসরি কোনো যোগাযোগ থাকত না। তাদেরকে সন্তুষ্ট থাকতে হত দূর থেকে আনন্দ উপভোগ করেই। অর্থনৈতিক অসাম্য ও জাতপাতের কারণে বিভিন্ন সামাজিক বর্গের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ প্রায় বিছিন্ন থাকত, তা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠেনি। তবে এই ছবি পাল্টাতে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। এই সময়ে গড়ে ওঠা স্বদেশি আন্দোলন বাংলার শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, দরিদ্র সবার মধ্যেই জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে সামজিক স্তরে নৈকট্য কিছুটা বৃদ্ধি করেছিল। এই নৈকট্য দুর্গাপুজোর সর্বজনীন উত্তরণে সাহায্য করেছিল। ১৯১০ সালে কতিপয় যুবক এবং ব্যবসায়ী মিলিত হয়ে লভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা প্রতিষ্ঠা করে শুরু করে দুর্গাপুজো। ‘বারোইয়ারি’ বা ‘বারোয়ারি’ শব্দটির উৎপত্তি ‘বারো’ (১২) ও ইয়ার (বন্ধু) শব্দদ্বয় থেকে।
আরো পড়ুন সর্বজনীন পুজোকে গ্রাস করছে রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদ
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দুর্গাপুজো এখন এক বৃহত্তর অর্থনৈতিক লেনদেনের খোলা মঞ্চ, যেখানে প্রায় মাস খানেক ধরে বিভিন্ন পেশার মানুষ বিভিন্নভাবে উপকৃত হন। জাঁকজমক এক অর্থে সমাজের আর্থিকভাবে প্রান্তিক মানুষের কাছে আর্শীবাদস্বরূপ, কারণ এই জাঁকজমকের জন্য উৎসবকে ঘিরে যেভাবে বাজার তৈরি হয়, বেচাকেনা হয়, উৎসবের উদযাপনের সময় মানুষ যেভাবে হইহুল্লোড়ে মাতে, রাস্তায় আনন্দ করে, বাইরে খাওয়াদাওয়া করে, পরিবহনের মাধ্যমে হিসাবে গাড়ি বা টোটো ভাড়া করে, বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনাকাটি করে তাতে টাকার যে হাতবদল হয় তাতে যেমন বড় ব্যবসায়ীরা লাভবান হন আবার মজুর থেকে রাস্তার একাংশ দখল করে ব্যবসা করা ছোট বিনিয়োগকারীদের পকেটেও কিছু আসে। গ্রাম থেকে বহু লোক এইসময় পরিযায়ী হন উৎসব পালনের আবশ্যিক উপাদান হিসাবে নিজেদের উপস্থাপিত করে বাড়তি কিছু রোজগারের আশায়। দল বেঁধে ঢাকির দল শহরে যায়৷ গ্রামে থাকাকালীন বছরভর তাঁরা বিভিন্ন কায়িক শ্রমনির্ভর ভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, কিন্তু উৎসবের সময়ে তাঁদের পূর্বপুরুষের শিখিয়ে যাওয়া পেশাকে আপন করে শহরে যান, ঢাক বাজান, রোজগার করেন। অনেক মানুষ পুরোহিত বৃত্তি বা রাঁধুনি হিসাবে একসঙ্গে, দল তৈরি করে শহরে যান। বহুমানুষ বছরভর অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে করে উৎসবের কয়েকদিন বিনিয়োগ করে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন – চা বিক্রি থেকে সস্তায় জামাকাপড়, ঝালমুড়ি, আইসক্রিম বা বিভিন্ন মুখরোচক জাতীয় খাবার বিক্রি করেন। উৎসবের এই সময় মন্থর অর্থনীতিকে সবল করে, টাকার হাত বদল বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে টাকা হাতবদলের মসৃণ পথ সুগম করে। বহু জায়গায় কাজের সুযোগ তৈরি হয়। অসংগঠিত ক্ষেত্রে বহু শ্রমিক কিছুদিনের জন্য হলেও রোজগারের দিশা খুঁজে পান। এত হরেকরকম রোজগারের সম্ভবনা অন্য কোনো সময়ে কখনো তৈরি হয় না।
দুর্গাপুজোয় ঠিক কত টাকার লেনদেন হয়? একবারে সঠিক তথ্য না পেলেও আমরা আনুমানিক একটা ধারণা পেতে পারি। ১৯৫৪ সালে ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যালি উইকলি পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল দুর্গাপুজোর অর্থনীতি নিয়ে। সেবছর দক্ষিণবঙ্গ ছিল খরার কবলে আর উত্তরবঙ্গ ছিল বন্যার কবলে। সেবছরও পুজোকে কেন্দ্র করে যেভাবে জামাকাপড়, জুতো, উপহার সামগ্রী, ছাড়, পত্রিকার পুজোসংখ্যা বিক্রির সূচক দেখলে বোঝা যায় প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে উৎসব উদযাপন করেছিল। ২০১৩ সালের অ্যাসোচ্যাম রিপোর্ট অনুযায়ী দুর্গাপুজোর অর্থনীতির বহর ২৫,০০০ কোটি টাকা। গতবছর দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে প্রায় ৮৪০০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে যা রাজ্যের জিডিপির ২.৫৮%। ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক গবেষণা অনুযায়ী, দুর্গাপুজো ঘিরে সৃজনশীল শিল্পের অর্থনৈতিক মূল্য উৎপাদন হয়েছিল ৩২,৩৭৭ কোটি টাকা, যা বিশ্বের অনেক ছোট দেশের অর্থনীতির সমান। অর্থনীতিবিদদের মতে কোনো রাজ্য ও দেশের অগ্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘মানি সার্কুলেশন’। স্বাভাবিকভাবেই উৎসবের মাসখানেক আগে থেকেই এই ‘মানি সার্কুলেশন’ করিডোর খুলতে থাকে এবং উৎসবের দিন যত এগোতে থাকে তত চলাচল বাড়তে থাকে।
যদিও এবারে মূলত তিলোত্তমার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দোষীদের শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন এবং আরও কিছু অর্থনৈতিক কারণে আশঙ্কা করা হচ্ছে গতবছরের তুলনায় উৎসব অর্থনীতিতে ২০-৩০% মন্দা দেখা দিতে পারে৷ দুর্গোৎসব ফোরামের সভাপতি কাজল সরকার জানিয়েছেন ‘এই বছর কর্পোরেট স্পনরশিপ আগেরবারের তুলনায় ৩০% কম।’ বাংলায় প্রায় ৪০ হাজারের বেশি পুজো হয় এবং এই কর্পোরেট অনুদান হ্রাস ছোট বাজেটের পুজোগুলির জন্য সমস্যা সৃষ্টি করবে। জামাকাপড় বিক্রি ৩০%-৪০% হ্রাস পেয়েছে মুর্শিদাবাদ, মেদিনীপুর এবং হুগলীর মত জেলাগুলিতে। তবে কেবলমাত্র আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদ নয়, এর নেপথ্যে আছে মূল্যবৃদ্ধি৷ বাজার অগ্নিমূল্য। নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি হিমশিম খাচ্ছে দিন চালাতে। হকার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক শক্তিমান ঘোষ জানিয়েছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবাদের তীব্রতা কমার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটলেও এখন পর্যন্ত ২০%-৩০% বিক্রি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।’ রাজ্য সরকার চেষ্টা করেছে পুজো কমিটিগুলিকে অনুদান দিয়ে, বেঙ্গল শপিং ফেস্টিভ্যাল এক্সপো আয়োজন করে উৎসবের মরশুমে আর্থিক গতি আনতে। তবে আর্থিক মন্থরতা কতটা কাটবে সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
তবুও বলা যায় উৎসবের বলয়ে সৃষ্ট এই অর্থনীতির বিশালতা চমকপ্রদ এবং জরুরি। মানুষকে মাসখানেক আপাতভাবে ভাল থাকার আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা দেয় এই উৎসব। এক অর্থে বলতে গেলে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই স্লোগান সামাজিকভাবে এখনো তেমন প্রতিষ্ঠিত নয়। কিন্তু দুর্গাপুজো কেবলমাত্র হরেকরকম মণ্ডপ সৃষ্টি করে না, এই সামাজিক উদযাপন হয় এক মজবুত আর্থ-সামাজিক পরিসরে, যেখানে অনেক মানুষের কিছুদিনের জন্য হলেও আর্থিক নিরাপত্তার দিকটি সুনিশ্চিত হয় উৎসব পালনের বাজারি তাগিদে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘উৎসবের দিনে’ লিখেছিলেন
মানুষের উৎসব কবে? মানুষ যেদিন আপনার মনুষ্যত্বের শক্তি বিশেষভাবে স্মরণ করে, বিশেষভাবে উপলদ্ধি করে, সেই দিন .. প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী – কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একাত্ম হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







