২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অপ্রতিরোধ্য সাংগঠনিক প্রাধান্য এবং জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছে। তবে একইসঙ্গে এই নির্বাচনের ফল এমন কিছু সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, যেগুলি হয়ত ততটা চোখে পড়ছে না।

প্রায় সবকটি বুথফেরত সমীক্ষা বিজেপিকে রাজ্যে বিপুল সংখ্যক আসনে জিতিয়ে দিয়েছিল। প্রশান্ত কিশোর সহ অনেকেই দাবি করেছিলেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে নিশ্চিতভাবেই তৃণমূলের চেয়ে বেশি আসন জিতবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ২০১৯ সালের তুলনাতেও অনেক কমে গিয়েছে বিজেপির আসন। কিন্তু যদি আমরা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে দেখা যাবে বিজেপির ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভাল। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের ফলাফল অনুযায়ী মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল পেয়েছিল ২১৩টি, বিজেপি ৭৭টি। একটি আসন পেয়েছিল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান কিন্তু বলছে, তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে ১৯২টি বিধানসভা আসনে। অর্থাৎ তিনবছর আগের তুলনায় ২১টি আসন কমেছে জোড়াফুল শিবিরের। বিজেপি ৯০টি বিধানসভায় এগিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ১৩টি বেশি। দৃশ্যত হতাশাজনক ফলাফল হলেও শূন্য থেকে খাতা খোলার অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে কংগ্রেস-বাম জোটও। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কংগ্রেস ১১টি এবং বামেরা একটি বিধানসভা আসনে এগিয়ে রয়েছে। তবে শূন্য হয়ে গেছে আইএসএফ। ভাঙড় বিধানসভায় এগিয়েছিল তৃণমূল। যদিও আইএসএফের ৭৫,০০০ ভোটের সঙ্গে সিপিএমের সৃজন ভট্টাচার্যের হাজার দশেক ভোট যোগ করলে ওই বিধানসভায় পিছিয়ে পড়ার কথা তৃণমূলের। তারা পেয়েছে ৮২,০০০ ভোট।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে প্রত্যাখ্যান করল। মোদী যে কেন্দ্রগুলিতে বিজেপি প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করেছিলেন, তার মধ্যে ১২টিতেই হেরে গিয়েছেন পদ্ম শিবিরের প্রার্থীরা। জিতেছেন মাত্র সাতটিতে।

লোকসভা নির্বাচনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, দলবদলু প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয়। বিজেপির অর্জুন সিং এবং তাপস রায় যেমন হেরে গিয়েছেন, ঠিক তেমনই তৃণমূলের বিপুল সাফল্যের মধ্যেও হারতে হয়েছে কৃষ্ণ কল্যাণী এবং মুকুটমণি অধিকারীকে। তৃণমূল রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরেই পাইকারি হারে দলবদল সংস্কৃতি চালু হয় পশ্চিমবঙ্গে। মুকুল রায় এই রাজনীতিকে অন্য স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই নির্বাচন প্রমাণ করল, দলবদলুদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষত অর্জুন সিংয়ের পরাজয় এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ সালে ভোটের ঠিক আগে শিবির বদল করে তিনি বাজিমাত করেছিলেন। এবার কিন্তু পারলেন না।

বিজেপির পরাজয়ের দায় নিঃসন্দেহে অনেকখানি বর্তায় শুভেন্দু অধিকারীর উপর। এবারের নির্বাচনে গেরুয়া শিবিরের প্রধান সেনাপতি ছিলেন তিনি। নিন্দুকরা বলেন, শুভেন্দুর তরতরিয়ে উত্থান বঙ্গ বিজেপির বিরাট অংশকে ক্ষুব্ধ করেছে। দিলীপ ঘোষের মত দীর্ঘদিনের আরএসএস নেতাকে তাঁর দুর্গ মেদিনীপুর থেকে সরিয়ে দেওয়া, সংঘ পরিবারের নেত্রী দেবশ্রী চৌধুরীকে জেতা আসন রায়গঞ্জ থেকে সরিয়ে কঠিনতম দক্ষিণ কলকাতায় এনে ফেলা – সবই নাকি শুভেন্দুর অঙ্গুলিহেলনে ঘটেছে। শোনা যায়, অমিত শাহ সহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন তিনি। কাঁথির শান্তিকুঞ্জের বাসিন্দার মধ্যে অমিত নাকি আরেকজন হিমন্ত বিশ্বশর্মা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখেন। কিন্তু এই নির্বাচনে অন্তত সুপার ফ্লপ শুভেন্দু। বস্তুত, বিজেপি এই রাজ্যে যা সাফল্য পেয়েছে সবই দিলীপের আমলে। ২০১৬ সালের বিধানসভায় তিনটি আসন, ২০১৯ সালের লোকসভায় দুর্দান্ত সাফল্য – সবই দিলীপের কৃতিত্ব। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে শুভেন্দুর যোগদান দলে একটি সমান্তরাল শক্তিকেন্দ্র তৈরি করে। তারপর ক্রমশ তাঁর প্রভাব বেড়েছে। কিন্তু বিজেপির ফলাফল তেমন ভাল হয়নি।

আরো পড়ুন কুণাল ঘোষের সুতো আছে অন্য হাতে

যদিও একথা স্বীকার করতেই হবে, তৃণমূল কড়া টক্কর দিলেও বিধানসভা ধরে হিসাব করলে, নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের দুর্গ অক্ষত রেখেছেন শুভেন্দু। জেলার ১৫টি বিধানসভার মধ্যে একটি বাদে সবকটিতেই এগিয়ে ছিল বিজেপি। নন্দীগ্রাম বিধানসভাতেও ব্যবধান বেড়েছে, যদিও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে ভরাডুবি হয়েছে বিজেপির।

তৃণমূলের অন্দরে অভিষেক ব্যানার্জির অবস্থান আরও পোক্ত হল নির্বাচনের এই ফলে। যে কয়েকটি আসন অভিষেকের কাছে ‘প্রেস্টিজ ফাইট’ ছিল, তার প্রায় প্রতিটিতে তৃণমূলের প্রার্থীরা জিতেছেন। কোচবিহারে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক হেরেছেন। বহরমপুরে অধীর চৌধুরীর পতন হয়েছে। ব্যারাকপুরে অর্জুনের রাজনৈতিক জীবন নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। নির্বাচন মিটতেই অভিষেক দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। আগামীদিনে তৃণমূল যে ক্যামাক স্ট্রিট থেকেই পরিচালিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

রাজ্যের মহিলারা, বিশেষত গরীব ও নিম্নবিত্ত মহিলারা সর্বান্তকরণে আরও একবার মমতা ব্যানার্জির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। কলকাতা এবং সন্নিহিত অঞ্চলেও গরিব মানুষের ভোট পেয়েছে তৃণমূল। উচ্চবিত্ত এলাকায় ভাল ভোট পেয়েছে বিজেপি। মালদহ আর মুর্শিদাবাদে তো বটেই, অন্য কিছু পকেটেও মুসলিম ভোটের একটি অংশ পেয়েছে বাম ও কংগ্রেসের জোট। কিন্তু বিজেপিকে হারাতে সংখ্যালঘুরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মমতাকেই বেছে নিয়েছেন। তমলুক সহ বেশকিছু কেন্দ্রে জোট প্রার্থীরা বিরোধী ভোটের বেশ খানিকটা টেনে নিয়ে সুবিধা করে দিয়েছেন তৃণমূলের। তবে সার্বিকভাবে সংসদীয় রাজনীতির পাটিগণিতে নির্বাচকমণ্ডলী বামপন্থীদের যে আর সেভাবে গ্রহণ করছে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে এই নির্বাচনের ফলাফল। বিশেষ করে যাদবপুর, দমদম, শ্রীরামপুরের ফলে এই প্রবণতা স্পষ্ট।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.