একটি ফ্ল্যাট থেকে কোটি কোটি টাকা, বিপুল পরিমাণ অলঙ্কার উদ্ধার হচ্ছে। রাজ্য মন্ত্রীসভার দু নম্বর ব্যক্তি বলে যিনি পরিচিত, সেই পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে ঘন্টার পর ঘন্টা টানা জেরার পর গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই ধরনের দৃশ্য পশ্চিমবঙ্গ কয়েক বছর আগেও খুব একটা দেখেনি। এখন যে দেখতে হল, তা তৃণমূল তো বটেই, গোটা রাজ্যের লজ্জা। লজ্জা সাধারণ মানুষের, লজ্জা বিরোধীদেরও। কারণ এই আশ্চর্য দৃশ্য অভিনীত হওয়ার পরেও রাজ্যে আগুন জ্বলে উঠল না, রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ হল না, সোচ্চারে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠল না।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে শুক্রবার রাত আটটা নাগাদ, তারপর দেড় দিন কেটে গিয়েছে। এই ৩৬ ঘন্টায় বাংলার রাজনীতি মূলত তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখেছে। প্রথমত, বিরোধীদের সংযত প্রতিবাদ। বামেরা কলকাতা এবং জেলায় জেলায় মিছিল করেছেন, কুশপুতুল পুড়িয়েছেন। বিজেপি টালিগঞ্জ এলাকা থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি যে এলাকায়, সেই নাকতলা পর্যন্ত মিছিল করেছে। হাতে গোনা কয়েকজন কংগ্রেস কর্মীও মিছিল করেছেন। কিন্তু বিরোধীদের কারও মিছিলেই প্রত্যাশিত আগুন ছিল না। দ্বিতীয়ত, নেট দুনিয়া ভরে গিয়েছে হরেক রকম মিম এবং কার্টুনে। টাকা নয়ছয় এবং চাকরিপ্রার্থীদের চোখের জলের বদলে সেখানে নজর কাড়ছে পার্থবাবুর শারীরিক গঠন এবং বান্ধবীভাগ্য। তৃতীয়ত, তৃণমূল কংগ্রেসের রক্ষণাত্মক প্রতিক্রিয়া। সাংবাদিক বৈঠকের বার্তা থেকে স্পষ্ট, সংকটের সময়ে দল তার মহাসচিবকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। মদন মিত্রের গ্রেপ্তারির সময়ে আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক তৎপরতার সাক্ষী ছিলাম। রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এবং বর্তমান শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের তেমন সৌভাগ্য এখন পর্যন্ত হল না।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বাম-বিজেপি-কংগ্রেসের প্রতিবাদ কেন বাঁধ ভাঙছে না, তা খানিকটা আন্দাজ করা যায়। এর দুটি দিক রয়েছে, প্রথমটি সাংগঠনিক। পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীরা এই মুহূর্তে সাংগঠনিকভাবে এতটাই হীনবল যে তাদের পক্ষে খুব বড় কিছু করা সম্ভব নয়। বামেদের কর্মীবাহিনীর একাংশ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগের দাবি তুলছেন। কিন্তু এই দাবিকে প্রকৃত অর্থেই গণদাবিতে পরিণত করতে হলে বুথ পর্যায় পর্যন্ত যে নিবিড় জনসংযোগ জরুরি, বামেদের তা নেই। তার পরেও যদি সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেরা পথে নামেন, তাহলে ঝিমিয়ে পড়া সংগঠন নড়েচড়ে উঠতে পারে। বিজেপির অবস্থাও তথৈবচ। প্রতিদিন তাদের সংগঠন ভাঙছে, দলে তীব্র গোষ্ঠীকোন্দল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাংলায় এসে রাজ্য সরকারের প্রশংসা করে যাচ্ছেন। সবমিলিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর ডিজিটাল হুংকার বাদে কিছু করার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে, শুভেন্দু নিজেও টেট-এসএসসি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত। তজ্জনিত অস্বস্তিও রয়েছে। যিনি রাজপথে থাকলে এই ভাঙা বাজারেও গেরুয়া শিবির খানিকটা চাঙ্গা হয়, সেই দিলীপ ঘোষও দলের আভ্যন্তরীণ সমীকরণে প্রায় অস্তমিত। কংগ্রেসের কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। সবমিলিয়ে বলাই যায়, বিরোধীরা আরও একটি বাস মিস করার দিকে এগিয়ে চলেছেন।

দ্বিতীয় কারণটি সামাজিক। বিরোধীরা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হলেও বঙ্গসমাজের অভ্যন্তরস্থ পরিস্থিতি যদি অন্তত দেড় দশক আগের অবস্থায় থাকত, তাহলে বিরোধীরা দৌড়তে বাধ্য হতেন। রাশি রাশি টাকা উদ্ধারের দৃশ্য ২০২২ সালের নাগরিক সমাজকে রাগিয়ে তুলছে না, ক্ষুব্ধ করছে না, সমস্ত শরীর চিড়বিড় করে উঠছে না বঙ্গ মধ্যবিত্তের। খুন বা ধর্ষণের খবর যেমন জলভাত হয়ে গিয়েছে, ঠিক তেমনই, নিজেদের রক্ত জল করা টাকা সরকারি দলের নেতারা দেদার চুরি করছেন দেখেও বাঙালি রেগে উঠছে না তেমন। আমরা কবে থেকে এতখানি অন্যায় সয়ে নিতে শিখলাম, ঠিক কবে থেকে আমরা এমন সুশীল হয়ে উঠলাম, তার সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা জরুরি। মনে পড়ছে, ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়ায় কলকাতায় আগুন জ্বলেছিল। বিরোধী বামপন্থী নেতা বলেছিলেন, ক পয়সা ভাড়া বাড়ছে সেটা বড় কথা নয়, জরুরি হল কার টাকা কার পকেটে যাচ্ছে।

আমরা, একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের বাঙালি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, এই জাতীয় বিশৃঙ্খলার ঐতিহ্য পেরিয়ে আসতে পেরেছি। আমাদের রাগ নেই, ঘৃণা নেই, অসহ্য ক্ষোভে ফেটে পড়া নেই, আছে কেবল নিয়মতান্ত্রিক কিছু প্রতিবাদ মিছিল, সোশাল মিডিয়ায় বুদ্ধিদীপ্ত অথবা কুরুচিকর মিম-প্রতিবাদ। মাসের পর মাস একদল ছেলেমেয়ে ধর্মতলায় গান্ধীমূর্তির পাদদেশে বসেছিলেন, বসে আছেন এখনো। রোদ্দুরে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা-ধুলো মেখে তাঁদের নিরলস প্রতিবাদ। চাকরির দাবিতে, দুর্নীতির প্রতিবাদে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারি তাঁদের সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে, নিশ্চিন্ত করেনি। তাঁরা এখনো জানেন না কবে হবে নিয়োগ। এই অনন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের হাত ধরতে পারছে না পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজ। তাঁদের সংকটকে নিজেদের বিপন্নতা বলে অনুভব করতে পারছে না। পারলে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ মিছিল আর মিম-খিল্লির বদলে গত দেড় দিনে বিক্ষোভের আগুনে পুড়ত বাংলা। ঘেরাও হত কালীঘাট, তপসিয়া, নবান্ন। হল না। একের পর এক দুর্নীতি আমাদের স্নায়ুকে অবশ করে দিচ্ছে। সারদ, নারদা থেকে শুরু করে শাসক দলের একজন জেলা সভাপতির দেহরক্ষীর কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকা উদ্ধার – একটি অন্ধকার তার আগেরটিকে ঢেকে দেয়।

কুণাল ঘোষ শনিবার সাংবাদিক বৈঠক করে বলেছেন, “এই টাকার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো সম্পর্ক নেই। যার বাড়ি থেকে টাকা উদ্ধার হয়েছে তাঁর সঙ্গে তৃণমূলের কোনো সম্পর্ক নেই। এই টাকার উৎস কী? বিচারে যদি পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে সেগুলি সত্যি বলে প্রমাণিত হয়, সেক্ষেত্রে তৃণমূল দলগতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে যা ব্যবস্থা নেওয়ার তা নেবে।” কয়েক বছর আগে এই কুণাল ঘোষ যখন প্রিজন ভ্যানের দরজা বাজাতেন, তখন পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলতেন, কুণালের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্ক নেই। এখন কুণাল প্রায় একই কথা বলছেন। কিন্তু কুণাল তো একা নন। গোটা তৃণমূল কংগ্রেস দলটাই সচেষ্ট নিজেদের মহাসচিবের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে। সংবাদমাধ্যমের খবর, পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। গ্রেফতারির পর দলের শীর্ষ নেতারা বৈঠক করেছেন। তারপর ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মত নেতৃত্ব কার্যত কুণালের কথার প্রতিধ্বনি করেছেন।

আরো পড়ুন একশো দিনের কাজ: কেন্দ্রের বঞ্চনা, রাজ্যের দুর্নীতির যুগলবন্দী

কিন্তু মদন মিত্রের বেলায় যা হয়েছিল, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সময়ে কেন তা হল না? মনে পড়ে যাচ্ছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়েকদিন আগের বক্তৃতা। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ দাবি করেছিলেন, ছ মাসের মধ্যে ‘নতুন’ তৃণমূল দেখা যাবে। কে না জানে, পার্থ চট্টোপাধ্যায় ‘পুরনো’ তৃণমূলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তাই কি খানিকটা রক্ষণাত্মক শীর্ষ নেতৃত্ব? আরও মনে পড়ছে, পৌরসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা নিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায় সহ আদি তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে ক্যামাক স্ট্রিট তৃণমূলের প্রায় সরাসরি সংঘাত। মনে পড়ে যাচ্ছে, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বার বার করে বলা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দলের নেত্রী,কোনও নাম্বার টু নেই৷ তৃণমূলের নবীন প্রজন্মের একাংশ যে এহেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের হেনস্থায় উল্লসিত হবেন, সে আর আশ্চর্য কী?

কিন্তু বল এবার বাংলার রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরের কোর্টে। একজন ব্যক্তিকে চাঁদমারি করে দুর্নীতির দুষ্টচক্রকে কি পশ্চিমবঙ্গ বাঁচিয়ে রাখবে? নাকি সযত্নলালিত জড়তার শিকড় উপড়ে আগামী প্রজন্মের জন্য রাজ্যটাকে খানিকটা বাসযোগ্য করার উদ্যোগ নেবে? এই প্রশ্নের উত্তরের উপরেই নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.