সায়নী ব্যানার্জি ও সোহম দাস
মাস দেড়েক আগের কথা। ফেসবুকের পর্দায় ইতিউতি অলস ঘোরাফেরার মধ্যেই চোখ আটকাল একটা খবরের শিরোনামে – ‘পুকুরের তলায় জুরাসিক যুগের জীবাশ্ম, বদলে যেতে পারে প্রাগৈতিহাসিক ভারতের ধারনা’। কোনো এক সংবাদমাধ্যমের পেজ থেকে খবরটা দেওয়া হয়েছে। কৌতূহলী হয়ে ঘটনাটা সম্পর্কে গুগলে আরেকটু বিস্তারিত খুঁজতে গিয়ে দেখি, কোটি বছরের পুরনো প্রাগৈতিহাসিক প্রাণির জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়ার খবরটা যত না চমকপ্রদ, তার চেয়েও বেশি চমক অপেক্ষা করে ছিল আমাদের জন্য। একাধিক সংবাদমাধ্যমেই খবরটা প্রকাশিত, তার মধ্যে বিশেষ করে চোখে পড়ল প্রথম তিনখানা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের খবর, তাদের শিরোনামের কারণে –
প্রথম শিরোনাম: জয়সলমীরে জুরাসিক পার্ক! রাজস্থানে উদ্ধার জীবাশ্ম ডায়নোসরের? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
দ্বিতীয় শিরোনাম: জয়সলমীরে জুরাসিক পার্ক? বিরল প্রাণীর ফসিল উদ্ধার হতেই গবেষক মহলে চাঞ্চল্য
তৃতীয় শিরোনাম: জয়সলমীরে জুরাসিক পার্ক? পুকুর খনন করতে গিয়ে এ কী উদ্ধার! দেখলে চোখ কপালে উঠবে
তা পুকুর খনন করে উদ্ধার হওয়া জীবাশ্ম দেখা হোক বা না হোক, এমনকি তা আদৌ জুরাসিক যুগের কিনা তাও জানা যাক বা না যাক, তিনখানা আলাদা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের খবরের শিরোনামের প্রথম বাক্যটিকে হুবহু এক হতে দেখেই ততক্ষণে চোখ কপালে উঠেছে। সাধারণভাবে জীবাশ্ম সম্পর্কিত বাংলা সংবাদ পরিবেশনায় ‘ডাইনোসর’ এবং ‘জুরাসিক পার্ক’, এই দুটো শব্দ আকছার ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য গালভরা বৈজ্ঞানিক নামের চেয়ে নিশ্চিতভাবেই এই দুই শব্দের অভিঘাত অনেক বেশি, সৌজন্যে জুরাসিক পার্ক নামক জনপ্রিয় হলিউড সিনেমা ফ্র্যাঞ্চাইজ। কিন্তু একথাও জেনে রাখা জরুরি, জীবাশ্মজগৎ এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিজ্ঞানের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত, ব্যাপ্ত ও বিচিত্র। ডাইনোসররা সে বিশালত্বের একটি অংশমাত্র।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জীবাশ্মবিদ্যা (palaeontology) সংক্রান্ত যেসব গবেষণার খবর মাঝেমাঝেই বাংলা সংবাদমাধ্যমে চোখে পড়ে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয় বিকৃত তথ্য আর অর্ধসত্যে পরিপূর্ণ, চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক পরিবেশনা। এমনিতেও অধিকাংশ বাংলা সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞান বিভাগ বলতে প্রায় কিছুই নেই। তার মধ্যেও যে গুটিকয়েক সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের খবর বেরোয়, তাতে বিজ্ঞানভাবনা প্রায় অনুপস্থিত। অবশ্য এক্ষেত্রে কেবল বাংলা সংবাদমাধ্যমকেই শুধু দোষ দিই কী করে? এই রাজস্থানের ঘটনা নিয়েই ইন্ডিয়া টুডে যে প্রতিবেদন লিখেছিল, সেখানে দেখা গেল দিব্যি একজন ভূতাত্ত্বিকের বয়ানে লেখা হয়েছে – এই জুরাসিক যুগের (সময়কাল আনুমানিক ২০ কোটি থেকে সাড়ে ১৪ কোটি বছর) পাথর থেকে পাওয়া জীবাশ্মটির বয়স নাকি কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে জানা যাবে। এখন বিষয় হল, পাথর বা জীবাশ্মের বয়স জানার জন্য নানারকমের যে ডেটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, তার মধ্যে কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৬০,০০০ বছর পর্যন্ত বয়স জানা যায়।
উপরের শিরোনামগুলো এই দায়বদ্ধতাহীন, বিজ্ঞানবোধহীন পরিবেশনার একটিমাত্র উদাহরণ। ঘটনাটি আসলে কী?
গত অগাস্টে ভূগর্ভস্থ জল-বিশেষজ্ঞদের (hydrogeologist) একটি দল রাজস্থানের জয়সলমীর জেলার মেঘা গ্রামে একটি জলাশয় খনন করতে গিয়ে প্রায় ৫-৬১/২ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি প্রাণির জীবাশ্ম খুঁজে পান। প্রাণিটিকে দেখতে কিছুটা কুমিরের মত, তবে কোনোভাবেই ডাইনোসর নয়। প্রাথমিক অনুমানে পুরাজীববিদ বা জীবাশ্মবিদরা এটিকে একটি ফাইটোসরের (phytosaur) জীবাশ্ম হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। ফাইটোসর পুরোপুরি কুমিরের সমগোত্রীয় না হলেও, দুই প্রাণির পূর্বসূরি একই। এদের আবির্ভাব মোটামুটি ২৪ কোটি বছর আগে, বিলুপ্তি ধরা হয় ২০ কোটি বছর আগে। এই সময়কালকে ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় বলা হয় ট্রায়াসিক যুগের শেষভাগ (Late Triassic)। এই ট্রায়াসিকের (সময়কাল আনুমানিক ২৫ কোটি থেকে ২০ কোটি বছর) পরে এসেছিল জুরাসিক যুগ। ট্রায়াসিক শেষ হয়ে জুরাসিক শুরু হয়েছিল যখন, সেইসময় পৃথিবী জুড়ে একটি গণবিলুপ্তির ঘটনা (চতুর্থ গণবিলুপ্তি) ঘটে, যেখানে প্রায় ৭৬% প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে যায়। যদিও ফাইটোসরের একটি প্রজাতি জুরাসিক যুগের প্রথম দিকেও বেঁচে ছিল বলে অনুমান।
ভারতে এই জীবাশ্ম পাওয়া (যদি সত্যিই তা ফাইটোসরের জীবাশ্ম হয়) অবশ্যই এক উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার, কিন্তু এটি গবেষণার একদম প্রাথমিক ধাপ। ধারাবাহিক গবেষণা এবং পরবর্তীকালে গবেষণাপত্র প্রকাশের পরেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে যা পাওয়া গেছে তা আদৌ ফাইটোসরের জীবাশ্ম কিনা। সে কাজ যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। এই অঞ্চলে আগেও নানারকম সামুদ্রিক মেরুদণ্ডী প্রাণির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এখানকার জুরাসিক যুগের পাথরের স্তরে (ভূতাত্ত্বিক নাম ‘লাঠি ফরমেশন’) এ ধরনের জীবাশ্ম পাওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়। কিন্তু সবটাই নির্ভর করছে গবেষণার আগামী ফলাফলের উপর। কিছু প্রমাণিত হওয়ার আগেই ‘জুরাসিক পার্ক’ শব্দদ্বয়ের জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে কেবল চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে এই ধরনের খবর প্রকাশ করা পাঠকের প্রতি অবিচার তো বটেই, অবিজ্ঞানের প্রচারও বটে।
তাও এই জুরাসিক পার্ক কাণ্ডে কপালে তোলা চোখ কিছু সময় পর নামিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু গত ১৩ অক্টোবর বাংলার এক নম্বর দৈনিকের ফেসবুক পেজে আরেকটি এমন ‘ভাইরাল’ খবরের পোস্টার দেখে চোখ আর কপালে না, ব্রহ্মতালুতে উঠে যাওয়ার জোগাড়। দেখলাম সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কোনো এক জীবাশ্ম খোঁজার ভিডিও (যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্মিত হলেও আশ্চর্য হব না), স্বাভাবিকভাবেই আজকাল যে ধরনের ভিডিওর সত্যতা যাচাই করার সময় পায় না বাংলার এগিয়ে থাকা বা পিছিয়ে থাকা সংবাদমাধ্যমগুলো। সেই ভিডিওতে পাথরের একটি অংশ দেখে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে নেটনাগরিকদের মনে হয়েছে, তা হয়ত ডাইনোসরের কন্ডোম, আর সেটি দিব্যি ক্লিকটোপের বিষয়বস্তু হয়ে গিয়েছে। একজন নেটনাগরিক অবশ্য বিলুপ্ত সামুদ্রিক প্রাণি বেলেমনাইটের জীবাশ্ম থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন, অন্তত লিঙ্কে ঢুকে খবরটা পড়লে সে তথ্য জানা যাচ্ছে। কিন্তু ক্লিকটোপের বাজারি প্রতিযোগিতায় বেলেমনাইটকে অনায়াসে পিছনে ফেলে দিয়েছে ‘ডাইনোসরের কন্ডোম’।
আরও কয়েকমাস পিছিয়ে যাই। গেম অফ থ্রোনস-খ্যাত ডায়ার নেকড়ের ফিরে আসা নিয়েও এই একই শিরোনামের প্রতিযোগিতা দেখতে পেয়েছি আমরা। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানচেতনা গড়ে তোলা দূরস্থান, পাঠক আকর্ষণ করার প্রতিযোগিতায় জিততে ক্লিকটোপ দেওয়াই এসবের একমাত্র লক্ষ্য। সেইসময় যে কটি এমন শিরোনাম চোখে পড়েছিল, সেগুলি এইরকম:
১. আশ্চর্য বিজ্ঞান, জীবিত হয়ে উঠল কয়েক হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ভয়ঙ্কর নেকড়ে!
৩. ১২,৫০০ বছর পর ফের পৃথিবীর বুকে হাঁটবে ওরা, ফিরল ‘গেম অফ থ্রোনস’-এর ডায়ার উলফ’
ঠিক এর পাশাপাশি যদি আমরা দু-একটি পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকার প্রবন্ধের শিরোনাম রাখি, তাহলেই তফাত প্রকটভাবে ধরা পড়বে। ৭ এপ্রিল লন্ডনের নিউ সায়েন্টিস্ট পত্রিকায় বিজ্ঞান সাংবাদিক মাইকেল ল্য পেজ যে প্রবন্ধটি লিখেছেন, তার শিরোনাম ‘No, the dire wolf has not been brought back from extinction’। অর্থাৎ না, ডায়ার নেকড়েকে ফিরিয়ে আনা হয়নি। ঠিক একদিন পরে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্সের মুখপত্র সায়েন্স লিখেছে ‘Is the dire wolf back from the dead? Not exactly”-শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। অর্থাৎ ডায়ার নেকড়ে কি ফিরে এসেছে? না, ঠিক তা নয়।
শিরোনামেই পরিষ্কার এখানকার সংবাদমাধ্যম পাঠকদের কেমন উলটো খবর গিলিয়েছে। তবু পাঠকদের সুবিধার জন্য বলে রাখি, ডায়ার নেকড়ে আমেরিকার ভূখণ্ড থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে আনুমানিক ১২,০০০ বছর আগে। মার্কিন জৈবপ্রযুক্তি সংস্থা কলোসাল বায়োসায়েন্স-এর বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, তাঁরা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সেই নেকড়ের জীবাশ্ম থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে এখনকার ধূসর নেকড়ের একটি প্রজাতির জিন সিকোয়েন্সের বেশকিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে যে নতুন ভ্রূণ তৈরি করেছেন, সেখান থেকে জন্ম নেওয়া তিনটি নেকড়ের শরীরে আগেকার বিলুপ্ত জিন সিকোয়েন্স ধরা পড়েছে। রোমুলাস, রেমাস আর খালিসি (তিন নেকড়ে-শাবকের নাম) যদি ফিরে আসতে পারে, তাহলে ম্যামথ, ডোডো, এমনকি ডাইনোসরদেরও এভাবে ফিরিয়ে আনা যাবে কিনা তা নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যে শোরগোল পড়েছিল।
এ বিষয়ে প্রশ্ন অনেক। যেমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অত হাজার বছরের পুরনো জীবাশ্ম থেকে অক্ষত ডিএনএ সিকোয়েন্সিং পাওয়া সম্ভব নয় এবং সেই বিকৃত সিকোয়েন্সিং অনুসরণ করে ডায়ার নেকড়ের জিনের মত অবিকল জিন সিকোয়েন্স বানানোও অসম্ভব। অল্প কয়েকটি পরিবর্তন করে লোমের রং বা বিন্যাসের সাদৃশ্য পেলেই ‘অ-বিলুপ্তিকরণ’-এর তত্ত্ব এখানে একেবারেই খাটে না। আবার বিজ্ঞানী মহলে এ প্রশ্নও উঠে এসেছিল যে, কোম্পানিটি কোনো সঠিক গবেষণা পদ্ধতি, ফলাফলের উল্লেখসহ কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশ করল না কেন? শিরোনামের প্রতিযোগিতায় জিততে যে খবর বেচা হল, তার মধ্যে অন্তত কোনো বাংলা সংবাদমাধ্যমের খবরে এই তথ্যগুলি উঠে এসেছে বলে জানা নেই।
অন্য রাজ্য বা বিদেশ ছেড়ে এবার আপন মুলুকে ফেরা যাক। কলকাতার একমাত্র ডাইনোসরের জীবাশ্ম রয়েছে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিটিউটের জিওলজিকাল স্টাডিজ ইউনিটের সংগ্রহশালায়। ইদানীং সেটি নিয়ে প্রায়শই নানা সংবাদমাধ্যমে সরস প্রতিবেদন চোখে পড়ে। সেসব প্রতিবেদনের দৌলতে তার নামকরণের ব্যাপারে রবি ঠাকুর-যোগটিও হয়ত অনেকের জানা। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে ১৯৬১ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে ক্ষেত্র সমীক্ষা চলাকালীন জুরাসিক যুগের এই তৃণভোজী সরীসৃপটির জীবাশ্মের বেশ কিছুটা অংশ পাওয়া গিয়েছিল বলে নামকরণ হয়েছিল Barapasurus tagorei।
এই মাস তিনেক আগে আরেকটি বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে বরাপাসরাস সংক্রান্ত একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্রতিবেদনেও দেখা গেল মোটামুটি সেই পুনরুক্তি। সঙ্গে এমন কিছু তথ্য, যা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন কেউ কেউ। তা জীবাশ্মের আপাত অচেনা ক্ষেত্রেও রবি ঠাকুরের মত বিক্রয়যোগ্য পণ্য পেয়ে গেলে ক্লিকটোপের জন্য আর অন্য শব্দেরই বা কী প্রয়োজন, মূল ভিডিওতে দায়বদ্ধতারই বা কী প্রয়োজন?
বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেমন সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য হওয়া উচিত, তেমনই একথাও মনে রাখা প্রয়োজন, সহজ করতে গিয়ে যেন বিষয়টিকে এমন লঘু না করে দেওয়া হয় যে, খবরটি হাস্যরস ছাড়া আর কিছুই উৎপাদন করতে পারে না। এ বিষয়েও এখুনি যাঁর নাম এল, সেই রবি ঠাকুরকেই উদ্ধৃত করা যায় ‘ছেলেদের পড়বার বই যাঁরা লেখেন, দেখি তাঁরা প্রচুর পরিমাণে ফেনার জোগান দিয়ে থাকেন। এইটে ভুলে যান জ্ঞানের যেমন আনন্দ আছে তেমনি তার মূল্যও আছে, ছেলেবেলা থেকে মূল্য ফাঁকি দেওয়া অভ্যাস হতে থাকলে যথার্থ আনন্দের অধিকারকে ফাঁকি দেওয়া হয়।’ (বিশ্বপরিচয়)
এই মূল্য ফাঁকি দেওয়ার অভ্যাস কীরকম হতে পারে, তা বাংলা সংবাদমাধ্যমের আরও কয়েকটি শিরোনাম দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যাবে। যেমন ‘জীবাশ্মের বয়স ৫২ কোটি বছর! নাড়িভুঁড়ি, মস্তিষ্ক নিয়ে আজও অক্ষত কাঁকড়া, মাকড়সার সেই পূর্বপুরুষ’, ‘ঠ্যাং চিবোতে চিবোতেই মৃত্যু! ডাইনোসরের নতুন প্রজাতির জীবাশ্ম আবিষ্কার, মুখে এক ‘শত্রু’ প্রাণীর হাড়গোড়’ ইত্যাদি। প্রথম খবরটি অন্তত খানিক আশাব্যঞ্জক এই কারণে যে সেখানে বলা হয়েছে ট্রাইলোবাইটের কথা, যা পৃথিবীর প্রাণিজগতের বিবর্তনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বিশেষজ্ঞ ছাড়া অধিকাংশ মানুষের কাছেই অজ্ঞাত প্রাণি। ফলে এ তার একরকম সৌভাগ্য যে, প্রথম সারির কাগজে সে জায়গা পেয়েছে। আবার তার সৌভাগ্য এতখানিও নয় যে, তাকে জানার মত, তাকে নিয়ে আগ্রহ তৈরি করার দায়বদ্ধতা দেখিয়ে সংবাদ পরিবেশিত হবে।
ট্রাইলোবাইট একধরনের সন্ধিপদী (arthropod)। এই গোত্রের মধ্যে মাকড়সা, আরশোলা সমেত প্রায় সব পোকাই পড়ে। এখন তাদের নাড়িভুঁড়ি বলতে সংবাদদাতা কী বোঝাতে চেয়েছেন তা বোঝা বেশ কঠিন। তার উপর এই যে ‘পূর্বপুরুষ’ বলে দেওয়া হল, এই শব্দ ব্যবহারও সমস্যার। যার জীবাশ্ম আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে এই খবর, সে পুরুষ না নারী, সেই সম্পর্কিত কোনো তথ্য বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো নেই। অবশ্য যে সময়ে সংবাদমাধ্যম ধর্ষণের দৃশ্যকে পণ্যায়িত করতে পারে, তাদের কাছে এসব সূক্ষ্ম সচেতনতা আশা করাই ভুল।
সেক্ষেত্রে সচেতন সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে তাহলে কী আশা করব?
কেবল জীবাশ্ম সংক্রান্ত খবর নয়, যে কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের খবরের ক্ষেত্রেই যে জার্নালে সেই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে, তার লিংক যেন দেওয়া হয়। প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলিতে লিংক তো দূরের কথা, গবেষণাপত্রের উল্লেখ পর্যন্ত থাকে না। তবে সচেতন সংবাদমাধ্যমের কাছে ওটুকুই যে যথেষ্ট নয় তা বলাই বাহুল্য। ধারাবাহিক বিজ্ঞান প্রতিবেদনের জন্য উপযুক্ত সম্পাদকীয় বিভাগ থাকা দরকার। প্রতিবেদনে সঠিক বিজ্ঞান পরিভাষার যথাযথ ব্যবহার যেমন দরকার, তেমনই মানুষের কাছে সহজ ভাষায় খবরটি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও মাথায় রাখা উচিত। এমনকি, মতামতের জন্য সঠিক বিশেষজ্ঞ খুঁজে বার করাও একজন প্রতিবেদকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অবশ্য আজকের দিনে তা দুরূহ বটে। জনপ্রিয়তার মোহে একজন বিজ্ঞান গবেষক তাঁর গবেষণা ক্ষেত্রের বাইরের বিষয় নিয়ে অগভীর বা ত্রুটিপূর্ণ মন্তব্য করছেন – এ ঘটনাও খুব বিরল নয়।
তবে সোশাল মিডিয়ার যুগে, কে কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তা বোঝা বেশ কঠিন হলেও সত্য খুঁজে বের করা বা তার সঠিক প্রচারের দায়ভার সংবাদমাধ্যমেরই, ‘সত্যতা যাচাই করেনি’-র মত দায় এড়ানোর কথা আদৌ সুস্থ সাংবাদিকতার লক্ষণ নয়, বিজ্ঞান সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তো নয়ই।
এককথায়, বর্তমান ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্ববাদী সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিবেশে বিজ্ঞানসাধনার যে সংকট, সে অবস্থারই শোচনীয় প্রতিফলন এখনকার সংবাদমাধ্যমের অবিজ্ঞান সাংবাদিকতা। ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করা উচ্চমেধার বিজ্ঞানীরাও গত কয়েক বছরে অনায়াসে রাষ্ট্র প্রচারিত অপবিজ্ঞান কর্মযজ্ঞে সামিল হয়েছেন। এর ভবিষ্যৎ ফলাফলের কথা ভেবে শিউরে উঠতে হয়। অথচ আশ্চর্য! ভারত পৃথিবীর প্রথম দেশ, যেখানে বিজ্ঞানমনস্কতাকে (scientific temper) সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় সংবিধানে বলা আছে ‘It shall be the duty of every citizen, to develop the scientific temper, humanism and the spirit of inquiry and reform.’
আরো পড়ুন গৌ-সম্মেলন: আইআইটি ও অপবিজ্ঞানের গলাগলি
বর্তমান পরিস্থিতি এমন শোচনীয় হলেও স্বাধীনোত্তর ভারতীয় রাষ্ট্রের কাঠামো নির্মাণে কিন্তু বরেণ্য বিজ্ঞানীদের বড় ভূমিকা দেখা গিয়েছিল। তাঁদের বেশিরভাগই আবার বাঙালি – প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, আরও অনেকে। আবার এঁদেরই পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে বাংলায় গণবিজ্ঞান আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। তবে ভূবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসাবে খানিক দুঃখের সঙ্গেই লক্ষ করেছি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বা জীবনবিজ্ঞানের মত গুরুত্ব ভূবিজ্ঞান পায়নি। এখনও যে দু-একটি পত্রপত্রিকা বা ওয়েবসাইট বিজ্ঞানচর্চার কাজ করে চলেছে, তাদের কাজেও সেই ধারাই অব্যাহত।
এ আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলা ভাষায় ছড়িয়ে দেওয়ার কর্মকাণ্ডে ভূবিজ্ঞান বেশ পিছনের সারিতেই রয়েছে। তার কারণও আছে। বিদ্যায়তনিক পরিসরের উন্নাসিক গবেষকরা জীবাশ্ম আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আঞ্চলিক শ্রমজীবী মানুষজনের অবদানকেই যেখানে সহজে স্বীকার করেন না, সেখানে সাধারণের কাছে বিজ্ঞানালোক পৌঁছে দেওয়ার মত শ্রমসাধ্য কাজের দায়িত্ব তাঁরা কেনই বা নেবেন? কিছু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ছাড়া পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বা জীবনবিজ্ঞানের মত ভূবিজ্ঞানকে সহজ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তেমন কোনো ধারা যে তৈরিই হয়নি, তার পিছনে এটি বড় কারণ।
সায়নী ব্যানার্জি বর্তমানে জীবাশ্মবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করছেন।
সোহম দাস যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র, পেশায় গবেষক ও লেখক।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







