সাজঘর। কলামন্দির। কলকাতা ১৯৯৭। অনুষ্ঠান শুরু হতে তখনো ঘন্টা দুয়েক দেরি। শিল্পীরা এসে গেছেন। হারমোনিয়ামের সঙ্গে তানপুরা, এস্রাজ বাঁধছেন। তবলিয়া ডান হাতের ঠেকায় মিলিয়ে নিচ্ছেন স্কেল।

একজন মহিলা শিল্পী কথায় কথায় বললেন, আজ কিছু সহজ গান গাইব।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

–সহজ গান মানে?

এই মানে যেগুলো সবাই বেশি শোনে, শুনতে পছন্দ করে। যেমন, ধরুন…‘আমার পরান যাহা চায়’…

–এটাকে সহজ বলছেন কেন?

কারণ, এর সুরটা খুব সহজ আর…

–আর?

এর কথাগুলোও খুব চেনা, সোজা…শ্রোতারা কানেক্ট করতে পারেন।

—কানেক্ট মানে?

মানে আমি যখন গাইব ওঁদেরও আমার সঙ্গে গাইতে বলব। আমরা একসঙ্গে গাইব। প্রোগ্রাম জমে যাবে। এখন তো সকলেই এই রীতিটা বেশ নিয়ে নিয়েছে…

–হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথের গানে কোরাসের অনেক সম্ভাবনা আছে এটা ঠিক। কিন্তু সব গান কি কোরাসে গাওয়া যায়, মানে উচিত কি?

কেন বলছেন এই কথা?

–বলছি, কারণ কোরাস গানের শরীরে যে আলাদা দার্ঢ্য এনে দেয় সব গান ওই বাড়তি ওজনটা ক্যারি করতে পারে না…

যেমন?

–ধরুন, ‘নির্জন রাতে নিঃশব্দ চরণপাতে কেন এলে’ গানটা, বা আরেকটু চেনা ‘বেদনা কী ভাষায় রে’ বা ‘আজি যে রজনী যায়’…

এগুলোকে আমরা শিল্পীদের পরিভাষায় ঢালা গান বলি

–হ্যাঁ, এরকম একটা গোত্র আছে বটে। আর রবীন্দ্রনাথের একটা গানও আছে ‘আমার ঢালা গানের ধারা/সেই তো তুমি পিয়েছিলে’। হয়ত সেখান থেকেই আপনার ওই গোত্রের নাম দেওয়া হয়েছে। তাই কি?

এটা আমার ঠিক জানা নেই…ইন ফ্যাক্ট ওই গানটার কথা আমি শুনিনি।

–তা তো হতেই পারে। ওঁর এত গানের মধ্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়া হয় মাত্র আড়াইশো-তিনশো গান। এই বিষয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার বিরক্ত হয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন, জানেন তো?

তাই নাকি ? না, আমার জানা ছিল না।

–তবে এটা ঠিকই যে আপনার আজকের অন্যতম নির্বাচন ওই তিনশোটি গানের মধ্যেই পড়ে। তা নিয়ে আমার অবশ্য কিছু বলার নেই। শিল্পী তাঁর অনুষ্ঠানে নিজের পছন্দে বা বিবেচনায় গান নির্বাচন করবেন এটাই সঙ্গত।

তবে, আমরা নিজেদের শিল্পী বলি ঠিকই, কিন্তু সুচিত্রা মিত্র নিজের ছাত্রছাত্রীদের বলতেন শুনেছি, শিল্পী তো আসলে রবীন্দ্রনাথ। আমরা পরিবেশক…

–কথাটা তো ভুল নয়। গায়করা তো আদপে কিছু সৃজন করেন না…তবে ওই আর কি, একটা কথা চলে আসছে। আপনি একটু খুঁজে পেতে দেখবেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গীতচিন্তা বইতে এই গায়কদের একটু সন্দেহের চোখেই দেখেছেন…বলেছেন গায়ক ব্যক্তিটা আসলে মাঝারি মানের লোক।

হুঁ, জানি। আবার এও তো বলেছেন ‘একাকী গায়কের নহে তো গান/গাহিতে হবে দুইজনে’। সেদিক দিয়ে এই আমরা যখন প্রেক্ষাগৃহে শ্রোতাদের সঙ্গে নিয়ে দু-চারটে গান গাই তাতে তো কিছু ভুল নেই।

–না, তা নেই। তবে মঞ্চের গানে শ্রোতাদের ঢুকিয়ে নেওয়া সম্ভবত খুব কাছাকাছি সময়ের ব্যাপার। পুরনো শিল্পী যাঁরা রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করতেন তাঁরা এইভাবে গাইতেন না। মনে হয়, পীযূষকান্তি সরকার মশাই এই ব্যাপারটা চালু করেছিলেন বাংলার মঞ্চে। আমি হেমন্তবাবুর গান সামনে বসে শুনেছি, ওঁকে এমন করতে দেখিনি। তবে পরিবেশনায় মুখবদল হতেই পারে…আমি স্থিতাবস্থার পক্ষে নই।

আরো পড়ুন শতবর্ষে কণিকা, সুচিত্রা: যে আনন্দধারা এখনো বহিছে ভুবনে

তাহলে ওই সহজ গান নিয়ে আপনার বক্তব্যটা…

–না, ওটা আসলে অন্য বিষয়। আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের অনেক গানই আমরা সহজ গান বলে খুব ভুলভাবে ভেবে নিই। রবীন্দ্রনাথ তো নিজেই বলেছেন, তিনি যখন গান লেখেন তখন তিনি এক অন্য মানুষ। শান্তিদেব ঘোষ তাঁর বইয়ে লিখছেন, গান রচনার সময়ে গুরুদেবকে দেখে মনে হয় এক নগ্ন ফকির, যাঁর কোনো ঐহিক যোগ আর নেই। এবং এটা নিয়ে আমাদের অনেক ভুল ধারণাও আছে।

যেমন?

–যেমন ধরুন আমরা মনে করি ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে’ বা ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ গানগুলো ছোটদের গাওয়ার গান, যার সঙ্গে নাচাও যায়। সত্যিই কি তাই? এগুলো ছোটদের গান আর ‘আজি মম জীবনে নামিছে’ বা ‘চরণধ্বনি শুনি তব নাথ’ বড়দের গান? এমন ভাগ তো আমরাই করেছি…

আমি যখন প্রথম গান শিখতে শুরু করলাম তখন দিদিমণি আমায় প্রথম কোন গান শেখালেন জানেন? ‘আয় তবে সহচরী’। এটা ছায়ানট রাগের ওপর। এই রাগের চেহারাটা মিষ্টি হলেও চলন মোটেও তেমন সোজা নয়। জানেন তো এখানে শুদ্ধ স্বরগুলির ব্যবহার বেশি, বিশেষ করে শুদ্ধ মধ্যম…এটা কি সোজা গান? রবিগানের বর্ণপরিচয়ের প্রথম লাইন?

–শিক্ষকের গানের ব্যাকরণের বিচারে তা হতেই পারে। বাংলা থেকে ইংরিজিতে অনুবাদ শেখানোর সময়েও তো খুব সরল বাক্য প্রথমে অনুবাদ করতে দেওয়া হয়, পরে আসে জটিল বা যৌগিক বাক্য। এ হয়তো খানিকটা তেমনই। কিন্তু ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ গানের অন্তরায় বলা হয়

তেপান্তরের পাথার পেরোই রূপ-কথার,
পথ ভুলে যাই দূর পারে সেই চুপ-কথার –
পারুলবনের চম্পারে মোর হয় জানা  মনে মনে।।

এখানে ‘চুপ-কথা’ শব্দটা খেয়াল করুন, আর ভাবুন পারুলবনের চম্পাকে মনে মনে জেনে নেওয়ার ইচ্ছে। একেবারে শিশুরা এই ব্যঞ্জনা কি বোঝে? অথবা ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে’ গানে লেখা হয় ‘নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ’। এই মুক্তি আর বন্ধনের দোলাচল কি বুঝতে পারে শিশুরা? আর কোন নাচের মুদ্রাতেই বা তারা প্রকাশ করবে এই বক্তব্য? এরপরেও আমরা বলব এগুলো শিশুদের নাচের গান! আর হরদম বিভিন্ন মঞ্চে তো শিশুদের নাচানোও হচ্ছে এর সঙ্গে!

অবশ্য ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’-র সঙ্গে নাচার বিষয়টা প্রথম দেখিয়েছেন তপন সিনহা মশাই, তাঁর ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিতে। মনে পড়ছে তো? ছোট মিনি ওই গানের সঙ্গে নেচেছিল।

–হ্যাঁ, ঠিকই। সেটা হয়ত ফিল্মের স্বার্থে। কিন্তু তারপরেই বোধহয় আমরা শিখে গেলাম ওটা কেবল নাচেরই গান…ওই গানটা খুব একটা মঞ্চে-টঞ্চে গাওয়াও হয় না। শ্রোতারাও মনে হয় ওই গানের সঙ্গে নাচ আশা করে আজকাল।

কিন্তু ‘আমার পরান যাহা চায়’ নিয়ে আপত্তিটা ঠিক কোন জায়গায়?

–না না গান নিয়ে আপত্তি থাকবে কেন? আমি ওই সহজ গান কথাটা নিয়ে ভাবছিলাম। গানটা আসলে কোথায় কীভাবে কতটুকু সহজ?

কেন? এটা একটা চমৎকার প্রেমের গান। শ্রোতারা সহজেই যার লিরিকের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন।

–প্রেমের গান?

কেন নয়?

–হ্যাঁ, গানের গোড়ার কথা দুটো, অর্থাৎ আমরা যাকে স্থায়ী বলি, তা একটা প্রেমের উচ্চারণ। কোনো প্রণয়ী যেন তার প্রেমিকের উদ্দেশে নিবেদন করছেন প্রেমের মিলনমালা। কিন্তু এটা একটা আপাত বিভ্রান্তি। খেয়াল করতে হবে এই গানের পরের অংশগুলো। ধরুন অন্তরাটা

তুমি  সুখ যদি নাহি পাও, যাও  সুখের সন্ধানে যাও –
আমি  তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে,  আর কিছু নাহি চাই গো।।

–লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রণয়ী কিন্তু তাঁর উদ্দিষ্টকে দূরে সরে যাওয়ার আভাস ও অভিমানে ভিজিয়ে দিলেন। তার প্রাণ যাকে চায় তিনি যদি অন্য কোথাও সুখের সন্ধানে চলে যান তাতে তাঁর কোনো প্রতিরোধ নেই, কারণ তিনি মনে মনে তাকে পেয়ে গেছেন। এতেই তাঁর প্রশান্তি। ওই হৃদয় মাঝে পেয়ে যাওয়াটুকুই তাঁর অর্জন ও অনুমোদন। এ গান কি প্রেমিকের? আপনি একবার সঞ্চারীটা গান দেখি?

আমি  তোমার বিরহে রহিব বিলীন,  তোমাতে করিব বাস
দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী,  দীর্ঘ বরষ-মাস।

–এ কেমন প্রেমিক যিনি প্রেমিকার বিরহে বিলীন হতে চান? আর বিরহের উদযাপন করতে চান সরে যাওয়া প্রেয়সীর হৃদয়নন্দনবনের কুসুম শাখা হয়ে? এটা কি সাধারণ এক মন দেওয়া-নেওয়ার খেলার নিয়ম, নাকি এ এক বিপুল ব্যতিক্রম! পরস্পরের প্রতি কোনো অধিকারবোধ নেই, নেই আশ্লেষ। সুদীর্ঘ সময়, হয়ত বা আজীবন তিনি বয়ে বেড়াবেন অতীত সুখের ঘ্রাণ, কোনো বিধুর প্রেমের পরম লগন। এই সম্পর্কের কোনো আবেশময় বর্তমান কই? শুধুমাত্র গানের গোড়ায় কাউকে নিজের প্রাণের দোসর হিসেবে উল্লেখ ছাড়া? প্রেম না বিরহ? বহমান ভালবাসা না আবহমান ভালবাসার শুকনো পাতা? ভিন্ন সুখের পিয়াসী কাছের মানুষকে অবাধ মুক্তির খোলা পথে রেখে নিজের ভিতর এক নিবিড় প্রেমের লালন, বিরহই হয়ে ওঠে যার প্রচ্ছদ! কার্যত এই অভিপ্রায় যেন প্রকাশ্য হয় গানের আভোগে।

যদি  আর-কারে ভালোবাস,  যদি আর ফিরে নাহি আস,
তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও,  আমি যত দুখ পাই গো।।

–আমার প্রণয়ী যদি অন্য কাউকে ভালবাসে এবং আমায় ত্যাগ করে যায় তবু আমি তার স্বস্তির কথা ভেবে দুঃখ পাব না। এই কথা একজন প্রেমিক বা প্রেমিকার পক্ষে ভাবা কি খুব সাধারণ ব্যাপার? খুব সহজ উচ্চারণ ? অথচ এই গান তো শেষ হয় তারই খুব স্পষ্ট বাচনে। অন্তরায় যার আভাস ছিল ‘সুখের সন্ধানে’ অন্যত্র যাওয়ার, তা-ই গানের পরিধিতে এসে উচ্চকিত হয়ে ওঠে। আমি যতই দুঃখ পাই আমার আপনজন যেন প্রার্থিত সুখ লাভ করে। আমাদের চারদিকে যে সহজ প্রেমের সঞ্চার তাতে এমন কোনো পঙক্তি মানায় না। তাই আমরা বিস্মিত হই। এই বিস্ময় কি শিল্পী হিসাবে আপনাকেও জড়িয়ে ধরে না?

এইভাবে ভাবিনি তো!

–এরপরেও বলবেন ও ভাববেন, এই গান সহজ? আশা করবেন আপনার গলায় গলা দিয়ে গোটা প্রেক্ষাগৃহ গেয়ে উঠবে গান? হ্যাঁ, গাইতেই পারে। তবে শ্রোতাদেরও খেয়াল রাখতে হবে, প্রেম নয়, অতল বিরহের এক ভিন্নরুচির মানুষের কথায় তাঁরা কথা বললেন। তিনি নারী পুরুষ প্রেমিক প্রেমিকা যে-ই হোন, এই গান তাঁকে সহজ প্রেম থেকে সরিয়ে এনেছে এক অন্য বিভায়। হয়ত তা প্রেম অথবা বিরহ। কিন্তু তাঁর প্রতিটি শব্দের ভিতর এক অন্য মায়া, অন্য মাত্রা। আর সেই শব্দের রেখা বয়ে চলেছে মাটির বেশ খানিকটা উপর দিয়ে। যুধিষ্ঠিরের রথের চাকার মতই।

থার্ড বেল বেজে ওঠে। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে এইবার শুরু হবে অনুষ্ঠান।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.