বাংলার সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক প্রতর্কের পরিসরে দলিত শব্দটির উপস্থিতি সীমিত, প্রভাব তো বটেই।  ‘দলিত’ ধারণাটির সঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালীর অপরিচয়ের স্পষ্ট প্রতিফলন চোখে পড়ছে সাম্প্রতিক অতীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘দলিত সাহিত্য অ্যাকাডেমি’ গঠন করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর।  সামাজিক মাধ্যমে নানান আলোচনায় প্রশ্ন তোলা হচ্ছে দলিতের জন্য আলাদা সাহিত্য অ্যাকাডেমি থাকলে ব্রাহ্মণ সাহিত্য অ্যাকাডেমি হবে না কেন? অপরপক্ষ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন দলিত বা বহুজনের ধারণার ব্যাপ্তি – জাতপাতের বাইরেও নিপীড়িত মানুষ – নারী অথবা সংখ্যালঘুও অনায়াসে এই ছাতার তলায় এক হতে পারেন।  কেউ বলছেন সাহিত্যের আবার দলিত ব্রাহ্মণ কী? অন্যপক্ষ প্রশ্ন তুলছেন দলিতের অভিজ্ঞতা তার যাপনের অংশীদার না হয়ে লেখা কি আদৌ সম্ভব? কিন্তু দলিত সাহিত্যও যদি বাংলা সাহিত্য হয় তাহলে বাংলা আকাদেমির পাশাপাশি এই দলিত সাহিত্য অ্যাকাডেমির দরকার হল কেন?

আপাত পাঠে এই নানান পক্ষের কাউকেই যুক্তিহীনতার দায়ে দায়ী করা যায় না।  যদি কেউ দলিত-বিদ্বেষ থেকেও কিছু প্রশ্ন তুলে থাকেন তাহলেও সৎ চিন্তকের জবাব দেওয়ার দায়িত্ব কিছু খারিজ হয়ে যায় না, বরং বাড়ে।  প্রশ্নগুলির দিকে নজর বুলিয়ে নিতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি মূল প্রশ্ন দলিত কে? এবং এরই সুতো ধরে উঠে আসছে দ্বিতীয় প্রশ্নটি, দলিত অভিজ্ঞতা বলতে কী বুঝি? প্রশ্নগুলো একই সূত্রে গাঁথা হলেও জবাব আলাদা করে দেওয়া জরুরি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Dalit politics and literature দলিত রাজনীতি, দলিত সাহিত্য
চিত্র সৌজন্য উইকিমিডিয়া

দলিত প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক পরিভাষা – প্রোলেতারিয়েত বা সাবঅল্টার্নের মতোই।   ১৯৩১ সালে আম্বেডকর এবং গান্ধীর পুনা প্যাক্টের মাধ্যমে আধুনিক ভারতীয় রাজনীতিতে দলিত শব্দটির সরকারি প্রবেশ ঘটলেও চতুর্বর্ণের হিন্দু সমাজের বাইরের যে বিপুল শ্রমশক্তি বংশপরম্পরায় সবর্ণের বর্জ্য অথচ সামাজিক স্বাস্থ্যের পক্ষে অপরিহার্য ক্ষেত্রগুলিতে শ্রম বিনিয়োগ করতে বাধ্য হন, সহজ বাংলায় যাঁদের ‘নীচু জাত’ বলা হয় তাঁদের এই শব্দটির ছাতার তলায় নিয়ে আসেন জ্যোতিবা গোভিন্দরাও ফুলে। গুলামগিরিতে ফুলে বামন অবতার ও রাজা বলির কাহিনীটিকে অনার্যের প্রতি আর্যের প্রবঞ্চনার নিরিখেই শুধু দেখছেন না, বলির নতমস্তকে নেমে আসা বামন অবতারের পা বর্ণহিন্দুর জাতিবাদী দলনের রূপক হয়ে উঠছে। ভীমরাও আম্বেডকর শব্দটিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে প্রাসঙ্গিক করে তোলেন।  আবার কাঁশীরাম যখন বহুজন পরিভাষাটি ব্যবহার করছেন তখন আদতে সংখ্যালঘুর সংখ্যাগুরুর ওপর আধিপত্যবাদের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দলিতকে তার সম্মিলিত শক্তির বিষয়ে সচেতন করে তোলাও হচ্ছে।  স্পষ্টতই দলিত ধারণাটির চারদিকে সংজ্ঞার অভেদ্য দেওয়াল গড়ে তোলা শক্ত।  লিঙ্গের মতোই দলিত ধারণাটিরও পরিধি খানিক আবছা।  তবে অন্তত এটুকু নিশ্চিত হয়ে বলাই যায় যে মার্ক্সিয় চেতনায় যেমন শ্রেণীবৈষম্যের ভাবনা গড়ে উঠেছিল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে, দলিতের রাজনৈতিক প্রতর্কে শ্রেণীচেতনার ভিত সামাজিক ন্যায়।  উল্লেখ্য, যে ঠাসবুনোট সংজ্ঞা না থাকার সুবাদে ‘দলিত’ কোনো বর্গীয় রাজনীতির আখড়া হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম।  কিন্তু এই একই কারণে দলিত অভিজ্ঞতা বিষয়টিকেও সংজ্ঞায়িত করা শক্ত।

দলিত অভিজ্ঞতার নান্দনিক বয়ানে যে সামাজিক ন্যায়ের প্রসঙ্গটিই চুড়ান্ত গুরুত্ব পাবে এ কথা না বললেও চলে।  কিন্তু সামাজিক ন্যায় তো এক নির্বিশেষ নৈতিক ধারণা। সাহিত্য তো বিশেষ অভিজ্ঞতার বয়ান।  সামাজিক ন্যায়ের (বা অন্যায়ের) যে দেহভাষ্য – বিশেষ ব্যক্তির উত্তম পুরুষ চেতনায় বোনা যে অভিজ্ঞতা দলিতের নান্দনিকতার ভরকেন্দ্র তা-ই দলিত সাহিত্যের মূল উপাদান।  কিন্তু দলিত যদি কোনো নির্দিষ্ট বর্গ না হয় তবে এই অভিজ্ঞতাও তো কোনো একপ্রস্তর স্তম্ভ নয়।  তাহলে দলিত অভিজ্ঞতা কি যে কোনো নিপীড়িত মানুষের অভিজ্ঞতা? তাহলে আর তাকে বিশেষ নাম দিয়ে দলিত অভিজ্ঞতা বলার যুক্তি কী? এখানেই বর্গীয় পরিচয়ভিত্তিক নিপীড়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।  দলিত অভিজ্ঞতা ব্যক্তিবিশেষের অভিজ্ঞতা হলেও ব্যক্তি সেই অভিজ্ঞতার ভার বহন করেন তাঁর বর্গপরিচয়ের কারণে।  দলিতের অভিজ্ঞতা বিশেষ হয়েও নির্বিশেষ।  এই বিশেষ ও নির্বিশেষ বয়ানের মধ্যে নিরন্তর যে দোলাচল তা দলিত সাহিত্যের অন্যতম নান্দনিক বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু প্রশ্ন হল দলিতের এই দোলাচল দলিতকেই লিখতে হবে কেন? কেন বাংলা সাহিত্যের মধ্যে দলিত সাহিত্য বলে আলাদা কিছু একটা থাকতে হবে? লিখনকর্মটি তো সাধারণত কল্পনা নির্ভর।  যে কল্পচরিত্রেরা আমাদের কাহিনী জুড়ে থাকেন তাঁরা তো কেউই আমি নই।  এক পুরুষ অন্য পুরুষকে নিয়ে বা এক নারী অন্য নারীকে নিয়ে যখন লেখেন তখন তাঁদের অভিজ্ঞতাবিশ্ব হুবহু এক হয় কি?

প্রসঙ্গ ভুলে না গিয়ে প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া জরুরি।  টমাস নাগেলের দ্য ফিলসফিক্যাল রিভিউতে প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘What is it Like to be a Bat?’ কল্পনার সীমান্ত বিষয়ে এক জরুরি প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল ১৯৭৪ সাল নাগাদ।  বাদুড়ের শরীর ও যাপন মানুষের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।  তার শ্রুতি, প্রতিধ্বনি-সংবেদনশীলতা, ওড়ার ক্ষমতা মানুষের শারীর অভিজ্ঞতার থেকে আলাদা হলেও আমরা শুনতে পাই, নির্দিষ্ট উচ্চতায় আরোহণ করতে পারি এবং এমন কিছু অভিজ্ঞতার আধারে বাদুড়ের মানসবিশ্বের একরকমের কল্পরূপ নির্মাণ করতে পারি।  কিন্তু এই কল্পনা কি বাদুড়ের নিজস্ব প্রেক্ষিতকে, তার নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতাবিশ্বকে ছুঁতে পারে? বাদুড় যেভাবে পৃথিবীকে তার দেহে গ্রহণ করে মানুষের কল্পনা কি তাকে ধরতে পারে? আদতে বাদুড় একটি উদাহরণমাত্র। মোদ্দা কথা হল আমরা কি অপরিচয়ের দূরত্ব সবসময় কল্পনায় সওয়ার হয়ে পার হতে পারি? কল্পনার ক্ষমতা কি আদৌ সীমাহীন? কোনো ম্যানহোলের ভেতর বর্জ্যের দুর্গন্ধে মিথেনের অসহ আক্রমণে ক্রমশঃ ঝিমিয়ে পড়ার অনুভূতিকে আমরা কল্পনায় ধরতে পারি কি? এর জবাব নিয়ে তর্ক হতে পারে তবে সহজ মীমাংসার আশা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।  দলিতের নিজস্ব অভিজ্ঞতাবিশ্বকে আমরা লিখতে পারি কি? অপরিচয়ের সেই দূরত্ব ঘোচানো কি সম্ভব হয়েছে আজও? কেউ বলবেন এই বাক্যে ‘দলিত’ কে? অস্পৃশ্য? নারী? সংখ্যালঘু? দলিত কে না জানলে তার অভিজ্ঞতাকে কল্পনায় ধরতে পারি কি না কী করে বলব? বলতে পারব না।  পারব না কারণ দলিত নির্মীয়মাণ একটি ধারণা।  তার অভিজ্ঞতা, তার যাপন বা তার নান্দনিক চেতনা নির্মীয়মাণ। এবং নির্মীয়মাণ তার ভাষা।  তার অভিজ্ঞতার বয়ান লেখার জন্য সবর্ণের সারস্বতচর্চার বাংলা, ইংরেজি, হিন্দী, তেলুগুরা যথেষ্ট নয়।

যাঁরা ভাবছেন নিবন্ধের শেষে শুধু কিছু প্রশ্ন পড়ে রইল, তাঁদের দলিতের নিজস্ব অভিব্যক্তির প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার গুরুত্ব নিশ্চয়ই আলাদা করে বুঝিয়ে দিতে হবে না।  আর যারা কলমচিকে গাল পাড়তে প্রস্তুত তাঁদের সনির্বন্ধ অনুরোধ জবাব দেওয়ার দায়িত্ব ও ক্ষমতা দলিত সমাজের প্রতিনিধিকেই দেওয়া হোক।  অন্যের হয়ে প্রক্সি দিতে গিয়ে কখনো কখনো আমরা নিজেদের জবাবই অন্যকে দিয়ে আবৃত্তি করাই।  সে বড়ো ভালো কথা নয়।  ধুলোবালির যাপনচিত্র হাওয়ার সঙ্গে বোঝাপড়ায় তারা নিজেরাই এঁকে নিন।  আমরা তা ঘেঁটে না দিলেই হল।

Leave a Reply