গৃহপালিত ছাগলের লড়াই দেখেছেন? দেখেননি? আচ্ছা, শুনে নিন। দুটো ছাগল বিপরীত দিক থেকে বেশ কিছুটা দৌড়ে আসে, তারপর সামনের দুটো পা তুলে পরস্পরের মাথায় আস্তে করে গুঁতো দেয়। তারপর আবার পিছিয়ে গিয়ে একই কাণ্ড করে। যতক্ষণ তাদের খেলার ইচ্ছে থাকে, ততক্ষণ এটাই চলতে থাকে। ব্যাস! আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন – স্কুল নিয়ে লেখার গুরুগম্ভীর শিরোনাম দেখার পর এসব কী বালখিল্য রসিকতা? আসলে দশ বছর ধরে আমাদের রাজ্য সরকার আর কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে যা চলছে সেটাকে এই ছাগলের লড়াই ছাড়া আর কিছু দিয়ে বোঝানো যায় না।
খেয়াল করে দেখবেন, গত কয়েক বছরে কেন্দ্র আর রাজ্য প্রত্যেকটা বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে এবং এক পক্ষ আরেক পক্ষের রিপোর্টকে মনগড়া বলে দাবি করেছে। সেটা একশো দিনের কাজ থেকে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো হয়ে মিড ডে মিলের হিসাবের গরমিল, আবাস যোজনার ঘর পাওয়ার হিসাব থেকে শৌচালয় – সব ব্যাপারেই। এবার কিন্তু এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। দেশের সমস্ত রাজ্যের স্কুলশিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা নিয়ে মোটামুটি নিশ্চুপ। শিক্ষামন্ত্রী তাঁর চর্চিত ব্যারিটোনে বলেছেন, আরও খতিয়ে দেখতে হবে। কেন রাজ্য এই রিপোর্টের প্রতিবাদ করছে না? কারণ রাজ্যের নিজস্ব ধারাবাহিক বাৎসরিক সমীক্ষায় (U-DICE REPORT) একই তথ্য উঠে এসেছে। আসলে কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার রাজ্যগুলো থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টের সংকলন মাত্র।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
স্কুলশিক্ষার সেই রিপোর্টে কী রয়েছে? সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে তা আপনারা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন। কিন্তু অনুভব করেছেন কি? তলিয়ে ভেবেছেন কি? প্রায় কেউই ভাবেনি। কারণ বঙ্গীয় সংবাদমাধ্যমে এসব নিয়ে আলোচনা হয় না। কোন ‘ঘন্টাখানেক’ হয় না। তাছাড়া এ রাজ্যের সরকারি স্কুলশিক্ষা নিয়ে আজকাল কেবল তাদেরই ভাবার প্রয়োজন হয় যারা এই ক্ষেত্রে কর্মরত অথবা যাদের সন্তান এখনো সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। আপনাকে একটু ভাবানোর জন্যে আর গোটা ব্যবস্থাটার কঙ্কালসার চেহারাটা আরেকবার বোঝানোর জন্যেই অন্য ধারার এই ওয়েবসাইটে আমার এই সামান্য প্রচেষ্টা।
রিপোর্ট বলছে, পড়ুয়াশূন্য স্কুলের নিরিখে দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্থানে আছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ৩,২৫৪ স্কুলে একজনও শিক্ষার্থী নেই। অর্থাৎ গতবছর এতগুলো স্কুল পড়ুয়াশূন্য ছিল। কেন? উত্তর অজানা। আরও বলছে, রাজ্যের ৬,৩৬৬ স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক আছেন। কেন? এর উত্তরও অজানা। যেসব স্কুলে পড়ুয়া নেই, সেখানে নিযুক্ত মোট শিক্ষকসংখ্যা ১৪,৬২৭। আর যেসব স্কুলে একজন করে শিক্ষক, সেখানে মোট পড়ুয়া ২,৪৮,৬৯৬।
এই তথ্য নিয়ে একটু ভাবলেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষ তথা অভিভাবকদের মধ্যে বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়েছে। না হলে এত বিপুলসংখ্যক স্কুল পড়ুয়াশূন্য থাকতে পারে না। উল্টোদিকে সরকার প্রচারের ঢক্কানিনাদে ক্লান্তিহীন। সে প্রচারে স্কুল সম্পর্কিত সরকারি প্রকল্পগুলোকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বিপুল সাফল্যের (এটাও সরকার এবং শাসক দলের দাবি মাত্র) অনুঘটক হিসাবে দাবি করা এবং প্রকল্পগুলোর উদ্গাতা হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর জয়গানই মুখ্য। এই রিপোর্ট কি সেই জয়গানের মুখে বিরাশি সিক্কা থাপ্পড় নয়?
পড়ুয়াশূন্য স্কুলের নিরিখে দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্থানে আছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ৩,২৫৪ স্কুলে একজনও শিক্ষার্থী নেই। রাজ্যের ৬,৩৬৬ স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক আছেন। যেসব স্কুলে পড়ুয়া নেই, সেখানে নিযুক্ত মোট শিক্ষকসংখ্যা ১৪,৬২৭। আর যেসব স্কুলে একজন করে শিক্ষক, সেখানে মোট পড়ুয়া ২,৪৮,৬৯৬।
এ প্রসঙ্গে দুটো কথা না বললেই নয়। প্রথমত, মুখ্যমন্ত্রী তথা সরকারের শিক্ষা সংক্রান্ত প্রচারের বা বক্তব্যের সিংহভাগ জুড়ে থাকে কন্যাশ্রীর গুণগান। যদিও দেশের একাধিক রাজ্যে অনুরূপ প্রকল্প বহুদিন আগে থেকেই চালু আছে এবং কন্যাশ্রীর জন্য বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে বা মেয়েদের স্কুলে আসার হার বিপুল বৃদ্ধি পেয়েছে – এই দাবি প্রমাণ করা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। কারণ বাল্যবিবাহে এবং অপরিণত মাতৃত্বের তালিকায় বেশ কয়েকবছর ধরেই এ রাজ্য দেশের মধ্যে প্রথম বা দ্বিতীয়। তাহলে?
সরকারের আরেক দাবি হল তরুণের স্বপ্ন নামক ছাত্রছাত্রীদের ট্যাব প্রদান প্রকল্পের সাফল্য (যদিও এতে কিশোর, কিশোরীদের ডিজিটাল আসক্তি বৃদ্ধি করা ছাড়া ইতিবাচক কিছু কেউ খুঁজে পেয়েছেন বলে এখনো জানা যায়নি)। সেই প্রকল্প ঘিরে কেলেঙ্কারি নিয়ে আপাতত শিক্ষাজগৎ সরগরম এবং ব্যতিক্রমহীনভাবে শাসক দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নামই উঠে আসছে। একাধিক গ্রেফতার হয়েছে ওই কাণ্ডে এবং তদন্ত চলছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেশকিছু অভিযুক্ত পলাতক বলেও খবরে প্রকাশ।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় রিপোর্টে (আগেই বলেছি এগুলো রাজ্য থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টের সংকলন) বলা হয়েছে, স্কুলছুট আটকানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দারুণ কাজ করেছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কোন স্কুলছুট নেই। অর্থাৎ গত শিক্ষাবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের কোনো ছাত্রছাত্রী স্কুলছুট হয়নি। যথারীতি রিপোর্টের এই অংশ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর জয়গান চলছে। এবার শুনুন এই তথ্যের প্রকৃত উৎস।
এ রাজ্যে কয়েক বছর আগে সরকারি স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের নথিভুক্তিকরণের জন্য বাংলা শিক্ষা পোর্টাল নামে এক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়। যে কোন স্তরের সরকারি স্কুলে কোনো শিশু ভর্তি হতে এলেই এই পোর্টালে তার যাবতীয় তথ্য নথিভুক্ত করে তাকে ভর্তি নেওয়া হয়। প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত যেহেতু পাশফেল নেই, পোর্টাল অনুসারে কেউ যদি সারা বছর স্কুলে না আসে বা পরীক্ষা না দেয়, তাহলেও পরের ক্লাসে তুলে দেওয়া হয়। সুতরাং কাগজে কলমে কোন স্কুলছুট নেই। তাই তথ্যভাণ্ডার একেবারে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন দেখাচ্ছে না। কিন্তু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা আর সেই ছাত্রছাত্রীরা যখন নবম শ্রেণিতে বোর্ডের পরীক্ষার জন্যে রেজিস্ট্রেশন করে – সেই দুই সংখ্যার তফাত খেয়াল করলেই প্রকৃত ছবিটা পরিষ্কার হবে। পোর্টালে ‘deactivate’ বলে একটা বিকল্প থাকলেও স্কুলগুলো তা ব্যবহার করে না খাতায় পড়ুয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কায়। এ হল তথ্যের ভোজবাজি।
মাঝে মাঝে মনে হয়, এটা কি একটা সরকার, না চিট ফান্ড? এদের তো উদ্দেশ্যই মানুষকে বোকা বানানো। সাধারণ মানুষ কি জানেন, সরকারি প্রকল্প চালানো ছাড়া স্কুলগুলোতে সরকারের ভূমিকা কী? প্রচারের ঢক্কানিনাদের আড়ালে আসল পরিস্থিতি কী?
পোর্টাল অনুসারে কেউ যদি সারা বছর স্কুলে না আসে বা পরীক্ষা না দেয়, তাহলেও পরের ক্লাসে তুলে দেওয়া হয়। সুতরাং কাগজে কলমে কোন স্কুলছুট নেই। তাই তথ্যভাণ্ডার একেবারে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন দেখাচ্ছে না। কিন্তু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা আর সেই ছাত্রছাত্রীরা যখন নবম শ্রেণিতে বোর্ডের পরীক্ষার জন্যে রেজিস্ট্রেশন করে – সেই দুই সংখ্যার তফাত খেয়াল করলেই প্রকৃত ছবিটা পরিষ্কার হবে।
একটা স্কুলের দৈনন্দিন খরচ, যাকে ‘কম্পোজিট গ্রান্ট’ বলা হয়, সেটা দীর্ঘদিন বন্ধ। স্কুলগুলোর প্রধানরা আর্তনাদ করছেন, চক ডাস্টার কেনার টাকা পর্যন্ত নেই অনেক জায়গায়। পরীক্ষার প্রশ্ন ছাপানো, খাতা কেনা, শৌচাগার পরিষ্কারের খরচ, বিদ্যুৎ বিল – এসব কী করে মেটানো সম্ভব? স্কুলগুলোর দেওয়ালের প্লাস্টার, সিলিংয়ের ভাঙা অংশ সারানো, টেবিল, বেঞ্চ বানানোর কথা তো ভাবলেও আতঙ্ক হয়। স্কুলটা চলবে কীভাবে? এইসব খরচের টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? কেউ খবর রাখেন?
শিক্ষা দফতরের কর্তারা শুধুমাত্র সরকারি প্রকল্পের হিসাবপত্র নিয়ে আগ্রহী। স্কুলের পড়াশোনা, ক্লাসের অবস্থা, পড়ুয়ার সংখ্যা, শিক্ষকের অভাব নিয়ে কথা বলার ন্যূনতম আগ্রহ তাঁদের নেই। স্কুলগুলোর অবস্থা ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মত। তাহলে হাতে কী রইল?
২০২৪ সালে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সংখ্যাবৃদ্ধির সদ্য প্রকাশিত খবর নিয়ে আপাতত শাসক এবং সরকার উচ্ছাস প্রকাশ করছে। কিন্তু পাঠককে একবার ভেবে দেখতে অনুরোধ করব, ঠিক কী কারণে এই সংখ্যাবৃদ্ধি? কেন বেসরকারি স্কুল থেকে দশম শ্রেণি বা সমতুল পরীক্ষায় পাশ করে ছেলেমেয়েরা সরকারি স্কুলে ভর্তি হল? সরকারি স্কুলে পড়ানোর দারুণ সুবিধা এবং পরিকাঠামো রয়েছে – এমন দাবি সম্ভবত কেউই করবেন না। গ্রামের দিকে বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয় শিক্ষকশূন্য (রিপোর্টেই প্রকাশ)। বিশেষত অঙ্ক এবং বিজ্ঞানের শিক্ষক গ্রাম, মফস্বলের স্কুলগুলোতে নেই বললেই চলে, সৌজন্যে অপরিকল্পিত বদলি প্রকল্প, যার গালভরা নাম উৎসশ্রী। পরিস্থিতি এতটাই মর্মান্তিক যে বহু পুরনো স্কুল ২০২৪ সালে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্র ভর্তি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। তাহলে কী করে ছাত্রসংখ্যা বাড়ল?
এই প্রশ্নের উত্তর হিসাবে যা উঠে আসে, তা এই রাজ্যের আরেকটা ভয়ঙ্কর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। তা হল মানুষের হাতে কাজ এবং অর্থের অভাব। সেই কারণে বেসরকারি স্কুলের খরচ চালানো অসম্ভব হওয়ায় বড় অংশের ছাত্রছাত্রী সরকারি স্কুলমুখী হয়েছে। ভাবের ঘরে চুরি না করলে এটাও স্বীকার করতে হবে যে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা এবং পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির সিংহভাগ কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি স্কুল বা এ বোর্ড, ও বোর্ডের কোনো ফারাক নেই। কেন নেই সে আলোচনা এখানে সম্ভব নয়।
আরো পড়ুন স্কুল বেহাল, শিগগির অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন ফুরোবে
এর সঙ্গে যোগ করতে হবে গত দশ বছর ধরে চলা শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে যাবতীয় কুকীর্তি ও অনিয়ম। এর ভুক্তভোগী এই মুহূর্তে রাজ্যের বিরাট অংশের মানুষ। প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী নিযুক্ত শিক্ষক এবং নিয়োগ না পাওয়া অপেক্ষমান শিক্ষকরা, পরোক্ষ ভুক্তভোগী ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকরা। কারণ শিক্ষক নিয়োগে বিপুল দুর্নীতি এবং পুকুর চুরি যে হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত সত্য। সাদা খাতা, ভুল উত্তর লেখা খাতা জমা দিয়ে চাকরি পাওয়া যেমন ঘটেছে, তেমনই আদৌ পরীক্ষায় না বসেও চাকরি পেয়েছে অনেকে। এর ফলে অভিভাবক মহলে কী বার্তা গেছে? অযোগ্য, পিছন দরজা দিয়ে কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে নিযুক্ত অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে কেউ যদি নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ তুলে দিতে না চান, তাঁকে দোষ দেওয়া যায় কি? ছাত্রছাত্রীদের মিড ডে মিলের কেলেঙ্কারিকেও এর সঙ্গে যুক্ত করুন। তার সঙ্গে যুক্ত করুন নিয়োগ দুর্নীতির দুর্বিপাকে জড়িয়ে সম্পূর্ণ আদালতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া হাজার হাজার স্কুলের একমাত্র শিক্ষককে। ওঁদের পক্ষে সব ক্লাসের উপস্থিত পড়ুয়াদের রোল কল করে মিড ডে মিলের বন্দোবস্ত ও হিসাব করার পর ক্লাস নেওয়া আকাশকুসুম কল্পনা।
এখানে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন ওঠে – শিক্ষার মত এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এ রাজ্যে এমন সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং দুরবস্থা নিয়ে কেন্দ্রের কী ভূমিকা?
এর উত্তরে যত কম বলা যায় ততই ভাল। কারণ নরেন্দ্র মোদী সরকারের মাথাদের শিক্ষা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা আছে বলে কেউ অভিযোগ করতে পারবে না। গত দশ বছরে তাদের করা কাজ বলতে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ নামক এক দানবীয় নীতি প্রণয়ন, যা পরবর্তী প্রজন্মকে শুধুই শস্তার শ্রমিকে পরিণত করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং শিক্ষার অধিকার গুছিয়ে ধনী ও অতিধনীদের হাতে তুলে দিয়েছে। দেশের বাকি ১৩০ কোটি মানুষের জন্যে রাখা হয়েছে স্কুল পাঠ্যক্রমে ধর্ম আর হাতে কলমে শিক্ষার কোর্সের নামে ধাপ্পাবাজি। জাতীয় শিক্ষানীতির কুফল ইতিমধ্যেই ফলতে শুরু করেছে। কলেজগুলোর দিকে তাকান, পরিষ্কার দেখতে পাবেন। সেই সরকার যে এ রাজ্যের স্কুলশিক্ষার অন্তর্জলী যাত্রা নিয়ে চিন্তিত হবে না তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ এই অব্যবস্থা শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণের দিকে দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে, যা কেন্দ্রীয় সরকারেরও লক্ষ্য।
এসব জেনে কী মনে হচ্ছে? আতঙ্কিত হচ্ছেন না? অন্ধকার দ্রুত ঢেকে ফেলছে বুঝতে পারছেন? ক্রুদ্ধ হচ্ছেন না? বোধহয় না। যদি হতেন তাহলে আজ রাজ্যটা দুর্নীতির মুক্তাঞ্চলে পরিণত হত না। আপনার বা আপনার সন্তানের গায়ে এসব সমস্যার আঁচ না লাগলে আপনি উদাসীন। তেমনই ভদ্রলোক, মধ্যবিত্ত হিসাবে প্রতিদিন আপনি যেসব দুর্নীতির দ্বারা তাড়িত হচ্ছেন, সমাজের অন্য অংশের মানুষ সেগুলো সম্পর্কে উদাসীন। কারণ সেগুলোর আঁচ হয়ত তাদের গায়ে লাগছে না। আসলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে হতে আমরা সামাজিক, মানসিকভাবে এতটাই পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি যে এই সরকার এবং শাসক দল নিশ্চিন্তে যা ইচ্ছে তাই করে যেতে পারছে।
আসলে আপনি নিরাপদ নন, আমিও নই। আমার, আপনার সন্তানরাও নয়। বরং তারা অজান্তে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ দুর্বিষহ হওয়া আটকানোর জন্যে আপনার হাতে এখনো হয়ত সামান্য সময় আছে।
ভাবুন, সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







