এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম হামিরপুর এনআইটি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক পদে প্রার্থী ঝাড়াই বাছাই প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় স্তরে বিভাগীয় বৈচিত্র্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে আলোচনার কারণ সেটা নয়, বরং বাছাই প্রক্রিয়ায় যে সমস্ত মাপকাঠি রাখা হয়েছে সেগুলোই আলোচ্য।
কী পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তাঁরা? একটা কথা সর্বাগ্রে বলে নেওয়া ভাল যে তাঁদের বাছাই প্রক্রিয়ার একটি ইতিবাচক দিক হল পূর্ণ স্বচ্ছতা। তাঁরা ঘোষণা করেই দিয়েছেন, প্রতি শূন্য পদের জন্য সর্বোচ্চ দশজন প্রার্থীর ইন্টারভিউ নেওয়া হবে। অর্থাৎ কোনো পদে ৫০ জন প্রার্থী প্রথম স্তরের বাধা অতিক্রম করলেও দ্বিতীয় স্তর টপকাতে পারবেন তাঁদের মধ্যে বড়জোর দশজন। পঞ্চাশজনের মধ্যে দশজনকে বেছে নেওয়ার জন্য তিন ভাগে প্রার্থীদের যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হবে। এই মূল্যায়ন পরিমাণগত এবং একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ৫০ নম্বর পেতে পারেন। তিনটে ভাগের মধ্যে আছে (১) কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি করেছেন (সর্বোচ্চ ২৫ নম্বর), (২) স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছেন (প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ১০ নম্বর) এবং (৩) কোন শিক্ষা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা, পিএইচডি পরবর্তী গবেষণা কিংবা চাকরি করেছেন (সর্বোচ্চ ৫ নম্বর)। কীভাবে দেওয়া হবে এই নম্বর?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
একমাত্র ২ নং ছাড়া বাকি দুটি ক্ষেত্রেই নম্বর দেওয়া হবে প্রতিষ্ঠানের কৌলীন্য দেখে। এই কৌলীন্য বিচার আবার হবে পরিমাণগত উপায়ে, তাদের র্যাঙ্কিং দেখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উৎকর্ষ বিচারে আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক স্বীকৃত পদ্ধতি হল QS World University Ranking, যা গোটা বিশ্বের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎকর্ষ অনুযায়ী র্যাঙ্ক দেয়। বিগত দশকে এর সঙ্গে সঙ্গে গজিয়ে উঠেছে আরও নানারকম আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং জাতীয় র্যাঙ্কিং পদ্ধতি, যেমন ভারত সরকারের উদ্যোগে ২০১৬ থেকে ভারতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চালু হয়েছে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট র্যাঙ্কিং ফ্রেমওয়ার্ক (NIRF)। হামিরপুর এনআইটি কর্তৃপক্ষ ১ নং ভাগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ নম্বর দিচ্ছেন QS র্যাঙ্কিংয়ে ৫০০-র মধ্যে থাকা প্রতিষ্ঠান এবং আইআইটি, আইআইএম থেকে করা পিএইচডিকে, ২০ নম্বর দিচ্ছেন এনআইটি, আইআইএসইআরগুলোর ক্ষেত্রে, ১৫ নম্বর দিচ্ছেন অন্যান্য কেন্দ্রীয় অনুদানে চলা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে, দশ নম্বর বরাদ্দ NIRF তালিকায় অন্তত দুবছর থাকতে পারা রাজ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এবং পাঁচ নম্বর অন্যান্যদের জন্য। প্রায় একইভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কৌলীন্যভিত্তিক মূল্যায়ন হয়েছে ৩ নম্বর ভাগের ক্ষেত্রে।
এত স্বচ্ছ হওয়া সত্ত্বেও এই পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি কিসের, বিশেষত যখন রাজ্য সরকারপোষিত বিশ্ববিদ্যালগুলোতে নিয়োগে অস্বচ্ছতা, স্বজনপোষণের অভিযোগ বহুলপ্রচলিত? প্রথমত, একজন ব্যক্তির শিক্ষক/গবেষক হিসাবে যোগ্যতার মূল্যায়ন হচ্ছে তাঁর কাজের ভিত্তিতে নয়, বরং তিনি কোথায় গবেষণা করেছেন তার ভিত্তিতে। অর্থাৎ ধরেই নেওয়া হচ্ছে, তুমি যাই করো না কেন, কিছু বিশেষ প্রতিষ্ঠানের দরজা পেরোলেই উৎকর্ষের মূল্যায়নে তুমি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। এমন নয় যে বিশ্বজুড়েই শিক্ষক/গবেষক নির্বাচনে প্রাতিষ্ঠানিক কৌলীন্যকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণি সচেতনতা অলিখিত উপায়ে উপস্থিত থাকে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রেও গবেষণার মান, প্রার্থীর বিষয়ের উপর দখল, বোঝানোর দক্ষতা ইত্যাদি বিচার করা হয়। এক্ষেত্রে যেটা করা হল সেটা আইনি এবং নৈতিক দুই দিক দিয়েই অবৈধ।
দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের কৌলীন্যের ভিত্তিতে যদি গবেষণার উৎকর্ষ স্থির করা হয় তাহলে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ফলাফলের ক্ষেত্রে সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে কেন? তথ্য সহকারে দেখানো যায়, বিশেষত দক্ষিণ ভারতের কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীরা গড়পড়তা ৮০% থেকে ৯০% নম্বর পেয়ে থাকে, যেখানে অনেক রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭০% থেকে ৭৫% হল খুব ভাল নম্বর। সুতরাং, এনআইটি কর্তৃপক্ষ এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করা প্রার্থীদের অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকার সুযোগ করে দিলেন। এটা অনৈতিক এবং অসাংবিধানিকও বটে। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে।
ধরা যাক দুজন প্রার্থী ক এবং খ। ক স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি তিনটেই করেছেন ভুবনেশ্বর আইআইটি থেকে। খ তিনটে ডিগ্রিই পেয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ধরা যাক স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরে দুজনেই ৭৫% করে নম্বর পেয়েছেন। খ পিএইচডির পর তিন বছর যাদবপুরে পড়িয়েছেন আর ক এক এনআইটিতে তিন বছর গবেষণা করেছেন। হামিরপুর কর্তৃপক্ষের ঠিক করে দেওয়া ৫০ নম্বরে ক পাবেন ৪৫ এবং খ পাবেন ২৮। এই ১৭ নম্বরের তফাৎ হয়ে যাচ্ছে কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক কৌলীন্যের নিরিখে। অথচ দুই প্রতিষ্ঠানেরই ২০২৩ QS র্যাঙ্কিং ৫০০-র বেশি। উপরন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ভুবনেশ্বর আইআইটির চেয়ে র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে। এনআইটি বা আইআইএসইআরগুলো QS র্যাঙ্কিংয়ে অংশগ্রহণই করে না। অথচ সেখান থেকে পিএইচডি করে বেরনো প্রার্থীরা বিশেষত মৌলিক বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেমন মুম্বইয়ের টিআইএফআর বা এলাহাবাদের এইচআরআই থেকে বেরনো প্রার্থীদের চেয়ে অন্তত পাঁচ নম্বরে এগিয়ে থাকবেন। উদ্দেশ্য যেখানে ন্যূনতম যোগ্যতামান পার হওয়া অধিকাংশ প্রার্থীকে ছাঁটাই, সেখানে পাঁচটা নম্বরের মূল্য অনেক।
উপরের আলোচনা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। হামিরপুর এনআইটি প্রশাসন তাঁদের প্রতিষ্ঠানে একটা বিশেষ ছাপওয়ালা গোষ্ঠীকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রশ্ন হল সেটা করার জন্য যে পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে তা যে আইনসিদ্ধ নয় এবং বিষয়টা আদালত অবধি গড়ালে তাঁদের মুখ পুড়তে পারে – এই সম্ভাবনা কি তাঁরা ভেবে দেখেননি? আমার ধারণা তাঁরা সমস্ত দিক খতিয়ে দেখেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলের কথা ভেবেই কিঞ্চিৎ ঝুঁকি নিয়েছেন। তাঁরা জানেন শিক্ষাক্ষেত্রে চাকরির বাজারে একরকম মন্দা চলছে। বহু যোগ্য প্রার্থী ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় যন্ত্রণাদীর্ণ। এই অবস্থায় মামলা করে শিক্ষাজগতের ছোট্ট বৃত্তে বদনাম কুড়িয়ে ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি কেউ নেবেন না। বরং যাঁরা এটা করতে পারতেন বা নিদেনপক্ষে শোরগোল করতে পারতেন সেই প্রতিষ্ঠিত, পাকা চাকরিওয়ালা শিক্ষাবিদরা সম্পূর্ণ নীরব, শিক্ষক সংগঠনগুলোও চুপ। তাঁরা নীরব কারণ তাঁরা র্যাঙ্কিং, ব্র্যান্ডিংয়ের বাজারি পদ্ধতির হাতে শিক্ষাকে তুলে দেওয়ার মতাদর্শে বিশ্বাসী। ২০২০ সালের নয়া শিক্ষানীতির দর্শন এই পদ্ধতিকেই স্বীকৃতি দেয়, যেখানে উচ্চশিক্ষার দিশা নির্ধারিত হবে কর্পোরেটপোষিত নয়া উদারবাদী অর্থনীতির দ্বারা। সমস্ত ধরনের সরকারি, বেসরকারি অনুদান কেন্দ্রীভূত হবে কিছু প্রতিষ্ঠানে, তাদের পরিকাঠামো উন্নত হবে, বিনিময়ে তাদের শিক্ষার কার্যক্রম এবং গবেষণার দিশা ঠিক করবে কর্পোরেট এবং তাদের মদতপুষ্ট শাসক। উচ্চশিক্ষায় নিযুক্ত শিক্ষক, গবেষকদের সিংহভাগেরই এতে আপত্তি নেই। বরং হামিরপুরের পদ্ধতি আগামীদিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সামান্য এদিক ওদিক করে ব্যবহৃত হবার সম্ভাবনা প্রবল। সেক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষায় এই আমূল পরিবর্তনের পথিকৃৎ হিসাবে হামিরপুর এনআইটি ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারে।
এহেন আমূল পরিবর্তনের ফলে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সঙ্গে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে সেইসব প্রতিষ্ঠান, যেগুলো আয়তনে ছোট এবং কেবলমাত্র গবেষণার জন্যই নিয়োজিত। যেমন কলকাতার সাহা ইন্সটিটিউট, সত্যেন বোস সেন্টার, এলাহাবাদের এইচআরআই, চেন্নাইয়ের ইন্সটিটিউট অফ ম্যাথমেটিকাল সায়েন্স। ডিগ্রির মূল্যমান যখন ব্র্যান্ডিংভিত্তিক হবে এবং সেই ব্র্যান্ডিং নির্ভর করবে র্যাঙ্কিংয়ের উপর, তখন হয় অপ্রতুল গবেষণা পরিকাঠামো, শুকিয়ে যাওয়া সরকারি অনুদানের ফলে ধুঁকতে থাকা গবেষণা অথবা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করেও কেবলমাত্র অন্য পাঁচরকম নির্ণায়কে (যেমন ছাত্রসংখ্যা, বিভাগের সংখ্যা) পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের সংখ্যা কমতে থাকবে। এর প্রভাব পড়বে গবেষণার মান এবং পরিমাণে। ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা এবং গবেষণার পরিমাণ নিম্নগামী হলে সরকারের পক্ষে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়া কিংবা একাধিক প্রতিষ্ঠানকে মিশিয়ে দেওয়ার কাজটা সহজ হয়ে যাবে। একইসঙ্গে অনুদানের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়াও স্বীকৃতি পেয়ে যাবে।
আরো পড়ুন কেন লাশকাটা ঘর বেছে নেয় পিএইচডি স্কলার?
ফলে দীর্ঘমেয়াদে যেমন কমবে চাকরির সুযোগ, তেমনি কমবে নিছক সৃষ্টির আনন্দে গবেষণার সুযোগ। এমনকি গবেষণা করতে পারার সুযোগও কুক্ষিগত হবে অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে। যাদের আর্থিক এবং সামাজিক পুঁজি ও তজ্জনিত শিক্ষাগত কৌলীন্য আছে একমাত্র তারাই ‘স্বয়ংশাসিত’ প্রতিষ্ঠানগুলিতে গবেষণার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ ভারতবর্ষের মত দেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যে বৈচিত্র্যকে উৎসাহ দেওয়া হত তা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাবে। উৎকর্ষের ঢক্কানিনাদের আড়ালে এই সত্য কজন অনুধাবন করছেন বলা শক্ত। তবে এখনই সচেতন হয়ে নড়েচড়ে না বসলে হামিরপুর মডেল আগামীদিনে সর্বত্রগামী হবে। তার আঁচ আজকের চাকরিপ্রার্থী থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত সবাইকে ছুঁয়ে যাবে এবং সে দায় আমরাও এড়াতে পারব না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








