অর্ক মুখার্জি

প্রবল দাবদাহের কারণে পশ্চিমবঙ্গে গরমের ছুটি এগিয়ে আনা হল। রাজ্য স্কুলশিক্ষা দফতর একটি বিবৃতি জারি করে ঘোষণা করেছে কালিম্পং, কার্শিয়াং এবং দার্জিলিং ব্যতীত অন্য সমস্ত জেলার সরকার এবং সরকারপোষিত স্কুল পরবর্তী ঘোষণা পর্যন্ত ছুটি থাকবে। স্কুল ছুটি দেওয়া হল, কিন্তু ক্লাসরুম শিখনের যে ঘাটতি তৈরি হবে অনির্দিষ্টকাল ছুটির জন্য তার ক্ষতিপূরণ হবে কী করে? কোনো বিকল্পই কি ছিল না? না সরকারের উচিত এ বিষয়ে ভাল করে ভাবা।

গত কয়েক বছরের আবহাওয়া খেয়াল করলে আমরা দেখব, গরমকালে তাপপ্রবাহ বেড়েই চলেছে। প্রত্যেক বছর এপ্রিল-মে মাসে এরকম অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই এই পরিস্থিতিতে স্কুল ছুটি না দিয়ে থাকা খুব মুশকিল। কিন্তু স্কুল কি সকালে খোলা যেত না? বিশেষ করে অষ্টম, নবম, দশম এবং দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস কি সকালে করা যায় না? একাদশ না হয় বাদ গেল, যেহেতু এখনো মাধ্যমিকের ফলপ্রকাশ হয়নি। কিন্তু আলোচনা অনুযায়ী যদি এপ্রিলের শেষের দিকে বা মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ফলাফল ঘোষিত হয়, তাহলে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করে মে মাসের তৃতীয় বা শেষ সপ্তাহ থেকে ক্লাস শুরু করা যেতে পারত। এবছর যেহেতু পঠন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে এবং নতুন পদ্ধতির সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পরিচিত হতে একটু বেশি সময় লাগবে, তাই এই ব্যবস্থা খুব জরুরি ছিল। সকালে স্কুল করতে বাধা কোথায়? কিছু কিছু ছুটি-প্রিয় শিক্ষক দাবি করছেন, অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা বহুদূর থেকে স্কুলে আসেন, তাঁদের অসুবিধা হবে। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষিকারা বিদ্যালয় এসে উপস্থিত হতে পারবেন কিনা সেই সংশয়ের জন্য কি পঠনপাঠন দুই বা আড়াই মাসের জন্য শিকেয় তুলে দেওয়া যায়? যাঁদের দূরে বাড়ি তাঁরা বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি কোথাও বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে পারেন বা শেয়ারে গাড়ি ভাড়া করে স্কুল আসতে পারেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আরো পড়ুন পরিযায়ী হওয়াই রাজ্যের শিক্ষক, শিক্ষিকাদের ভবিষ্যৎ?

আমরা যদি এখনকার শিক্ষাবর্ষের ধরন লক্ষ করি, তাহলে দেখতে পাব নভেম্বরের শেষে বা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে যায়। আবার নতুন করে ক্লাস শুরু হয় জানুয়ারি মাসে। ইদানীং যেহেতু তাপপ্রবাহ জনিত কারণে এপ্রিল, মে মাসে স্কুল খোলা রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং পড়ানোর দিন কমে যাচ্ছে স্কুল বন্ধ থাকার কারণে, তাই ডিসেম্বর থেকেই নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করে দেওয়া যেতে পারে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাস-ফেল নেই, তাই সমস্যা হবার কথা নয়। কলেজেও ফলাফল বের হওয়ার আগেই ক্লাস শুরু হয়ে যায়। তাহলে স্কুলে একই ব্যবস্থা অনুসরণ করলে ক্ষতি কী? ডিসেম্বর মাসে যদি ১৫-২০ দিন নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস করানো যায় তাহলে এই ঘাটতি অনেকটা মিটতে পারে।

করোনার সময় অনিবার্য কারণে অনলাইন ক্লাস করানো শুরু হয়েছিল। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় অনলাইন ক্লাস করানো সমস্যার। অনলাইন ক্লাস কখনো ক্লাসরুম শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। তবুও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রী, যাদের সরকার থেকে ট্যাব কেনার টাকা দেওয়া হচ্ছে, তাদের জন্য গ্রীষ্মের ছুটিতে স্কুলের তরফ থেকে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করে যেতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা সুবিধা অনুযায়ী স্কুল থেকে বা তাঁদের বাড়ি থেকে ক্লাস নিতে পারেন। স্কুল থেকে নিলে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা সংগঠিতভাবে ঘটবে। দরকার হলে সপ্তাহে একদিন বা দুদিন স্কুলে শিক্ষক, শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত থাকুক। সেখানে অনলাইন ক্লাসে পড়ানো অধ্যায়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা এমনিতে টেস্টের আগে পর্যন্ত ক্লাস করে। জুন মাসে যদি স্কুল খোলে (ভোট এবং ভোটের ফলাফলকে মাথায় রেখে), তাহলে জুন থেকে অক্টোবর এই পাঁচ মাসে দ্বাদশ শ্রেণির বিরাট সিলেবাস শেষ করা খুবই মুশকিল।

সরকার তীব্র গরম দেখিয়ে স্কুল বন্ধ করেছে। মজার কথা, ছাত্রছাত্রীরা কিন্তু তাদের টিউশন ব্যাচে বা কোচিং সেন্টারে পড়া বন্ধ করবে না। বরং তাদের কাছে এগুলোই বিকল্প। অনেক স্কুলশিক্ষক যাঁরা এই তীব্র গরমে স্কুল খোলা থাকলে কী ভীষণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং কীভাবে তা ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে তা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় নাতিদীর্ঘ বা অতি দীর্ঘ পোস্ট করছেন, তাঁরা অনেকেই নিজের বাড়িতে বা অন্য কোথাও নিষিদ্ধ হলেও টিউশন কিন্তু করবেন। অন্যদিকে একেবারে প্রান্তিক বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রীরাও ঘরে বসে থাকবে না এই রোদের আঁচ থেকে বাঁচতে। এদের অনেককেই আর্থিক বাধ্যবাধকতায় এমন কিছু কাজ করতে হবে যার জন্য তাদের কড়া রোদের মুখোমুখি হতে হবে।

আসলে সরকারের সদিচ্ছার উপর অনেককিছু নির্ভর করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বিদ্যালয় শিক্ষার ব্যাপারে সবুজ সাথী সাইকেল প্রদান, কন্যাশ্রী এবং ট্যাব প্রকল্পে টাকা দেওয়া ছাড়া সেভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়নি। স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত যত তাড়াতাড়ি এই সরকার নিয়েছে সেই তৎপরতা অন্য কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হীরক রাজার দেশে এক অসামান্য সৃষ্টি। সেই সিনেমার মনে দাগ রেখে যাওয়া সংলাপ ‘লেখাপড়া করে যে, অনাহারে মরে সে’, ‘বিদ্যালাভে লোকসান, নাহি অর্থ, নাহি মান’। সরকারের এই স্কুল বন্ধ রাখার প্রচেষ্টা দেখে মাঝে মাঝে গায়ে চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছে করে, সত্যি আমরা বাংলায় আছি তো নাকি স্বপ্নে হীরক রাজার দেশে চলে গেছি?

আরও এক সন্দেহ মনের ভিতর দানা বাঁধে। সরকার কি বারবার অপরিকল্পিতভাবে ছুটি ঘোষণা করে স্কুলশিক্ষার বেসরকারিকরণের পথ আরও মসৃণ ও প্রশস্ত করছে? বেসরকারি স্কুলগুলো সরকারি নির্দেশ মেনে স্কুল বন্ধ রাখলেও অনলাইন ক্লাস চালু রাখে। সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক সঙ্গতির কারণে অনলাইন ক্লাস করতে অসুবিধাও হয় না। ফলে সচেতন এবং সচ্ছল অভিভাবকরা বেসরকারি স্কুলগুলোকেই উপযুক্ত শিক্ষালাভের কেন্দ্র হিসাবে বেছে নেবেন। একটু ভালভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, শুধুমাত্র বড় শহরে নয়, মফস্বলে এবং গ্রামেও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারের এহেন অনীহা দেখে মানুষ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁদের ছেলেমেয়েদের ভর্তি করতে বাধ্য হবেন। পরোক্ষ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জমে উঠবে বিদ্যালয় শিক্ষার ব্যবসা।

একবছর আগেই একটা খবর শিক্ষাক্ষেত্রে হইচই ফেলে দিয়েছিল, আঁতকে উঠেছিলেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব স্তরের মানুষ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৮,২০৭টি স্কুল বন্ধ করার কথা ঘোষণা করেছিল। কারণ দেখানো হয়েছিল পড়ুয়ার অভাব। ওই স্কুলগুলোতে পড়ুয়ার সংখ্যা তিরিশের কম। পরে অবশ্য শোরগোল পড়ে যাওয়ায় সরকার জানায় ওই স্কুলগুলো বন্ধ হচ্ছে না।

এমনিতেই অনেকদিন স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ হয়নি বলে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোতে শিক্ষকের অভাব রয়েছে। তাই স্কুল খোলা থাকলেও যে ছাত্রছাত্রীরা পর্যাপ্ত পঠনপাঠনের সুযোগ পায় তা নয়। তার উপর যদি সরকারের এরকম সিদ্ধান্তে স্কুল বন্ধ থাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য, আর চোখের সামনে বেসরকারি স্কুলে পঠনপাঠন নির্দিষ্ট গতিতে ও ছন্দে হতে থাকে, তাহলে কী করে অভিভাবকরা সরকারি স্কুলের উপর ভরসা রাখবেন? অনেকেই বাধ্য হয়ে সন্তানদের জন্য বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাছতে বাধ্য হচ্ছেন। আর্থিক সমস্যা থাকলেও সেই চাপ সহ্য করেই বেসরকারি স্কুলে পড়াচ্ছেন ছেলেমেয়েদের। অন্যদিকে নিম্ন মধ্যবিত্ত বা প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুলছুটের প্রবণতা বাড়ছে। অপরিকল্পিত ছুটির অবসরে আরও বেশি ক্ষতি হচ্ছে। স্কুলের সঙ্গে সেভাবে কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। স্বাভাবিকভাবেই ক্লাসরুমে যেটুকু শেখা উচিত তারা শিখছে না। কৈশোর উপভোগের অন্যতম উপাদান হল স্কুলজীবন। সেই স্বাদ বহু ছাত্রছাত্রী পাচ্ছে না। বেশিরভাগ সরকারি স্কুলের পড়ুয়া পঠনপাঠনের জন্য গৃহশিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর দায় কি সরকারের নয়? কেবলমাত্র সাইকেল, ট্যাব বা জামা জুতো দেওয়া কি এই বঞ্চনার ক্ষত ঢাকতে পারবে?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.