অর্ক মুখার্জি

একাদশ শ্রেণির প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষার নির্ঘণ্ট প্রকাশিত হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষাজগতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা নিয়ে এত হঠকারিতা কেন? প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। সেমিস্টার ব্যবস্থা এবছরেই প্রথম চালু হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন ব্যবস্থাপনায় মানিয়ে নিতে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীদের প্রথম বছর একটু বেশি সময় লাগবে। শিক্ষা সংসদের কর্তাদের একথা বোঝা উচিত ছিল।

শিক্ষা সংসদের কর্তাব্যক্তিরা যখন এই সেমিস্টার ব্যবস্থা প্রবর্তন সম্পর্কে ঘোষণা করেন, তখন বলেছিলেন প্রথম সেমিস্টার জুন থেকে অক্টোবর এবং দ্বিতীয় সেমিস্টার হবে নভেম্বর থেকে মার্চ। এখন হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদল করে যে পরীক্ষা অক্টোবর বা নভেম্বরে হওয়ার কথা ছিল, তা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি করা হচ্ছে কেন, সে বিষয়ে ছাত্রবান্ধব সংবেদনশীল শিক্ষাজগতে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। এমন নয় যে জুন মাসের বদলে আগে ক্লাস শুরু হয়েছে। মাধ্যমিকের ফল ২ মে প্রকাশিত হলেও ভোট এবং সেই সময়ের প্রচণ্ড গরমের কারণে সমস্ত স্কুল ৪ জুন পর্যন্ত ছুটি দেওয়া হয়েছিল। ভোটের ফলাফল ঘোষণা ৬ জুন হওয়ার কারণে বেশিরভাগ স্কুল তারপর খুলেছে। বলা ভাল, অধিকাংশ স্কুল ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করে একাদশ শ্রেণির ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে ২০ জুন। অনেক জায়গায় আরও পরে ক্লাস শুরু হয়েছে, তবু আমরা হিসাবের সুবিধার জন্য যদি ২০ জুন ধরে নিই ক্লাস শুরু করার সম্ভাব্য তারিখ হিসাবে, তাহলেও দেখা যাবে ছাত্রছাত্রীরা ছুটিছাটা বাদ দিয়ে ৮০ দিনের কম কর্মদিবস পাচ্ছে। এত কম সময়ে কিভাবে শিক্ষক-শিক্ষিকারা নির্দিষ্ট সিলেবাস শেষ করবেন?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শিক্ষা সংসদের এই একপেশে সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র মহলে ভীতি এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। প্রথম সেমিস্টারের সব বিষয়ের পরীক্ষা এমসিকিউ পদ্ধতিতে হবে। কেবলমাত্র এমসিকিউ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতির ধরন আলাদা। পড়ানোর সময়ে বিশদে বিশ্লেষণ পন্থা অনুসরণ করা প্রয়োজন। স্বাভাবিক সূত্রে বিশদ বিশ্লেষণ পন্থা অনুসরণ করতে সময় লাগবে। কম সময়ে এই পন্থা অনুসরণ করতে গেলে সিলেবাস শেষ করা যাবে না। আর এখন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সিলেবাস শেষ করতে গেলে ‘All detailing’-এর পরিবর্তে ‘Selective detailing’ পন্থা অনুসরণ করতে হবে যা ‘প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থা’ ধারণার পরিপন্থী।

শিক্ষা সংসদ যখন ঢাকঢোল পিটিয়ে সেমিস্টার ব্যবস্থা শুরু করার কথা ঘোষণা করে, তখন বলা হয়েছিল ছাত্রছাত্রীরা যাতে পরবর্তীকালের বিভিন্ন প্রবেশিকা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিতে গিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ না করে বা তাদের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে ওইসব পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির ধারণা তৈরি হয় – তার জন্যেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু সময়ের অভাবে সিলেবাস শেষ করার তাড়ায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দৌড়তে হবে। সেই দৌড়ে অল্প কিছু ছাত্রছাত্রী ছাড়া বাকি সবাই, বিশেষ করে মধ্য মেধা, অল্প মেধা বা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা কেবলই পিছিয়ে পড়বে।

তাহলে কি শিক্ষা সংসদের কর্তাব্যক্তিরা যখন প্রথম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন কোনো পরিকল্পনা না করে বা স্কুলগুলোর পরিকাঠামোর কথা না ভেবে কেবলমাত্র বিজ্ঞাপনী চমকের মত ভোটের কথা মাথায় রেখে অভিভাবকদের জানাবার জন্য সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন? ১৪ মার্চের সেই বৈঠকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছিলেন, সেমিস্টার সিস্টেম একাদশ শ্রেণির দুটি সেমিস্টারকে প্রথম এবং দ্বিতীয় সেমিস্টার বলা হবে এবং একাদশ শ্রেণীর প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষা হবে নভেম্বর মাসে। তেমন হলে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যাপ্ত কর্মদিবস পাওয়া যেত, ছাত্রছাত্রীরাও মানিয়ে নিতে পারত। শিক্ষক-শিক্ষিকারাও একটু ধরে ধরে পড়ানোর সুযোগ পেতেন। শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য সুরক্ষিত থাকত। একাদশ শ্রেণির প্রথম সেমিস্টারে যদি পরীক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কিত পরিকল্পনার অভাবে ছাত্রছাত্রীদের ভুগতে হয়, তাহলে তারা সরকারি স্কুল ছেড়ে যে আরও বেশি মাত্রায় বেসরকারি স্কুলমুখী হবে, তা বলাই বাহুল্য।

বর্তমানে অধিকাংশ স্কুল উপযুক্ত শিক্ষকসংখ্যার অভাবে ধুঁকছে। শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে জটিলতার কারণে ২০১৬ সালের পর থেকে আর কোনো শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা সরকার আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই পরীক্ষার মাধ্যমে যাঁরা নিযুক্ত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের নিয়োগ ঘিরে অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকেই অবৈধ ঘোষণা করেছিল। পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে রায়ের উপর স্থগিতাদেশ পেলেও মামলা এখনো চলছে। এছাড়া পরিকল্পনাহীনভাবে অতিমারীর সময়ে শিক্ষক বদলি করার ফলে গ্রামীণ স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বহু বিষয়ের কোনো শিক্ষকই নেই। তাই তখন ঘোষণা করে দিলেও, পরে সংসদ নিশ্চয়ই বুঝেছে যে নভেম্বর মাসে একসাথে দ্বাদশ শ্রেণির টেস্ট, একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা এবং তার সঙ্গে পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা পরিচালনা করার মত যথেষ্ট পরিমাণ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী অনেক স্কুলেই নেই। স্বাভাবিকভাবেই একসাথে আয়োজন করা যখন সম্ভব নয়, তখন একাদশ শ্রেণির সেমিস্টারকে পূর্ব ঘোষণার চেয়ে প্রায় দুমাস এগিয়ে এনে সেপ্টেম্বরে করবার এরকম তুঘলকি সিদ্ধান্ত। এখানে ছাত্রছাত্রীরা আদৌ কিছু শিখল কি শিখল না, বা কতটা শিখল, সেই বিষয়টা উপেক্ষা করে পরীক্ষা আয়োজনের মাধ্যমে ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হয়েছে – এটা দেখানোর কৃত্রিম প্রচেষ্টার মাধ্যমে সাফল্যের মুকুট আদায় করাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন এসএসসি: অপরাধীদের বাঁচাতে নিরপরাধদের বিপদে ফেলা হল

এখান থেকে পরীক্ষার সময়ে বিভিন্ন বেনিয়মের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। অতিমারীর সময়ে যখন উচ্চমাধ্যমিক হয়েছিল, তখন বিভিন্ন স্কুলের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে নজরদারিতে শিথিলতার অভিযোগ উঠেছিল। অনেক জায়গায় অবাধ টোকাটুকির অবৈধ আবদারের কাছে নতিস্বীকার করতে হয়েছিল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। এছাড়া সেইসময় একাদশ শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে বলেও অভিযোগ উঠেছিল। এবার যদি স্কুলের পক্ষ থেকে সিলেবাস শেষ করার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে এরকম বিভিন্ন বেনিয়ম, শিথিলতার ও টোকাটুকির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শিক্ষাক্ষেত্রে এই প্রবণতা যে কোন সমাজের চেতনার বিকাশের পরিপন্থী।

আরও একটা দিক প্রকট হচ্ছে। এই ধরনের সরকারি নীতিতে স্বভাবতই মনে হয় যে সরকার বা শিক্ষা সংসদ আদৌ ছাত্রছাত্রীদের মেধা ও দক্ষতানির্ভর বিকাশের জন্য পরিকল্পনা করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। বরং সংসদের অবিবেচকের মত পরীক্ষার দিন ঘোষণা ছাত্রছাত্রীদের আরও বেশি করে সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থাৎ প্রাইভেট টিউশনের দিকে ঠেলে দেবে। তেমন শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রীদের পরিবারের তরফ থেকে অর্থের জোগান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে বিত্তবানরা এগিয়ে থেকে শুরু করবে, নিম্নবিত্তরা পিছিয়ে পড়বে।

এবছর প্রথম চালু হওয়া প্রথম সেমিস্টার যেহেতু এমসিকিউ-ভিত্তিক, তাই বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বইয়ের জোগান একটু দেরিতে এসেছে। এমনকি সংসদ থেকে প্রকাশিত বাংলা ও ইংরিজি বই ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়েছে। অনেক স্কুলের ছাত্রছাত্রী বই হাতে পেয়েছে জুলাই মাসের মাঝামঝি। তাই নিজে থেকে বই জোগাড় করে স্কুল খোলার আগে প্রস্তুতি অনেকেই শুরু করতে পারেনি। তাই কীভাবে এইটুকু সময়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি সম্ভব সে বিষয়ে ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে। সঠিক দূরদর্শিতার অভাব একাদশ শ্রেণির এই সেমিস্টার ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করবে – এমন আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ আছে। স্কুলের উপর যখন পরীক্ষা এবং প্রশ্ন তৈরি করার দায়িত্ব, তখন কেন্দ্রীয়ভাবে রুটিন প্রকাশ না করে পরীক্ষা নেওয়ার একটা সময়সীমা বেঁধে দিলেই স্কুলগুলো পরিকল্পনা করে পরীক্ষা নিয়ে এই সম্ভাব্য প্রহসন আতঙ্ক থেকে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্বস্তি দিতে পারত।

কিন্তু সংসদের এসব নিয়ে চিন্তা আছে বলে মনে হয় না। তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন এবং ঘোষণায় বিশ্বাসী। ছাত্রছাত্রীদের জন্য তাঁদের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরী বা উপকারী তা নিয়ে ভাবতে তাঁদের বয়ে গেছে। পরীক্ষা হোক প্রস্তুতিহীন অবস্থায়, অবাধ টোকাটুকি হোক, ছাত্রছাত্রীরা কিছু না শিখেই সেমিস্টার পাস করুক, তাতে কিছু এসে যায় না। সংসদ কেবল সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘোষণা করবে পাসের হার, গ্রেড বৃদ্ধি এবং তাঁরা শিক্ষার বিস্তারে কতটা সফল। তবে যে সত্য সবকিছু ছাপিয়ে সামনে আসে, তা হল দায়সারা ব্যবস্থা কখনো ছাত্রছাত্রীদের প্রকৃত উন্নতি ঘটাতে পারে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.