অর্ক মুখার্জি

২০১৬ সালে আয়োজিত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে হওয়া দ্বিতীয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে বিস্তর অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি এবং নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন করে মেধা অগ্রাহ্য করে টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রির অভিযোগে রাজ্যজুড়ে আলাপ, আলোচনা, প্রতিবাদ, জমায়েত গত কয়েক বছর ধরে দেখা গিয়েছে এবং মামলা মোকদ্দমা কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। শেষপর্যন্ত অভিযোগকারীদের অভিযোগ স্বীকৃতি পেয়েছে দুই কোর্টের রায়েই। বাতিল করা হয়েছে ২০১৬ সালের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী নিয়োগের সম্পূর্ণ প্যানেল। বাতিল হয়েছে ২৫,৭৫৩ জনের চাকরি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তড়িঘড়ি আবার শিক্ষক নিয়োগের জন্য নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের দুটো আলাদা পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল এবং গত ৭ সেপ্টেম্বর নবম-দশম, আর গত ১৪ সেপ্টেম্বর একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল। এসএসসির মতে দুদিনের পরীক্ষাই নির্বিঘ্নে সুসম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দিন থেকে এসএসসি স্বচ্ছভাবে নিয়োগ হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও সেই বিজ্ঞপ্তি ঘিরেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেরই সন্দেহ, এসএসসির কতটা ইচ্ছা আছে যোগ্যদের নিয়োগ করার আর কতটা উদ্দেশ্য নতুন নিয়োগের আড়ালে অযোগ্য চাকরিহারাদের আবার নিয়োগ করা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এই নিয়োগ পরীক্ষায় একজনও অযোগ্য অংশ নিতে পারবেন না এবং এতে কোনোরকম বেচাল দেখলে সুপ্রিম কোর্ট এই প্রক্রিয়াও অবৈধ বলে ঘোষণা করতে পারে।

তদন্ত চলাকালীন সিবিআই সুপ্রিম কোর্টে বলেছিল যে ২০১৬ সালের নিয়োগে বিভিন্নরকম বেনিয়ম হয়েছিল। সাদা খাতা জমা দিয়ে চাকরি, র‍্যাংক টপকে চাকরি, মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া প্যানেল থেকে চাকরি, ইন্টারভিউতে বিশেষ কারণে বেশি নম্বর দেওয়া – কিছুই বাকি ছিল না। অথচ অনেক টালবাহানার পর এসএসসি কেবলমাত্র দাগী হিসাবে চিহ্নিত ১,৮০৪ জনের নাম প্রকাশ করে, যাদের এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু মামলার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন আইনজীবী অভিযোগ তুলেছেন – এই তালিকা আসলে আরও লম্বা, এবং বহু দাগী প্রার্থীর নাম প্রকাশ না করে তাদের আবার পরীক্ষায় বসার সুযোগ করে দিয়েছে এসএসএসি। এমনকি দাগী শিক্ষাকর্মীদের নাম পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। তাই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই যে দাগী হিসাবে সুপ্রিম কোর্টে চিহ্নিত শিক্ষাকর্মীরা এবারের পরীক্ষায় বসেননি। তাঁরা যদি বসে থাকেন এবং পরবর্তীকালে তা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে আবার নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে মামলা মোকদ্দমা হতে পারে, প্রক্রিয়া ফের বাতিল হতে পারে। সেক্ষেত্রে যোগ্য পরীক্ষার্থীরা আবার সমস্যায় পড়বেন। গত ৮ অক্টোবরের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনকে দাগীদের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করতে নির্দেশ দেয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৬ সালের বঞ্চিত পরীক্ষার্থীদের অনেকে বয়সের কারণে এই পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেলেন না। অথচ ২০১৬ সালের বাতিল হয়ে যাওয়া প্যানেলের এখনো পর্যন্ত দাগী প্রমাণিত নন এমন শিক্ষকরা বয়সের ব্যাপারে ছাড় পেলেন। ২০১৬ সালের বঞ্চিতরা নিয়োগ দুর্নীতির শিকার হয়েছিলেন, এদিকে ২০২৫ সালে সেই নিয়োগ যখন অবৈধ ঘোষণা করা হল তখন অনেকে বয়সের কারণে পরীক্ষায় বসতে পারলেন না। সোজা কথায়, যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগই পেলেন না।

আরো পড়ুন শিক্ষক পিটিয়ে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দেওয়ার চক্রান্ত

এসএসসি এবারের নিয়োগবিধি নিয়ে যে গ্যাজেট প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, শিক্ষকরা সরকারি বা সরকারপোষিত স্কুলে পড়ানোর অভিজ্ঞতা থাকলে প্রতি বছরের জন্য দুই নম্বর করে পাবেন এবং সর্বাধিক দশ নম্বর পাবেন। ২০১৬ সালের বঞ্চিত প্রার্থীরা, বা যাঁরা নতুন পরীক্ষার্থী, তাঁরা এই দশ নম্বর থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এসএসএসসি গ্যাজেটে নম্বর কোথায় যোগ হবে তা স্পষ্ট করে বলা না থাকলেও, কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, লিখিত পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্যে প্রাপ্য নম্বরের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং মোট ৮০ নম্বর, অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষার ৬০, শিক্ষাগত যোগ্যতার ১০ এবং শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে ১০ যোগ করে ইন্টারভিউয়ের তালিকা প্রকাশ করা হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, ২০১৬ সালের বঞ্চিত প্রার্থীরা যখন স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশোনা করেছিলেন, তখন সেমিস্টার ব্যবস্থায় পরীক্ষা হত না। অনেক রচনাধর্মী প্রশ্ন থাকত, ফলে নম্বর তোলা এখনকার চেয়ে কঠিন ছিল। গ্রেডেশন ব্যবস্থায় ৬০% পাওয়া আর সেই পুরনো ব্যবস্থায় ৬০% পাওয়ার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে। ফলে ২০১৬ সালে বঞ্চিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে স্নাতকোত্তর স্তরে ৬০% বা তার বেশি পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অল্পই হবে এবং তাঁরা শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য প্রাপ্য দশের মধ্যে আট বা ছয় পাবেন। অন্যদিকে সরকারস্বীকৃত স্কুলে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকায় ওখানে তাঁরা শূন্য পাবেন। অর্থাৎ একজন অভিজ্ঞতাহীন পরীক্ষার্থী যদি লিখিত পরীক্ষায় ষাটের মধ্যে ৫৫ পায়, তার ৮০ নম্বরে প্রাপ্ত নম্বর হবে ৫৫+৮ (ধরে নেওয়া হল তিনি স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে ৫০%-৫৯% পেয়েছেন) + ০ (অভিজ্ঞতা না থাকার জন্য)। অথচ একজন ২০১৬ সালের প্যানেল বাতিল হয়ে চাকরি হারানো শিক্ষক যদি ৪৬ (লিখিত পরীক্ষায়) পান, তাঁর নম্বর হবে ৪৬+৮ (ধরে নেওয়া হল তাঁরও স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে ৫০%-৫৯% নম্বর আছে ) +১০ = ৫৬। সুতরাং ইন্টারভিউতে ডাক পাওয়ার ক্ষেত্রে সে অনেক এগিয়ে যাচ্ছে।

এসএসসি প্রথম থেকে বলে আসছে, এবারের পরীক্ষায় মেধা সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। স্বচ্ছ পেন, জলের বোতল নিয়ে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছিল। আগের এসএসসি পরীক্ষাগুলোতে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নম্বর ইন্টারভিউয়ের পর যোগ করা হয়েছিল এবং তারপর চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার সেই নিয়ম অনুসরণ করা হলে ছাত্রজীবনে বেশি নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীরা ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগ পেত এবং অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীরা ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগই পেত না। কিন্তু এখন এসএসসির নিয়মের গ্যাঁড়াকলে হয়ত দেখা যাবে, অভিজ্ঞতাহীন অথচ লেখাপড়ায় ভালো প্রার্থীরা ইন্টারভিউ পর্যন্ত পৌঁছতেই পারল না। তাহলে কি নিয়োগ স্বচ্ছ হবে? যোগ্যতা এবং মেধার প্রতি অন্যায় তো করা হলই। যে রাজ্যে সরকার শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষাই নিয়ে উঠতে পারে না দশ বছর ধরে, সেখানে এমন অদ্ভুত নিয়োগ বিধি কি শিক্ষিত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিন্তু অভিজ্ঞতাহীন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা প্রার্থীদের প্রতি নিষ্ঠুর তামাশা নয়?

স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যজুড়ে অনেকে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে। দশ বছরে একবার পরীক্ষা, তার নিয়োগ বিধি তৈরির নামেও যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়, তখন তো রাস্তাই একমাত্র রাস্তা। আসলে তেতো সত্যিটা হল, পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা অন্যায়। নানা ফন্দিফিকিরে সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। কত আশা ঝরে পড়ল, কত আশা লাশে পরিণত হল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. typical syndrome of post Communist society with failed record of shock therapy .. due to systematic destruction of economy . society . polity of bengal by Communists .. it is inevitable that it would be warlordism…

    both highly educated & lowly educated class are going outside the state for their sustenance and half educated people with no economic opportunities are craving for Govt jobs ..

    Shame Shame Shame to Communist who destroyed my state to the ground

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.