‘এখানে ঈশ্বর বাস করেন।’

ফলক পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম গির্জা চত্বরে। ৯ এপ্রিল, শনিবারের সন্ধে। দুপুরের গরমটা আর নেই, সন্ধেবেলায় ফুরফুরে হাওয়া বইছে। ফুটপাথের ওপর শনিমন্দির থেকে ঘন্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে, সন্ধ্যারতি চলছে। শনিবার ভিড় কম, সানডে মাসে লোকসমাগম অনেক বেশি হয়। আবার অনেকের কাছে হয়ত এখনো খবর পৌঁছয়নি যে করোনা অতিমারীর পর গির্জা আবার সকলের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম প্রবেশদ্বারের দিকে। ভিতরে ঢুকতেই প্রভু যীশুর সেই শান্ত, সমাহিত মূর্তি। দামী মেহগনি, সেগুন কাঠের আসবাবপত্র, আর তার থেকেও দামি ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরে যীশু, এবং মা মেরির কিছু তৈলচিত্র। ফাদার রাফায়েল কালো গাউন পরে বাংলায় পবিত্র বাইবেল থেকে পাঠ করছেন। তিনিই এখন এই গির্জার তত্ত্বাবধানে আছেন, সিস্টার নেকটারিয়া পারদিসি এখন গ্রীসে গিয়েছেন। অতিমারীর কারণে গির্জা প্রায় দুবছর বন্ধ ছিল, তাই সিস্টারের দেশে যাবার ফুরসত মিলেছে। সেই ১৯৯১ সাল থেকে গ্রীক দূতাবাস এই গির্জার দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছে। অনেকদিন বন্ধ হয়ে থাকা এই গির্জাকে নতুন জীবন দিয়েছেন তিনি। এখন টালিগঞ্জের দিকে একটা অনাথ আশ্রম আর ইগনিয়াস স্কুলেরও দায়িত্বে আছেন।

সপ্তদশ শতকের শুরু থেকে গ্রীকদের কলকাতায় আগমন। আস্তে আস্তে শহরটার সাথে তাদের আত্মিক বন্ধন গড়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতকে কলকাতায় গ্রীকদের সংখ্যা নগণ্য ছিল না। সেই গ্রীকরা সকলেই ছিলেন ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য। তাঁদেরই উদ্যোগে এই শহরে গির্জা এবং গ্রীক কবরখানা তৈরি হয়।

কালীঘাট ট্রাম ডিপোর পাশে রসা রোড ও লাইব্রেরি রোডের ঠিক মাঝখানে এই গ্রীক অর্থোডক্স চার্চ। হলুদ রঙের গির্জা, হঠাৎ করে দেখলে কোনো গ্রীক মন্দির বলে ভুল হয়। বারান্দার চারটে থাম ত্রিভুজাকৃতি বিরাট ইমারতটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ওয়ারেন হেস্টিংসের অর্থানুকুল্যে এই গির্জা তৈরি হয়, দেওয়ালে সে কথাও লেখা আছে

গ্রীকদের এই গির্জাটা তুলনায় নতুন। প্রথম গির্জা তৈরি হয় ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পরিত্যক্ত হয়। তারপর গির্জা তৈরি আমড়াতলা ঘাট স্ট্রিটে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রধানত গ্রীক ব্যবসায়ী আরগিরি এবং কলকাতার গ্রীকদের উদ্যোগে সেই গির্জা তৈরি হয়েছিল। এই আমড়াতলা গির্জার পিছনে ছিল একটা কবরখানা, যা পরবর্তীকালে ফুলবাগান অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়। কবরখানায় ছিল প্রায় দুশো কবর। সবকটাতে শবদেহ না থাকলেও কবরের উপরের ফলক দেখে বোঝা যায় সেই সময় কলকাতায় থাকা গ্রীকরা কতটা সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী ছিলেন। ধীরে ধীরে আমড়াতলার এই অঞ্চল জনাকীর্ণ ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হয়ে ওঠার ফলে গির্জার নিস্তব্ধতা বিঘ্নিত হয়। তাই ১৯২৫ সালে কালীঘাটের এই অঞ্চলে এই গির্জা স্থানান্তরিত হয়।

গ্রীকরা আমাদের কাছে নতুন নন। সেই কোন ছোটবেলায় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছোটদের রামায়ণ, ছেলেদের মহাভারতের সাথে ইলিয়াড, ওডিসির কাহিনী আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত। তারপর ইতিহাস বইয়ে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার আর ভারতীয় রাজা পুরুর কাহিনি পড়েছি। কিন্তু আলেকজান্ডার বাহিনী ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিন্ধু নদের তীর থেকে না এগোলেও উত্তরসূরীরা সপ্তদশ শতকে কিন্তু আরও এগিয়ে এসে হুগলি নদীর পাড়ে আস্তানা গেড়েছিলেন।

গ্রীকদের নিয়ে আমাদের পড়াশোনা থেমে থাকেনি। প্লেটো, অ্যারিস্টটলের দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা আমাদের বিস্মিত করেছে। আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার বীজ যে প্রাচীন গ্রিসের পলিস বা নগররাষ্ট্রের মধ্যে, এ কথাও আমরা জেনেছি। শাসকের কোপানলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সক্রেটিসের ইতিহাস আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে।

১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো দ্য গামা ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করে ইউরোপীয় বণিকদের ভারতে আসার পথ সুগম করে দিলেন। পর্তুগীজ, আর্মেনীয়, ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজ বণিকরা ভারতে পাড়ি জমালেন। সবশেষে এলেন গ্রীসের বণিকরা। তাঁরা কলকাতা আর ঢাকাকে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। ঢাকায় নুন আর কলকাতায় প্রধানত পাট এবং মশলার কারবার করতেন।

বাণিজ্য করতে দোভাষীর প্রয়োজন হত। সেই প্রয়োজনেই সপ্তদশ শতকের শেষে কলকাতায় আগমন ঘটল হেডি অ্যালেক্সিস আরগিরির। গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। আরগিরি ব্যবসার প্রয়োজনে একবার আলেকজান্দ্রা জাহাজে মোচা (ইয়েমেন), জেদ্দা প্রভৃতি জায়গায় যাত্রা করেন। কিন্তু সেই জাহাজ এক ভয়ানক সাইক্লোনের সম্মুখীন হয়। সেই ঝড়ের হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়ে তিনি কলকাতায় গ্রীক চার্চ তৈরি করবেন স্থির করেন। কিন্তু কলকাতায় ফিরে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে আমড়াতলার গির্জার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার আগেই আরাগিরির জীবনদীপ নির্বাপিত হয়। কলকাতা শহরের গ্রীক বাসিন্দারা এগিয়ে আসেন তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে।

গ্রীকরা এই শহরটাকে আপন করে নিতে শুরু করলেও স্বদেশের সঙ্গে বন্ধন ছিন্ন করেননি। কলকাতার সম্ভ্রান্ত, ধনী, প্রভাবশালী গ্রীকরা মূলত এসেছিলেন তদানীন্তন গ্রীসের পন্তাস, বিথিনিয়া, ক্যাপাদোসিয়া প্রভৃতি জায়গা থেকে। গ্রীসের মানুষ যখন অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন কলকাতার গ্রীক অধিবাসীরা অর্থসাহায্যের জন্য বিনা বাক্যব্যয়ে এগিয়ে আসেন।

কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে ইংরেজদের সাথে গ্রীকরাও শহর ছাড়তে থাকেন। গ্রীকরা দলে দলে লন্ডন, জোহানেসবার্গ রওনা হন। কেউ কেউ আবার দেশে ফিরে যান। ১৯৬০ সালে কলকাতায় একজনও গ্রীক না থাকায় কালীঘাটের গির্জা চরম অব্যবস্থার মধ্যে পড়ে। ১৯৭২ সালে দরজা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে কলকাতার গ্রীক দূতাবাস সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সেইসময় এই গির্জার প্রধান পুরোহিত ছিলেন ইগনেসিওস। তাঁর উদ্যোগেই এখানে সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠে, আসেন সিস্টার নেকটারিয়া পারদিসি এখন এই শহরের গ্রীকদের অভিভাবক।

গুড ফ্রাইডে পালন করতে এখন যাঁরা গ্রীক চার্চে আসেন তাঁরা প্রায় সবাই ধর্মান্তরিত বাঙালি খ্রিস্টান, কেউই গ্রীক অভিবাসী নন।

তথ্যঋণ: দ্য টেলিগ্রাফ; অচেনা এই কলকাতা, রমাপদ চৌধুরী সম্পাদিত

আরো পড়ুন

সুরিনাম ঘাট: পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.