একেকসময় কী যেন হয়, গম্ভীর বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজতে ইচ্ছা করে না আর। পড়ি, পড়ি মন করে বটে। কিন্তু বই খুলে বসলেই মন আর কালির আখরে আটকে থাকতে চায় না, এদিক ওদিক ছুটে পালায়। বই পড়া মাথায় ওঠে, অক্ষরগুলো আর অর্থের পিঠে চড়ে মাথায় সেঁধোয় না। হালফ্যাশনের নিয়মমত একেই চিনতে শিখেছি ‘রিডার্স ব্লক’ হিসাবে। এই অসুখের টোটকা হিসাবে একদা গুরুস্থানীয়রা যেমনটা শিখিয়েছেন, তেমনভাবেই হাতের গুরুগম্ভীর বই নামিয়ে রেখে বরং খুঁজে পেতে বার করতে হয় ছোট লেখা, টানটান লেখা। যে লেখা ওসব ব্লক-টক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে ফের পড়ায় মন ফিরিয়ে আনবে। এবছরের বইমেলা-উত্তর পর্বে যখন রিডার্স ব্লক এসে ঘাড়ে চেপে বসল, নেহাতই সৌভাগ্য বলতে হবে যে হাতে এসে পড়ল একটা চটি বই – ঘুনসিযন্ত্রের রহস্য। সে বইয়ের শুরুটা এইরকম

বংশীবদনের আজ সকাল থেকেই মনটা বড়ো খারাপ। বুকের মধ্যে কী যেন একটা দুঃখ চাপ হয়ে বসে আছে। অনেক ভেবেও দুঃখটা কীসের বংশী তার কোনও কূলকিনারা পাচ্ছে না। পরশু রাত্রে দু-বারের পর তিনবার ডাল চাওয়াতে বউ উমারানি কষে গাল দিয়েছিল বটে কিন্তু তার দুঃখ কি আর দু-দিন পার করে মনে চাগাড় দেবে? এই ঘটনা বাদ দিলে গত হপ্তায় তার একটা দাঁত পড়েছে আর শুক্কুরবার পাড়ার কুকুর ঘটিগরম তার একপাটি চটি মুখে করে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। তবে কথাটা হল, দাঁতটা ওকে ভোগাচ্ছিল তা বহুদিন ধরেই আর চটিটার আগের পাটিটা খোয়া গেছিল গত পুজোতে। অতএব ওই দুটো ঘটনা আজকের দুঃখের কারণ হতে পারে না। তবে কি অন্য কিছু হয়েছে, যেটা বুকে চোরকাঁটার মত খোঁচা মারছে?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কী, গন্ধটা খুব সন্দেহজনক লাগছে তো? লাগতে পারে, যদি না অত ভাবার আগেই তাড়াতাড়ি পাতা উলটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই যে লেখা রয়েছে, আসল বিপদটা আসবে তারপর। বিপদ! সে আবার কী? কেন? কার?

শুরু হয়ে যায় ধুন্ধুমার গল্প। সে গল্পের একদিকে আছে বংশীবদন আর তার ছেলে গণশা, একই অঙ্গে বহুরূপ কানাই মাস্টার ওরফে কৃষ্ণকমল কানুনগো ওরফে কন্নন গোপালন কৃষ্ণন। অন্যদিকে রয়েছে টিভি চ্যানেলের মালিক মানচান্দানি আর তার হুকুমের চামচা, নিউজ অ্যাঙ্কর সমুদ্র। আর আছে একটি পানপাতার আকৃতির লকেট।

উঁহু, রহস্য আছে যখন, আর বিশেষত বই যখন মাত্র ৮৫-৮৬ পাতার, তখন গপ্প নিয়ে আর কিছু বলা যাবে না। তবে কিশোর গল্পের ফর্মুলা মেনে এই বই দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের ধ্বজা ওড়ালেও এটা কি আদতে কোমলমতি সব ধরনের কিশোর-কিশোরীদের? আপাতভাবে কল্পবিজ্ঞানের মোড়ক থাকলেও আদতে এই বইয়ের পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশের দুনিয়াকে নিয়ে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। খলনায়করা সংবাদমাধ্যমকে তাঁবে এনে, মানুষকে বিনামূল্যে ইন্টারনেট পাইয়ে দিয়ে, সোশাল মিডিয়াকে কব্জা করে মানুষের ভাবনার দখল নিতে চায়। মনে হয়, যথেষ্ট সমাজ তথা রাজনীতি সচেতন পরিবেশে বড় না হলে এ বইয়ের মার্জিত নাগরিক রসের নাগাল এমনকি বড়রাও পাবে না। সমুদ্রের চরিত্রও কি কিশোরদের বোধগম্য হবে? তা জানা নেই, তবে এ বই যে বড়দের মন ভাল করার দাওয়াই তা মানতেই হবে।

এ বই স্বপ্ন দেখার বই, স্বপ্ন দেখানোর বই। পড়তে পড়তে ভাবতে ভাল লাগে এদেশের শিশুরা অভিজিৎ মাস্টারের মত একজন শিক্ষক পাচ্ছে, যার ছোঁয়ায় তার চেতনার ভুবন বদলে যাচ্ছে। “বর্ষারাতের আকাশচেরা যে অশনি নিজের অসংবৃত মহাশক্তিতে চরাচরে ধ্বংস নিয়ে আসে সেই একই তড়িৎ যে আমাদের সকল চিন্তাকে বেঁধে রেখেছে এই বোধ কৃষ্ণনকে যেন ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। ফিজিক্স কেমিস্ট্রি বায়োলজির সমস্ত কৃত্রিম সীমানা এক নিমেষে মুছে গেল।” হিংসে করতে ইচ্ছে হয় কৃষ্ণনের শিক্ষকভাগ্যকে। ঠিক তেমনই মন জুড়িয়ে যায় একেবারে শেষে যখন দুষ্টের দমনে ঝাঁটা হাতে সমুর পিসি, হাতুড়ি নিয়ে রামাকান্ত কামার নেমে পড়ে। মায় রহিম চাচার মেয়েও কাস্তে হাতে ভিলেন-সহায়ক ভগবান দারোগাকে মারতে চলে আসে আর পালের গোদা নাকাল হয় কুকুর-বিড়ালের হাতে। দৈবের ন্যায়বিচার, যাকে পরিণত বয়সে কল্পনা বলেই চিনতে শিখেছি, আবার যেন এক ঝলকের জন্য বিশ্বাস করতে মন চায়। আজকের গ্রামে কি আর এমন ঐক্য সম্ভব? ধুত! কূট প্রশ্ন দূর হটো। মন ডুব দিক ইতিবাচক ভাবনার সাগরে।

আরো পড়ুন বাংলা রহস্য কাহিনিতে মৃত পাখির উড়ান

তবে লেখকের কাছে অভিযোগও আছে বৈকি। কানাই মাস্টারের যে ছবি মনের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে যেন কোনো যন্ত্রের আবিষ্কর্তা হিসাবে টিভিতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার লোলুপতা মানায় না। অবশ্য খুঁটিয়ে দেখতে গেলে তেমন অনেককিছুই চোখে পড়ে। যেমন বইয়ের একটি-দুটি মুদ্রণ প্রমাদ অথবা প্রথম শিরোনামের পাতা থেকেই পৃষ্ঠাসংখ্যা গণনার অভ্যাস। আবার তেমনই চোখ আটকে যায় বইয়ের প্রচ্ছদ ও ভিতরের পর্বে পর্বে অলংকরণে। রঙিন প্রচ্ছদে তো বটেই, ভিতরের সাদাকালো ছবিতেও আলো আলো ভাব।  খুশির আমেজে ভরা ছবিগুলোর গায়েও নস্ট্যালজিয়ার গন্ধ। বিজ্ঞান ছুঁয়ে যাওয়াটা অবশ্য লেখকের নিজস্বতা। ওইখানে চকিতে আসল ‘অভিজিৎ মাস্টার’ উঁকি দিয়েছেন। এমন জাত মাস্টাররা কেন যে সরাসরি বিজ্ঞান নিয়ে ছোটদের উপযোগী লেখাও লেখেন না! এদেশে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পরিসরটি এতই ক্ষুদ্র আর সাধারণ বাচ্চাদের সে সুযোগ এতই কম যে এই ধরনের লেখকদের না লেখার দুঃখ বড় বাজে।

হ্যাঁ, শুরুতে দেওয়া বইয়ের উদ্ধৃতি পড়ে যা মনে এসেছিল সেটাই সঠিক। এখানে লেখক সজ্ঞানে তাঁর শৈশব, কৈশোরের বুকের তলায় বালিশ চেপে পূজাবার্ষিকীর রহস্য গল্প পড়ার সময়কে ফিরিয়ে আনার চেষ্টাই করেছেন। একেবারে ‘সজ্ঞানে টুকলিফাই’, কারণ তাঁর মতে ‘নকল করা হল সব থেকে বড় ফ্ল্যাটারি।’ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই বইটি দুজন মানুষকে উৎসর্গ করা। একজন তো বোঝাই যাচ্ছে – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। আরেকজন কে? একজন সমকালীন শিরদাঁড়াযুক্ত মানুষ। আন্দাজ করুন দেখি?

ঘুনসিযন্ত্রের রহস্য
লেখক: অভিজিৎ মজুমদার
প্রকাশক: গুরুচন্ডা৯ ট্রাস্টের পক্ষে জ্যোতিষ্ক দত্ত
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: রমিত চট্টোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ সহায়তা: সায়ন কর ভৌমিক
মূল্য: ১৩০ টাকা

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.