সুপ্রিয়া চৌধুরীকে এখনো নায়িকা হিসাবে আমাদের বোঝা হল না।

সুপ্রিয়ার সঙ্গে একদা আমার দেখা হয় বেসরকারি একটি টিভি স্টুডিওতে, তখন তাঁর সদ্য হাঁটু অপারেশন হয়েছে। ব্যথাকাতর তিনি আমাকে বলেছিলেন – “শুধু ঋত্বিকবাবুর জন্যই এলাম। শুধু এই নীতার বিষয়ে কথা বলার জন্যই এলাম, নাহলে কী যে যন্ত্রণা!” আমি খেয়াল করছিলাম এই বর্ষীয়সী নায়িকার দীর্ঘ গ্রীবা। তিনি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, আমি একটু অস্বস্তিতে তাঁকে জানাই যে আপনার এই গলা রাজহাঁসের মত লম্বা বলেই ঋত্বিকদা আপনাকে মেঘে ঢাকা তারাকোমল গান্ধার-এ পছন্দ করেছিলেন। তিনি, যেন মুখে চাঁদ উঠেছে, স্মিত হেসে জানালেন – “ও মা, তাই নাকি? আমাকে ঋত্বিকদা কখনো বলেননি তো!” সুপ্রিয়া আমাকে জানান, প্রথমদিনের দেখাটা বেশ বিস্ময়কর। “ঋত্বিকবাবু আমাকে ডাকছেন শুনে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাই তাঁদের ভবানীপুরের বাড়িতে। শুটিং দেরিতে শেষ হওয়ায় আমার একটু দেরি হয়েছিল, ট্যাক্সি থেকে নেমেই দেখি লম্বা ঋত্বিকদা বাড়ির সামনে অধৈর্য হয়ে পায়চারি করছেন। আমি একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে তাঁর কাছে পৌঁছবার চেষ্টা করতেই চটিটা ছিঁড়ে যায়। তিনি সেটা খেয়ালও করেন। আমি জানি না, কিন্তু আমার বিশ্বাস মেঘে ঢাকা তারার শেষে চটির যে স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে যাওয়া দেখানো আছে, তা ভবানীপুরের সেই বিকেলের স্মৃতি থেকে।” আমি ভাবছিলাম ঋত্বিকদা তাঁকে নিয়ে যে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন তার অনেককিছুই হয়ত সুপ্রিয়া জানেন না। যেমন বতিচেল্লির বিভিন্ন মুখাবয়ব, শুধু ‘বার্থ অফ ভেনাস’ নয়, ঋত্বিক ব্যবহার করেছেন কোমল গান্ধারে সুপ্রিয়ার নানা ক্লোজ আপে। কেন না কোমল গান্ধারে ঋত্বিক সময়ের নানা স্তর যুক্ত করতে চাইছিলেন। সুপ্রিয়ার মুখ তাঁকে সাহায্য করেছিল রেনেসাঁস-পূর্ব চিত্রকলার উদ্ধৃতি ব্যবহার করতে। যেমনভাবে ওই দীর্ঘ গ্রীবা মেঘে ঢাকা তারার নীতাকে জগজ্জননীর সমীপবর্তী করে, ঋত্বিক তেমনভাবেই ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি…’ গানটির শেষে চূর্ণ কুন্তল ও আলোক বিচ্ছুরিত মুখখানি বিজয় দশমীর প্রতিমা হিসাবে প্রয়োগ করেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সের্গেই আইজেনস্টাইন একবার বলেছিলেন এল গ্রেকোর নিসর্গ চিত্রগুলি তাঁর শ্রেষ্ঠ আত্ম প্রতিকৃতি। দেখা যাবে মেঘে ঢাকা তারা ও কোমল গান্ধারে অনেক ল্যান্ডস্কেপই সুপ্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘সারপ্লাস অফ আইকনোগ্রাফিক সাইনস’। অর্থাৎ সুপ্রিয়ার মুখের সঙ্গে বাংলার কিছুটা নিজস্ব প্রতিচ্ছায়া যেন জুড়ে আছে। সৌন্দর্যের নিরীখে তিনি অরুন্ধতী দেবী বা সুচিত্রা সেন নন, কিন্তু তাঁর শরীরী উপস্থিতি অনেক সময়েই বাংলাদেশের অগোছালো প্রাণপ্রতিমা হয়ে থাকতে পারে। একথার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ তো কোমল গান্ধারের শেষ দৃশ্য, যেখানে ঋত্বিক সুপ্রিয়াকে ভাস্কর্যে উন্নীত করেছেন।

কোমল গান্ধার
কোমল গান্ধার ছবির শেষ দৃশ্যে

তাছাড়াও আমরা যা বুঝতে পারিনি বা চাইনি তা হল, সুপ্রিয়া বিশেষ বিশেষ ভূমিকায় এক ধরনের আতঙ্ক নির্মাণ করেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। তাঁর এই ভঙ্গিমা অনেকক্ষেত্রে হলিউডের মে ওয়েস্টের নাশকতার সঙ্গে তুলনীয়। আম্রপালী ছবিতে তাঁর নৃত্যভঙ্গিমা যেরকম শাণিত ও উদ্ধত, অথবা মন নিয়ে ছবিতে ছোট বোনের ভূমিকায় তিনি যেরকম প্ররোচনামূলক, তা সাধারণভাবে বাঙালি নায়িকাদের চরিত্র নয়।

মন নিয়ে
মন নিয়ে ছবিতে

আর এই আপাতভাবে সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে সুপ্রিয়া নিজেকে ‘নক্ষত্র’ রূপে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। কারণ আমরা জানতাম যে সিনেমার মধ্যে যেমন তিনি উত্তম-সঙ্গিনী, পর্দার বাইরেও তাঁর উত্তম সঙ্গ আছে, আর তা একদা আমাদের কম কৌতূহল জাগায়নি। সম্পর্কের এই অশান্তি মাঝে মাঝেই বাঙালির আড্ডায় আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ ফরাসী সমাজতাত্ত্বিক এদগার মর‍্যাঁ যেমন দাবি করেছিলেন যে ‘স্টার’ হল সেই অভিনেতা যার একটি জীবনী আছে। সুপ্রিয়া, আজ স্বচ্ছন্দে বলা যায়, পর্দার বাইরে মঞ্চের আড়ালে তিনি যে দ্রৌপদীর মত রন্ধনপটিয়সী, উত্তমকুমার তাঁর হাতের ভেটকি মাছের কাঁটাচচ্চড়ি ছাড়া মুখে তুলতে চাইতেন না কিছু – এসবও আমাদের রোজনামচার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। এমন সর্বাঙ্গীণ, সর্বার্থসাধক অভিনেত্রী চলে গেলে আমাদের সিনেমার তো গরিব হয়ে যাওয়ারই কথা। অন্তত গরিব নায়িকার ভূমিকা, মুখে ব্রণর দাগ, এমন নটী সুপ্রিয়া ছাড়া আর কে কীভাবে কবে হবেন তা বলা দুষ্কর। তাঁর প্রয়াণে আমাদের স্মৃতি কিছুটা উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। বলা বাহুল্য পর্দায় প্রত্যক্ষ অনুপস্থিতির জন্য আমরা তাঁকে কিছুটা বিস্মরণে নিয়ে গিয়েছিলাম। বস্তুত এখনো যে তাঁর বিষয়ে মাঝে মাঝে কথা হয়, তা মূলত ঋত্বিক ঘটকের দুটি অবিস্মরণীয় নির্মাণ নিয়ে। বলা বাহুল্য মেঘে ঢাকা তারার নীতা ও কোমল গান্ধারের অনসূয়া প্রায় কিংবদন্তি। দেবী ও মানবীর মধ্যে একটি সেতুবন্ধন ঋত্বিক করতে পেরেছিলেন সুপ্রিয়ার দেহভঙ্গিমা, দীর্ঘ গ্রীবা ও কিছুটা অমসৃণ কণ্ঠস্বরে। আমরা খেয়াল করিনি, উত্তর-স্বাধীনতা পর্বে কানন দেবী ও সুচিত্রার পরে – এমনকি মাধবী, কাবেরী বসু ও অপর্ণা সেনকে মাথায় রাখলেও – সুপ্রিয়া কিছুটা অনিয়মের স্বাক্ষর। তাঁর মুখে ও উচ্চারণে কিছুটা রুক্ষতা আছে যা স্বপ্নহীন মধ্যবিত্ত পরিবারে লক্ষ করা যায়। এই সত্য শুধু নীতার ক্ষেত্রে নয়, অনসূয়া যখন দেশমাতৃকা হয়ে যায় তখনো নয়, এমনকি জনপ্রিয়তার নুড়িপাথরে যেখানে সুপ্রিয়া উত্তমকুমার সহ অথবা উত্তমবিহীন, সেখানেও মুদ্রিত আছে।

একথা ঠিক, ঋত্বিক ছাড়া অন্য পরিচালকরা তাঁকে সভয়ে পরিহার করেছেন। কিন্তু যখনই সুপ্রিয়া অজয় করের মত পরিচালকের কাছে কাজ করেছেন তখনই শুন বরনারী নির্মিত হয়েছে। সেখানে উত্তমকুমার ছাড়াই তিনি গুরুত্বপূর্ণ। অসিত সেনের সঙ্গে তাঁর একটি অসামান্য নির্মাণ, স্বরলিপি, উল্লেখ করতে পারি। এখানে সুপ্রিয়া সৌমিত্রের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু পোশাকে, উচ্চারণে, ভ্রূভঙ্গিতে তাঁর নিজস্ব চিহ্ন অনুপস্থিত ছিল না। একথা এমনকি সাতের দশকের শুরুতে উত্তমকুমারের পরিচালনায় বনপলাশীর পদাবলী ছবিতেও সত্য।

আরো পড়ুন ‘বাম বৃত্তে না থাকায় উত্তমকুমার বুদ্ধিজীবীদের অবজ্ঞার শিকার হয়েছেন’

তাহলে সুপ্রিয়া চৌধুরী কে? কীভাবে আমরা তাঁকে সিনেমার ইতিহাসে স্থান দেব? একটু তদন্ত করলে দেখা যাবে বাঙালি অভিনেত্রীদের মধ্যে সুপ্রিয়া দেবীই শরীরকে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় ব্যবহার করেছেন। পাঁচের দশকের একেবারে শেষে আম্রপালী ছবিতে তাঁর শরীরের উচ্ছ্বাস দেখে আমরা যুগপৎ মুগ্ধ ও হতচকিত হই। এই একই জিনিস সনতের সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন কম্পোজিশনে মেঘে ঢাকা তারায় দেখা গেছে। ঋত্বিক বস্তুত সুপ্রিয়ার দেহরেখাগুলিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীত্ব সম্পর্কে যে ধারণা তার বিপরীতে প্রয়োগ করেছেন। সেদিক থেকে দেখলে সুপ্রিয়া আমাদের মে ওয়েস্ট বা লিজ টেলর।

মেঘে ঢাকা তারা
মেঘে ঢাকা তারা ছবির একটি দৃশ্য

অভিনেত্রী হিসাবে তাঁর সফলতার বাইরেও দাম্পত্য অশান্তি বা উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর বহুখ্যাত সম্পর্ক তাঁকে নক্ষত্রের পর্যায়ে উন্নীত করে। আমরা বলতেই পারি, সুপ্রিয়া এমন একজন অভিনেত্রী, যাঁর জীবনী পর্দার পাশে পাশে ভবানীপুরের রাস্তাতেও হাঁটে। যখন তিনি উত্তমকুমারের সঙ্গে বসু পরিবার ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তখন ভারতীয় গণতন্ত্রের উন্মেষের সময়। বলা বাহুল্য আমরা সংস্কৃত নন্দনতত্ত্ব থেকে উদ্বাস্তু কলোনির দিকে এগিয়ে আসি। আর সুচিত্রার অস্তের পরে সুপ্রিয়া যখন উত্তম-সঙ্গিনী হয়ে উঠলেন, তখন নিশ্চিতভাবেই দেখা গেল তিনি শুধু রোম্যান্টিকতার চিহ্নায়ন নয়, বরং সিগমুন্ড ফ্রয়েডের থেকে ধার নিয়ে বলা যায়, তাঁর শরীর ও কণ্ঠস্বর অনেক সময়েই ‘ক্যাস্ট্রেশন কমপ্লেক্স’-কে উস্কে দেয়। সুপ্রিয়ার প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গিয়েছিল, অভিনয় যে অতুলনীয় শ্রম ও নিষ্ঠা দাবি করে তার একটি পর্বের অবসান হল। আর কে পাবনা জেলার মেয়ে হয়ে, বর্মাফেরত হয়েও নীতার চরিত্রে ঢাকাই বাঙাল ভাষা অমন নিখুঁতভাবে বলবেন? অথবা নিতান্ত ঘটি গীতা দেকেও শেখাবেন ঢাকাই বাঙাল উচ্চারণ? এমনকি মন নিয়ে জাতীয় তুচ্ছাতিতুচ্ছ ছবিতেও তিনি যৌনতার যে বিপর্যন্ত মানচিত্র তৈরি করতে পেরেছিলেন, আজকের বাংলা সিনেমার দিকে তাকালে তাকে অবাস্তব মনে হয়। কাল তুমি আলেয়া থেকে আরম্ভ করে আরও অনেক ছবিতেই তাঁকে নিজের উপস্থিতি রূপে নয়, গুণে প্রমাণ করতে হয়েছিল। আজকে সিনেমার পর্দায় সেই গুণটুকুও অনুপস্থিত। আজ শুধুই মেঘে ঢাকা তারার কথা মনে পড়বে, আর সেই বিখ্যাত সংলাপ “দাদা আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম।”

সুপ্রিয়া চৌধুরীকে বোঝার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.