মৃণাল শতপথী

দূরে কোথাও একটা যুদ্ধ হচ্ছে আজম শেখ জানে না। সে চন্দ্রকোণা রেলস্টেশন থেকে কিছুটা দূরে মস্ত পাকুড় গাছের নিচে বসে আছে তার ঘোড়া বাছুনিয়ার পিঠে। বৃদ্ধ আজম শেখের চোখে কালো চশমা। ছানি কাটানোর পর সেই যে পরেছিল আজও ছাড়েনি। শালবনীর রোদতপ্ত পাথুরে গ্রামগুলির ধুলো ভরা রাস্তা ধরে ঘোড়া ছোটানোর সময় দুনিয়াকে সে ছায়া-শীতল দেখে। শরীর নির্মেদ, ঋজু, ধনুকের ছিলার মত টানটান। সামান্য কুঞ্চন আসা প্রশস্ত কপাল, পাকা শনের মতো চুল ঘাড় ছাড়িয়ে কাঁধের উপর লতিয়ে পড়ে থাকে। ঘন্টার পর ঘন্টা আজও ঘোড়া ছোটাতে পারে সে। দেহের ঝাঁকুনিতে কাঁধে পড়ে থাকা চুল লাফায়। পরনে অকাচা তহমতের সঙ্গে বুক কাটা লম্বা ঢোলা চোগা। নিজেকে তার সৈনিক মনে হয়। জঙ্গল ছাড়িয়ে বড় বড় গাছপালায় ঢাকা ছোট রেলস্টেশন চন্দ্রকোণা। এখানে সে বাছুনিয়াকে রেলগাড়ি দেখাতে নিয়ে আসে নিয়ম করে।

ঘন শালবন চিরে সাপের মত রেলগাড়ি ছোটে তীব্র শিসে। তাকে পাল্লা দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয় আজম শেখ। বনের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ, গাছেদের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় ছুটে যাওয়া রেলগাড়ি। আজম শেখ বাঁশের হ্যান্ডেল দেওয়া চাবুক হাঁকড়ায়, জোরসে দৌড় বুড়হা, আজ কে জিতে দেখি, তুই নাকি লোহালক্কড়, উও খিলোনে কা অজগর! গড়বেতার জঙ্গলে এসে প্রতিবার ট্রেনটাকে কোথায় হারিয়ে ফেলে। গড়বেতা স্টেশন ছাড়িয়ে ততক্ষণে চলে গেছে সে। খোয়াব দেখে, একদিন রেলগাড়িকে হারিয়ে দেবে তার বাছুনিয়া।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বুড়ো বাছুনিয়ার পিঠে চেপে ঘুরে বেড়ায় মাঠ ঘাট প্রান্তর। গোঁসাইবাঁধ, গোপালপুর, শিরসা, জয়ন্তীপুর, ঝাকরা, কল্লা, মহেশপুর, চন্দ্রকোণার কতশত গ্রাম। কখনো ভাঙা পিচের রাস্তা, লাল মোরাম, আবার জমির অপরিসর আল ধরে ধানঘোরির দিকে। জঙ্গল রাস্তায় ছায়া আর পাথর খাদানে জমা স্বচ্ছ জল পেলে থামে। বাছুনিয়া জল খায়, ছায়ায় জিরোয়। আজম শেখ লালচে বাদামিবর্ণ ঘোড়াটির তপ্ত কপালের সাদা একফালি চাঁদে হাত বোলায়, স্নেহের স্পর্শ রাখে ঘোড়ার কেশরে। মুখ ফাঁক করে পাকা দাঁত দেখে।

“বুড়হা হো গেলি, খুরের জোর কইমেছে তোর।”

ঘোড়ার নেশা তার কিশোরবেলা থেকে। বাপ পিটেমেরেও ইশকুলে পাঠাতে পারেনি। বাছুনিয়ার জন্য ঘর থেকে পালিয়ে কত জায়গায় ঘুরেছে, কত ঘোড়ার হাটে। তরুণ বয়সে গোপীনাথপুর মেলার ঘোড়ার হাটেও গেছে। জমিদারের চালু করা প্রতি দোলপূর্ণিমার মেলায় সেখানে বসে বিরাট হাট, তিন হাজারের বেশি ঘোড়া বিক্রির জন্য আসে। মুসলমান ঘোড়া বিক্রেতারা তাদের খামার থেকে আনে মাদি, মদ্দা নানা কিসিমের ঘোড়া, ঘোড়ার বাচ্চা। তিন বছর, চার বছরের পোক্ত তাজি জাতের ঘোড়া সবের কী রঙ, কী স্বাস্থ্য, ভরাট তাদের পাছা, সুন্দর করে ছাঁটা কেশর, মাদিদের বাহারি নাম, জেসমিন, কিরণমালা, বিজলীরানি! দৌড়ের মাঠে সে সব ঘোড়ার পিঠে উঠে দেখেছে, গিরিস মারা খুরে ফুলকি ছোটে। দরদামে পোষায় না। শেষে ফেরার পথে মা মরা পাঁচমাসের ঘোড়ার বাচ্চার সন্ধান পায় পাঁশকুড়ার এক চাষি বাড়িতে। বড় করুণ তার চোখদুটি। গরু মহিষের সঙ্গে একটি মাদি ঘোড়া পুষেছিল চাষি। একেবারে জলের দামে পায় শিশু ঘোড়াটিকে, নাম রাখে বাছুনিয়া। তেরো মাসের ঘোড়ার পিঠে চেপে গেছে ফতেমাদের গাঁয়ে, সাদাতপুর। ঘোড়া ঘিরে ভিড় জমে গিয়েছিল ছেলেবুড়োর।

“কে গো তুমি বঠে, আইসছ কুথান থিইকে?”

“আমি হলম সৈনিক, যুদ্ধ কইরতে গেছলম!”

“যুদ্ধ হচ্ছে কুথায় বঠে?”

সে কথার উত্তর না করে সে ঘোড়া হাঁটায় দুলকি চালে, পিছু পিছু বাচ্চা-বুড়ো। ভাঙা পাথরে বসে পুকুরে বাসন ধোয় কিশোরী ফতেমা। মাথায় গামছা গিঁট করে বাঁধা। আড়চোখে দেখে, কে এই ভিনদেশী। ফতেমার চোখে সে তখন যুদ্ধবাজ বীর ঘোড়সওয়ার! বাছুনিয়ার পিঠে চড়েই একদিন পিয়াশালের অরণ্যপথে পালায় দুজন।

কুসুমগাছের ফাঁকে ঐ জামবর্ণ মেঘ। সেদিকে তাকিয়ে আজম শেখ বলে, বাছুনিয়া, চল এবার। যেতে যেতে বৃষ্টি নামে। আজম শেখ ছোটায় না তাকে, অলস চালে হাঁটে। বনের ভেতর লক্ষ পাতায় পড়া জলের শব্দে ঘোর আসে, আনমনা করে। বৃষ্টিতে ভেজে আজম শেখ আর তার ঘোড়া।

“হ রে বুড়হা, কার সঙ্গে কার যুদ্ধ হইছে?”

জবাবে বাছুনিয়া মুখ থেকে ফ্যারর করে তাচ্ছিল্যের শব্দ বের করে।

ঘোড়াই তার সব – এ কথা সংসারে এসে বুঝেছিল ফতেমা। যুদ্ধের বাজারে আগুন জিনিসপত্র। নিজে আধপেটা খেয়ে ঘোড়ার মুখে তুলে দিয়েছে দানা। তার যত্নআত্তি। তাকে গা ধোয়ানো, খড় দিয়ে তার গোটা দেহ মেজে পরিষ্কার করা, শুকনো কাপড়ে মোছা। পায়ের খুরে জমা হওয়া মাটি-পাথরকুচি হুক দিয়ে কুরে কুরে বের করা, গিরিসে চকচকে হয়ে ওঠে খুর। ঘোড়ার রোগ জ্বালা, অজীর্ণ রোগ, রাত জেগেছে। ঘোড়ার ডাক্তারের কাছে পড়ে থেকেছে হত্যে দিয়ে। নিজের কোলের বাচ্চা খিদেয় কাঁদে, ফতেমা উঠানে বাঁশের খুঁটি ধরে চেয়ে থাকে দূর আকাশপানে। যে বীর ঘোড়সওয়ারকে দেখে ঘর ছেড়েছিল ফতেমা, কাছে এসে দেখে যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া বহুদূর, যুদ্ধ কী তা-ই জানে না সে। কোথায় যুদ্ধ হয়, কার সাথে কার, কিচ্ছু না, কেবল পালিয়ে বেড়ায়।

“বউ-বিটাকে ভাত দিতে লার-অ, তুমি একটা সঙের সৈনিক, পুতলা!”

ঘোড়া এখন ফতেমার দু-চোখের বিষ। রোগে ভুগে একদিন মরে বাছুনিয়া। তার ফুলে থাকা পেটের উপর হাত বুলিয়ে কাঁদে আজম শেখ। মনে মনে খুশি হয় ফতেমা। লোকটার ঘোড়া নিয়ে এই পাগলপন বুঝি গেল এবার। অবাক হয়ে দেখে আবার সে ছুটেছে মাঠে ঘাটে প্রান্তরে, নতুন ঘোড়ার খোঁজে। সে ঘোড়ার আবার নাম দেয় বাছুনিয়া!

জঙ্গল শেষ হয়ে পাকা রাস্তায় ওঠে। এই পথ ধরে ঘাটাল, পাঁশকুড়া, বাগনান, হাওড়া। বাছুনিয়াকে কলকাতা দেখিয়ে এনেছিল একবার মনে পড়ে। রাজপথে মানুষের, গাড়িঘোড়ার অবিরাম চলমান ভিড়। কোথায় ছুটে চলেছে সব দিগদিশাহীন। রাজপথে হঠাৎ এসে পড়া এক লাল ঘোড়ার সওয়ার দেখে ক্ষণিকের জন্যে থমকে দাঁড়ায়, অবাক হয়, রাস্তা করে দেয়। সেই পথ ধরে টগবগিয়ে রাজার মতন মাথা উঁচু করে গেছে আজম শেখ। মহানগর অভিবাদনে নত হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, সে সব সোনার দিন ফিরবে আবার, আবার মহানগরের পথে পাড়ি দেবে সে।

ঘরে কামাই নেই। তার চেয়ে বড়, কামাইয়ের কোশিসও নেই! কিন্তু ঘোড়ার খাবারই বা জোগাবে কীভাবে? মাঝে মাঝে গাড়ি জুড়ে দিয়েছে ঘোড়ার সঙ্গে। বিয়েশাদিতে ভাড়া খাটে। ফুল লতাপাতায় সাজানো জুড়িগাড়ি, বর-কনে আলো করে বসে থাকে। কিছু টাকা পায়, বাছুনিয়ার চলে যায়। সে কাজও ভালো লাগে না। আজম শেখের রক্তে বল্গাহীন ছুটে বেড়ানোর নেশা। গ্রাম শহর নগর জল-জঙ্গল পার করে সে যায়। স্থানে স্থানে বিচিত্র মানুষ, হরেক কিসিমের জীবন, তাজ্জব ঘটনা তাকে দুর্নিবার টানে। একেক প্রান্তে গল্প শোনার এমন আজিব নশা তাকে মাতিয়ে রাখে। সবচেয়ে ভালো লাগে তার যুদ্ধের গল্প শুনতে। কোন দূর দেশে আকাশ ছেয়ে যায় ভোমরার মত যুদ্ধবিমানে। পেট থেকে বোমা ওগরাতে ওগরাতে যায়। গ্রাম নগর জনপদ তছনছ করে যায়। হাজার হাজার মাইল দূরে যুদ্ধ হয় আর এখানে জিনিসের দাম মানুষের হ্যাসিয়েতের বাহার চলে যায় কী করে, তার এই পাকা মাথার বুদ্ধিতে কুলোয় না। এরোপ্লেনের যুদ্ধ কায়েরদের যুদ্ধ। ঘোড়ায় চড়ে হাতে তলওয়ার নিয়ে ছুটে যাওয়া আসলি মর্দের যুদ্ধ, খুনে আগুন লেগে যায়! এক জায়গার গল্প বুকে বয়ে সে ছোটে অন্য জায়গায়। মধ্যরাতের শুনশান গ্রাম ঘোড়ার ছুটন্ত খুরের ধ্বনি শোনে ঘুমের ভেতর।

রাতে পাশে শুয়ে ফতেমা কেঁদেছে কতবার, আল্লার কিরা দিয়েছে, তার পা ধরেছে, বাত সমঝো, মেরে লিয়ে না সহি, আপনে বচ্চে কে লিয়ে। অস্থির হয়েছে আজম শেখ, বলেছে, চিন্তা কোরো না বেগম, ঢঙের একটা কাম কাজ ধরবই জলদি। ফতেমাকে ফেলে রেখে রাতের অন্ধকারে নিঃসাড়ে ঘোড়া যুতে আবার উধাও হয়েছে। মাসাধিককাল পর ফিরে এসে দেখে ঘর খাঁ খাঁ। দিশাহারা হয়ে বেগমকে খোঁজে, সারা গ্রাম হাঁক দিয়ে ঘোরে, ফতেমা, বেগম! ফতেমা কি বাচ্চা নিয়ে মাইকে চলে গেল? সে ঘরের দরজা যে তার বন্ধ। লোকে বলে, না, শিশুটি তার অসুখে মরেছে, বিনা ইলাজে। সন্তানকে গোর দিয়ে ফতেমা সেই যে গিয়ে ঊঠল দূরান্তের ট্রেনে, আর কোনোদিন ফিরে এলো না।

পাকুড় গাছের তলায় কালো চশমা চোখে অপেক্ষা করে আজম শেখ। কবেকার মরে যাওয়া শিশুটির জন্য বুকের ভেতর আজিব এক দর্দ পুষে রেখেছে সে। ট্রেনের তীক্ষ্ম শিস। ঝমঝমিয়ে আসে রেলগাড়ি। থামে। আবার চলা শুরু করে। গতি বাড়ায়। রেলগাড়ির ওপর তার কিসের গোপন রাগ? সে কি ফতেমাকে কেড়ে নিয়ে গেছে বলে, নাকি তার ঘোড়ার চেয়ে দ্রুত ছোটে লক্কড়কা ইয়ে যান? তাকে হারাতেই হবে!

“চল বুড়হা, ইয়ে আখরি জঙ্গ তুঝে জিতনা হ্যায় মেরা বাচ্চা!”

বাঁশ হ্যান্ডেলের চাবুক চলে সপাং সপাং, উর্ধ্বশ্বাসে ছোটে বাছুনিয়া, ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছোটে তিরবেগে, রেললাইনের ধার দিয়ে, জমির আলের উপর দিয়ে, নালা-ডোবা লাফ দিয়ে, ভাঙা রাস্তা, মোরাম রাস্তা, বনপথের জটিল আবর্ত দিয়ে, সহায়সম্বলসম্পর্কহীন আজম শেখের বৃদ্ধ দেহ তুমুল কাঁপে সৈনিকের মত, হৃদপিণ্ড উপড়ে আসা ঘোড়ার মুখে সফেদ ফেনা, দীঘল বনের ফাঁকে ফাঁকে ট্রেন হারায়, আবার উঠে আসে, সর্পিল লৌহ পথে সর্বনাশের মত ছোটে বেতমিজ, সুতীব্র শিস দিয়ে, ইসে হারানা হ্যায়, হারানা হ্যায়, ঐ দূরে স্টেশন দেখা যায়, সেখানে কে আগে পৌঁছবে, সে কি জিতবে, সে কি হারবে, মুহূর্তে সবকিছুই শূন্য হয়ে জেগে থাকে এক গতি, তুমুল গতির ভেতর ব্যথার আশ্চর্য উপশম, গতির ভেতর ডুবে যায়, উঠে আসে, হারিয়ে যায় বউটির মুখ, তার শিশুটি, দীন দুনিয়া, আজম শেখের ঘোড়া ছোটে, ছুটে যাওয়াই এই বেওকুফ জীবনের নিয়তি তার,

আরো পড়ুন পাঁচিল 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.