অরিজিৎ সেন

অলস আড্ডা চলছিল পাড়ার চায়ের দোকানে। রাতের আড্ডা। প্রায় বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। শহরের শব্দগুলো কমে এসেছে। হঠাৎ মোটা ভাঙা গলায় ভেসে এল –

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি
আমার মনের ভিতরে…

আমাদের সবার চোখ চলে গেল গানের উৎসের দিকে।
“রামজীবন মেসো! শরীর খারাপ নাকি?”
টলতে টলতে অশীতিপর অশক্ত রামজীবন মুখার্জী আমাদের দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে এগিয়ে গেলেন। গানের শব্দ ওঁর বাড়ির দরজার ভিতরে মিলিয়ে গেল।
“মদ খায় নাকি লোকটা?” রনি জিজ্ঞেস করল।
“ কোনোদিন খেয়েছে বলে তো শুনিনি। এই বয়সে তো আর ধরবে না,” বিলু বলল।
“এত ফুর্তি কিসের বুড়োটার?”
“মাথাটা গেছে বোধহয়।”
আমার মনটা অন্য রাস্তা ধরল। বুড়ো বয়সটা বেশ, তাই না? বেশিদিন আর এই যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতে হবে না, বেশি দিন আর এই লতাপাতাকে সত্যি আবরণ বলে ভাবতে হবে না। অনিশ্চয়তা ডাক দেবে – বিযুক্তি ডাক দেবে…
“কী রে? তুইও খেলাঘর বাঁধছিস নাকি?” ঘন্টে পিঠে চাপড় দিল।
“বাড়ি যাই।” আমি উঠলাম।
তখন দশটা বাজে, রামজীবন মেসো আস্তে আস্তে মন থেকে মুছে গেল, আবার ফিরে এল তিন ঘন্টা পরে, রাত একটায়, অসীমদার ফোনে। “ঋজু – একবার আসবি – বাবার কিছু একটা হয়েছে…”
রামজীবন মুখার্জী রোজ সন্ধ্যায় দাবার আসরে যান, রাতে ফেরেন। সেদিনও ফিরেছেন। গানটা রাস্তার লোক শুনেছে, বাড়ির লোক শোনেনি। বাড়ির লোক দেখেছে লোকটিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতন ঘরে প্রবেশ করতে। বেসিনের সামনে দাঁড়াতে। আয়নার দিকে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে। তারপর ডান হাত দিয়ে নিজের পেটের নিচে কিছু খুঁজতে শুরু করতে, খানিকক্ষণ পরে পেয়ে যান যা খুঁজছিলেন। নিজের পায়জামার দড়ি! এক টানে খুলে ফেলেন সেটা। গুরুগম্ভীর লোকটা খুলে আম বেআব্রু হয়ে যান। বাড়ির লোক বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে – ধরতে আসে – আসার আগে বেসিনের গায়ে পেচ্ছাপ করতে শুরু করেন রামজীবন মুখার্জী। বেসিনের গা বেয়ে মূত্রধারা শখের কার্পেটের গা ভিজিয়ে দেয়। অনন্তকালের জমা মূত্র নির্গত হতে থাকে যেন। তারপর রামজীবনবাবু, উলঙ্গ রামজীবনবাবু নিজের শোওয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে যান। ‘বাবা’, ‘দাদান’ শব্দগুলো উপেক্ষা করে রামজীবনবাবু নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন, মানে ভেজিয়ে দেন। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় তিনি শুয়ে আছেন, চোখ খোলা, ঠোঁটে হাসি, মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি।

অ্যাম্বুলেন্স ডাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অসীমদার এই কোভিডের বাজারে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। অতএব সকালে পাড়ার ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে হল। আমিই নিয়ে এলাম তাকে।
“ স্ট্রোক হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলাম।
“হতে পারে।”
বুঝলাম কনফিডেন্টলি বললেন না, মানে না-ও হতে পারে।
“সোডিয়াম ড্রপ করতে পারে। আচ্ছা উনি তো ল্যাসিক্স খান? তাই না?”
“খান,” বৌদি বলল।
“তাহলে তাই হবে। সোডিয়াম, পটাশিয়ামটা বাড়িতে কাউকে দেখে যেতে বলুন, মানে ব্লাড নিয়ে যেতে বলুন। ওটা ঠিক থাকলে একটা ব্রেন স্ক্যান। এমনি প্রেশার ট্রেশার তো ঠিকই আছে।”
ব্লাড টেস্ট হল, সেদিন স্ক্যানও করালাম । সব ঠিক আছে, শুধু লোকটা হঠাৎ পাল্টে গেছে। কাউকে চিনতে পারছেন না, খাচ্ছেন না, মুচকি মুচকি হাসছেন।
বিকেলে রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের গেলাম। তিনি আরও লম্বা একটা ইনভেস্টিগেশনের ফর্দ ধরিয়ে দিলেন।
“ডেলিরিয়াম।” ডাক্তারবাবু বললেন।
“ সেটা আবার কী?” অসীমদা জিজ্ঞেস করল।
“নিউরোলজিস্ট দেখাতে লাগবে। ভর্তিও করতে হতে পারে।” নিজের পায়ে বল রাখলেন না ডাক্তারবাবু।

একটা কাজে দুদিনের জন্য কলকাতার বাইরে যেতে হয়েছিল। ফোনও করা হয়নি। ফিরে দেখলাম পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। রামজীবনবাবুর বাড়িতে রীতিমত উৎসবের মেজাজ!
একটা চেয়ারে রামজীবন মেসো বসে ধর্মগুরুর স্টাইলে । বৌদি, মানে অসীমদার বউ, হারমোনিয়াম বাজিয়ে “জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে” গাইছে। কজন অচেনা লোক ভক্তিতে গদগদ হয়ে আশেপাশে বসে মাথা নাড়াচ্ছে।
বললাম “কিছু মাথায় ঢুকছে না।”
অসীমদা আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, “কারোরই কিছু ঢুকছে না। এই অভিনয়টা না করলে বাবাকে কিচ্ছু খাওয়ানো যাচ্ছে না।”
“ও, এটা অভিনয়?”
“আবার কী? সবাই অভিনয় করছে। বাবা ছাড়া। পাশের ঘরে আয়, বলছি।”
পাশের ঘরে গেলাম। অসীমদা খাটে পা তুলে বসে বলতে শুরু করল। “২৪ ঘন্টা কিছু খাওয়ানো যায়নি – তুই জানিস। হাসপাতালে ভর্তির তোড়জোড় করছি, হঠাৎ বাবার গলা পেলাম –

এই তো প্রেমে পড়লে সবে
এখনই অশ্রুনদী –
এবার কী হয় দেখতে পাবে
সঙ্গে থাকো যদি।”

“আরে, এ তো চেনা কবিতা!” আমি বললাম।
“ও, আমি ভেবেছিলাম বুঝি বাবার লেখা।”
“না না। আচ্ছা বেশ, তুমি বলতে থাকো, খুব চেনা লাইন। ভাবছি।”
“বেশ এই কবিতা বলে বাবা ওই চেয়ারে এসে বসল। আমি ডাকলাম, বাবা… বাবা বলল “উহুঁ এখানে কেউ কারোর না।” আমি বললাম, এখানে মানে বাবা? তুমি তো বাড়িতেই আছো। বাবা বলল ‘বাড়ি? ঠিকই। এটাই আমার বাড়ি। চিরস্থায়ী বাড়ি। আগেরটা মিথ্যে, মায়া।’ আমি বুঝলাম বাবা অন্য জগতে হাঁটছে। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী বলো তো?
“মীর তকী মীর”, আমি বললাম।
“কী বললি?” অসীমদা বলল।

“ইবতেদা-এ-ইশ্ক হ্যায়
রোতা হ্যায় কেয়া
আগে আগে দেখিয়ে
হোতা হ্যায় কেয়া।

মীর তকী মীরের বিখ্যাত গজল। মেশোমশাই তার অনুবাদ করেছেন। ভালোই করেছেন

এই তো প্রেমে পড়লে সব
এখনই অশ্রুনদী
এবার কী হয় দেখতে পাবে
সঙ্গে থাকো যদি।”

“ও” অসীমদা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল। “তারপর শোন, বাবা নিজের নামটা ঠিকই বলল। কী করত বলল। ছেলে, নাতি, পুত্রবধূ, মৃতা স্ত্রী – সবার নামই বলল। আমি জিজ্ঞেস করলাম “জন্মসাল মনে আছে?” বাবা বলল “আছে জন্ম ১৯৪০, ১২ই আগস্ট। মৃত্যু ২০২১, ৭ই নভেম্বর!”
আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। “মানে ৭ই নভেম্বর তো সেই দিন, যেদিন রাতে মেসোমশাই গান গাইছিলেন, ইউরিন…
“ঠিক। বাবার বিশ্বাস ওদিন উনি মারা যান।”
“মারা যান?”
“হ্যাঁ। চোখের সামনে পিছনে, চারপাশে আঁধার নেমে আসে। কালো ছায়া ঢেকে দেয় আকাশ। শুধু একটু আলো জেগে থাকে।”
“কীসব বলছ, অসীমদা?”
“আমি না, বাবার কথা। শুনে যা। সেই আলো, মানে আলোর রেখা, পথ দেখায়, বাঁশিওয়ালার মতন হাতছানি দেয়, বাবা এগিয়ে যায়, এগোতে থাকে, এগোতে থাকে, দিন, রাত, বছর, যুগ কেটে যায়, দেখা যায় একটা নদী…”
“নদী?”
“নদী — সেই নদী পেরোতে হবে। হাঁটুজল, বাবা পা ডোবায়, গরম জল ছেঁকা দিয়ে ওঠে, বাবা যেতে পারে না…”
“আরেব্বাস!”
“এবার সেই ফুটন্ত জলে বাবার পাশে একটা জন্তু এসে দাঁড়ায়। ষাঁড় একটা….
“ষাঁড়?”
“ষাঁড়টা দাঁড়াতেই নদীর জল শীতল হয়ে যায়। বাবা নদী পার হয়ে যায় ওপারে, মানে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করে।”
“ষাঁড়টা নন্দী নাকি?”
“তাই হবে বাবা বিস্তারিত জানায়নি।”
“সেই থেকে বাবা স্বর্গরাজ্য আছে। সেখানে শুধু সঙ্গীত আর আনন্দ। তার ব্যবস্থাই আমরা করেছি। তোর বৌদি ওভারটাইম খেটে গান শোনাচ্ছে। নাটকের দল থেকে ভাড়া করে ভক্তবৃন্দকে আনছি। পিতৃদেবকে কামধেনুর দুধ বা কল্পতরুজাত মধু বলে হরলিক্স বা ডি প্রোটিন খাওয়ানো হচ্ছে। হাসিস না… হাসিস না… সমাধান বের কর, এভাবে চলতে পারে না… হাতজোড় করছি ঋজু, পথ দেখা…”

তো এই পথ দেখাতে গিয়েই আমার গোলাম ফরিদের নাম শোনা।
মেসোমশাইয়ের এক দাবার আড্ডা ছিল। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা – বিরামহীন দাবার আসর বসত সেখানে। একটা বটগাছের নিচে। জায়গাটার নামও বটতলা। বেশি দূর না, তবে শহরের সীমা ছাড়িয়ে মফস্বল ঘেঁষা জায়গা – রিকশায় পনেরো মিনিট।
এই বটগাছের তলায় সেদিন, মানে ৭ই নভেম্বর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। তিরিশ বছরে প্রথমবার এমন ঘটনা ঘটে। সে কথায় আসছি।
মেসোমশাই সুস্থ দেহে এবং মস্তিষ্কে সেদিন দাবার আসরে যান, “খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি” গাইতে গাইতে ফেরেন। অর্থাৎ, আমার গোদা বুদ্ধিতে এই খেলার আসরেই কিছু একটা ঘটেছিল, পুরো ঘটনার মিসিং লিঙ্ক!
সেই মিসিং লিঙ্কের সন্ধানে আমি বটতলা গেলাম। আড্ডা চলছিল, মেসোমশাইয়ের কথা জানালাম। সবাই যারপরনাই বিস্মিত হল। সেদিন কোনোরকম বিচ্যুতিই কারোর চোখে পড়েনি। শুধু একটা ঘটনা ঘটেছিল । তিরিশ বছরে প্রথমবার মেসোমশাই দাবায় হেরে যান। তাও হারেন একটা আনকোরা বাচ্চা ছেলের কাছে, যার নাম গোলাম ফরিদ, যে মূলত দর্শকাসন থেকে দাবার লড়াই দেখত। সেদিন কেন জানি না খেলতে বসে, তাও আবার সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে “রামজীবনবাবু কিন্তু খারাপ খেলছিলেন না। দিব্যি খেলছিলেন রোজকার মতই”, দাবার আসরের একজন বলেন।
“কিন্তু ছেলেটার উপর যেন ঈশ্বর ভর করেছিল,” আরেকজন মাথা নাড়ান। “রামজীবন কেন, কারোরই ওর বিরুদ্ধে কিছু করা সম্ভব ছিল না।”
আমি অধৈর্য হয়ে বলি “তারপর? খেলা শেষের পর?”
“রামজীবন উঠে দাঁড়ায়। মাথা নাড়াতে নাড়াতে এগিয়ে চেনা রিকশায় ওঠে।”
রিকশা পাড়ার মোড়ে নামিয়ে দেয়… রামজীবনবাবু গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যান… এই অংশটা আমি জানি।
“গোলাম ফরিদ কই?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। কেউ বলতে পারল না। একজন একটা মেসের ঠিকানা দিল। সেদিনের পর গোলাম ফরিদ বটতলায় আসেনি।

গোলাম ফরিদকে খুঁজতে যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি জানি না – কোথায় যাচ্ছি? মেস – হ্যাঁ মেসে গেছি, সেখানে নেই… চলে গেছে। গ্রামের বাড়ির ঠিকানা পেয়েছি, সেখানকার ট্রেন ধরেছি, ট্রেন চলছে, আমি জানলার ধারে, সন্ধ্যার আকাশ চলছে, চাঁদ চলছে, অকালের বৃষ্টিতে জমা ধানক্ষেতে জমা জল চলছে।
কেন যাচ্ছি? গোলাম ফরিদকে পেলে কোন রহস্যের সমাধান হবে? কোন অসুখ সারবে? কোনো উত্তর আমার জানা নেই। শুধু জানি আমিও সম্মোহিত – রামজীবন মুখার্জীর মতন আমিও যেন কোনো বাঁশিওয়ালার আহ্বানে এগিয়ে চলেছি… ট্রেন যত এগোচ্ছে বিশ্বাস তত দৃঢ় হচ্ছে গোলাম ফরিদ সেই বাঁশিওয়ালা – লাটাইয়ের সুতোয় ওড়াচ্ছে আমাদের সবাইকে…
… টিমটিমে আলোর স্টেশনে নামলাম, বাইরে দাঁড়ানো রিকশাভ্যানকে ঠিকানা জানালাম, পৌঁছেও গেলাম, পেয়েও গেলাম বাড়ি…
…“আচ্ছা সবাই ভাইয়ের খোঁজে বিরক্ত করছেন কেন সকাল থেকে?” ব্রণর দাগওয়ালা লম্বা বছর পঁচিশের একটা ছেলে বলল, “আমরা কিছু জানি না।”
“কী জানেন না?” আমি বললাম।
“ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্ট, যার জন্য আপনি এসেছেন।”
“আ্যাক্সিডেন্ট ?আমি তো কিছুই জানি না।”
“মিথ্যে কথা বলছেন। আপনি পুলিশের লোক।”
“বিশ্বাস করুন…”
“ভাই নেই। কাল রাতে রেললাইনের…কী বলব দাদা হয়ে…সুইসাইড করেছে।”
“কী বলছেন!”
“আর না…এবার আসুন…আমাদের মানসিক অবস্থা ঠিক নেই, ভাই কলকাতায় মেসে থাকত, কী করত জানি না, পরশু রাতে এসেছিল…”
সশব্দে দরজা বন্ধ হয়ে গেল মুখের উপর।
হেমন্তের রাতে, বাঁকা চাঁদ, টুকরো মেঘ, ইটের রাস্তা, আর কৌতূহলী কয়েকটা চোখের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।

বড্ড তাড়াতাড়ি সবকিছু ঘটছে, সিনেমার মত। একটা লোকের দাবায় হেরে যাওয়া, হেরে গিয়ে অন্য জগতে বিলীন হয়ে যাওয়া, যে হারিয়েছে তার আত্মহত্যা, মাথা বিমঝিম করে উঠছে আমার।
ফিরতি ট্রেন ফাঁকা। ট্রেনের জানলায় মাথা এগিয়ে দিয়ে ভাবছি আমি কীভাবে জড়িয়ে পড়লাম এসবের মধ্যে…
ভাবছি আর গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু…অন্ধকারের ভিতর থেকে জোলো হাওয়া আমার মুখে ধাক্কা মারছে। মোবাইলে গুগল সার্চ করলাম। গোলাম ফরিদ…কেন করলাম জানি না…পাঞ্জাবি সুফি কবি। জন্ম ১৮৪৫, মৃত্যু ১৯০১…ধুস…ফোন বেজে উঠল।
…অসীমদা…
“বলো দাদা”
“কোথায় তুই?”
“সত্যি কথা বলব?”
“আলবাৎ।”
“গোলাম ফরিদের খোঁজে বেরিয়েছি।”
“সে কে?”
“মেসোমশাই যার কাছে দাবায় হেরেছিল।”
“খুঁজে কী হবে?”
“জানি না।”
“আর কিছুতেই কিছু লাভ নেই।”
“মানে?”
“বাবা মিসিং। পাওয়া যাচ্ছে না।”
“সারাদিন পর সবাই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম – বাবা বেরিয়ে গেছে!”
“কী বলছ?”
“ঠিকই বলছি। পাড়ায় কেউ খেয়াল করেনি, কেউ দেখেনি, থানায় যাব ভাবছি, তাই তোকে ফোন করছিলাম।”
“থানায় যেও না। আমি আধঘন্টায় আসছি।”
আমি জানি কোথায় যেতে হবে।

বটতলা। ফাঁকা গাছের তলা। একা মেসোমশাই বসে। সামনে দাবার বোর্ড। কেউ যেন খেলেছে এক্ষুনি। একজন জিতেছে। একজন হেরেছে।
“হাবুল, এসেছিস?” মেসোমশাই অসীমদাকে ডাকল। “ঋজু, তুমিও! কী ব্যাপার, এত উদ্বিগ্ন কেন?”
মেসোমশাইয়ের গলার স্বর, কথাবার্তা একদম স্বাভাবিক। কোন অপার্থিব ছোঁয়া তাতে নেই।
“কার সাথে খেলছিলে বাবা?”
“আরে বলিস না। একটা বাচ্চা ছেলে আমায় চ্যালেঞ্জ করল, বলল হারিয়ে দেবে। আমি বললাম, বাছা, তিরিশ বছর কেউ আমায় হারায়নি। তাও চ্যালেঞ্জ করল, দশ মিনিটে কিস্তি মাত করে দিলাম।”
অধৈর্য হয়ে বললাম “ছেলেটার নাম কী মেসোমশাই?”
“কী যেন নাম? আরে পাশে একটা মেসে থাকে…কী যেন নাম…বড় বড় কথা বলে, সে নাকি মীর তকী মীরের কবিতা অনুবাদ করে…ইডিয়ট হেরে কেমন পালিয়ে গেছে দ্যাখ…চল হাবুল বাড়ি চল। দেরি হয়ে গেছে না একটু? চল…”
অসীমদা আর রামজীবনবাবু রিকশায় উঠল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একা। ভয় লাগছিল না। জানি গোলাম ফরিদ কাছে পিঠে কোথাও নেই। চলে গেছে। রামজীবনবাবুকে বাঁচানোর জন্য সে শেষবারের জন্য শুধু হারতে এসেছিল।

আরো পড়ুন অ্যালফাবেট ক্লাব

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.