মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়

২ অক্টোবর ১৯৪৭ গান্ধীর জীবনের শেষ জন্মদিন। এরপরের জন্মদিনগুলিতে তিনি হয়ে উঠবেন মালায়, পুষ্পে সুসজ্জিত জাতির জনক। এরপর থেকে ২ অক্টোবর জাতীয় ছুটির দিন। আরও পরে দোসরা অক্টোবর মানে রাজঘাটে রাজন্যবর্গের নিয়মমাফিক দর্শন এবং কোনো কোনো গান্ধী আশ্রমে নিয়মরক্ষার চরকা কাটা, রামধুন গাওয়া আর তাঁর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকা কিছু ব্রাত্যজন। যখনই কোনো রাষ্ট্রনায়ক এ দেশে আসেন তাঁকে অবশ্যই নিয়ে যাওয়া হয় রাজঘাটে। তিনি যে মতেই বিশ্বাস করুন, ভারত মানে গান্ধী – এই যে পরিচয় দুনিয়া জুড়ে, সে কারণেই হয়ত এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। কিন্তু আসল কথা হল, তিনি এই দেশ তথা দুনিয়া সম্পর্কে যা কিছু ভেবেছিলেন, যে পথে তিনি হেঁটেছিলেন একা অথবা অনেকের সাথে, সেই স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই যে রাষ্ট্রীয় ভাবনায় নেই তা বোঝা যায়।

স্বাধীন ভারতে গান্ধীকে মৃত্যুর হাত থেকে দূরে রাখা গিয়েছিল মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস। তারই মধ্যে জন্মদিনে তিনি বলেছিলেন, আমার বিস্ময় জাগে, লজ্জা হয় যে এখনো বেঁচে আছি। আজ আমার কথা কেউ শোনে না। একটা সময় ছিল যখন আমি ১২৫ বছর বাঁচতে চেয়েছিলাম, এখন আর চাই না। কেননা যে হিন্দ স্বরাজের কথা তিনি ভেবেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। নেহরুকে লেখা তাঁর শেষ গুরুত্বপূর্ণ চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন দেশ সম্পর্কে দুজনের ভাবনার পার্থক্য। গান্ধী জানতেন তাঁর দেশ লক্ষ লক্ষ গ্রামে বাস করে। স্বাধীনতার পর তিনি কংগ্রেসকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেন স্বাধীনতার জন্য তৈরি করা এই দল ভেঙে দেওয়া হয়, সমস্ত কর্মী যেন ছড়িয়ে পড়ে এ দেশের গ্রামগুলিতে এবং সেখানকার কাজে আত্মনিয়োগ করে। এরপর আর কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন কথা বলবেন না। এরপর নগর হবে কেন্দ্র আর জল, জঙ্গল, জমির স্বাভাবিক নিয়ম লঙ্ঘন করে চলবে উন্নয়ন, যার খেসারত দশকের পর দশক দিয়ে যাবে নিজ বাসভূমে পরবাসী হওয়া এ দেশের জনসাধারণ। স্বাধীন ভারত ঘোর শিল্পায়নের পশ্চিমী ধাঁচে বিকশিত হতে গিয়ে তার প্রাণভোমরা কৃষি ও হস্তশিল্পকে চূড়ান্ত অবহেলা করেছে, যা ছিল কোটি কোটি মানুষের ভরসা। সেইসঙ্গে বুনিয়াদী শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করেছে। ফলে সাত দশকেও একটি গোটা প্রজন্মকে সাক্ষর করা যায়নি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এরকমই চলছিল। মুদ্রায় গান্ধীর ছবি ছেপে তাঁর সমস্ত আদর্শ বিসর্জন দিয়ে তাঁকে একরকম সরিয়েই রেখেছে রাজশক্তি। শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মননের একটা বড় অংশ তাঁর এই ‘কঠোর’ জীবনযাপন, বিজ্ঞান সম্পর্কে সন্দেহ, বৃহৎশিল্পের প্রতি অনাস্থাকে যেমন বর্জন করেছে, তেমনই বহু প্রচারে মেনে নিয়েছে – তিনি এই সভ্যতায় বেমানান। একদা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সিঁড়িতে তাঁকে দেখে ঔপনিবেশিক শাসক (যার দৌলতে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ঘটে) যে মন্তব্য করেছিলেন, আজকের কর্পোরেট সংস্কৃতির অনুগামী ভারতীয়রাও প্রায় তেমনই ভাবেন। আগের জমানায় গান্ধীর স্মৃতিভার হয়ত বা এত সরাসরি রাজদণ্ডকে বণিকের মানদণ্ডে পরিণত করতে পারেনি, হয়ত কিছু চক্ষুলজ্জা ছিল। বর্তমান শাসক গান্ধীর ভাবনাকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়ার পরিকল্পিত রাজনীতি নিয়ে চলছে। এমনকি গান্ধীর নামাঙ্কিত সংস্থার পত্রিকা সাভারকর সংখ্যা প্রকাশ করছে।

তবু বিগত কয়েক বছরে এ দেশের অভূতপূর্ব বিদ্বেষময় পরিস্থিতিতে আবার ডান, বাম সবারই মনে পড়েছে তাঁকে। যে নাস্তিক রাজনীতির আঙিনায় ধর্মের বাড়বাড়ন্তকে নেহাতই বাল্যখিল্য সমস্যা ভেবে একদা উপহাস করেছেন, আজ ঘরে ঘরে পথে পথে শুধু ধর্মের কারণে ভোট নেওয়া ও গণহত্যার হিড়িক তাকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতবিক্ষত সমাজে আবার সম্প্রীতির বীজ বপন করার পথ এ দেশে একমাত্র গান্ধীই জানতেন। নোয়াখালীর পথে পথে একখানি লাঠিতে ভর দিয়ে, জীবন সায়াহ্নে পায়ে হেঁটে নড়বড়ে সেতু পেরিয়ে তিনি মানুষের প্রতি মানুষের ভরসা ফিরিয়ে এনেছিলেন, নতুন সেতুবন্ধন করেছিলেন। তার অনেক আগে পুণা চুক্তির সময় কারাবন্দী গান্ধীর অনশনভঙ্গের সময়ে পাশে বসে বন্ধু রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন, জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো। এই করুণা যেন সেই বুদ্ধের করুণা। যা থেকে উদ্ভূত প্রেম ক্ষতবিক্ষত মনকে কিছুটা হলেও জুড়তে পারে।

১৯৮৯ সালের শেষদিকে স্বাধীন ভারতের প্রথম সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক গণহত্যা ঘটে ভাগলপুরে। তার পরে সাহিত্যিক সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষের আহ্বানে আমরা কিছু ছাত্রী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ বেশ কয়েকবার সেখানে গিয়েছি। নিরন্তর প্রয়াসের পর একটি ছোট অংশে হন্তারক ও আক্রান্তের পরিবারদের একসাথে বসানো সম্ভব হয়। এই পথ ছিল একান্তই গান্ধীর পথ। আজ তাঁকে স্মরণ করছে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। উদ্যত হিংসার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে তারা। তাদের এক হাতে ভগৎ সিং, এক হাতে গান্ধী। কারো সঙ্গে আম্বেদকর। আজাদির স্লোগান দিতে গিয়ে বলে উঠছেন, হামে চাহিয়ে গান্ধীওয়ালা আজাদি।

গান্ধীই যে আজকের ভারতে সম্প্রীতির প্রধান প্রতীক, একথা সবচেয়ে ভালো জানে তারা, একদিন যারা মেরেছিল তারে গিয়ে। সংঘ পরিবারের গান্ধীকে নিয়ে সমস্যা কিছুতেই কমে না। চুয়াত্তর বছর আগে আশি ছুঁই ছুঁই মানুষটিকে প্রার্থনা সভায় যাওয়ার পথে মেরে ফেলেও শেষ করা যায়নি। ইদানীং এ দেশের প্রথম উগ্রপন্থী নাথুরাম গডসেকে নায়ক বানানোর বহু চেষ্টা চলছে, যদিও ঐতিহাসিকভাবে গডসের গান্ধীহত্যা ছাড়া আর কোনো বিশিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায় না। গান্ধীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি এতই কম যে তা নিয়েও বিশেষ কিছু করা যায়নি। শেষমেশ তাঁর চশমাটিকে স্বচ্ছ ভারতের লোগো করে দিয়ে খানিক ভার কমানো গেছে। খুঁড়ে খুঁড়ে গান্ধীই এ দেশের যাবতীয় বিপর্যয়ের কারণ – এমনটা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি কারণ ৭৪ বছর হল তিনি সশরীরে উপস্থিত নেই। অতএব যত দোষ শুধু নেহরুর। স্বাধীনতার লড়াইয়ে সংঘ পিতামহদের ভূমিকা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে, এদিকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর এসে পড়ল। সেই মহোৎসবে বিষকে অমৃতে পরিণত করার একমাত্র উপায় ইতিহাস নতুন করে লেখা। ১৯১৭ সালে আমেদাবাদের কাছেই গড়ে উঠেছিল সবরমতী আশ্রম। গান্ধীর পরবর্তী এক দশকের বেশি সময় কেটেছে সেখানে। এখান থেকেই শুরু হয় বিখ্যাত ডান্ডি পদযাত্রা। সেই সত্যাগ্রহ গোটা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে। সবরমতী আশ্রমের মূল অংশে এখনো সেই স্মৃতি বিদ্যমান। ইতিমধ্যেই আশ্রমের আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সেটি চটকদার আধুনিকতার ছোঁয়া পায়, যে আধুনিকতার গান্ধী ছিলেন চিরবিরোধী। তবু তাঁকে শেষ করা গেল না।

রামের নামে যে ভোট চায়, রাম জন্মভূমির ঐতিহাসিক ভিত্তিকে অস্বীকার করে আস্থার ভিত্তিকে গুরুত্ব দিয়ে যারা দেশ জুড়ে উন্মাদনার সৃষ্টি করে, তাদের সামনে দাঁড়াতে পারেন এই গান্ধী, যিনি রঘুপতি রাঘব রাজা রামকে বলবেন পতিতপাবন আর বলবেন “ঈশ্বর আল্লা তেরো নাম”। গান্ধী অনুগামীদের মুখে এই রামনাম শুনলেই ক্ষিপ্ত হয় সংঘ পরিবার, তারা নাথুরামকে স্মরণ করে।

দুনিয়াজুড়ে বাড়তে থাকা পরিবেশ আন্দোলনের মূল সূত্রটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন গান্ধী কত আগে। এই পৃথিবী সকলের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু একক ব্যক্তির লোভকে মেটানোর ক্ষমতা তার নেই। সভ্যের বর্বর লোভ আজ এমন এক মহাশঙ্কার সামনে আমাদের ফেলেছে যে গোটা পৃথিবী বিনাশের মুখোমুখি। বহুকাল আগে এই সভ্যতার সমালোচনায় গান্ধী স্পষ্ট বলেছিলেন, একটি ক্ষুদ্র দ্বীপের মানুষের চাহিদা মেটাতে যদি অর্ধেক দুনিয়াকে গোলাম বানাতে হয়, তবে ভারতের মত দেশের জনসাধারণের চাহিদা পূরণ করতে কতগুলি পৃথিবীর দরকার পড়বে! পঙ্গপালের আক্রমণের মত দুনিয়া ছারখার হয়ে যাবে। আমরা তো ভুবন বাজারে বাস করি এখন। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, জিরে থেকে হিরে – সবই বাজারে পাওয়া যায়। আর যে কোনো বিলাসদ্রব্যেরই মিনি সংস্করণ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে শহর থেকে গ্রাম ভরিয়ে দিয়েছে। সবাই একইরকম খাবেন, পড়বেন, এমনকি ভাববেনও। কর্পোরেট সভ্যতায় বাজার সবার মনে মনে। রাজনীতিও তাদেরই হাতে। প্রতিটি দলের হাত ধরে আছে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা। মানুষের মতামত তৈরি করে দিচ্ছে প্রশিক্ষিত বাহিনী। অবশ্যই বৈষম্য না থাকলে কর্পোরেটের সাম্রাজ্য টেকে না। গান্ধী বহুকাল আগে একথা বলেছিলেন।

আজকের ভারতে গান্ধীকে চাই ভয়মুক্ত হতে। যাঁরা আজ এ দেশের মাথায় চেপে বসে আছেন তিরিশ শতাংশ ভোটারের সমর্থনে, তাঁরা জানেন অর্থ, মান, পদ দিয়ে যাদের বশীভূত করা যায় না তাদের ভয় দেখাতে হয়। আর ভয় দেখাতে হয় তাদের যারা প্রতিবাদী। এ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঘৃণায় মত্ত করে বারবার তাদের সামনে শত্রু হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে সহনাগরিককে। যিনি প্রতিবাদ করছেন তাঁকে বলা হয় দেশদ্রোহী। তারপর শুরু হয় ভয় দেখানো। সামাজিক মাধ্যমে ট্রোল দিয়ে ঘেরাও করা, মিথ্যাকে চেঁচিয়ে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু শেষপর্যন্ত কিছু নির্ভীক মানুষ থেকেই যাবেন।

এই মুহূর্তে দেশের গণমাধ্যম দিনভর রাজস্তুতি করে চলেছে। খবরের বদলে কয়েকজন ভাড়াটে সূত্রধার সারাদিন একই গল্প বলেন, বিদ্বেষ বিষ প্রচারে তাঁদের একমাত্র হাতিয়ার উগ্র কণ্ঠস্বর। প্রতি সন্ধ্যায় তাঁরা দেশপ্রেম শেখান এবং দেশদ্রোহী চিহ্নিত করেন। কিন্তু এর সমান্তরালে সত্যকে তুলে ধরে চলেছেন বেশ কিছু মানুষ। তাঁদের অন্যতম এই মুহূর্তে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক রবীশ কুমার। তাঁর একার লড়াইয়ে বারবার তিনি স্মরণ করেন গান্ধীকে। বিলকিস বানোর নির্যাতনকারী ও শিশুহত্যাকারীদের মুক্তি দেওয়ার পর যখন এ দেশেরই কিছু মানুষ তাদের সম্মান জানায়, তখন স্তম্ভিত দেশবাসীর সামনে সেই গুজরাটেই “বিলকিস বানো, আমাদের ক্ষমা করো” – এই কথাটুকু বুকে ঝুলিয়ে হাঁটেন সমাজকর্মী সন্দীপ পান্ডে। পুলিশ মাঝে মাঝে এঁদের ধরছে, ছাড়া পেয়ে তাঁরা আবার হাঁটছেন।

গান্ধীর নাম থাকুক বা না থাকুক, তাঁর পন্থা গোটা দুনিয়াতেই মানুষ গ্রহণ করেছেন। যেমন তাঁর সত্যাগ্রহ। নেহাত ছাপোষা গৃহস্থ মোহনদাস দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতিবিদ্বেষের শিকার হয়ে এই পথটি খুঁজে পেয়েছিলেন। অসম্ভবকে সম্ভব করার এই অভূতপূর্ব পন্থা সেখানে শাসককে নতুন করে ভাবায়। হিংসাই একমাত্র শক্তি যাঁরা ভাবতেন, তাঁরা অহিংসার শক্তিকে উপলব্ধি করেন। সেটিই হয়ে দাঁড়ায় গান্ধীর পথ। উত্তরকালে সেই দক্ষিণ আফ্রিকাতে নেলসন ম্যান্ডেলা, তার আগে আমেরিকায় মার্টিন লুথার কিং এবং আরও অনেকে ওই পথ বেছে নিয়েছেন। ভারতে জীবন, জীবিকা ও পরিবেশ সুরক্ষার বহু আন্দোলন এই পথেই চলেছে। এই যে বর্ষব্যাপী কৃষক আন্দোলন অতিমারীর সময়েও শান্ত ও অটল রইল, এ তো গান্ধীরই পথ।

চুয়াত্তর বছর ধরে মানবতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, অহিংসা ও সত্যের মূর্ত প্রতীককে মেরেও মারতে না পারার অসহায়তা থেকেই হয়ত বারবার তাঁর ভাবনাকে আঘাত করতে হয়। ১৯৫০ সালে ভারত যখন গণতন্ত্রের পরিণত হল, তখন থেকেই ২৬ জানুয়ারির পর ২৯ জানুয়ারি ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের প্রত্যাবর্তন সমারোহে নিজস্ব ব্যান্ডের মাধ্যমে সঙ্গীত পরিবেশন করে থাকে। ‘বিটিং দ্য রিট্রিট’ নামক এই সমারোহে এত বছর ধরে বাজানো হত ওই অসামান্য সঙ্গীত, যার ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছর পেরিয়েছে। অ্যাবাইড উইথ মি, অর্থাৎ আমার সঙ্গে থাকো, চূড়ান্ত বেদনা বিপর্যয়ের মুহূর্তে আমার সঙ্গে থাকো, অসহায়ের সহায় আমার সঙ্গে থাকো। মাসের পর মাস একা উত্তুঙ্গ বরফের পাহাড়ে হিমবাহের পাশে কিংবা অতি দূর সীমানায় যে সৈনিক অতন্দ্র প্রহরায় থাকেন, কখনো বা সম্পূর্ণ একাকী, তাঁর মনের কথা উঠে আসে এই গানে। তুমি আমার সাথে থাকো। সারা পৃথিবীতেই এই গানটি জনপ্রিয়।‌ এই গানটি এ বছর বাজানো হল না। কারণ বিশেষ কিছু নয়, গানটি নাকি ঔপনিবেশিক ভাবনার ধারক। বলা বাহুল্য, সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ বিষয়টিই ঔপনিবেশিক, অতএব এই যুক্তি ধোপে টেকে না। গানটি লিখেছিলেন উনিশ শতকের এক ধর্মযাজক। তাই অদ্ভুতভাবে কেউ কেউ বলছেন, এই গানটি নাকি খ্রিস্ট ভাবনার, তাই এটিকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ল। যদিও গানে কোনো দেবতার নাম নেই। গানটি গান্ধীর খুব প্রিয় ছিল।

এখান থেকেই এদেশের বিচ্ছিন্নতার, ঘৃণার রাজনীতির শুরু, যে ঘৃণা এখন সরকারি মদতে ভারতীয় সংবিধান এবং ভারত রাষ্ট্রের মূলগত ঐক্য, তার বৈচিত্র্য, তার সহিষ্ণুতা, উদারতা, সর্বোপরি ভালবাসার মূলে কুঠারাঘাত করার চেষ্টা করে চলেছে। খ্রিস্টীয় ভাবনা চলবে না — একথা বলার কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায়, যে দেশে মুসলমান মহিলাদের অনলাইনে নিলাম করার চেষ্টা চলছে, খ্রিস্টান উপাসনালয়ে আগুন ধরানো হচ্ছে, ঘৃণাই সেখানে শেষ কথা বলবে।‌

গান্ধী বলেছেন “আমার সমস্ত সত্তা এই ভাবনার বিরোধী যে হিন্দুত্ব ও ইসলাম দুই পরস্পর বিরোধী সংস্কৃতি।” বারবার মনে করানো হয়, তিনি স্বাধীন ভারত সরকারকে চাপ দিয়েছেন পাকিস্তানকে প্রতিশ্রুত অর্থ দেওয়ার, ভুলিয়ে দেওয়া হয়, তিনি দিল্লির হিন্দু ও শিখ নিধনের বিরুদ্ধে অনশন করেছেন। উদ্বাস্তু পরিবারগুলিকে নিয়ে পায়ে হেঁটে লাহোর যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। শুধু দেশ নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশকে এক করে যাওয়াই ছিল তাঁর স্বপ্ন। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা কোথায় নিয়ে যেতে পারে তা তিনি তখনই জানতেন। আজ সেই আশঙ্কা সত্যি করেই দুই দেশ সর্বদা যুযুধান, পরস্পরের বোমার ভয়ে প্রতিরক্ষা বাজেট আকাশছোঁয়া, ও দেশের শিল্পী এ দেশে এলে বয়কট। বীর তিনিই যিনি পাকিস্তানকে এক হাত নিতে পারেন, আর উগ্র সাম্প্রদায়িক মতবাদের গান্ধীহত্যাকারী শক্তি আজ দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন। মনে পড়ে কি গান্ধী একবার মাত্র কাশ্মীর গিয়েছিলেন ভারতভুক্তির প্রশ্নে, শেখ আবদুল্লা তখন কারাগারে। গান্ধীর আগমনে উচ্ছ্বসিত শ্রীনগরে রানি পায়ে হেঁটে এসেছিলেন সোনার পাত্রে দুধ নিয়ে স্বাগত জানাতে। কিন্তু গান্ধী বলেছিলেন যে রাজার প্রজা দুঃখে আছে, তার কাছে আমি কিছু নিতে পারি না। ক্ষণিকের জন্য কাশ্মীরে গিয়েও তিনি এভাবেই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

আরো পড়ুন মহাত্মা গান্ধীকে কায়েমি স্বার্থের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া দরকার

সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে গান্ধীর অবদান নিয়ে আজ সবচেয়ে বেশি চর্চা প্রয়োজন। কারণ রাজনীতিবিদ হিসাবে গান্ধী এমন একজন যিনি ধর্ম নিয়ে কঠিন পরীক্ষায় নেমেছিলেন। সেই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ধর্মান্ধতা নয়, সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা। ধর্মকে এড়িয়ে যে রাজনীতি, গোটা পৃথিবীতেই তা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ধর্মীয় উন্মাদনাই জনসাধারণকে সর্বাংশে নিষ্ঠুর ও অসহিষ্ণু করে তুলতে পারে। সে তখন শুধুই মারে আর মরে। এই মৃত্যু উপত্যকায় অকুতোভয়ে দাঁড়াতে পারতেন গান্ধী। সাতাত্তর বছর বয়সে জরাজীর্ণ দেহ নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন নোয়াখালী। কোনো পুলিশ, কোনো সেনার ছত্রছায়ায় নয়, গুটিকয়েক সঙ্গী নিয়ে। বিধ্বস্ত, আক্রান্ত গ্রামগুলিতে পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন। মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, থেকেছেন দুই ধর্মের মানুষের ঘরে। এমন নিদারুণ পরিস্থিতিতেও যে মৈত্রীর দীপ জ্বলতে পারে, গান্ধী তা দেখিয়েছেন। নির্বিচারে নরহত্যা, মেয়েদের উপর চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা, লুণ্ঠন যা ভারতের ইতিহাসে বারবার ঘটেছে এবং নামাতে হয়েছে সেনা, সেখানে গান্ধী পদে পদে বিপদের মুখোমুখি হয়ে দুই সম্প্রদায়কে মেলাতে চেয়েছেন এবং পেরেছেন।

পরস্পরকে তারা শুধায়, কে আমাদের পথ দেখাবে।
পূর্বদেশের বৃদ্ধ বললে,
আমরা যাকে মেরেছি সেই দেখাবে।
সবাই নিরুত্তর ও নতশির।
বৃদ্ধ আবার বললে, সংশয়ে তাকে আমরা অস্বীকার করেছি,
ক্রোধে তাকে আমরা হনন করেছি,
প্রেমে এখন আমরা তাকে গ্রহণ করব,
কেননা, মৃত্যুর দ্বারা সে আমাদের সকলের জীবনের মধ্যে সঞ্জীবিত
সেই মহামৃত্যুঞ্জয়।

— শিশুতীর্থ; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নিবন্ধকার সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। গান্ধী ভাবনায় অনুপ্রাণিত। লেখালিখি ও সক্রিয়তার বিষয় শিক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নারীর অধিকার ও ভারতের বহুত্ববাদী স্বরূপ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.