অলোকপর্ণা

গৌতমীকে আমি প্রথম আমাদের নাচের ক্লাসে দেখি ১৯৯৯ সালে। নাচতে ভালো লাগত না আমার, মা পাঠাত জোর করে, কারণ সবাইকে কিছু না কিছু শিখতে হয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গৌতমীকে আমি যখন দেখি, তখন আমার ন বছর বয়স। তাকে দেখি আমাদের নাচের মহড়ায়। “অ্যালফাবেট ক্লাব” নামে এক মজার নৃত্যনাট্য আমরা পরিবেশন করতে চলেছিলাম স্থানীয় এক ক্লাবের অনুষ্ঠানে। নৃত্যনাট্যটি কার লেখা এখন আর মনে নেই, বিষয়টা হল এমন যে, একটি বাচ্চা মেয়ে স্বপ্নের মধ্যে এমন এক দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে যেখানে সব অ্যালফাবেটরা জীবিত। নাচের ক্লাসের ছাব্বিশজন মেয়েকে ছাব্বিশটা বর্ণ হিসেবে দেগে দেওয়া হয়েছিল। তাদের বিভিন্ন সংলাপ, নাচ এবং গানে গোটা নৃত্যনাট্যটি তৈরি হয়েছিল। সেখানে আমি ছিলাম “জে”, গৌতমী “আই”। আর “কে” হয়েছিল যে মেয়েটি, রূপসা, সে পায়ে পা লাগিয়ে সবার সঙ্গে, বিশেষত “আই”য়ের সঙ্গে, ঝগড়া করত নাচের ক্লাস চলাকালীন। আমি আমার মুখচোরা স্বভাবের দোষে দুজনের ঝগড়ার মাঝে পড়ে জেরবার হয়ে যেতাম।

দীর্ঘ দু তিন মাস মহড়ার পর দুর্গাপুজোর আগে নৃত্যনাট্যটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বেশকিছু হাততালি কুড়িয়েছিলাম আমরা। এরপর আমি আমার অনিচ্ছার নাচের ক্লাস ছেড়ে দিই। “আই”কে ভুলেও যাই।

২০০১ সালে গৌতমী স্কুলে আমাদের ক্লাসে এসে ভর্তি হল। এবার তাকে “আই” নয়, তার নিজের নামে চিনলাম। বন্ধুদের যে ছোট দলটা ছিল, গৌতমী সেখানে জুড়ে গেল কিছুদিনেই। কী এক অদ্ভুত কারণে আমার ধারণা হয়েছিল যে, গৌতমীর পরিবার বাংলাদেশ থেকে এপারে এসেছে, তাই ক্লাস সিক্সে তার নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়াটা অবাক করেনি আমায়। ২০০১ সালে যখন গৌতমীর সঙ্গে পাকাপাকিভাবে আলাপ হল, তখন আমি খেয়াল করলাম, সে আমায় চিনতে পারেনি। আমিও তাকে আর ১৯৯৯ সালের অ্যালফাবেট ক্লাবের কথা মনে করালাম না।

ক্লাস সেভেনে গৌতমী আমার সঙ্গে একই টিউশনে ভর্তি হল আর ওর অসম্ভব স্মৃতিশক্তি আমাদের তাজ্জব করে দিল। অংক, বিজ্ঞানে যাই হোক না কেন, ওকে ইতিহাস বইয়ের পাতা খুলে দিলে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে গোটা পাতাটা ও মুখস্থ বলে দিতে পারত। আর আমি পারতপক্ষে ইতিহাসকে ঘাঁটাতাম না।

ক্লাস সেভেনে উঠতে না উঠতেই গৌতমী দ্রুত লম্বা হতে লাগল। ক্লাস এইট থেকে নাইনের মধ্যে ওর উচ্চতা এক ফুট বেড়ে গেছিল। অবশেষে ক্লাস টেনে গৌতমী আমাদের সবাইকে ছাড়িয়ে পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চিতে গিয়ে ঠেকল। বহরে অবশ্য তার কোনো বৃদ্ধি হল না। ওর কবজি আমরা মধ্যমা আর বুড়ো আঙুলের ফাঁকে ধরতে পারতাম।

বাড়ি খুব কাছাকাছি হওয়ায় আমরা জনাকয়েক বন্ধু একসাথে স্কুলে যাতায়াত করতাম। গরমকালে আমাদের স্কুল ছুটি হত বেলা সাড়ে চারটেয়। ততক্ষণে রাস্তার কুকুরগুলো গরমে গলে গিয়ে দলা পাকিয়ে আটকে থাকত রাস্তার পিচের উপর। “দেখবি একটা জিনিস!”- বলে গৌতমী ওর লম্বা লম্বা পা ফেলে ছুটে এসে ঘুমন্ত কুকুরের উপর দিয়ে লাফ মেরে তাদের টপকে যেত। ঘুমের ঘোরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কুকুরগুলো চমকে গিয়ে উঠে বসত। নিজেদের উচ্চতা সম্পর্কে সচেতন আমরা এই দুঃসাহস দেখাইনি কোনোদিন। স্কুল থেকে ফেরার পথে গৌতমী তবু দৌড়ে দৌড়ে ঘুমন্ত কুকুর টপকে টপকে যেত।

আমরা দেখেছিলাম মিথ্যে বলার সময় ওর মুখে কোনো ভাঁজ পড়ে না। নির্দ্বিধায় ও যা খুশি আবোলতাবোল বলতে এবং অপরকে তা বিশ্বাস করাতে পারত। তাই যেদিন ও আমাদের জানাল যে ওরা বৌদ্ধ, আমরা মুহূর্তে তা অবিশ্বাস করেছিলাম। এই সময় আমরা জানতে পারি ওর পাঁচ বছরের ছোট ভাইয়ের নাম রাহুল। আমরা এই ভাইয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কেও নিশ্চিত ছিলাম না। কারণ বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন কথা বলার পর একসময় হেসে বলে উঠত, “কেমন দিলাম?” একবার ও জানিয়েছিল আমাদেরই ক্লাসের অন্য একটি মেয়েকে ও পুজোর সময় এমন এক জামা পরতে দেখেছে যার একটা হাত ফুলস্লিভ ও অপর হাত স্লিভলেস। আর তার জিনসের প্যান্টও অনুরূপ — এক পা ফুল আরেক পা হাফ। আরেকবার সে স্কুলে এসে জানাল হারমোনিয়ামের শেষ রিডটি ধরে খুব করে গলা সাধতে গিয়ে সে তার গলা ভেঙে ফেলেছে। গৌতমীর সেই ভাঙা গলা আর জোড়া লাগেনি কোনোদিন। তাই ওর কাছে থেকে পাওয়া যে কোনো তথ্য আমরা যাচাই করতাম, “এটা তোর কতনম্বর গুল?” বলে। ও তৎক্ষণাৎ উত্তর দিত — “তিনশো ছত্রিশ” বা “সাতশো একান্ন নম্বর”। আমরা কখনো জানতে চাইতাম না কেন ও এমন ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা বলে। উল্টে কাউকে কিছু মিথ্যে বলার প্রয়োজন পড়লে আমরা গৌতমীকে এগিয়ে দিতাম। একবার খুব চিন্তিত মুখে গৌতমী টিউশনে এসে আমাদের জানিয়েছিল ওর মাকে হিপনোটাইজ করে দুজন লোক দুপুরবেলা ওদের বাড়ি থেকে দু হাজার টাকা চেয়ে নিয়ে চলে গেছে। ২০০৩-০৪ সালের পক্ষে সে অনেক টাকা। গৌতমীর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণে ভীত আমরা বাড়ি ফিরে আমাদের মায়েদের সতর্ক করলাম যেন তারা ওরকম বেমালুম হিপনোটাইজড না হয়।

গৌতমীর মা একজন হাসিখুশি মহিলা। এবং অসম্ভব ভাল তাঁর রান্নার হাত। এই খবর পাওয়ার পর আমরা প্রায়ই গৌতমীদের বাড়ি গিয়ে পড়তাম। কৃষ্ণা কাকিমা আমাদের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতেন। সাথে এটা সেটা খাবার আসত আমাদের জন্য। এই সময় আমরা গৌতমীর ভাই রাহুলকে দেখতে পাই। সে এক অদ্ভুত বালক। আমরা যখন কাকিমা আর গৌতমীর সঙ্গে গল্প করতাম, রাহুল ঘরের চারপাশে ঘুরপাক খেত। কখনো জানালার গ্রিল ধরে ঝুলত। কখনো চিৎকার করে উঠত অকারণে। অথচ কোনো কথা বলতো না সে আমাদের সঙ্গে। গৌতমী বলত রাহুলকে উপেক্ষা করতে। এমনকি কৃষ্ণা কাকিমাও তাকে কিছু বারণ করতেন না। গৌতমীর চেয়ে আমাদের গল্প বেশি হত কাকিমার সঙ্গে। বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন কথা বলতে পারতেন তিনি। গৌতমীর বাবাকে এভাবেই একদিন আমরা দেখে ফেলি। অত্যন্ত লম্বা এবং শীর্ণকায় এক ব্যাংককর্মী। তাঁকে কখনো কোনো কথা বলতে শুনিনি আমরা। নিঃশব্দে তিনি অফিস থেকে শুধু আসতেন, অথবা নিঃশব্দে অফিসে যেতেন। গৌতমীর উচ্চতা এবং শীর্ণতার রহস্য জানতে পেরে আমরা অবাক হয়েছিলাম। যেন ম্যাজিক দেখছিলাম আমরা। কাকু এতটাই লম্বা ছিলেন যে, আমাদের স্কুলের পাঁচিলের ওপার থেকে আর কারো নয়, কেবলমাত্র কাকুর মাথা দেখা যেত। কাকিমার অনর্গল কথাবার্তা, গৌতমীর হাসিঠাট্টা, রাহুলের দৌড়ঝাঁপ আর কাকুর নিস্তব্ধতা আমাদের চোখে অদ্ভুত ঠেকত। মনে হত, কোথাও কোনো সুর কাটছে। যেন কোথাও কোনোকিছুই ঠিক নেই। অথচ গৌতমী হেসে আর হাসিয়ে চলেছে। কৃষ্ণা কাকিমা আমাদের হেসে হেসে এটা সেটা খাওয়াচ্ছেন। কাকু অনুপস্থিত। আর রাহুল জানালা দিয়ে আমাদের দেখে চিৎকার করেই চলেছে। এতে আমাদের পৃথিবীটা একটু নড়েচড়ে বসত। গৌতমীর খাতার পিছনের পাতায় আমরা তার নিজের হাতে লেখা দেখতাম, “গৌতমী খুব ভালো মেয়ে, গৌতমী একজন পরী। গৌতমী। গৌতমী। গৌতমী। গৌতমী একজন ভালো মেয়ে। গৌতমী একজন পরী।” আমরা এসব বিশেষ ভ্রূক্ষেপ করতাম না।

গৌতমীদের বাড়ি যে গলিতে ছিল, তার ঠিক মুখেই ছিল একটা কদম গাছ। বর্ষাকালে গলির মুখটা কদমফুলের গন্ধে রিরি করত। স্কুল থেকে ফেরার পথে আমরা অনেক চেষ্টা করতাম সেই গাছ থেকে কদমফুল পাড়তে। গৌতমী আমাদের সঙ্গে থাকলে হাত বাড়িয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ফুল পেড়ে দিত। না থাকলে আমরা অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ মনোরথ বাড়ি ফিরতাম।

কয়েক বছর লাগাতার গৌতমীর সঙ্গে ওঠবোস করলেও কী কারণে যেন সে আমার মনে বিশেষ দাগ কাটতে পারেনি। ২০০২ সালে একবার কোনো কারণে আমি রাগ করে তাকে “অপদার্থ” বলেছিলাম। এতে সে কষ্ট পেয়েছিল এবং আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল। বেশ কিছুদিন যাওয়ার পরেও আমি খেয়াল করিনি যে গৌতমী আমার সঙ্গে আর আগের মত কথা বলছে না। যখন অন্য বন্ধুরা আমাকে এসে জানাল গৌতমী রাগ করেছে, আমি বলেছিলাম, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। কারণ এতকিছুর পরেও গৌতমী আমার মনে দাগ কাটতে পারেনি। বয়সের দোষে আমাদের ভাব হতে বেশি দেরি হয়নি যদিও। তবু আমি তাকে অ্যালফাবেট ক্লাবের কথা কখনো জিজ্ঞেস করিনি।

বিভিন্ন উদ্ভট টিভি সিরিয়ালের দৃশ্য, সিনেমার দৃশ্য, এমনকি বিজ্ঞাপন পর্যন্ত গৌতমী অবিকল নকল করতে পারত। ক্লাসের ফাঁকে, টিউশনে ও সেসব করে দেখাত আমাদের। ফিজিকালি, ভোকালি। নায়িকার দিকে প্রসেনজিতের সাদা ফুলপ্যান্ট পরে স্লো মোশনে ছুটে আসা অথবা লোকাল কেবল চ্যানেলের “চিন্টু ক্যান্ডি”র বিজ্ঞাপন সে বারবার নকল করে দেখাত আমাদের।

দুর্গাপুজোর সময় বন্ধুরা নীলকন্ঠপুর ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে বেরোতাম। গৌতমীও যেত আমাদের সঙ্গে। কিছুদূর যাওয়ার পরই সে বাড়ি ফিরে আসতে চাইত। অনেক সাধাসাধি উপেক্ষা করে সে একসময় রিক্সা নিয়ে বাড়ি ফিরে যেত। বেশ কয়েক বছর এরকম চলার পর আমরা আর তাকে ডাকতাম না দুর্গাপুজোয় ঠাকুর দেখতে যেতে। আমরা এটাও ভেবেছিলাম যে বৌদ্ধ বলে হয়ত তার দুর্গাপুজো বিশেষ পছন্দ নয়।

মাধ্যমিক পরীক্ষায় আমার পাশের ঘরে গৌতমীর সীট পড়েছিল। ভৌত বিজ্ঞান পরীক্ষার দিন শোরগোল শোনা গেল পাশের ঘর থেকে। আমরা জানতে পারলাম কেউ একজন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। খাতা জমা দিয়ে বাইরে বেরনোর পর জানা গেল পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছু পরেই গৌতমী অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং জ্ঞান হারায়। জল ছিটিয়ে, ডাক্তার ডেকে এনে তার জ্ঞান ফেরানো হয়। তারপর সে বাকি পরীক্ষা কোনোরকমে শেষ করে। এরপরের পরীক্ষাগুলোতেও সে কোনোরকমে উত্তর লিখেই বেরিয়ে যায়, আমাদের মনে হয়েছিল যেন কীসের তাড়া আছে তার।

ভৌত বিজ্ঞান পরীক্ষার দিন অসুস্থ হয়ে পড়ায় এবং বাকি পরীক্ষা কোনোরকমে শেষ করায় গৌতমীর মাধ্যমিকের ফলাফল আশানুরূপ হল না। এমনকি তার প্রিয় বিষয় ইতিহাসে সে আমার চেয়েও কম নম্বর পেল। উচ্চমাধ্যমিকে গৌতমী আর্টস নিয়ে ভর্তি হল আর আমাদের বাকি বন্ধুদের থেকে সে আলাদা হয়ে পড়ল। আমরা যারা সায়েন্স নিয়েছিলাম, তারা দল বেঁধে আরও আরও বিভিন্ন টিউশনে যেতাম, সেখানে আমাদের আরও আরও বিভিন্ন বন্ধু হল, বিশেষত ছেলেরা। গৌতমী আর আমাদের স্কুলজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রইল না।

২০০৭-০৮ চোখের পলকে উবে গেল। আমরা কলেজে ভর্তি হলাম। গৌতমী ইংলিশ অনার্স বেছে নিল। এইসময় থেকে আমি গৌতমীর থেকে দূরে সরে আসছিলাম। আমরা প্রত্যেকেই দূরে সরে আসছিলাম, ফোন ছাড়া যোগাযোগের মাধ্যম আর কিছু ছিল না। তবু জোর করে কোনোদিন দেখা করলে আমরা টের পেতাম গৌতমী আরও রোগা হয়ে গেছে। প্রতিবার তাকে আরও আরও রোগা এবং ফ্যাকাশে দেখাত। এবং আমরা দেখতাম সে আগের চেয়ে কম হাসছে। সবার কথার মাঝে চুপ করে বসে আছে অন্যদিকে তাকিয়ে। একসময় সে আমাদের সঙ্গে দেখা করাও বন্ধ করে দিল, ফোন করলে সে আমাদের তার বাড়ি আসতে বারণ করত। একদিন আমরা জানতে পারলাম গৌতমী তার ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা দিতে যায়নি। প্রস্তুতি তেমন না হওয়ায় সে পরীক্ষাটা দিলই না। এবার খুব জোর করে, এক দুর্গাপুজোতেই আমাদের বাড়িতে বন্ধুদের নৈশ আড্ডায় গৌতমীকে ডেকে এনে খুব করে বোঝালাম আমরা। সে মুখ খুলে কিছু বলল না। চেষ্টা করল আমাদের সঙ্গে হাসার, আমাদের হাসানোর।

এভাবে একদিন কলেজ শেষ হল। বন্ধুরা চাকরি পেয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে গেলাম। গৌতমীর প্রতি কোনোকালেই তেমন টান তৈরি না হওয়ায় আমি আর যোগাযোগ রাখিনি তার সঙ্গে। অন্য বন্ধুদের মারফৎ জানতে পারতাম তার পায়ে নাকি আর্থ্রাইটিস ধরা পড়েছে। সে নাকি লাঠি নিয়ে এখন হাঁটাচলা করে। শোনার পর যথারীতি এটা তার “এক লাখ ছিয়ানব্বইতম গুল” বলে আমরা কথাটায় কর্ণপাত করলাম না।

২০১৭ সালে আমাদের এক বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে আমরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে নীলকন্ঠপুর ফিরলাম। বিয়ের আগের সঙ্গীতানুষ্ঠানে গৌতমী এসেছিল। জোর করতে হয়নি তাকে। এক মাথা উসকোখুসকো চুল নিয়ে, আগের চেয়েও রোগা আর ফ্যাকাশে গৌতমী ঘরে পরার জামা পরে সেই অনুষ্ঠানের বাড়িতে চলে এসে বন্ধুদের মাঝে চুপ করে বসেছিল। কোনো কথাই প্রায় সে বলেনি সেইদিন। আমি তখনও তাকে আর অ্যালফাবেট ক্লাবের কথা জিজ্ঞেস করিনি। আমরা জানতে পেরেছিলাম সে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার বাড়ি থেকে কেউ চায় না সে আমাদের মত বেসরকারি চাকরি করুক, কারণ ওতে নিরাপত্তা নেই।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে আমরা ফের ফিরে গেলাম যে যার কর্মক্ষেত্রে। গৌতমী যেহেতু কোনো সোশাল মিডিয়ায় বিশ্বাস করত না, তাই টেক্সট মেসেজ এবং কল বাদে অন্য কোনো উপায়ে তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রাখাও আর সম্ভব হল না। ২০১৮ সালে একদিন গৌতমী আমাদের একজন বন্ধুকে জানাল সে শয্যাশায়ী। উঠে বসার মত শক্তিও নাকি তার নেই। আমরা এবারও গৌতমীর চিরপরিচিত ধাপ্পাবাজি বলে এই খবরটা উড়িয়ে দিতে চাইছিলাম, কিন্তু জানা গেল একথা সত্যি যে সে গুরুতর অসুস্থ। ঠিক করা হল, পুজোয় সবাই বাড়ি ফিরলে তাকে দেখতে যাওয়া হবে।

২০১৮-র পুজোয় আমরা যে গৌতমীকে দেখলাম, সে তখন আর আমাদের বন্ধু গৌতমী নয়। অস্থিচর্মসার এক পূর্ণবয়স্ক মেয়ে বিছানার চাদরের সঙ্গে মিলেমিশে শুয়ে ছিল আমাদের সামনে। আমাদের দেখে অবাক হয়ে, হাসিতে, কান্নাতে সে একশেষ হয়ে পড়ল। আমরা দেখলাম এত বছরে কাকিমা বদলাননি। আরও পৃথুলা হয়েছেন। আরও অনর্গল। কাকিমা জানালেন, গৌতমী অনেক দিন হল খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। সাধলেও সে কিছু খেত না। সারাক্ষণ তার চোখের সামনে টিভি চলত। খবর দেখে, খবরে সিয়াচেন বর্ডারে সৈন্যদের কষ্ট দেখে সে হাউহাউ করে কাঁদত। এইভাবে না খেতে খেতে, রাজরোগ বাসা বেঁধেছে তার ফুসফুসে।

আমরা তার বিছানার উল্টোদিকের সোফায় নড়েচড়ে বসলাম। গৌতমী দম নিয়ে নিয়ে কেঁদে কেঁদে আমাদের জানাল, “আমি অনেকবার ভেবেছি আমি সব…” বাকিটুকু সে অনেক চেষ্টা করেও শেষ করতে পারল না। আমরা কোনোরকমে পালিয়ে এলাম তার কাছ থেকে।

পরবর্তী দুই বছর আমি চেষ্টা করতাম গৌতমীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার। কখনো শুনতাম সে সেরে উঠছে, কখনো শুনতাম তার ফুসফুসে আরও কিছু দাগ পাওয়া গেছে। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে আমি বুঝতে পারতাম না আর। অতিমারীর সময় সমস্ত অফিস বন্ধ হয়ে গেলে আমরা আবার নীলকন্ঠপুর ফিরলাম। এবার গৌতমীকে এড়িয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল কারণ, নীলকন্ঠপুরে আমরা যা যা ফেলে চলে গেছিলাম তার মধ্যে অন্যতম হল গৌতমী। অতিমারীর প্রকোপ কমলে আমি মাঝেমধ্যে একা একাই যেতাম গৌতমীর বাড়ি। চকলেট, গল্পের বই, নতুন ইংলিশ সিনেমার হদিস নিয়ে। অ্যালফাবেট ক্লাব নিয়ে আমাদের তখনো কোনো কথা হত না। অবান্তর নানা বিষয়, রান্নার রেসিপি, বন্ধুদের বিয়ে, বন্ধুদের বাচ্চা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করত গৌতমী। কিন্তু তখন আর সে আমাদের বন্ধু গৌতমী নয়। তার কোনো কথাতে আমাদের হাসি পেত না। তার কোনো কিছুকে আমরা “এই দেখ নকল করছে” বলে দেগে দিতে পারতাম না। বলতাম সে সেরে উঠলে তাকে নিয়ে আমরা গোয়া ঘুরতে যাব। কিন্তু আমাদের পা আঠা দিয়ে কে যেন মাটিতে লাগিয়ে রেখেছিল। গৌতমীর মেসেজ পেতাম তবু, অবান্তর নতুন বিজ্ঞাপন, অবান্তর নতুন সিনেমার খবর দিত সে মেসেজে। তার কষ্ট খুব বেড়ে গেলে ফোন করে সে কাঁদত। মিটিংয়ের তাড়ায় কোনোরকমে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে আমি দায় সারতাম। ফের কাজ সেরে রাত্রিবেলা মেসেজ করে জিজ্ঞেস করতাম, “গৌ, এখন কেমন আছিস?”

 

২০২১ সালের ৫ই অক্টোবর বেলা ১টায় এক বন্ধু ফোন করে আমায় জানাল, “গৌতমী আজ ভোরবেলা এক্সপায়ার করেছে।”

আমি সঙ্গে সঙ্গে গৌতমীর শেষ মেসেজটা খুলে দেখলাম, ১৪ই সেপ্টেম্বর সে আমার সঙ্গে শেষবারের মত যোগাযোগ করেছে। সে জানতে চেয়েছে, “আজ কিছু লেখালেখি করলি? কত বৃষ্টি হচ্ছে!”

এবং আমি তার জবাব দিতে ভুলে গেছি। আমি জানতেও চাইনি ১৯৯৯ সালের অ্যালফাবেট ক্লাবের কথা, “আই”, “জে”, “কে”- এর কথা তার মনে আছে কিনা।

আরো পড়ুন একাধিক প্রকাশকের বাংলা ই-বই এবার একটা অ্যাপে

পূর্ববর্তী নিবন্ধদুর্গোৎসবের আমোদ
পরবর্তী নিবন্ধফেরা
কলকাতায় জন্ম। পেশাগত কারণে অস্থায়ী বাস বেঙ্গালুরুতে। দশটা- আটটার তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী। নিশাচর অক্ষরশ্রমিক। প্রকাশিত বই- ঝিঁঝিরা (২০১৫), হাওয়াশহরের উপকথা (২০১৮), দাস্তানগো (২০১৯) এবং রণ বিশ্বাস কারো নাম নয় (২০১৯)।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.