রোদ্দুর রায় গ্রেফতার হয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পর্কে অভব্য ভাষা প্রয়োগ করে কুরুচিকর মন্তব্য করার অভিযোগে। মামলা দায়ের করেছেন রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের মুখপাত্র, ভারতীয় দণ্ডবিধির আওতায় (কোন কোন ধারায় তা স্পষ্ট না হলেও অনুমান করছি ২৯৪ ধারা, যা অশালীন বক্তব্য প্রকাশকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে অভিহিত করে)। আমার অনুমান এ-ও যে এই গ্রেফতারির পেছনে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭ নম্বর ধারাও প্রযোজ্য হবে, যদি “শালীনতা” (obscenity)-কে সূচক হিসাবে ধরা হয়। আইনের ছাত্র হিসাবে আশা করতে ইচ্ছা করে আইন আইনের পথে চলবে, কিন্তু বিশেষ আশা বোধ হয় নেই। তবে আইনের পথে মীমাংসা হওয়ার ঢের আগেই সামাজিক যাপনের ধর্ম অনুযায়ী নেটিজেনরা তাঁদের কোর্টে বল টেনে নিয়ে নিজেদের রায় দিতে লেগে পড়েছেন।

সেই জনতার আদালত থেকে যতরকম মন্তব্য উঠে আসছে তার মধ্যে অনেকগুলোর বক্তব্য এইরকম – বাকি সবকিছু মেনে নিলেও, রোদ্দুর রায়ের বাচনভঙ্গি এবং ভাষা অশালীন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। হয়ত সত্যিই নেই, কিম্বা হয়ত আছে। কারণ শালীন বা শোভন ভাষা বলতে কী বোঝাবে তা নির্ধারিত হওয়ার পিছনে অবশ্যই শ্রেণিগত অবস্থান থাকে। কেমন? যেমন যাকে আমরা ভদ্রলোকেরা কটূক্তি কিম্বা অশালীন মন্তব্য বলি, আমাদের চেয়ে অল্প শিক্ষিত/অপশিক্ষিত শ্রেণির মানুষ বলেন “খিস্তি”। ঠিক সেরকমই অনেক শব্দ আমরা খানিক মোলায়েম করে বলি যা ওঁরা বলেন রূঢ়ভাবে। ধরুন, আপনি বলবেন “কুকুর”, ওঁরা বলবেন “কুত্তা”। তাতে আপনি মনে করবেন ওঁরা অসম্মান করলেন, অশালীন ভাষা প্রয়োগ করলেন। অথচ একটা সমাজ কোনো একটা বিশেষ সময়কালে কোন ধরনের ভাষাকে “অশালীন” বলে দাগিয়ে দেবে তা নির্ণীত হয় সমাজের শিক্ষিত, তুলনামূলক উচ্চবিত্ত মানুষের সভ্যতার সংজ্ঞা অনুযায়ী।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কিন্তু ভাষা তো মন্তব্যের একটা অংশ মাত্র, অপর অংশটার নাম বক্তব্য। অর্থাৎ মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে কী বক্তব্য প্রকাশের চেষ্টা হয়েছে। রোদ্দুর রায় কুরুচিকর ভাষা প্রয়োগ করে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সেই বক্তব্যের সারমর্ম হল, সাম্প্রতিককালে সঙ্গীতশিল্পী কেকের অকালপ্রয়াণের আগের বিশৃঙ্খলা যেহেতু একটা সরকারি প্রেক্ষাগৃহে হয়েছে এবং সেই প্রেক্ষাগৃহের নিত্যদিনের কর্মচারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রেক্ষাগৃহের আসনসংখ্যা ছাপিয়ে দু থেকে তিনগুণ মানুষকে ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল, সেহেতু সরকারপক্ষ এবং পুলিশ এই মৃত্যুর জন্য কিছুটা দায়বদ্ধ। আমরা প্রত্যেকেই জানি সদ্যপ্রয়াত শিল্পী শুধুমাত্র ভিড় এবং অব্যবস্থার কারণে মারা না গেলেও, তাঁর হৃদরোগের উপর একপ্রকার মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছিল নজরুল মঞ্চের ভিড় ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। তাছাড় আসনসংখ্যার থেকে এক-দুজন নয়, দু থেকে তিন গুণ বেশি মানুষ ঢুকে পড়া যে সরকারি প্রেক্ষাগৃহের দুয়ারে দাঁড়ানো পুলিশবাহিনীর বড় ব্যর্থতা, তা নিয়ে প্রায় কারোরই সন্দেহ নেই। অন্যদিকে, কয়েকমাস আগেই নদীয়ার হাঁসখালি কাণ্ডে তথাকথিত অপশব্দের প্রয়োগ না করেই মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তার অর্থ একজন নাবালিকা ধর্ষিতা হতেই পারে, কারণ তার প্রেমসম্পর্ক ছিল অভিযুক্ত ছেলেটির সঙ্গে। এই মন্তব্যে অপশব্দ না থাকলেও অপবক্তব্য অবশ্যই রয়েছে, আমার মতে শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন রয়ে যায়, ওই মন্তব্যের অশালীনতার জন্য মামলা দায়ের হয়নি কেন? রুচির একমাত্র সূচক কি তবে শব্দ? শব্দ বাক্য হয়ে যে অর্থ বহন করে সেটা নয়? যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় শব্দের শালীনতাই রুচির একমাত্র সূচক, তাহলেও কি “শুঁটিয়ে লাল করে দেবো, নোংরামি বার করে দেবো” কিম্বা “গোলি মারো সালোঁ কো” কিম্বা বুদ্ধিজীবী অপর্ণা সেনের লাথি মেরে শহীদ বেদি ভেঙে দিতে চাওয়া আমাদের ভদ্রসমাজের নির্ধারিত রুচির মাত্রা অতিক্রম করে না?

প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তরই বোধহয় একই জায়গায় লুকিয়ে – ক্ষমতা। প্রথমত, মুখ্যমন্ত্রী কিম্বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা ক্ষমতাসীন দলের অনুগতরা এই ধরনের মন্তব্য যাঁদের উদ্দেশ্যে করেছেন, তাঁদের শতকরা নব্বইভাগ বক্তার তুলনায় অনেক কম প্রভাবশালী, যা রোদ্দুরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দ্বিতীয়ত, পুলিশি ব্যবস্থার উপরেও প্রভাবশালীদের বিপুল প্রভাব। ফলত, তাঁরা নালিশ করলে যেমন ঝটপট কাজ হয়, তাঁদের বিরুদ্ধে নালিশ হলে ততোধিক ধীরগতিতে কাজ এগোয়, যা আনিসের খুনি কিম্বা তুহিনা খাতুনের আত্মহত্যার প্ররোচকদের ব্যাপারেই প্রমাণিত।

এসব বাদ দিয়ে যদি আমরা শুধু আইনের কথাই ধরি, সেখানেও অশালীন বলতে কী বলা হয়েছে তা অস্পষ্ট। যে আইন চালু আছে তার আওতায় সাদত হাসন মান্তোর ‘কালী সালওয়ার’ গল্পটাও অশালীন, আবার পুলিশি বর্বরতার শিকার এক সাংবাদিকও অশালীন। কারণ তিনি অত্যাচারী উচ্চপদস্থ পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে অপশব্দ ব্যবহার করেছেন। তার উপর এই আইনের শিকড় পরাধীন ভারতে, যখন নীতির মাপকাঠি ছিল শ্বেতাঙ্গ শাসকের নৈতিকতা, আর আমরা ছিলাম তাদের অধীনে। ভারত আজ পরাধীন নয়, শাসক শ্বেতাঙ্গ নয়। কিন্তু গায়ের রং ছাড়া শাসকের এবং তার নিকটাত্মীয়দের শ্রেণিচরিত্রের বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে কি?

সবচেয়ে বড় কথা, আমরা কিসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করব শালীনতার মাপকাঠি? শাসকের নির্ধারিত ভাষাই একমাত্র সভ্য, বাকি সব অশালীন — এটা কিসের ভিত্তিতে ঠিক হল? আমার মতে, এর কোনো যুক্তি নেই। কারণ প্রথমত, শাসকের নির্ধারিত ভাষায় খোদ শাসক এবং তার অনুগতদেরই অনেকসময় কথা বলতে দেখা যায় বেশি। দুই, গণতন্ত্রে শাসক কে হবে তার রাশ যেমন থাকা উচিত সাধারণ মানুষের হাতে, তেমনই শাসক কোন ভাষাকে অশালীন বলে দাগিয়ে দেবে, তাতেও সাধারণ মানুষের স্বতন্ত্র মতামত গুরুত্বপূর্ণ। স্বতন্ত্র শব্দটার ওপর আলাদা করে জোর দিলাম কেন? কারণ, অমুকটা ভদ্রতা, তমুকটা বর্বর, এই অবচেতন ধারণাগুলোও অনেকাংশে ক্ষমতাশালীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়।

আরো পড়ুন কবীর সুমনের কুবাক্যে ঢাকা পড়ে গেল যেসব কথা

তা বলে কি রোদ্দুরের পথ বৈপ্লবিক? একেবারেই না। শুধু সোশাল মিডিয়ায় কথা বলে বদল আনা সম্ভব নয়। আজও পথের আন্দোলন আমার মতে সবচাইতে কার্যকরী। কিন্তু রোদ্দুরের বক্তব্যে কি পথের আন্দোলন দিকনির্দেশ পাবে? তা-ও না। দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে মন্তব্য করা সহজ, কাজে করে দেখানো নয়। তবুও ওঁর মুক্তির দাবি কেন? কারণ উনি যে ভাষা বলেছেন সেই ভাষা আমরাও লোকলজ্জার ভয়ে হয়ত লুকিয়ে বলি, বা প্রকাশ্যেই বলি খানিকটা “সাহস” করে। কিন্তু সমাজের অর্ধেকের বেশি মানুষ অক্লেশে এই ভাষাটাই বলেন। এটা শালীন না অশালীন তা না জেনেই বলেন। সমাজের সিঁড়িতে দু ধাপ বেশি উঠে গেছি বলে আমার তাঁদের শালীনতাবোধকে প্রশ্নের মুখে ফেলার অধিকার নেই।

মতামত ব্যক্তিগত

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.