ভুলে যেতে চাইলে কত কিছুই মনে না রাখলেও চলে। ভুলে যাওয়া এমন সুচারু অভ্যাস যেখানে দেওয়াল জোড়া সারি দেওয়া দেশনেতাদের মধ্যে প্রীতিলতা, মাতঙ্গিনী সংখ্যালঘু হয়ে থাকে। ভাইয়ের রক্তের কথা বলতে গিয়ে রওশন আরা বাচ্চু, নাদিরা বেগম, শরিফা খাতুন, সুফিয়া কামালের কথা অগোচরে থাকা (বা রেখে দেওয়া) তাই অস্বাভাবিক নয়। একশো পঁয়ষট্টি বছর, ১৮৫৬। বিধবা বিবাহ আইন বা দ্য হিন্দু উইডো’জ রিম্যারেজ অ্যাক্ট প্রণয়ন হয়ে গিয়েছে। ঠিক এক বছর পরেই সিপাহী বিদ্রোহ। ভুলে যাওয়া বা মনে রাখা দুইয়ের ক্ষেত্রেই আমরা বেশ মাপ মত কাটছাঁট করে নিই। মাপের অতিরিক্ত যা কিছু, যাকে ঠিক নির্দিষ্ট আধারে ও আকারে ফেলে দাগিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া যায় না সেসবই বিড়ম্বনাময়। যেমন স্বর্ণকুমারী, স্বর্ণকুমারী দেবী। যাকে রবি ঠাকুরের ন’দিদি বলে সমাজ সভ্যতার সাথে আলাপ করিয়ে দিলেই ঠিক খাপের খাপ ইতিহাস লেখা যেত, যদি না মাঝে এসে পড়ত বিধবা বিবাহ, বিবাহকেন্দ্রিকতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে তোলা সোজাসাপটা অথচ তির্যক কিছু প্রশ্ন। ঠিক যে সময়টায় আমাদের আদরের সমাজ বিধবা বিবাহের মত প্রগতিশীল এবং ব্যতিক্রমী ভাবনার প্রয়োগ নিয়ে নাজেহাল, সেই সময়েই দাঁড়িয়ে বিকল্প উচ্চারণ নিয়ে আসেন স্বর্ণকুমারী দেবী। ব্যতিক্রমীদের মধ্যে যারা ব্যতিক্রমীতর, তাদের নিয়ে সমাজের ভারি সমস্যা। বিকল্পের পাশে আরেক বিকল্প এলে যেমন দ্বন্দ্ব শুরু হয় কোনটা নির্বাচনযোগ্য, বিধবা বিবাহের পাশে স্বর্ণকুমারী দেবীর বিকল্প প্রস্তাব সম্ভবত সেই দ্বন্দ্বের অজুহাতেই এই একশো পঁয়ষট্টি বছরেও সেভাবে চর্চায় উঠে এল না। ১২৯২ বঙ্গাব্দে দাঁড়িয়ে স্বর্ণকুমারীই প্রশ্ন করেছিলেন, বিধবাদের আবার বিয়ের প্রয়োজনটাই বা কোথায়!

অল্প বয়সে বিধবাদের যা ভবিষ্যত সমাজ লিখেছিল, বিদ্যাসাগর সেই সময়কালে দাঁড়িয়ে সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে এক অন্য বিকল্পের সন্ধান দেন। শুধু সন্ধান নয়, সমাজের নিয়মকে আইনের কানুন দিয়ে কিস্তিমাত করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, বিধবাদের পুনর্বিবাহের প্রয়োজনটাই বা কেন? দায়গ্রস্ত পিতা দায় ঝেড়ে ফেলার পরে সে দায় কে বহন করবে অবলার? প্রথম স্বামী। প্রথম স্বামীর নামের গোড়ায় অকালে বা যথাকালে চন্দ্রবিন্দু জুড়ে গেলে সেই দায়ের উত্তরাধিকার তবে কার? আরেকজন স্বামীরই। বিধবার অন্ন, বিধবার বস্ত্র এবং বিধবার আশ্রয়ের প্রয়োজনের জন্য বিকল্প হিসাবে ফের বিবাহের প্রয়োজনই সামনে এসে দাঁড়াল। কিন্তু বিধবা যদি আবার বিবাহকেন্দ্রিকতার মধ্যে এসে না পড়তে চায়? বিধবা যদি নিজের জীবন নিজের মত করে এগনোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চায়? সমাজ বলে যে বিষম বস্তু আমাদের ধারণ পালন এবং শাসন করে রাখে টাখে, সে অতি বুদ্ধিমান। রাষ্ট্র যেমন বিরুদ্ধ স্বরের জনপ্রিয়তা দেখলে বিরুদ্ধ উচ্চারণকে টুকে বা কিনে নেয়, ভোগবাদ যেমন বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখলেই বিপ্লবকে ব্র্যান্ড করে বেচে দেয়, সমাজ সেই পথেই নিজের বিবর্তন জারি রাখে। তৎকালীন সময়ে বিধবা বিবাহের মতো রেবেল ভাবনাকে সমাজ ঠিকই কাটছাঁট করে পিতৃতন্ত্রের মশলা মাখিয়ে আপন করে নিল। বিধবাদের পিতৃতান্ত্রিকতায় বেঁধে রাখতে গিয়ে যদি বিধবাদের পুনর্বিবাহের মতো বিপ্লবকে মান্যতা দিতে হয় তাতে সমাজের দীর্ঘমেয়াদি লাভই। বিধবা খাঁচায় রইল, বিধবা অন্যের আশ্রয়েই রইল, বিধবার দায় অন্য মানুষই নিল, কেবল খাঁচার ভিতর বিধবা কিছু রঙিন ফানুশ নিয়ে মেতে রইল। বিবাহের সমগ্র তন্ত্রই যেখানে যৌনতাকে ঘিরে আবর্তিত, সেখানে বিধবাদের বিয়ে দিয়ে মহিলাদের যৌনজীবনকে ফের একমুখী রেখে ব্যাভিচারিনী হওয়া আটকানো যদি যায়, আখেরে সমাজেরই ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে তাতে। বিবাহকেন্দ্রিকতাকে প্রশ্ন করার মতো সাহস বহু ‘প্রগতিশীল’, ‘অনুভূতিশীল’, ‘দায়িত্বশীল’, ‘সুশীল’, ‘স্বাধীনচেতা’ মানুষের এই ২০২১ সালে দাঁড়িয়েও নেই। অথচ রবীন্দ্রনাথের ন’দিদির ছিল। একশো পঁয়ষট্টি বছর আগেই ছিল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেকেরই মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় “মেয়েদের ক্ষমতা দিতে হবে, মেয়েদের স্বাধীনতা দিতে হবে।” শব্দ এমন দুরন্ত ব্রহ্ম রচনা করে যে আমরা প্রশ্ন করতে ভুলে যাই ক্ষমতা দেওয়ার মালিক কে? স্বাধীনতা দেওয়ার মালিক কে? যা অর্জন করার তা অন্যের দাক্ষিণ্য কোনওভাবেই নয়। ১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসের ভারতী পত্রিকায় স্বর্ণকুমারী ‘একটি প্রস্তাব’ লেখেন। লেখেন, “দেশের স্ত্রীলোকেরা সুশিক্ষিত না হইলে প্রকৃত প্রস্তাবে যে দেশের উন্নতি হইতে পারে না, ইহা আজকাল অনেকেই বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছেন। একটি গাছের একদিকে সূর্য্যকিরণ পড়িলে যেমন গাছটির সর্বাঙ্গীণ স্ফূর্ত্তি বিকাশ হয় না, তাহার একদিক দুর্বল, একদিক সবল, একভাগ ফলবান, অপরভাগ নিষ্ফল হইয়া পড়ে, সেই রূপ যে জাতির একভাগ শিক্ষিত, অন্যভাগ অশিক্ষিত, একভাগ মাত্র সুস্থ, অন্য ভাগ রুগ্ন সে জাতির পূর্ণ শ্রী কোথায়?”

জেন্ডার বিষয়ক ভাবনা বা লিঙ্গ বৈষম্য বা জেন্ডার ভায়োলেন্সের কথা বলতে গিয়েও একটা ভাগ অধরা থেকে যায়। হালফিলে আলোচনা শুরু হয়েছে পুরুষদের সংবেদনশীলতার পাঠ নিয়ে, বেশি বেশি প্রশ্ন করা হচ্ছে একটি সন্তানকে পুরুষ করে গড়ে তোলা এবং নারী করে গড়ে তোলা নিয়ে। জেন্ডার ইক্যুয়ালিটির বিকল্প উচ্চারণে আসছে জেন্ডার ইক্যুইটি। সহজ কথাটা সহজ করে ‘একটি প্রস্তাব’ প্রবন্ধে স্বর্ণকুমারী উল্লেখ করেছেন। লিঙ্গসাম্য বিষয়ে পুরুষদের ‘মানুষ’ করে তোলার কথা বলতে গিয়ে স্বর্ণকুমারী সেই সময়েই প্রশ্ন করেছিলেন, “বাহিরের শিক্ষাই কি পুরুষদের একমাত্র শিক্ষা? ঘরের শিক্ষা কি তাঁহাদের জীবনের উপর কোনই কার্য্য করে না? মাতার দুগ্ধের সহিত, ভগিনীদের খেলাধূলার সহিত, আত্মীয় সম্পর্কীয় মহিলাদের কথাবার্ত্তার সহিত, স্ত্রীর গল্পের সহিত কি পুরুষদের শিক্ষা জড়িত নহে?”

সুতরাং পথ কী?

পথ কোনটা জানার পাশাপাশিই জানতে হয় কোনটা কোনটা আদতেই কোনও পথ নয়। “পুনর্বিবাহই বিধবাদের বেঁচে থাকার পথ হইতে পারে না” এই কথাটা স্বর্ণকুমারীই সর্বাগ্রে বলেছিলেন। বলেছিলেন এবং করেওছিলেন। অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের সঙ্গে শিক্ষিতা মহিলাদের সম্মিলন ঘটাতে পারলে শিক্ষা এবং চেতনার যে ব্যাপ্তি ঘটতে পারে তা গাছের ওই একদিকে রোদ পড়ে অসম বিকাশের সমস্যার এক মীমাংসা ঘটাতে পারে বলেই মনে করেছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। সে কারণেই বিধবাদের গতি করতে আবার বিয়ে দেওয়া নয়, বিধবাদের পড়াশোনা শিখিয়ে, বিবিধ প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের অন্তরের বিকাশকে পথ করে দেওয়াটাই পথ বলে মনে করেছিলেন তিনি। ১২৯৩ বঙ্গাব্দে ভারতী পত্রিকাতেই ‘আর একটি প্রস্তাব’ প্রবন্ধ লেখেন স্বর্ণকুমারী। প্রস্তাবে জানানো হয় “স্ত্রী শিক্ষার ভিত্তি ও উপায় স্বরূপ আমাদের দেশের শিক্ষিতা মহিলা ও অন্তঃপুরবদ্ধা মহিলাদিগের পরস্পর মেলামেশা সদ্ভাব বৃদ্ধির জন্য” সখি সমিতি গঠিত হচ্ছে। বিধবাদের আবার বিয়ে না দিয়ে তাদের পড়াশোনা করিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন স্বর্ণকুমারী, যাতে তাঁরা অন্তঃপুরের অন্য মহিলাদের এবং শিশুদের পড়াশোনা শেখাতে পারেন। ১৮৮৫ সালে গঠিত হওয়া সখি সমিতি নানা অনুদান সংগ্রহ করেই অল্পবয়স্কা বিধবা ও কুমারীদের বৃত্তির বন্দোবস্তও করে। পড়া শেষ হলে তাঁদের শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত করার দায়িত্বও ছিল সখি সমিতির। ধর্ষিতাদের জন্য উকিল দিয়ে মোকদ্দমা চালিয়ে যাওয়া, মেয়েদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করতে মেলার আয়োজন, মহিলাদের অভিনয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল সখি সমিতির কাজের অন্যতম মূল। ১৮৮৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বেথুন কলেজের মাঠেই সখি সমিতির উদ্যোগে মহিলা শিল্পমেলা আয়োজিত হয়। ‘আর একটি প্রস্তাব’ প্রবন্ধে স্বর্ণকুমারী জানিয়েছিলেন, “যতটা অর্থ সঞ্চিত হইয়াছে, তাহাতে আপাততঃ কয়েকটি বিধবাকে বেথুন স্কুলে দিতে পারা যায়। বেথুন স্কুলে দেওয়া অপেক্ষাকৃত অল্পব্যয় সাধ্য আর সেখানে থাকিলে এই সমিতির কর্ত্রীগণ সর্বদা তত্ত্বাবধারণ করিতে পারেন, এই জন্যই বেথুন স্কুলে দিবার কথা বলিতেছি। বিধবারা স্কুলে বাস না করিয়া শুদ্ধ পড়িবার নিমিত্তে সেখানে যাতায়াত করিলে বোধ করি তাহাতে ধর্ম্মবিরোধী আচরণ ঘটিবে না। তাঁহাদের নিজের শিক্ষা শেষ হইলে তাঁহারা যখন অন্তঃপুরে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করিবেন, তখন সমিতির নিকট হইতে তাঁহারা বেতন পাইবেন।”

এই যাঁর ক্ষমতায়নের ধারণা, যিনি এভাবে বিকল্পের অনুসন্ধান করেছেন, পিতৃতন্ত্রকে প্রশ্ন করেছেন, তাঁকে সুচারুভাবেই ইতিহাস মনে রাখার তালিকা থেকে সরিয়ে ফেলবে এ অস্বাভাবিক কিছু না। অস্বাভাবিক এটাই যে এখনও লিঙ্গসাম্য বা ক্ষমতায়ন বিষয়ে আলোচনা হলেও স্বর্ণকুমারী সেখানে পঠিত বা আলোচিতই নন। ঠাকুরবাড়ির কন্যা হয়েও “woman more ambitious than ability”-র ট্যাগলাইন জুড়ে যায়, অথবা সভা সমিতি করতে গিয়ে মাতৃত্বের দায় থেকে কতখানি চ্যুত হয়েছেন স্বর্ণকুমারী, সমাজ সেই সব প্রশ্ন তুলে বিকল্প অনুসন্ধানের পথ থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়ে মস্করা করে। শুধু কবি, সাহিত্যিক হিসাবে নয়, একজন সংগঠক হিসাবে, নারী আন্দোলনের নেতৃত্বের মুখ হিসাবে স্বর্ণকুমারী দেবীকে চর্চার প্রয়োজন, আরও খননের প্রয়োজন। তবে সুখের খবর এটাই, যে দেরি হলেও স্বর্ণকুমারী দেবীকে নিয়ে চর্চা বাড়ছে, স্বর্ণকুমারী দেবীর জন্মদিনকে সামাজিক লিঙ্গ বৈষম্য বিরোধী দিবস হিসাবে পালনের আহ্বানও উঠেছে। ভুলে যাওয়া সহজ, মনে রাখার কঠিন কাজ সবকালেই কেউ না কেউ ঠিক করে চলেন। সেখানেই বিকল্প, সেখানেই অন্য এক চিন্তা। সেই চিন্তার রিহার্সাল জারি থাক আজন্ম।

Leave a Reply