Souvik-Sarkar

অন্ধকার যখন রাখাল হয়, তখন হাড়ের কুঞ্জবনে বাঁশি বাজে। যা শুধুমাত্র মাংস, তা ভ্রমর হয়; যা শুধুমাত্র বস্তুপিণ্ড, তা আকাশ হয়; যা শুধুমাত্র আকার, তা রূপ হয়। নক্ষত্র শরীরে নামলে, শরীর অন্তরীক্ষ হয়ে অন্তহীনতায় ভেসে যায়। মধুরের ঘাটে নৌকা কে বাঁধে ― কার মন? যে অবশ হয়েছে, যার চোখের পলক পড়ছে না আর, যার সমস্ত অস্তিত্ব ফুল হয়ে গেছে। রূপ কী না করে ― শক্তিকে প্রেমে ভেঙে তছনছ করে, তারপর তুলোর মতো ভাসিয়ে দেয় বাতাসে। হে বাতাস, যে প্রেমে পড়ে তুলো হয়েছে, তাকে তুমি কোথায় ওড়াও?

বিদর্ভের তরুণ রাজা সুরমান যখন মৃগয়া করতে গিয়ে ঘন অরণ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে হারিয়ে গেলেন, তখন ঢাক ঢোল থেমে গেল। বৃদ্ধ মন্ত্রী তাঁবুতে ফিরে এসে বললেন, রাজা ইচ্ছে করেই হারিয়েছেন। হারিয়ে যেতে তাঁর ভালো লাগে। সেই জন্যেই মৃগয়া করতে এসেছেন, পশু মারতে নয়। তোমরা চিন্তা কোরো না। কয়েকদিন পরেই উনি ফিরে আসবেন। ততদিন আমাদের ছুটি। পাত্র মিত্র বিটের দল বলল, কিন্তু এ তো রীতিমতো বিপজ্জনক। রাজার এ ব্যবহার সংগত নয়। তরুণ হলেও, রাজা তো বটে। মন্ত্রী বললেন, সুরমানের পিতা অর্চিষ্মানের মন্ত্রী আমি। ওকে ছোট থেকে দেখছি। ও সুর নিয়ে জন্মেছে। ওর ভেতর যতটা রাজা, ততটাই শিল্পী। ও গন্ধর্ব। অথচ ওকে রাজা হতে হল। মহারাজ যুদ্ধে নিহত না হলে এই ছাব্বিশ বছর বয়সে ও রাজা হত না। মাথায় মুকুট উঠল ওর, হাতে এল রাজদণ্ড। অথচ ওর শিল্পীসত্তা? কী হবে তার? যে ছেলেটার গলা খুলে দিলে আকাশের যাবতীয় নক্ষত্র নেমে আসে ঘাসে, সেই ছেলেটা দিনরাত রাজ‍্যের কাজে ডুবে আছে। এ দশা যার হয়, কেবল সে জানে। কর্ম আর আনন্দকে মেলাতে পারা সহজ কথা নয়। আজ বহুদিন পরে ও হারিয়েছে। ওকে হারাতে দাও। ও নিজের কাছে ফিরে যাক। নিজের সঙ্গে কথা বলুক। রাজারও তো ছুটি লাগে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গহন অরণ্যে রাজা সুরমান ঘোড়া ছুটিয়ে ক্লান্ত হয়ে দেখতে পেল অদূরেই একটি টলটলে পুষ্করিণী। সে ঘোড়াটিকে ছেড়ে দিয়ে তার পিঠ চাপড়ে বলল, যা খেয়ে নে কিছু। অশ্ব নিবিষ্ট মনে প্রভূত লতাগুল্মের মধ্যে থেকে বেছে বেছে তার আহার্য ভক্ষণ করতে লাগল। সুরমান লতাগুল্মের জাল ভেদ করে পুষ্করিণীর দিকে এগিয়ে হল বিস্মিত। পুকুরের জলে খেলা ক‍রছে একরাশ পদ্মফুল? নারী এমনভাবে পদ্ম হয়? তাহলে পুকুর কি কেবলই পুকুর? সখীপরিবৃতা কেন্দ্রীয় নন্দিনী যেন শরৎকালের আত্মীয়। সুরমানের যাবতীয় শরীর পাখি হল। তার হৃদয়ে ডানা এল। সে আকাশ দেখেছে জলে, তার কি আর মানুষ হওয়া সাজে? সে দেখছে বৃক্ষলতার আড়াল থেকে কীভাবে সেই নারীর স্তনমণ্ডলে শুকতারার মতো জ্বলে উঠছে জলবিন্দুরা। কীভাবে তার মসৃণ পৃষ্ঠদেশ গৌড়সারংয়ের মত আন্দোলিত। কীভাবে তার গভীর নাভির ভেতর থেকে শিউলি ফুলের মতো ঝরে পড়ছে জলকুসুম। এ কি নারী না গান্ধর্বী? সু্রমান বুঝল, একেই পেতে হবে। ইনি যে-ই হোন না কেন।

কামতাড়িত রাজা পুকুরে ঝাঁপ দিল। অথচ সে সাঁতারে তেমন পটু নয়। জলে হাবুডুবু খেতে লাগল সে। নারীর দল চমকিত হল। সখীপরিবৃতা রমণী হাঁসের মতো সাঁতার কেটে তাকে ডাঙায় তুলল। যখন জ্ঞান ফিরল রাজার তখন সন্ধ‍্যা হয়েছে। একটি তাঁবুর ভেতরে প্রদীপের আলোয় রাজা উঠে বসল। দেখল পাশে বসে সেই নারী। সুরমান বলল, আমি মৃত‍্যুর ভেতর দিয়ে কোথায় জেগে উঠেছি? এ স্বপ্নের অধিক। এ কোন পারের ঘটনা? স্মিত হেসে নারী বলল, আপনি জীবিত। বিশ্রাম করুন। সুরমান জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? নারী বলল, আমি অবন্তীরাজদুহিতা, কুমুদিনী!

কিছুদিন পর সুরমান যখন ফিরল নিজের রাজধানীতে, তখন সে একা নয়। তার সঙ্গে কুমুদিনী। খবর গেল অবন্তীতে। রাজ‍্যবাসী মেতে উঠল। বিবাহ হল সম্পন্ন। আকাশে উড়ল আবির, বাতাস মুখরিত হল বাদ্যে, সঙ্গীতে। বৃদ্ধ মন্ত্রী চোখের জল ফেললেন। শৈশবে মাতৃহারা, যৌবনে পিতৃহারা ছেলেটি তো তাঁরই পুত্রের মতো। হোক না রাজা, তবু সন্তান তো! বিবাহ শেষে মন্ত্রীকে প্রণাম করলেন সুরমান ও কুমুদিনী। মন্ত্রী অশ্রুসজল চোখে বললেন, পরিপূর্ণ হও ধরণীর মত, বিস্তৃত হও রাজ‍্যের মত, হৃদয়বান হও অরণ্যের মত।

বিবাহশেষে ফুলশয্যার রাত। সুরমান বীণা বাজিয়ে গান শোনাল কুমুদিনীকে। অভিভূত কুমুদিনী। এ কী অপূর্ব কন্ঠ! এ ঐশ্বরিক। সঙ্গীতের মাতনে কুমুদিনীর শরীরে বাসনা পল্লবিত হল। সে সুরমানের সঙ্গে কামক্রীড়ায় আবিষ্ট হল। শৃঙ্গারের রসে পৃথিবী হল পরিপূর্ণ। তবু বাধল বিরোধ। সুরমান সেই মুহূর্তে আবিষ্কার করল যে রতিক্রিয়ায় সে অপারগ। সে শীতল। সংগম করার শক্তি তার নেই। নারী পুরুষের কাছে যা চায়, তা সে নারীকে দিতে পারবে না। যা শুরু হয়েছিল অসামান্য মাধুর্যে, তা পর্যবসিত হল অপরিসীম তিক্ততায়। কুমুদিনীর মুখ ঘৃণায়, হতাশায়, বিরক্তিতে কুঁচকে গেল।

সে সুরমানকে বলল, ছিঃ। এই তোমার পৌরুষ! এই তোমার ক্ষমতা! তুমি আমার জীবন যৌবন অস্তিত্ব আনন্দ পদ্ম নদী আকাশ সরোবর নষ্ট করেছ! তুমি একটি কীট! তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ।

সুরমান বলল, নিজের সম্পর্কে আমার এ বিষয়ে ধরণা থাকলে আমি বিবাহ করতাম না। আমি ঠকাইনি তোমাকে।

কুমুদিনী বলল, কিন্তু আমি তো ঠকেছি! এ ফাঁকি কী করে ভরব আজ রাতে? আমার পুরুষ চাই! তোমার মতো অ-পুরুষে আমার কাজ চলবে না।

সুরমান বলল, কিন্তু আমাকে কি আমার মত করে গ্ৰহণ করা যাবে না? আমার তো গান আছে, মনন আছে, ভালবাসা রয়েছে। সেসব কি কিছুই নয়?

কুমুদিনী বলল, তোমার যাবতীয় গান নষ্ট, তোমার অতুলনীয় কন্ঠ অশ্রাব্য, তোমার কন্দর্পকান্তি রূপ ঘৃণ্য! তুমি উল্টো-শিব! ফল অথচ মাকাল। পাখি অথচ ডানা নেই। তোমার অস্তিত্বের যাবতীয় গুণ নষ্ট হয়ে গেছে শুধুমাত্র এই কারণে। তুমি অবান্তর আজ। তোমার গানে আমার শরীরের জ্বালা জুড়োবে না।

সুরমান হতবাক হয়ে গেল। অকথ্য বেদনায় তার শরীর নীল হয়ে উঠল। কুমুদিনী বলল, প্রহরীকে ডাকো।

প্রহরী এল। কুমুদিনী তাকে নিয়ে চলে গেল রাজপ্রাসাদের গোপন শৃঙ্গারকক্ষে। সমস্ত রাত সুরমান অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় বীণা বাজাল। নীরব প্রাসাদের আনাচে কানাচে সেই সুর ঘোমটা-পরা অশ্রুকন্যার মত ছুটে বেড়াতে লাগল। সে সুর পৌঁছল বৃদ্ধ মন্ত্রীর কানে। মন্ত্রী গভীর রাতে জেগে উঠে বললেন, ছেলে আমার কাঁদছে কেন? তিনি তাড়াতাড়ি সুরমানের প্রাসাদে এসে পৌঁছলেন। একী! সুরমান একা কেন? কুমুদিনী কোথায়? যে যামিনী আনন্দধারায় সিক্ত হবার কথা ছিল, সেই নিশিথিনী এমন বিষাক্ত হল কী করে? সুরমানের কাছে সব শুনে বৃদ্ধ মন্ত্রী স্তব্ধ হলেন। কী করবেন তিনি? মন্থর পায়ে হেঁটে গেলেন ভোরের দিকে।

এরপর প্রায় প্রত‍্যহই কুমুদিনী রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে শৃঙ্গারকক্ষে অতিবাহিত করতে লাগল। সুরমান বাধা দিল না। নীরব যন্ত্রণায় কেঁপে চুপ করে গেল। রাজ‍্যে খবর ছড়াল রানির শৃঙ্গারের জন্যে সখাগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। রাজ‍্যের লোক তাদের অতিপ্রিয় রাজার এমন দুর্দশা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। একদিন সুরমানের কানে খবর এল, কুমুদিনী বাহ্লিকরাজার সেনাপতির সঙ্গে চলে গেছে। সুরমানের শরীর ঝরাপাতার মতো কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল। বৃদ্ধ মন্ত্রী এলেন। সুরমানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝলেন, সুরমান আর কথা বলতে পারছে না। সে বাকশক্তি হারিয়েছে। সুতীব্র আঘাতে বোবা হয়ে গেছে সে। তার চোখের দৃষ্টি উন্মাদের মত। মন্ত্রী সুরমানকে বুকে জড়িয়ে আতর্নাদ করে ওঠেন, হে বিধাতা! এ কী করলে?

রাজ‍্যের রাজা বোবা হয়েছে, এ খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল রাজ‍্যে। যে রাজ‍্যের রাজা কথা বলতে পারে না, সে কী করে রাজ‍্যশাসন করবে? বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করল সুরমানকে উৎখাত করার জন্য। বৃদ্ধ মন্ত্রী সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বিদ্রোহ দমনে গিয়ে মৃত‍্যুর স্রোতে ভেসে গেলেন। সুরমান তখন তার নিভৃত কক্ষে বসে বীণা বাজাচ্ছে। পৃথিবীর জয় পরাজয় নিয়ে তার কোনো আগ্ৰহ নেই। তার কানে যখন সংবাদ এল যে বৃদ্ধ মন্ত্রী নেই, সে তখন শিশুর মতো ঝরঝর করে কেঁদে আবার উন্মত্তের মতো বীণা বাজাতে শুরু করল। সুরমানের জীবনে আর কেউই রইল না। শুধু সুর ছাড়া। সে ক্রমশ সুরের ভেতর আরও ডুবে গেল। কে কী ভাবল, কে কী করল, কে সিংহাসন থেকে তাকে টেনে হিঁচড়ে ফেলে দেবে ― এতে তার বিন্দুমাত্র আগ্ৰহ নেই। তার অস্তিত্বের ভিত টলে গেছে, এখন সে নিজের ভেতরে পা রাখবার জায়গা খুঁজছে। বিদ্রোহীরা সিংহাসন দখল করল। বোবা রাজার মাথা কামিয়ে ঘোল ঢেলে কারাগারে নিক্ষেপ করল। পদাঘাতে ভেঙে দিল তার বীণা।

এমনই সময় রাজ‍্যে লাগল মড়ক। হাজারে হাজারে লোক মরতে শুরু করল। রাজ‍্য ছেড়ে দলে দলে মানুষ পালাতে শুরু করল। বিদ্রোহীদের দল রাজ‍্যের এই দশা দেখে সিংহাসন পরিত‍্যাগ করে পালাল। একদা শস্য, সৌন্দর্য ও ধনরাশিতে পরিপূর্ণ রাজ‍্য শ্মশানে পরিণত হল — যেখানে রাজপথে থরে থরে পড়ে থাকা মৃতদেহ ঠুকরে খেতে লাগল শকুন, চিল আর কাকের দল। যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে শিশুদের মৃতদেহ মুখে করে তুলে নিয়ে যেতে লাগল শেয়াল আর ভামের দল। যেখানে বাতাসে বিষ, জলে তমসা।

কারাগারের দারোয়ান সুরমানকে মুক্ত করে বলল, তুমি পালাও! আমিও পালাই। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে আমি পালিয়ে যাব অন্য রাজ্যে। এখানে থাকলেই মরতে হবে।

সুরমান বহুদিন পরে রাজপ্রাসাদের বাইরে পা দিল। রাজ‍্যের অবস্থা দেখে জল এল চোখে তার। তবু ভূতের মতো এই খাঁ-খাঁ রাজধানী ছেড়ে সুরমান চলে গেল শান্ত গোদাবরীর ধারে অরণ‍্যে। তার মলিন পোশাক, তার মুখে শ্মশ্রুগুম্ফের জঙ্গল। সে যেন পূর্বজন্মে রাজা ছিল। এখন সে পথের কাঙাল।

গোদাবরীর ধারে ধীবরপল্লি। রোজ ভোরে জেলে সর্দার নৌকো করে তুলতে আসে মাছ। সেদিন ভোরে তার মাছের জালে ধরা পড়ল একটি মানুষ। কে? ওরে দ্যাখ রে তোরা দ্যাখ। ও কি মরে গেছে? বেঁচে আছে? আমাদের গণেশ কবিরাজ ওকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে নিশ্চয়ই। সেদিন সকালেই সর্দার ফিরল গ্ৰামে। কবিরাজের কাছে গেল জলে ভেসে আসা দেহ। সর্দার জিজ্ঞেস করে, কী গো কবিরাজ ― এই লোক বাঁচবে তো? কবিরাজ গম্ভীর গলায় বলে, দেখছি। অবস্থা ভালো নয়, সর্দার। তবু সেরে ওঠে মানুষটি। কে সে? তার পরিচয় কী? লোকটি বলতে পারে না। বোবা নাকি? কোথাকার লোক। লোকটি চুপ করে গোদাবরীর ধারে বসে থাকে। তার চোখে মুখে বাতাস ও সূর্যের আলো এসে হাত বুলিয়ে যায়। তার ভালো লাগে। একদিন কবিরাজ সর্দারকে ডেকে বলে, সর্দার তুমি কি জানো লোকটা কে? সর্দার বলে, বুঝতে পারি না। গোঁফ দাড়িতে ঢাকা মুখ। কথা কইতে পারে না। কী যেন ভাবে সারাক্ষণ। দেখে পাগলের মতো মনে হলেও পাগল ও নয়। কিন্তু ও কে, তা বলা কঠিন। কবিরাজ তার জোব্বার ভেতর থেকে বের করল একটি আংটি। এ কী! এ তো রাজার আংটি! সর্দারের চোখ বিস্ফারিত হয় ― শুনেছিলাম বটে দেশের রাজার বোবা ধরেছে। কেমন যেন পাগল হয়ে গিয়েছে। তাহলে এই কি সেই রাজা? আমাদের রাজা? সুরমান?

হঠাৎ বেজে উঠল অপরূপ বাঁশির সুর। কে বাজায় এই বাঁশি? সর্দার ও কবিরাজ তাদের কুটিরের বাইরে এসে দ্যাখে গোধূলির আলোয় একদল রাখাল ছেলে ঘিরে ধরেছে রাজাকে, আর রাজা তাদেরই কারোর একটি বাঁশি নিয়ে বাজাচ্ছে। সর্দারের চোখ জলে ভরে এল ― বিধাতার কী লীলা! দেশের রাজা আজ নিঃস্ব। সবাই ছেড়ে গেছে তাকে ― সময়, নারী, রাজছত্র, ক্ষমতা, পাত্র মিত্র ― কিন্তু সুর ছাড়েনি তাকে। সর্দার বলল, কবিরাজ, আজ থেকে রাজা আমার কুটিরে থাকবে।

সর্দার কুটিরে সুরমানকে নিয়ে এল। সেইখানে সর্দারের মেয়ে পারুলের ওপর দায়িত্ব পড়ল রাজার দেখাশুনা করার। পারুল ষোড়শী। চাপা রং তার। চেহারা সাধারণ। তাকে দেখে সুরমান উন্মত্তের মতো ব্যবহার করতে লাগল। সে যেন ভীত, সন্ত্রস্ত। কবিরাজ বলল, নারীর কাছে আঘাত পেয়েছে রাজা। এখন নারীকে দেখলে ভয় পায়। পারুল, তুই দূর থেকে রাজার খেয়াল রাখবি, কাছে যাবি না। সেই থেকে পারুল সুরমানের খেয়াল রাখে, কাছে যায় না। সুরমান নদীর ধারে বসে আড়বাঁশি বাজায়। সেই বাঁশির সুরে যেন সে বিধাতাকে কিছু বলতে চায়। যেন সে বলতে চায়, কেন এই দহন দিলে, কেন এই জীবন দিলে, ফিরিয়ে নাও! পারুল দূর থেকে অবাক হয়ে শোনে সে বাঁশি। তার যৌবন আসে সুরের পথে। যে লোকটা পুড়ছে, সে একসময়ে রাজা ছিল। যার গান শোনার জন্য দেশের লোক উদগ্ৰীব হয়ে থাকত, আজ সে বোবা। পারুলের মায়া হয় লোকটার জন্য। যন্ত্রণা কাকে বলে তার একটা ধারণা পায় সে।

একদিন সকালে গোদাবরীর ঘাটে পারুল বস্ত্রাদি প্রক্ষালন করছিল। এমনই সময় একটি আর্তচিৎকার শোনা গেল। কী হয়েছে? পারুলকে ধরেছে কুমির। তাকে টেনে জলের ভেতরে নিয়ে চলেছে। সকলে স্তম্ভিত। এ ঘাটে, এ দিকে তো কুমির আসে না। আজ এল। সকলে দিশেহারা। এমনই সময়ে সবাইকে হতবাক করে দিয়ে কুটির থেকে সর্দারের কুঠার হাতে ছুটে এসে জলে ঝাঁপ দিল সুরমান! অথচ সে সাঁতার জানত না। কোথায় গেল তার জড়তা? কোথায় গেল তার ভয়? গভীর আক্রোশে সে বারংবার কোপ মারতে থাকল কুমিরটিকে। কুঠারের কোপে গোদাবরীর জল লাল হল। কুমির পারুলকে ছেড়ে পালিয়ে গেল জলের গভীরে। সুরমান টলোমলো পায়ে জল থেকে উঠল অচৈতন্য পারুলকে নিয়ে।

সেদিন রাতে স্তিমিত প্রদীপের আলোয় নিদ্রামগ্ন ছিল পারুল। তার শিয়রে ম্লান শুকতারার মতো জেগে বসেছিল সুরমান। সঙ্গে ছিল কবিরাজ। পারুলের হাতে পায়ে মলম লাগানো। জ্বরে তার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। এমনই সময়ে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল সর্দার। সে গিয়েছিল অন্য গ্ৰামে মাছের বেসাতি করতে। পারুলকে দেখে আঁতকে উঠল সে। কবিরাজ আশ্বস্ত করল তাকে ― চিন্তা কোরো না। পারুল সেরে উঠবে কয়েক দিনেই। এরপর কবিরাজ আড়ালে সর্দারকে ডেকে সমস্ত ঘটনার কথা বলল।

সর্দার সাশ্রুলোচনে রাজার সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়াল। কোনও কথা বলল না। সুরমান সর্দারের দিকে তাকাল। যে পৃথিবী এতকাল তাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, সেই পৃথিবী আজ বহুদিন পরে তার দিকে তাকিয়েছে। ঘৃণার আগুন থেকে আজ বহুদিন পরে সে উঠে দাঁড়িয়েছে। সুরমানের শরীরের অনেক ভেতরে আজ বৃষ্টি হল।

পারুল যেদিন সেরে উঠল, সেদিন ধীবরপল্লিতে হল উৎসব। গান-বাজনা-নাচ-রসিকতায় ভরে উঠল পল্লির আনাচ কানাচ। সুরমান বসে রইল তার নির্জনতায়। কুটিরের ভেতর। এত লোক, এত উৎসব, এত আনন্দে তার কুন্ঠা আসে। তার ভয় করে। এমনই প্রদীপের আলোয় আধেক-উজ্জ্বল ঘরে এল পারুল। সে এসে বলল, আপনি আমায় জীবনদান করেছেন। অথচ আপনার চোখে ভয় দেখেছি আমি। আপনার নীরবতায় শুনেছি চিত্রকূট পর্বতের আহত বাঘের চিৎকার। আপনি যা বলতে পারেন না, অথচ জানেন ― আপনার সেই জ্ঞান আপনাকে বোবা করেছে। আমি বলি, অভিশপ্ত জ্ঞান ত‍্যাগ করুন। একটা না-পারা কীভাবে রাজত্ব করতে পারে আপনার মনে? আমি আজ রাতে, আপনাকে গ্ৰহণ করছি আপনার সমস্ত না-পারা নিয়ে। হে অভিশপ্ত রাজা, আমার পতি হন। আপনার সঙ্গে ঘর করতে চাই। এই গোদাবরীর তীরে! এ কি খুব শক্ত? একসময়ে আপনি রাজা ছিলেন, আমি বরাবরই সামান্য। আমাদের বয়সের, অভিজ্ঞতার বিস্তর তফাৎ। তবু আপনি আমার পুরুষ। আপনি যেমন, আপনাকে তেমনভাবেই গ্ৰহণ করব আমি। ভয় পাবেন না। জীবন অফুরান। তমসার স্মৃতি মুছে আলোয় পা ফেলুন। এখনও অনেক আলো পড়ে আছে আকাশে বাতাসে।

সুরমান অনুভব করল, বহুদিন পর তার ভেতরের ঘরের বাতায়নগুলি কে যেন ধাক্কা দিয়ে খুলে দিল। আলো ঢুকতে লাগল। কবেকার বোঝা যেন কমে এল। এ কী কথা বলে গেল ষোড়শী!

বিবাহ হল। বাসরঘরে জ্বলল প্রদীপ। ধীবরপল্লি রাশহীন অশ্বের মতো উন্মত্ত হয়ে উঠল। সুরমান সর্দারের কুটিরের নির্জন পালঙ্কে মাথা নীচু করে বসে রইল। ঘরে ঢুকল পারুল। সে অনাবৃতা। তার মণিবন্ধে জুঁইফুলের কঙ্কণ। কন্ঠে তার বেলকুঁড়ির মালা। কপালে তার শ্বেতচন্দনের টিপ। তার বিভাজিকায় ম‍ৎস‍্য-চিহ্নিত উল্কি। কোমরে তার নাগকেশরের মালার মেখলা। পায়ে বনফুলের নুপূর। সুরমান অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল পারুলের দিকে। তার মনে হল পারুলের মতো রূপসী কাউকে সে এ পৃথিবীতে দেখেনি। পারুল যেন স্বর্গের দেবী। সে যেন আশ্রয়। সে যেন শীতল জল।

পারুল এগিয়ে এসে সুরমানের মুখমণ্ডলে তার নরম উদর স্পর্শ করে দাঁড়াল। তারপর বলল, এই গর্ভ নিয়ে ভাববেন না― এ গর্ভ আমি মৃত‍্যুর হাতে তুলে দিয়েছি। আমি আপনাকে চাই। আপনার জন্য আমি অপেক্ষা করব। অভিশাপের তমসা ফুঁড়ে আবার বেরিয়ে আসবে আপনার কন্ঠস্বর। আমি সেই দিনের অপেক্ষায় থাকব। এ পৃথিবীতে আপনার বহু কাজ বাকি থেকে গেছে। সেই কাজ আপনাকে করতে হবে। আপনি আবার আপনি হয়ে উঠবেন। আমার কামনা, আমার শরীরের কথা ভাববেন না। আমি সব বুঝেশুনেই একাজ করেছি। আমরা একসঙ্গে হাঁটব, একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গে ভেসে যাব আবহমানকাল।

সুরমানের চোখের কোণা থেকে গড়িয়ে পড়ল জল। তার মুখের কোণায় ফুটে উঠল স্মিত হাসি। সে পারুলকে আলিঙ্গন করল। তার মনে হল, কত হাজার বছর পরে সে কাউকে নিজের হৃদয়ের পাশে পেল। কত হাজার জন্ম পরে। সুরমান গাঢ় চুম্বন করল পারুলকে। বাইরে ধীবরপল্লিতে স্পন্দিত হতে লাগল মদ্যপ ধামসা।

মহাকালের কাস্তে কাটতে লাগল সোনালি দিনের মতো শস্য তার স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায়। সুরমানের জীবন গোদাবরীর জলে ধুয়ে গেল। কতকাল পরে সে ঘুমোতে পারছে। কতকাল পরে তার পৃথিবীকে পৃথিবী মনে হচ্ছে। কতকাল পরে তার ভেতরে সুরের জন্ম হচ্ছে।

একরাতে আকাশ কালো করে এল সর্বনাশা ঝড়। পুরনো পৃথিবীকে হেঁচকা টানে দিল ফেলে। যা ছিল, তা রইল না। ভেতরের যাবতীয় বাধা বাইরের ঝড়ে গেল উড়ে। সুরমান ও পারুল কুটিরের ক্ষুদ্র কক্ষে হল আলিঙ্গনাবদ্ধ। কক্ষস্থিত প্রদীপবর্তিকা মহাক্রোধে একবার নিজের আগুনের শরীরকে ফুলিয়ে তুলে দপ করে নিভে গেল। পারুলের বাতাসে পাখির মতো উড়ে গেল সুরমান। কোনো বিচার নেই, কোনো আঘাত নেই, কোনো অবমাননা নেই, কোনো চাওয়া নেই। সেখানে শুধুই সহানুভূতি, সেখানে শুধুই মুক্তি, সেখানে শুধুই বন্ধুত্ব। দুজনার চোখে জল। মধুর ছুঁয়েছে তারা। হয়েছে হরিণ।

প্রভাত এল ফুলের ওপর কোমল পদচিহ্ন রেখে। ঘুম ভেঙে সুরমান বললেন, পারুল!

চমকিত রাজা নিজে। আত্মহারা পারুল। ফিরেছে সে, ফিরেছে। অসম্ভবের দেশ থেকে ফিরেছে নৌকো। মৃত‍্যুর জল থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে জীবন। জাগ্ৰত হয়েছে নিদ্রামগ্ন চরাচর।

কবিরাজ বললেন, এ মহাচমৎকার! এমনও হয়!

আকাশে মেঘ সেদিন, সুরমানের কন্ঠে বৃষ্টি। ধীবরপল্লি স্তম্ভিত হয়ে শুনছে গন্ধর্বের গান। পারুল ভেসে যাচ্ছে। তার শরীরের যাবতীয় আকাঙ্খায় কে যেন ফুল ছড়িয়ে দিচ্ছে। সর্দার একবার নিজের মেয়েকে দেখছে, একবার রাজাকে। তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে অশ্রুধারায়।

নিশুতি রাত্রে পারুল বলল, রাজা, আপনার দিন ঘুরেছে। অভিশাপ ফুরিয়েছে। এইবার আবার সব নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। আপনার যা প্রাপ্য, তা বাহুবলে নিতে হবে। আপনার রাজ‍্য, আপনার সিংহাসন। আশ্রয়হীন প্রজাদের আশ্রয়স্থল হতে হবে। আপনি মহীরুহ, নিজের লক্ষ্যে নিজেকে প্রসারিত করুন!

সুরমান বলল, একসময়ে আমি পারতাম। সে ক্ষমতা ছিল আমার। কিন্তু এখন কি আর পারব? আজ বুকের ভেতরে শাখা প্রশাখা মেলতে দ্বিধা আসে। আমার যে জন্ম দেবার ক্ষমতা নেই আজও ―

পারুল বলল, কে বলেছে? আপনি পিতা, আমি মাতা। আমরা জন্ম দেব— সুসময়ের।

পারুলের কথায় শিহরিত হল সুরমান। এইবার সে আলো দেখতে পাচ্ছে, সে লক্ষ‍্যবস্তু দেখতে পাচ্ছে, সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে।

বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। পারুল বলল, রাজা, বিদ্যুতের মানে কী?

সুরমান বলল, যে খুঁজতে গিয়ে নিজেকে হারিয়েছিল, সে হারিয়ে-যাওয়া নিজেকে খুঁজে পেল।

পারুল বলল, বৃক্ষ মানে কী?

সুরমান বলল, যে নিজের স্বভাবকে স্বীকার করে নিজের মাটিতে শিকড় ছড়াতে পেরেছে।

পারুল বলল, মানুষ মানে কী?

সুরমান বলল, এমন একটি কাহিনি যেখানে সম্ভাবনার শেষ নেই।

বৃষ্টি নামল ঘোর রাতে। সুরমানের গলায় নামল মল্লার। পারুল ক্রমশ ময়ূর হয়ে উঠল।

1 মন্তব্য

Leave a Reply