তৃণমূলের কেক উৎসব হবে। তাই অন্য কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে না, করতে গেলে পেটানো হবে উদ্যোক্তাদের। মার খাবেন এই মুহূর্তের বাংলা থিয়েটার তো বটেই, সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা অমিত সাহা। গোটা ঘটনার নিশ্চুপ দর্শক হিসাবে রাজ্য মন্ত্রিসভার শোভা বৃদ্ধি করবেন নাট্যব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসু। একটি শব্দও উচ্চারণ করবেন না আরেক নাট্যব্যক্তিত্ব তথা তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ অর্পিতা ঘোষ।

এটাই এখন পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক জগতের চেহারা। এলাকায় এলাকায় লুম্পেন, সমাজবিরোধীদের দাপট। একতরফা দাদাগিরি। তাদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছেন থিয়েটারের মানুষজন। কিন্তু মুখে রা কাড়তেও ভুলে যাচ্ছেন তৃণমূলের অন্দরে থাকা নাট্যব্যক্তিত্বরা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সমকালীন বাংলা থিয়েটারের অন্যন্ত জনপ্রিয় মুখ অমিত সাহা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলার নাট্যমঞ্চে দাপিয়ে অভিনয় করে আসছেন তিনি। একের পর এক নাটকে তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। পরিচালক হিসাবে বলতে পারি, অমিত এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা। কেবল মঞ্চেই নয়, সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজেও অমিতের অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের মত মূলধারার সিনেমার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচালকরা বারবার অভিনেতা হিসাবে ভরসা রেখেছেন অমিতের উপর, অমিত ভরসা করার মত অভিনেতা বলেই।

সেই অমিতকে মারধর করল তৃণমূল কংগ্রেস। অপরাধ? তৃণমূলের কেক উৎসব থাকা সত্ত্বেও অমিতরা নাট্য উৎসবের আয়োজন করেছিলেন।

পূর্ব কলকাতা বিদূষক নাট্যমণ্ডলী ওই এলাকার একটি সুপরিচিত নাটকের দল। অমিত ওই দলের সদস্য এবং নাটকের নির্দেশক। বেলেঘাটা রাসমেলা মাঠে তাঁরা ২৪-২৫ ডিসেম্বর দুদিনের নাট্য উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। উৎসবের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে ২৩ তারিখ অমিত এবং দলের সম্পাদক অরূপ খাঁড়া রাসমেলা মাঠে যান। তখন স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব তাঁদের উপর চড়াও হয়। শাসক দলের স্থানীয় নেতারা দাবি করেন, ২৪ ডিসেম্বর বেলেঘাটায় তাঁদের কেক উৎসব রয়েছে। তাই অন্য কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না। তারপর কোনো কথা বলার অবকাশ না দিয়েই অমিতকে মারধর করা হয়, মারতে মারতে মাঠের বাইরে নিয়ে আসা হয়, নাট্য উৎসবের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়। স্থানীয় যে মানুষজন অমিতদের সমর্থন করছিলেন, নাট্য উৎসবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদেরও হুমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে বিদূষক নাট্যগোষ্ঠী নাট্য উৎসব মুলতুবি করে দেন।

অমিত
পূর্ব কলিকাতা বিদূষক নাট্যমণ্ডলীর প্রেস বিজ্ঞপ্তি

থিয়েটারের একজন মানুষ হিসাবে এই ঘটনাকে আমি আমার ব্যক্তিগত অপমান হিসাবে নিচ্ছি। এই ঘটনা সহ্যের অতীত। রাজ্যের শাসকের স্পর্ধা সব সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। বাংলার থিয়েটারের ইতিহাসে গত কয়েক দশকে এমন ঘটনা ঘটেনি – এটা স্পষ্ট করে বলা জরুরি।

নাট্য আন্দোলনের একজন কর্মী হিসাবে জানি, সব সরকারের আমলেই সহিষ্ণুতার অভাব ছিল। কোনো সরকারই ধোয়া তুলসীপাতা নয়। আমার মনে পড়ছে, তিস্তাপারের বৃত্তান্ত নাটকটি চলার সময় তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের সহিষ্ণুতার অভাব ছিল। তারপরেও কিছু ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষিপ্ত ঘটনা, কিন্তু নিঃসন্দেহে সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু তৃণমূল আমলে যা চলছে, তার সঙ্গে কোনো তুলনা হয় না। এই আমলে লুম্পেনদের লাগামছাড়া হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে থিয়েটারের লোকজনকে।

অমিতের মত একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতাকে ধরে পেটানো হচ্ছে, এমন ঘটনা আগের আমলে ভাবা যেত না। অমিত জানিয়েছে, ও কথা বলতে চেয়েছিল, আলোচনা করতে চেয়েছিল। তাতেই চড়থাপ্পড় মারা শুরু হয়। তারপর আরও মার। এমন একজন অতিপরিচিত অভিনেতার সঙ্গেই যদি এমন ঘটে, তাহলে বাকিদের সঙ্গে কী হতে পারে সহজেই অনুমেয়। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, এমন ঘটনা বাম জমানায় ঘটেনি। নজির খুঁজতে গেলে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জমানায় ফিরে যেতে হবে। আমরা শুনেছি কল্লোল নাটক চলার সময়ে কংগ্রেসের গুন্ডারা এমন হামলা করত। তৃণমূল সেই অন্ধকার ফিরিয়ে এনেছে।

আমি বারবার একটা কথা বলি, তা হল তৃণমূলের অন্দরে থাকা নাট্যজনেরা গোটা থিয়েটার জগতের সঙ্গে বেইমানি করছে। নাটকের লোকজন রাজনৈতিক দলে বড় পদে রয়েছেন, এরকম তো আগে কখনো ঘটেনি। বাংলার নাট্য জগতের দুই মুখ ব্রাত্য বসু এবং অর্পিতা ঘোষ। একজন শাসকদলের নেতা, একজন মন্ত্রী। ব্রাত্য তো অমিতকে সরাসরি চেনেন। তাঁর তো প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল সোচ্চার হওয়ার। অথচ তিনি চুপ। এর আগে নাট্যব্যক্তিত্ব শুভঙ্কর দাসশর্মাকে হেনস্থা করা হয়েছে। সেই ঘটনাটি ঘটেছিল ব্রাত্য বসুর বিধানসভা এলাকা দমদমে। তিনি রা কাড়েননি। এমন উদাহরণ আরও দেওয়া যায়।

আসল কথা হল, বাংলায় গণতন্ত্র উচ্ছন্নে গেছে। একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন কি আমরা তুলব না? এই কেক উৎসব কি রীতিমত অশ্লীল নয়? আজকের বাংলার যা অবস্থা – চাকরি নেই, কাজ নেই, হবু শিক্ষকরা রাজপথে, সরকারি কর্মীরা ডিএ পান না। এর মধ্যে এমন উৎসব তো অশ্লীলতা ছাড়া কিছু নয়। কেক উৎসব কেন হবে? চলচ্চিত্র উৎসব যে ভঙ্গিতে হল, তাও অতীব অশ্লীল। সর্বত্র মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। বলিউড নিয়ে আদেখলেপনা, বলিউডের সুপারস্টারদের নিয়ে আদিখ্যেতা। চলচ্চিত্র উৎসবের তো প্রতিস্পর্ধী হওয়ার কথা। তার বদলে এসব কী! বাম সরকার ত্রুটিহীন ছিল না। সমালোচনার বহু জায়গা ছিল। কিন্তু সেই আমলে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে জানুসির মতো মানুষ আসতেন, বলিউড সুপারস্টারকে ভাড়া করা হত না। আসলে এগুলো প্রতীক মাত্র। তৃণমূল আমাদের যাবতীয় অর্জনকে ধ্বংস করছে। ঠিক যে কাজটা বিজেপি করছে দিল্লিতে বসে।

আরো পড়ুন টিনের তলোয়ারের ৫০ ও ‘প্রোপাগ্যান্ডিস্ট’ উৎপল দত্ত

অমিতের উপর আক্রমণ আসলে গোটা থিয়েটার জগতের উপর আক্রমণ। হয় আমরা রুখে দাঁড়াব, নয়তো লুম্পেনদের দাপট আরও বাড়বে। মন্ত্রীরা চুপ করে দেখবেন বা তাঁরাও হামলাকারী হয়ে উঠবেন। এটা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত সকলের বুঝে নেওয়া ভালো।

মতামত ব্যক্তিগত। ঘটনাবলী নাগরিক ডট নেট স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করেনি

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.