আজফার হোসেন

“তত্ত্ব কাকে বলে? যিশু বলেছেন, ‘আমি আর আমার পিতা এক।’ এ হল তত্ত্ব। পিতার সঙ্গে আমার যে ঐক্য সেই হল সত্য ঐক্য, ম্যানেজারের সঙ্গে কুলির যে ঐক্য সে সত্য ঐক্য নয়।” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটো ছবির দিকে তাকানো যাক।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রথম ছবিতে কোটপ্যান্ট পরে ডাণ্ডা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর চোখ থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে জ্বলজ্বলে দ্যুতি। আরেক ছবিতে দেখি, রবীন্দ্রনাথ আলখাল্লা পরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখে লেগে আছে বিকেলের রোশনাই। সাহেব ট্যাগোর ও ঋষি রবীন্দ্রনাথ?

প্রশ্নটা এত সহজে তোলা গেলেও তার উত্তরটা বোধ করি অত সহজেই মেলে না। যদিও প্রশ্নটা একটি সহজ ও সরল বিভাজনকে সামনে আনে (এবং যদিও তথাকথিত উত্তর-আধুনিকতাবাদের সুবাদেই কেউ কেউ যে কোনো বিভাজনকেই ফর্মুলা মাফিক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন), প্রশ্নটি বর্তমান সময়ের তাগিদেই খতিয়ে দেখা জরুরি। এও জানিয়ে রাখি, ওই প্রশ্নটা আমার নয়। প্রশ্নটি তুলেছেন শেক্সপিয়র গবেষকরা খোদ শেক্সপিয়রের জন্মস্থানেই, এই কিছুদিন আগে। সাদা সমালোচকদের একটা দল প্রশ্নটির উত্তরও দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বটে: রবীন্দ্রনাথ যেমন সাহেবও ছিলেন, তেমনি তিনি ঋষিও ছিলেন। পশ্চিম বা ‘উত্তর’ থেকে আসা এই উত্তর আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। কেন মনে হয়নি, তা পরে বলব। তার আগে ওই প্রশ্নের সূত্র ধরেই আরেকটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করতে হয়।

না, কেবল পশ্চিমি পঠনপাঠনের প্রোটোকল মানা তুলনামূলক সাহিত্য সমালোচনাই যে শেক্সপিয়র ও রবীন্দ্রনাথকে হ্যাঁচকা টানে একই জায়গায় আনার চেষ্টা করেছে তা নয়, একটি আবক্ষ মূর্তিও সেই কাজটা করেছে বটে। এই মূর্তিটি খোদ রবীন্দ্রনাথের। বেশ কয়েক বছর আগে শেক্সপিয়রের জন্মস্থান স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভনে তৈরি করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের একটি আবক্ষ মূর্তি। পশ্চিম মুলুকে রবীন্দ্রনাথকে তেমন একটা পাত্তা দেওয়া হয়নি বলে যেসব রবীন্দ্রভক্ত গলা ফাটিয়ে আক্ষেপ করেছেন, তাঁদের জন্য এটি হয়ত সুসংবাদ। কিন্তু লক্ষ করা দরকার, এই মূর্তিটির সঙ্গে ইংরেজি তর্জমায় রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতাও উৎকীর্ণ করা হয়েছে। কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ শেক্সপিয়রকে শুধু সালামই ঠুকছেন না, সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা গদগদ হয়েই শেক্সপিয়রকে পশ্চিমি সভ্যতার উজ্জ্বল গৌরব হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। সত্য, পশ্চিমা ‘সভ্যতা’কে রবীন্দ্রনাথ অনেকবারই সালাম ঠুকেছেন; ‘সভ্যতা’ বর্গটাও রবীন্দ্রনাথ বেশ আগ্রহ নিয়েই ব্যবহার করেছেন বারবার।

কিন্তু এ-ও সত্য, রবীন্দ্রনাথ ওই সভ্যতার সমালোচনাও করেছেন বারবার (শুধু ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধেই নয়)। সেই ১৯০১ সালে রচিত তাঁর ‘সমাজভেদ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ “[…] যাহা প্রাচ্যসভ্যতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তাহা সাহেবিয়ানা, কিন্তু য়ুরোপীয় সভ্যতা নহে। যে আদর্শ অন্য আদর্শের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ তাহা আদর্শই নহে”। ঠিক এর পরপরই রবীন্দ্রনাথ আরো বলছেন, “সম্প্রতি য়ুরোপে এই অন্ধ বিদ্বেষ সভ্যতার শান্তিকে কলুষিত করিয়াছে”।

হ্যাঁ, বিদ্বেষ বিরোধী, সভ্যতায় বিশ্বাসী, মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ শেক্সপিয়রকে আন্তরিকভাবেই যে প্রশংসা করবেন তাতে বিস্মিত বা ক্ষুব্ধ হওয়ার কিছু নেই। আমি মোটেই রবীন্দ্রনাথের উদাত্ত শেক্সপিয়র প্রীতির সমালোচনা করার জন্য কথাগুলো বলছি না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মূর্তি ও তাঁর শেক্সপিয়র ভক্তি নিয়ে কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। সেগুলো খেয়াল করা দরকার।

স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভনে ওই দৃশ্যটা ইতিমধ্যে জমে উঠেছে বেশ: পূর্বের এক ঋষি কবি ইংরেজ সভ্যতার অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধি শেক্সপিয়রকে নমস্কার জানাচ্ছেন। অবশ্যই একজন কবির কাছে তাঁরই অগ্রজ আরেক কবি কিংবা নাট্যকার ভীষণ নমস্য হয়ে উঠতেই পারেন। বিভিন্ন কারণেই তো শেক্সপিয়র আমাদের নমস্য, যেমন রবীন্দ্রনাথও। কিন্তু এর মধ্যে উদারনৈতিকতাকে রীতিমতো ফুর্তিতে রূপান্তরিত করে একদল সমালোচক ওই স্ট্র্যাটফোর্ড নামের ঝলমলে টুরিস্ট শহরে শেক্সপিয়র ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের ভেতর দিয়েই পশ্চিম ও পূর্বের মিলন দেখেছেন। মিলন? কিন্তু লক্ষ না করে উপায় নেই যে, রবীন্দ্রনাথের ‘আইকনিক’ মূল্য ও বিনিময় মূল্যকে এক বিন্দুতে টেনে এনে রবীন্দ্রনাথের এক ধরনের প্রদর্শনী মূল্য যেমন তৈরি করা হয়েছে, ঠিক তেমনি শেক্সপিয়রকে আরও মহান করার তাগিদেই রবীন্দ্রনাথের নতজানু ভক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেটা করা হয়েছে এমনভাবে, যে রবীন্দ্রনাথের প্রদর্শিত সম্মানকে সম্মান দেখতে গিয়েই চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে আরেকটি সংস্কৃতি কেবল সম্মানিতই হচ্ছে না, তা একটি আধিপত্যবাদী অসম ক্ষমতা সম্পর্কও তৈরি করেছে বটে। হ্যাঁ, ভাবটা এমন যে, সবার উপরে শেক্সপিয়র, তাঁহার উপরে নাই। কিন্তু সাদা মানুষদের বাহবা ছাড়া যারা জাতে উঠছেন না বলে মনে করেন, তাঁরা কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ‘সম্মানিত’ হতে দেখে মহা খুশি। অন্যদিকে পশ্চিমি উদারনৈতিকতা সমস্ত অসম ক্ষমতা সম্পর্ককে বিভিন্নভাবে আড়াল করেই মিলনের গান গেয়ে চলেছে অবিরাম। কিন্তু সেই ‘সমাজভেদ’প্রবন্ধের বিশ বছর পরে ১৯২১ সালে লেখা ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বেশ জোর দিয়েই জানিয়েছেন, “ম্যানেজারের সঙ্গে কুলির যে ঐক্য সে সত্য ঐক্য নয়” যদিও অবশ্যই বলা যাবে যে ঐক্য বা মিলন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এটি একমাত্র অবস্থান নয়।

এখানে এ-ও বলে নেওয়া দরকার, যে বর্তমান রচনায় রবীন্দ্রসমগ্রের কোনো বিশেষ মূল্যায়ন আমার উদ্দেশ্য নয়; তা সম্ভবও নয়। রবীন্দ্রনাথের কাজের বিস্তার ও বহুমাত্রিকতাকে বিবেচনায় রাখলে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া মোটেই সহজ কম্ম নয়। এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল না—এমনি একটি ধারণা বেশ চালু আছে। আমি মনে করি, এ ধারণায় তেমন কোনো বাড়াবাড়ি নেই। বিশ্বসাহিত্য ও তুলনামূলক সাহিত্যের একজন ছাত্র হিসেবে উনিশ ও বিশ শতকে আমি এমন কোনো কবির সন্ধান পাইনি, যিনি ফর্ম ও বিষয়ের বিস্তার ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথকে টপকাতে পারেন। এখানে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ ও নিবন্ধের কথাও সঙ্গত কারণেই চলে আসে। প্রথমত ও প্রধানত কবি ও গীতিকার হলেও রবীন্দ্রনাথের কাজের বিশাল জায়গা জুড়ে থাকে তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও ছোট রচনাসহ অনেক চিঠি। এসব কাজ আবারও রবীন্দ্রনাথের বিষয়বৈচিত্র্য ও বিস্তারকেই নির্দেশ করে বৈকি।

একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক। তিনি ভারতের ইতিহাস নিয়ে লিখতে গিয়ে ইউক্লিডের সরলরেখার দৌড় দেখিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে অকেজোও প্রমাণ করেছেন। উত্তরাধুনিকতাবাদীদের কেউ কেউ হয়তো ১৯১১ সালে লিখিত রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ ‘ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা’-র এই পঙক্তিতে বেশ মজা পাবেন “সোজা লাইনের সমাপ্তিহীনতা, সোজা লাইনের অতি তীব্র তীক্ষ্ণ কৃশতা বিশ্ব প্রকৃতির নহে”। অবশ্য ‘উত্তরবাদী’ ও সাবঅলটার্ন ইতিহাসতাত্ত্বিক রণজিৎ গুহের পোয়াবারো হয়েছে এর মধ্যেই। তিনি রবীন্দ্রনাথের ইতিহাসতত্ত্ব নিয়ে একটা নাতিদীর্ঘ বই লিখে ফেলেছেন। এছাড়া যেমন রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন গণিত ও সঙ্গীতের মিল নিয়ে, ঠিক তেমনি তিনি লিখেছেন ভেষজবিদ্যা ও সংস্কৃতির ‘অত্যুক্তি’ নিয়ে। আবার যেমন তিনি লিখেছেন কৃষি ও পরিবেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এবং যেমন তিনি লিখেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ নিয়ে, তেমনি লিখেছেন তিনি ছেলে-ভুলানো ছড়া নিয়ে, শূন্যের মাজেজা নিয়ে, দান্তের বিয়াত্রিচে ও পেত্রার্কের লরা নিয়ে, কবিওয়ালাদের গান নিয়ে, ব্যঙ্গ ও কৌতুকের অন্তর্নিহিত তত্ত্ব নিয়ে, নীতিবিদ্যা নিয়ে, বিশ্বসাহিত্য নিয়ে, জাতীয় সাহিত্য নিয়ে, সমালোচনা ও সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে। এমনকি তিনি ১৯৩৪ সালে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিয়ে একটি ছোট্ট ভক্তিমূলক রচনা লিখেছেন, যেখানে তিনি ইসলামকে বড় ধর্ম ও শান্তির ধর্ম হিসেবে দেখেছেন। আর শিক্ষা তো রবীন্দ্রনাথের একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। কমপক্ষে পঞ্চাশটির বেশি প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখেছেন ওই বিষয়ের উপর।

এছাড়া রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ ও পুরুষতন্ত্র নিয়েও, তাঁর নিজস্ব মানবতাবাদী অবস্থান থেকেই। হ্যাঁ, ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ সরাসরি ‘ইম্পীরিয়ালিজম’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধ লিখে ফেলেন, যেমন ১৮৯২ সালে তিনি লিখেন ‘ক্যাথলিক সোশ্যালিজম’ও ১৮৯৩ সালে ‘সোশ্যালিজম’ শিরোনামের প্রবন্ধ। ওই ১৮৯২ সালেই রবীন্দ্রনাথ আরেকটি প্রবন্ধ লেখেন, যার শিরোনাম ‘আমেরিকানের রক্তপিপাসা’। প্রবন্ধটির শিরোনামই তার প্রতিপাদ্য বিষয়কে সরবে ঘোষণা করে। রবীন্দ্রভক্তদের কেউ কেউ এ-ও মনে করেন যে, রবীন্দ্রনাথ এই প্রবন্ধে ‘অরাবীন্দ্রিক’ ভাষা ব্যবহার করেছেন এভাবে: “মনুষ্যজাতির মধ্যে একটি বিষ আছে; যখন এক জাতি আর এক জাতিকে আহার করিতে বসে, তখন ভক্ষ্য জাতি মরে এবং ভক্ষক জাতির শরীরেও বিষ প্রবেশ করে। আমেরিকানদের রক্তের মধ্যে বিষ গেছে”। আসলে রবীন্দ্রনাথের এই প্রবন্ধটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সংস্কৃতি নিয়ে ২০০২ সালে তৈরি করা মাইকেল মুরের একটি প্রামাণ্য ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই ছবির শিরোনাম বোলিং ফর কলাম্বাইন। এ-ও বলা দরকার, ওই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বেশ জোরেশোরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদ আক্রান্ত, নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত কৃষ্ণাঙ্গদের ও আদিবাসীদের পক্ষ অবলম্বন করেছেন।

উপরে দেওয়া ফর্দটি মোটেই পর্যাপ্ত নয়। তবে এটি পরিষ্কার, রবীন্দ্রনাথ কত শত বিষয় নিয়ে ভেবেছেন ও লিখেছেন। এ কারণে রবীন্দ্রনাথের চূড়ান্ত ও একমাত্রিক চরিত্রায়ন যেমন ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি সহজ হয়ে পড়ে তাঁর স্ববিরোধিতা শনাক্ত করাও। অবশ্যই কেবল স্ববিরোধিতা দেখানোর জন্যই স্ববিরোধিতাকে চিহ্নিত করা এখানে আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে রবীন্দ্রনাথের বিষয়বৈচিত্র্য নিজেই ওই প্রশ্নটাকে সামনে আনতে সাহায্য করে: কোন রবীন্দ্রনাথ? আর সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কাজ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে বৈকি। আর তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার অর্থ রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করা নয়। বরং বর্তমান সময়ের তাগিদেই ও বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাঁকে সম্পর্কিত করার লক্ষ্যেই তাঁর সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়া জরুরি হয়ে পড়ে।

এ বোঝাপড়ার জন্য তাঁর প্রবন্ধ-নিবন্ধকে যথেষ্ট ব্যবহার করা যায়। সত্য, রবীন্দ্রনাথের ‘সৃজনশীল’ এবং ‘মননশীল’ রচনার মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা এঁকে দিয়ে গত অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে অনেকেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গান-উপন্যাস-গল্প-ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে যতটা কথাবার্তা ও লেখালেখি এবং গবেষণা করেছেন, তাঁর প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে ততটা তাঁরা করেননি। যদিও তাঁর প্রচুর শক্তিশালী প্রবন্ধ ও নিবন্ধ রয়েছে, তাত্ত্বিক প্রবন্ধসহ। এখানে আমি তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধের তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত গুটিকয়েক দিককে সামনে আনতে চাই, তার বেশি কিছু নয়। তার আগে রবীন্দ্রনাথের কাজ নিয়ে অন্তত একটা প্রশ্ন সামনে আনা যাক।

সেই ১৯৯৪ সালেই আমাদের সময়ের প্রতিভাবান চিন্তাবিদ ও লেখক আহমদ ছফা একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন। ‘জীবিত থাকলে রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করতাম’ নামের একটি প্রবন্ধে ছফা লিখেছেন, “আমার প্রশ্নটিতে আসি। অত্যন্ত সহজ ও সরল প্রশ্ন। কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মুসলমান প্রজাদের নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ গল্প কিংবা উপন্যাস কেন লিখলেন না?” অর্থাৎ সবচেয়ে কঠিন ও বোধকরি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রবীন্দ্রনাথ হাত দিতে পারেননি, যে কাজে শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের প্রশ্ন জড়াজড়ি করে অবস্থান করে, যে কাজে রাজনৈতিক অর্থনীতি শোষণের আপাত অদৃশ্য এলাকাকে উন্মোচিত করতে চায়, যে কাজে বাস্তবতাকে তুলে ধরা ও চ্যালেঞ্জ করার প্রশ্ন থাকে, যে কাজে এমনকি নিজেকেও নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে হয়, বা নিজেকে নগ্ন করতে হয়, যে কাজে একইসঙ্গে একাত্ম হওয়ার ও আত্তীকরণের অনেক সমস্যাও থাকে। আবার অন্যদিকে আমার প্রিয় পুর্তোরিকান কবি পেদ্রো পিয়েত্রির ওই কথাটাও মনে আসে: সবচেয়ে কাছের মানুষকে নিয়ে লেখা সবচেয়ে কঠিন কাজ। ঐক্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কথাটাও ফিরে আসে খানিকটা ভিন্ন প্রসঙ্গে: জমিদারের সঙ্গে প্রজার যে ঐক্য সে সত্য ঐক্য নয়।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে শুধু জমিদার বলে থেমে থাকা মোটেই যথেষ্ট নয়।

বরং অবিভক্ত ভারতের উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণির উপনিবেশবাদ বিরোধিতার একটি জটিল পর্যায়কে নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথের কাজ। এই পর্যায়কে বোঝার জন্য রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি প্রবন্ধের ‘সিম্পটোম্যাটিক’ পাঠকে সামনে আনা যেতে পারে। সে কারণেই যাব রবীন্দ্রনাথের একটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘শিক্ষার মিলন’-এর কাছে। কিন্তু তার আগে আরও কয়েকটি কথা বলে নিতে চাই।

 

আগেভাগেই, সেই ১৮৯৮ সালে, ভারতে ‘সিডিশন’ বিল পাস হওয়ার এক দিন আগে কলকাতার টাউন হলে রবীন্দ্রনাথ ‘কণ্ঠরোধ’ শিরোনামের যে প্রবন্ধটি পাঠ করেন, তার প্রায় শুরুতেই তিনি একটি স্বীকারোক্তিমূলক উচ্চারণকে আমাদের সামনে হাজির করেন এভাবে: “আমি বিদ্রোহী নহি, বীর নহি, বোধ করি নির্বোধও নহি”। নিঃসন্দেহে এ উচ্চারণে বিনয় আছে, যে গুণটিকে রবীন্দ্রনাথ সুযোগ পেলেই তারিফ করেছেন। আবার আমরা এ-ও জানি, সমাজের শক্তিশালীদের কাছে বিদ্রোহীরা ‘বেয়াদব’ হিসাবে চিহ্নিত হয়। সেটি আরেক প্রসঙ্গ। তবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষ্য মোতাবেক মোটেই “নির্বোধ” নন। জোর দিয়েই বলা দরকার, তিনি অনেক বিষয়ই আগেভাগে দেখতে পেতেন, বুঝে ফেলতেন, ধরতে পারতেন। ওই কথাটা বেশ পুরনো হলেও আবারও ফিরে আসে: কবিরা দ্রষ্টা। রবীন্দ্রনাথও দ্রষ্টা ছিলেন। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

‘ক্যাথলিক সোশ্যালিজম’ ও ‘সোশ্যালিজম’ প্রবন্ধ দুটির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। বোধ করি রবীন্দ্রনাথই ভারতবর্ষে প্রথম দেখতে পেয়েছিলেন যে, ইতিহাসের মঞ্চে ‘সোশ্যালিজম’ হাজির হবে বিজয়ীর বেশেই। উনিশ শতকের শেষদিকে রবীন্দ্রনাথ যা দেখেছিলেন তা ১৯১৭ সালেই প্রমাণিত হয়েছে রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে, যদিও রবীন্দ্রনাথ ও সমাজতন্ত্র একই সঙ্গে যায় না, যদিও ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব রবীন্দ্রনাথকে ভেতর থেকে নাড়া দিতে পারেনি। ইংরেজদের যে ভারত ছেড়ে চলে যেতেই হবে তা-ও আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যদিও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান আগাগোড়া বৈপ্লবিক ছিল না। একজন নজরুল ইসলাম বা একজন ফ্রানৎস ফাঁনোর মতো রবীন্দ্রনাথ চেঁচিয়ে বা চিৎকার করে পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দিতে পারেননি, যদিও উপনিবেশবাদের নৃশংসতাকে রবীন্দ্রনাথ আগেভাগেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তাকে ধিক্কারও দিয়েছিলেন। সেই ১৯০৫ সালে লেখা ‘ইম্পীরিয়ালিজম’প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেন “ব্রিটিশ এম্পায়ারের মধ্যে এক হইয়া যাওয়াই ভারতবর্ষের পক্ষে যখন পরমার্থলাভ, তখন সেই মহদুদ্দেশে ইহাকে জাঁতায় পিষিয়া বিশিষ্ট করাই হিউম্যানিটি। ভারতবর্ষের কোনো স্থানে তাহার অধীন শক্তিকে সঞ্চিত হইতে না দেওয়া ইংরেজ সভানীতি অনুসারে নিশ্চয়ই লজ্জাকর; কিন্তু যদি মন্ত্র বলা হয় ইম্পীরিয়ালিজম, তবে যাহা মহামনুষ্যত্বের পক্ষে একান্ত লজ্জাকর তাহা রাষ্ট্রনীতির পক্ষে চূড়ান্ত গৌরব হইয়া উঠিতে পারে”।

হ্যাঁ, চেঁচিয়ে বা চিৎকার করে কথা বলাটাও রবীন্দ্রনাথের পক্ষে আসলে সম্ভব ছিল না; বরঞ্চ সেটা ছিল তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। চেঁচিয়ে কথা বলার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি নিবন্ধ ফেঁদেছিলেন, যার মূল কথাটা হল এই, যে ‘সভ্য’ লোকেরা চেঁচিয়ে কথা বলে না। আসলে সভ্য, অসভ্যের স্পষ্ট বিভাজনে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ দারুণ আস্থাশীল। এছাড়া জাপানের যে তুমুল বৈষয়িক উন্নতি ঘটবে তা-ও রবীন্দ্রনাথ বেশ আগেই বুঝে ফেলেছিলেন। সর্বোপরি উপনিবেশবাদী সংস্কৃতি ও ঔপনিবেশিক হীনমন্যতা থেকে ভারতবাসীর মুক্তি যে মোটেই সহজ নয়, তা-ও ভালো করেই বুঝেছিলেন, যেমন তিনি বুঝেছিলেন উগ্র জাতীয়তাবাদের দৌড়ও। উগ্র জাতীয়তাবাদের তীব্র সমালোচনাও পাই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে, যদিও রবীন্দ্রনাথ সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে এক অমীমাংসিত টানাপোড়েনেও ভুগেছেন বারবার। বিশেষ করে ১৮৯৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎসভার বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত রবীন্দ্রনাথের গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘বাংলা জাতীয় সাহিত্য’-এ ওই টানাপোড়েনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

এসব দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ একজন দ্রষ্টাই বটে, যিনি আগেভাগে দেখে ফেলেন ও বুঝে ফেলেন। আবার অনেককিছুই একসঙ্গে বুঝতে পারেন বলেই টানাপোড়েনেও ভোগেন। এখানে এ কথাও বলে নেওয়া দরকার, রবীন্দ্রনাথের উপনিবেশবাদ বিরোধিতার গায়েই লেগে থাকে তাঁর ঔপনিবেশিক টানাপোড়েনের বিভিন্ন চিহ্ন। বিষয়টি নিয়ে পরে খানিক আলোচনা করা যাবে।

তাহলে আবার ফিরি জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে। আসলে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে একটি মতাদর্শিক আধিপত্যবাদী ব্লকে শ্রেণি সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে তার উপর নির্ভর করে কোনো বিশেষ জাতীয়তাবাদের অভিক্ষেপ ও অভিমুখ। তবে এ-ও বলা যাবে, উগ্র জাতীয়তাবাদ যে ফ্যাসিস্ট চেহারাও নিতে পারে তার বিস্তর প্রমাণ ইউরোপসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় মেলে। রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার সমালোচনাই করেছেন। এই কারণে দেখি, আমাদের সময়ের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিখ্যাত বই কালচার অ্যান্ড ইম্পিরিয়ালিজম (১৯৯৩)-এ রবীন্দ্রনাথকে বাহবা জানিয়েছেন, যদিও সাঈদ ও রবীন্দ্রনাথ উভয়েই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে শ্রেণির নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সম্পর্ককে খতিয়ে দেখেননি। এ-ও সত্য, রবীন্দ্রনাথ অনেক ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণাকেও পরিত্যাগ করতে পারেননি। বিষয়টি অবশ্য সাঈদের চোখে পড়ার কথা নয়, কেননা সাঈদ নির্ভর করেছেন কেবল জাতীয়তাবাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি বক্তৃতার ওপর।

আরেকটি কথা এখানে দ্রুত উল্লেখ না করে পারছি না। কালচার অ্যান্ড ইম্পিরিয়ালিজম-এ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সাঈদের ঘোর ও অভিভব কাজ করেছে এমনভাবে, যে রবীন্দ্রনাথকে সাঈদ তৃতীয় বিশ্বের লড়াকু ও বিপ্লবী তাত্ত্বিক ও লেখকদের — অর্থাৎ এমে সেজেয়ার, সিএলআর জেমস, ফ্রানৎস ফাঁনো, আমিলকার কাব্রালের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এঁরা সবাই আন্তর্জাতিকতাবাদী, যদিও এঁরা জাতীয়তাবাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদান অন্বেষণ করেছেন এবং একইসঙ্গে বিশেষ করে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতাও লক্ষ্য করেছেন।

হ্যাঁ, জাতীয়তাবাদ, জাতীয় মুক্তির লড়াই ও জাতি এক জিনিস নয়, যদিও জাতিগঠনে ও জাতীয় মুক্তির লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণার ভূমিকা থাকেই। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন সমকালীন তাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন নিজেই, তাঁর সাড়া জাগানো বই ইমাজিনড কমিউনিটিজ (১৯৮৩)-এ। এই বইয়ে অ্যান্ডারসন জাতির সেই বিখ্যাত সংজ্ঞাটাকে সামনে আনেন: “জাতি হচ্ছে কল্পিত রাজনৈতিক কমিউনিটি”। এর মধ্যেই কল্পিত কমিউনিটির ধারণাকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার ও সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু লক্ষ না করে উপায় নেই, যে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১৮৯১ সালে লিখিত ‘নেশন কী’ নামের প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “সুগভীর ঐতিহাসিক মন্থনজাত নেশন একটি মানসিক পদার্থ, তাহা একটি মানসিক পরিবার, তাহা ভূখণ্ডের আকৃতির দ্বারা আবদ্ধ নহে”। যদিও ধর্ম, ভাষা, ভূগোল ইত্যাদি জাতিগঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েছে, তবুও এসবের কোনোটি জাতিগঠনে একমাত্র ও শাশ্বত নির্ণায়কের ভূমিকা রাখে না। রবীন্দ্রনাথের মতে, জাতি গঠনে যা প্রয়োজন, তা হলো ‘দুটি জিনিস। রবীন্দ্রনাথ বলেন, “তাহাদের মধ্যে একটি অতীতে অবস্থিত, আর একটি বর্তমানে। একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর একটি পরস্পর সম্প্রতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছা”। এভাবে অ্যান্ডারসনের আগেই রবীন্দ্রনাথ জাতি সম্পর্কে এ ধরনের ধ্যানধারণাকে সামনে এনেছেন।

হ্যাঁ, হাল আমলের অনেক তত্ত্বের পূর্বাভাসও আমরা রবীন্দ্রনাথের তাত্ত্বিক প্রবন্ধগুলোতে পেয়ে থাকি। অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে। তবে পরিসরের কারণে এখানে একটা উদাহরণই যথেষ্ট হবে।

এডওয়ার্ড সাঈদের ‘প্রাচ্যবাদ’ ধারণাটির পূর্বাভাসও আমরা একদিকে যেমন কাব্রালে পাই, অন্যদিকে তেমনি পাই রবীন্দ্রনাথেও, যদিও আফ্রিকার লড়াকু কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক ও রাজনীতিক কাব্রাল ও রবীন্দ্রনাথ এক পংক্তিতে বসতে পারেন না। যাহোক, ইউরোপের সমালোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ একাধিক জায়গায় নিজেই দেখিয়েছেন, যে পশ্চিম প্রায়শ কিছু ছাঁচে ও আদলে পূর্বকে উপস্থিত করে এমনভাবে যে, পূর্বের ইতিহাস ও সংস্কৃতি তাদের বৈচিত্র্য ও জীবন্ত সত্তা হারিয়ে নিশ্চলভাবে ইউরোপের বিভিন্ন বয়ানে হাজির হয়। রবীন্দ্রনাথ এই নিশ্চলতার বিরুদ্ধে এবং এক অর্থে সাঈদ কথিত উপনিবেশবাদী ও বর্ণবাদী ‘প্রাচ্যবাদ’-এর বিরুদ্ধেই অবস্থা নিয়েছেন। উদাহরণ তাঁর ‘সমাজভেদ’, ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্য’, ‘ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা’ প্রবন্ধগুলো। ‘সমাজভেদ’ থেকে রবীন্দ্রনাথের মাত্র একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চারণ: “সাধারণত এশিয়া-চরিত্রের ক্রুরতা বর্বরতা দুর্জ্ঞেয়তা য়ুরোপীয় সমাজে প্রবাদবাক্যের মতো”।

এবার আসি রবীন্দ্রনাথের ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধটিতে। আমি মনে করি, বর্তমান সময়ের তাগিদেই এবং একাধিক কারণে ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধটি আবারও পাঠ করা দরকার। যদিও রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ দিকে অর্থাৎ ১৯৪১ সালে লেখা ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটিকে রবীন্দ্রনাথের উপনিবেশবাদবিরোধিতার দলিল হিসাবে আদর্শায়িত করার রেওয়াজ এখনো বর্তমান, একটু মনোযোগ সহকারে প্রবন্ধটি পাঠ করলে দেখা যাবে যে এমনকি এই প্রবন্ধেও তিনি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু অবস্থান নিতে পারছেন না। রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমি ‘সভ্যতা’কে ধিক্কার দিচ্ছেন সত্য; কিন্তু এই ‘সভ্যতা’ সভ্যতাই থেকে যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত। আসলে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটিকে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশাভঙ্গজনিত বা বিশ্বাসভঙ্গজনিত দীর্ঘশ্বাস হিসাবে পাঠ করা চলে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “ইংরেজকে একদা মানবহিতৈষীরূপে দেখেছি এবং কী বিশ্বাসের সঙ্গে ভক্তি করেছি। য়ুরোপীয় জাতির স্বভাবগত সভ্যতার প্রতি বিশ্বাস ক্রমে কী করে হারানো গেল তারই এই শোচনীয় ইতিহাস আজ আমাকে জানাতে হল”। রবীন্দ্রনাথ এখানেই থামছেন না। তিনি বলছেন, “জীবনের প্রথম আরম্ভে সমস্ত মন থেকে বিশ্বাস করেছিলুম য়ুরোপের অন্তরের সম্পদ ওই সভ্যতার দানকে। আর আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল”। কিন্তু একটি বিশেষ অর্থে রবীন্দ্রনাথ দেউলিয়া হননি। কেননা ওই প্রবন্ধটির শেষ দিকে তিনি বলেছেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব”। ওই ইংরেজদের প্রতিও তাহলে বিশ্বাস হারানো পাপ? শেষ পর্যন্ত ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আশ্রয় খুঁজেছেন উদারনৈতিক মানবতাবাদেই।

কিন্তু ‘সভ্যতার সংকট’-এর উদারনৈতিক মানবতাবাদের দৌড় যেন রবীন্দ্রনাথ তার আগেই দেখিয়ে দিচ্ছেন ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধটিতে। প্রবন্ধটির কিছু বিষয় সামনে আনা যাক।

 

১৯২১ সালে লেখা ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধটিতে আমরা যে তেজ লক্ষ্য করি, তা সবসময় আমরা রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলোতে তেমন লক্ষ্য করি না। প্রবন্ধের প্রায় শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ বলছেন, “মানুষের সবচেয়ে বড় স্বভাব হচ্ছে মেনে না নেওয়া। জন্তুরা বিদ্রোহী নয়, মানুষ বিদ্রোহী”।

হ্যাঁ, এই মেনে না নেওয়ার বিষয়টি প্রবন্ধের প্রায় সমস্ত অংশেই লক্ষ করার মতো। না, তিনি পূর্বের সবকিছুই মেনে নিতে চাইছেন না, যেমন পশ্চিমের দাপট ও আধিপত্যকেও মেনে নিচ্ছেন না মোটেই। এভাবেই তিনি পূর্ব ও পশ্চিম কোনোটাকেই আদর্শায়িত বা রোমান্টিকায়িত করছেন না। স্পষ্ট করেই তিনি বলছেন, কেবল অতীতে ফিরে যাওয়ায় যেমন মুক্তি নেই, ঠিক তেমনি বর্তমানকে মেনে নেওয়ার ভেতরেও মুক্তি নেই। তবে তিনি প্রবন্ধটিতে “নিখিল মানবের মুক্তির” স্বার্থেই ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যেই পরিবর্তনকামী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। বলেছেন তিনি, “আমাদের সর্বপ্রথম সমস্যা হচ্ছে শিক্ষাসমস্যা”। এই রবীন্দ্রনাথ আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক।

আর এই রবীন্দ্রনাথই বলে দিচ্ছেন যে, পশ্চিমি শিক্ষার অন্ধ অনুকরণে যেমন মুক্তি নেই, পশ্চিমি শিক্ষার অন্ধ বর্জনেও তেমনি অগ্রগতি সম্ভব নয়। পূর্বের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চাইছেন, যে শিক্ষা সর্বসাধারণের মুক্তির পক্ষে কাজ করে না, তা চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে অকেজোই বটে, যদিও রবীন্দ্রনাথের ‘সর্বসাধারণ’এবং মুক্তি’ ও ‘অগ্রগতি’র ধারণা নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে রবীন্দ্রনাথের কাজের স্পিরিটটা স্পষ্ট থাকে: বিদ্যা দখলের স্বার্থে বারবারই প্রশ্ন তোলা জরুরি, যেমন তিনি নিজেই এমনকি ‘মিলন’ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর অন্যান্য ‘মিলন’ ও ঐক্য সংক্রান্ত কাজের অবস্থানের বিপরীতেই।

এ-ও সত্য যে উপনিষদীয় ঐক্য চেতনায় অনেকসময় গদগদ হয়ে রবীন্দ্রনাথ মিলনের ডাক দিয়েছেন আন্তরিকতা সহকারেই। কিন্তু ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ কেবল ওই মিলনকে প্রশ্নই করছেন না; বরঞ্চ এ-ও বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে মিলন অত সহজ নয়, যদিও ওই উপনিষদীয় ঐক্যচেতনাই রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধটির জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বলা যায়, ওই ঐক্যচেতনার এক ধরনের উপনিবেশবাদবিরোধী রাজনীতিকীকরণ ঘটেছে ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধটিতে। তাই মিলনের বিষয়টি প্রত্যাশিত বটে, তবে তা একই সঙ্গে সংগ্রামেরও, যে সংগ্রামের অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে পরিবর্তনকামী ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা, যে শিক্ষা বস্তুজগতের জ্ঞানকে অস্বীকার করে না, যেমন অস্বীকার করে না ভাবজগতের জ্ঞানকেও। বিশ্বের নিয়ম এবং বুদ্ধির নিয়মের পরস্পর সম্পর্কিত লেনদেনকে জরুরি বিবেচনা করে বস্তুজগৎ ও ভাবজগতের মধ্যে কিংবা জীবন ও চেতনার মধ্যে এঁকে দেওয়া সনাতন বিভাজনরেখাকে রবীন্দ্রনাথ অস্বীকার করেছেন। না, রবীন্দ্রনাথ মার্কসের ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ রপ্ত করেননি, যদিও তাঁরই নিকটাত্মীয় এবং স্নেহভাজন কমিউনিস্ট সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুবাদেই রবীন্দ্রনাথ কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সঙ্গে খানিকটা পরিচিত হয়েছিলেন। বন্ধনীতে বলে নেয়া যায়, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরই ভারতে প্রথম কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো অনুবাদ করেন। তা তিনি করেন বাংলা ভাষাতেই।

তাহলে উপরের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখলে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ সাহেব হতে চাননি, এমনকি ঋষিও নয়। নিদেনপক্ষে ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধটিতে তা ধরা পড়ে স্পষ্ট করেই, যদিও আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন মুনাফার স্বার্থেই সাহেবকে ঋষি এবং ঋষিকে সাহেব বানাতে চায়। ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ এই ধরনের লেনদেনের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেন। তিনি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন, বিভিন্নতা বাদ দিয়ে সংহতি কাঙ্ক্ষিত নয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “এই ঐক্যতত্ত্ব সম্বন্ধে আমার কথা ভুল বোঝবার আশঙ্কা আছে। তাই যে কথাটা একবার আভাসে বলেছি সেইটে আর একবার স্পষ্ট বলা ভালো। একাকার হওয়া এক হওয়া নয়। যারা স্বতন্ত্র তারাই এক হতে পারে। পৃথিবীতে যারা পরজাতির স্বাতন্ত্র্য লোপ করে তারাই সর্বজাতির ঐক্য লোপ করে। ইম্পিরিয়ালিজম হচ্ছে অজগর সাপের ঐক্যনীতি; গিলে খাওয়াকেই সে এক করা বলে প্রচার করে”। রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলো এত স্পষ্ট যে এগুলো বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। তবে বলা প্রয়োজন যে, রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলো আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আজকের মার্কিনায়নের মাধ্যমে ইম্পিরিয়ালিজম যে অজগর সাপের ঐক্যনীতি অব্যাহত রেখেছে, তা তো খোলা চোখেই দেখা যায় — কোকাকোলায়ন থেকে দুনিয়ার মার্কিন সামরিকীকরণ পর্যন্ত। তবে রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদের উদারনীতির সঙ্গে উদারপন্থী উদারনীতির যোগাযোগটা তেমনটা ধরতে পারেননি বলে মনে হয়। যেমন ধরতে পারেননি কীভাবে সাম্রাজ্যবাদের ঐক্যনীতি আসলে বিভাজননীতিরই অপর পিঠ — এই বিভাজন ও বৈষম্য শ্রেণির, লিঙ্গের, বর্ণের।

তবে ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বায়ন নয়, একেবারে আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের চিত্র এঁকেছেন এবং তার এক ধরনের সমালোচনাও হাজির করেছেন, সেই ১৯২১ সালেই। তারও আগে, ১৮৪৮ সালে, মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে আরও শাণিতভাবে আজকের গোলকায়নের ছবি এঁকেছেন। যেন মনে হয় “ম্যানিফেস্টোটি গতকাল লেখা হয়েছে,” যে-কথাটা একুশ শতকের গোড়াতে যথার্থই বলেছিলেন পৃথিবীখ্যাত মিশরীয় রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ সমির আমিন। এবার বিশ্বায়ন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু কথা হাজির করা যাক, যদিও রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই ‘বিশ্বায়ন’ বর্গটি ব্যবহার করেননি: “বিজ্ঞানের কল্যাণে জলে-স্থলে-আকাশে আজ এত পথ খুলেছে, এত রথ ছুটেছে যে, ভূগোলের বেড়া আজ আর বেড়া নেই। আজ কেবল নানা ব্যক্তি নয়, নানা জাতি কাছাকাছি এসে জুটল; অমনি মানুষের সত্যের সমস্যা বড়ো হয়ে দেখা দিল। বৈজ্ঞানিক শক্তি যাদের একত্র করেছে তাদের এক করবে কে?… মানুষের যোগ যদি সংযোগ হল তো ভালোই, নইলে সে দুর্যোগ। সেই মহাদুর্যোগ আজ ঘটেছে। একত্র হবার বাহ্যশক্তি হু হু করে এগোল, এক করবার আন্তরশক্তি পিছিয়ে পড়ে রইল। ঠিক যেন গাড়িটা ছুটেছে এঞ্জিনের জোরে, বেচারা ড্রাইভারটা ‘আরে আরে! হাঁ হাঁ’ করতে করতে তার পিছন পিছন দৌড়েছে – কিছুতে নাগাল পাচ্ছেনা। অথচ, একদল লোক এঞ্জিনের প্রচণ্ড বেগ দেখে আনন্দ করে বললে, ‘শাবাশ! একেই তো বলে উন্নতি।’

না, রবীন্দ্রনাথ এই ধরনের ‘উন্নতি’ চান না; আজকের দুনিয়ায় আমরাও চাই না। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিজ্ঞানকে বর্জন করব, পশ্চিমি প্রযুক্তিকে বর্জন করব। কিন্তু যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সর্বসাধারণের মুক্তি আনে না, সেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসম ব্যবহারকে প্রশ্ন করা চাই। সর্বোপরি যে ব্যবস্থা ওই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সবার কাজে ও সবার উন্নতিতে ব্যবহার করতে দেয় না, সেই ব্যবস্থারই খোলনলচে পাল্টে ফেলা জরুরি। এই ব্যবস্থার নাম সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদ। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ওই ব্যবস্থাকে ‘ইম্পীরিয়ালিজম’ নাম দিয়ে খানিকটা শনাক্ত করেছেন বটে, যদিও ওই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দিকে তিনি যাননি। তাই এই রবীন্দ্রনাথকেই ‘নিখিল মানবের মুক্তির’ লক্ষ্যে সম্প্রসারিত করা চাই।

না, পুতুপুতু রাবীন্দ্রিকতা নয়, চাই বর্তমান সময়ের তাগিদেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বোঝাপড়া, যে বোঝাপড়ার উপর রবীন্দ্রনাথ নিজেই জোর দিয়েছেন। আর হ্যাঁ, যে কোনো রবীন্দ্রনাথ পাঠ মানেই একটি অসমাপ্ত পাঠ।

নিবন্ধকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে লিবারেল স্টাডিজ ও ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজের অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত।

আরো পড়ুন

স্বর্ণকুমারী দেবী: স্রেফ রবীন্দ্রনাথের ন’দিদি নন

Leave a Reply