ভারত সরকারের আমলাদের কখনো হালকাভাবে নেবেন না। ভুলে যাবেন না, কেন্দ্রীয়ভাবে মুসৌরির লাবাসনা বা বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব সিভিল সার্ভিস ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোতে যে নকশায় রাষ্ট্র পরিচালনার ট্রেনিং দেওয়া হয় তার আধুনিকতম নকশাটাও ব্রিটিশ আইসিএস ট্রেনিং প্যাটার্ন অনুসারেই তৈরি। এনজিও নিয়ে আলোচনাটা এখান থেকে শুরু করব।

ভারতের কূটনৈতিক ইকোসিস্টেম এমন সিস্টেম বা মডিউল নির্মাণে সর্বদা বিশ্বাসী যার প্রভাব ও ফলাফল সুদূরপ্রসারী; তা সে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাই হোক অথবা অন্য কিছু। আমরা জানি, সত্তরের দশকের আগে ও পরে সারা দুনিয়ায় ঘটে চলা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকদের ক্ষোভ বিক্ষোভ সমান্তরাল ভাবে বহু গণআন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। ওদিকে জনবিক্ষোভ থেকে সরকারগুলোকে বাঁচাতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জসহ তৎকালীন আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলো যেমন সরাসরি কাজ শুরু করে দিয়েছিল, তেমনই এদিকে ভারতবর্ষে ব্যাপক বৈষম্য, কর্মহীনতা, ক্ষোভের আগুনে ফোটা তরুণ ভারতবর্ষকে সামলানো, জনকল্যাণের সরকারি প্রতিশ্রুতিভঙ্গের ফলে ভারত সরকারের প্রতি শ্রমজীবী ভারতবর্ষের তীব্র অনাস্থা ম্যানেজ করা ভারত সরকারের কাছে অন্যতম মাথাব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কাজে এল দীর্ঘমেয়াদি মডিউল প্রতিস্থাপনের চিন্তা। তার ফলেই সরকারি বদান্যতায় এনজিও ব্যবস্থার সূচনা ও বাড়বাড়ন্ত। সরকারী জনকল্যাণমূলক কাজগুলো তৃণমূল স্তরে তাদের দিয়ে করানো গেল, কিছু কর্মসংস্থান সম্ভব হল, বেকার ভারতবর্ষের সামনে নতুন ধরনের একটা কাজের ক্ষেত্র খুলে গেল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পরবর্তীকালে নব্বইয়ের দশকের উদার অর্থনীতির কল্যাণে সেইসব সংস্থাগুলো ফুলে ফেঁপে উঠল বিদেশি অনুদান পেয়ে। যেমন নকশালবাড়ির পরে আর কোনোকিছুই আগের মতো রইল না, তেমনই ভারতের মুক্ত বাজারে বিদেশি পণ্য ও সরাসরি বিদেশি টাকা ঢোকার পরও আর কোনোকিছুই আগের মতো রইল না। তারপরের তিন দশকে ভারতের জনগণ বারবার সরকারি অব্যবস্থা, বৈষম্য এবং সরকারি মদতে হয়ে চলা কালোবাজারির বিরুদ্ধে একাধিকবার পথে নেমেছেন, প্রতিনিয়ত নিজেদের নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকারের দাবিতে লড়াই করছেন। অন্যদিকে সরাসরি নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ভারত সরকার।

এখন জনকল্যাণ, সাম্য এবং বঞ্চনাহীন সমাজ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এনজিওগুলোতে যে তারকারা আছেন, যাঁরা নিজের কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাকে স্টেট অব দি আর্ট বলে প্রচার করেন, আজকের কর্মহীন ভুখা ভারতবর্ষ যদি তাঁদের দুটো প্রশ্ন করে, তাহলে কেমন হবে?

১. এই কয়েক দশকে আপনারই সংস্থায় আপনারই সঙ্গে একইভাবে কাজ করে আপনার মত তারকা হয়ে উঠেছেন এরকম আর একজন সহকর্মীও আছেন কি?

২. যদি থেকে থাকেন তাহলে আপনার বেতন, অন্যান্য আয় এবং প্রভাব প্রতিপত্তি যেভাবে বেড়েছে, তাঁরও তা হয়েছে কি?

এগুলো অবশ্য নেহাতই মোটা দাগের কথা। কিন্তু একথা সত্যিই ভাবার সময় এসেছে, যে এতদিন অন্যের অধিকার নিয়ে কাজ করেও নিজেদের অধিকার, শ্রমিক হিসাবে নিজেদের পাওনাগণ্ডা বুঝে নিতে এনজিও শ্রমিকদের কোনো ইউনিয়ন গঠিত হল না কেন? কেন মহানুভবতার বিজ্ঞাপনের আড়ালে তাদের উপর ঘটে চলা অনিয়ম, বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাদের জন্য ন্যূনতম দিন প্রতি ৭০০ টাকা মজুরির দাবিতে কোনও নেটওয়ার্ক তৈরি হল না? কোনো কোনো এনজিওর মালিক যথেষ্ট বিলাসী ও আয়েশী জীবনযাপন করে থাকেন। তাঁদের সন্তানরা বিদেশে পড়তে যেতে পারে, তাঁরা নিজেরাও কারণে অকারণে বিদেশভ্রমণ করতে পারেন। সে সুযোগ একই সংস্থায় কাজ করা অন্য কর্মচারীদের কেন হয় না তা ভাবা জরুরি।

মহান হওয়ার মোহ বা সমাজকল্যাণের খোয়াবে থাকতে বাধ্য করা হয় সংস্থাগুলোর কর্মীদের। তাদের বলা হয় তারা সমাজকর্মী। এমন “নোবল” জবে আর যা-ই হোক কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকা চলে না। লকডাউনের সময়ে মাসে একবার বিদেশ যাওয়ার অভ্যাসে ছেদ পড়ায় অস্থির হয়ে উঠেছেন কোনো এনজিওর কর্ণধার – এমন দৃষ্টান্তও আছে। বাইরে থেকে গাড়ির দরজা খুলে না দিলে গাড়ি থেকে নামেন না – এমন এনজিও কর্মীও দেখা যায়। এমনও ঘটেছে যে শাসক দলের সংগঠিত যৌন নির্যাতনের শিকার লড়াকু মহিলা সুবিচার পাওয়ার আশায় কোনো এনজিওর সাথে যোগাযোগ করেছেন। তারপর দেখেছেন সেই দলের নেতাদের সাথে ওই এনজিওর কর্তাদের দহরম মহরম। সুবিচারের আশা নিমেষে হতাশায় পরিণত হয়েছে। সকালে ওই সংস্থার বড় কর্তা বিরাট সরকারবিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট সেজে রাস্তায় ছবি তুলেছেন, বিকেলে সেই সরকারের হাত থেকেই হাসিমুখে সেরা সমাজকর্মীর পুরস্কার নিয়েছেন। এই দ্বিচারিতার লজ্জা তাঁরা লুকোবেন কোথায়?

তবে প্রাণপাত কি কেউ করছেন না? রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করছেন, ইউএপিএ আইনে সরাসরি কাজের জায়গা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে দিনের পর দিন জেলেও থাকছেন অনেক এনজিও কর্মী। তাঁরা সত্যিই নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁরা বিরল। তাঁরাই আমাদের লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা।

পরিশিষ্ট: গত ৮ মার্চের কথা। শহরের রাজপথে চলেছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মিছিল। গ্রাম থেকে এসেছে শাসক দলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করা মহিলাদের দল। মিছিলে আছেন বহু সমাজকর্মী, তাঁরা মূলত গ্রাম থেকে পান্তা খেয়ে আসা মহিলাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন, এমনকি কোন পথে কতটুকু বাম দিক বা ডান দিকে তাঁরা হাঁটবেন তা-ও দুহাত তুলে নিয়ন্ত্রণ করছেন। দিনের শেষে রঙিন ছবিতে ভরে উঠল সমাজমাধ্যম, দেখা গেল দুহাত তুলে পান্তা খাওয়া ভারতবর্ষের শ্রমজীবী মহিলাদের মুক্তির লড়াইয়ের পথ আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে পেট ভরে ব্রেকফাস্ট খাওয়া আর লিনেন কাপড়ের ধারাবাহিকতা।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

এনজিও নিয়ে লেখায় অধিকারের প্রশ্ন গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.